বিশ্বে ভারতের পরিচিতি যেভাবে বদলে যাচ্ছে

ভারতের পতাকা- সংগৃহীত

ভারতের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দুনিয়াজুড়ে বিতর্ক চলছে। দিল্লিতে মুসলিম হত্যাকান্ডের পর ভারতের ভাবমর্যাদা দারুনভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদি সমাজের যে দাবি ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব করে আসছিলো তা এখন ভুল প্রমানিত হচ্ছে। ভারত এখন একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদি রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করছে। দিল্লির ঘঁনার পর কূটনৈতিকভাবে মোদি সরকার চরম বিব্রতকর সময় পার করছে। নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে দিল্লির সহিংস ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে ওআইসি পর্যন্ত দেশটির নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এতোটা উদ্বিগ্ন যে ভারতের আদালতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দিল্লির ঘটনার পর জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতারেস উদ্বে প্রকাশ করেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিব নিবিড়ভাবে দিল্লি পরিস্থিতি নজরে রেখেছেন। বিক্ষোভকারীদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংযত থাকা উচিত- এ বিষয়টির ওপরই জোর দিচ্ছেন তিনি। সেইসঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশ শান্ত করা এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলেও মত দিয়েছেন তিনি।’

অপরদিকে ভারতের বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে হস্তক্ষেপ চেয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারে কার্যালয়। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ইস্যুতে কোনও বিদেশি পক্ষের হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার বলেছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাখেলেটের কার্যালয় জেনেভায় অবস্থিত ভারতীয় স্থায়ী মিশনকে এই আবেদনের বিষয়ে অবহিত করেছে।এর আগে বাখেলেট নাগরিকত্ব আইন এবং দিল্লির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পার্লামেন্টে আইনটি পাস হওয়ার পর জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এটিকে চরিত্রগতভাবে মৌলিক বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল। রাভিশ কুমার বলেন, সিএএ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত কোনও ইস্যুতে বিদেশি কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। তিনি আরও বলেন, আমরা স্পষ্ট যে সিএএ সাংবিধানিকভাবে বৈধ এবং সংবিধানের সব মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়কে এখন বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ার জবাব দিতে হচ্ছে। যতই এসব ঘটনাকে আভ্যন্তরিন বিষয় বলা হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে মুসলমানরা যে মোটেই নিরাপদ নয় তা প্রমানিত হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগের আগে কড়া ভাষায় ভারতের নীতির কড়া সমালোচনা করে ওআইসি। নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে দিল্লির সহিংসতার ঘটনায় ৫৪টি মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কর্পোরেশনের (ওআইসি) নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে দিল্লিতে মসজিদ ও মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি ভাঙচুরের নিন্দা এবং এই সহিংসতার শিকার পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করে সংস্থাটি। বিবৃতিতে ওআইসি মুসলিমবিরোধী সহিংসতার জন্য প্ররোচনাকারী ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, মুসলিম নাগরিকের সুরক্ষা এবং সারা দেশে ইসলামি পবিত্র স্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। ওআইসির নেতৃত্বে আছে সৌদি আরব। দেশটি এখন ভারতের ঘনিষ্ট মিত্র। সরাসরি সৌদি আরব এ ঘটনায় মুখ খোলেনি। ওআইসির এই বিবৃতিতে সৌদি আরবের অনুমোদন আছে বলে মনে করা হয়। যথারীতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ওআইসির বিবৃতির কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওআইসি’র বক্তব্যকে উল্টো ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভিশ কুমার বলেন, ‘ভারতে মুসলিমদের উপর সহিংসতার যে অভিযোগ করেছে ওআইসি, তা দায়িত্বজ্ঞানহীন’। তিনি আরো বলেন ‘দিল্লিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। সংগঠনগুলোর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য থেকে বিরত থাকুন।’

মুসলিম বিশ্বের আরেক প্রভাবশালী দেশ তুরস্ক নাগরিকত্ব আইনের বিভিন্ন সময় সমালোচনা করেছে। এমনকি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দিল্লির ঘটনায় মুসলিম গনহত্যার অভিযোগ করেন এ ব্যাপারে বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায় ভারত। এর আগে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের পাশে থাকার ঘোষণা দেন এরদোয়ান। সেখানে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন কাশ্মীরীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় দিল্লিতে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ভারত। ভারতের ঘটনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কথা বলছেন। ভারতের মুসলমানরা নিরাপদ নয় বিভিন্ন ফোরামে ইমরান এমন কথা আগেও বলেছেন। যা এখন অনেকটা সত্য প্রমানিত হচ্ছে।
শুধু ওআইসি কিংবা তুরস্ক নয় ভারতের বন্ধু দেশ হিসাবে পরিচিত দেশগুলোও হিন্দুত্ববাদের উন্থানে শংকা প্রকাশ করেছে। ভারতের আরেক ঘনিষ্ট মিত্র দেশ হচ্ছে ইরান। ভারতের সাথে ইরানের মিত্রতা অনেক পুরানো। কিন্তু দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরানের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করা হয়। সম্ভবত ভারতের নীতি হচ্ছে মুসলিম ইস্যুতে যে দেশ কথা বলুক না কেন তার প্রতিবাদ করা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ টুইটারে এক বার্তায় লিখেন ‘বহু শতাব্দী ধরে ইরান ভারতের বন্ধু। আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সব ভারতীয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং কান্ডজ্ঞানহীন অপরাধী না হয়ে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছি। শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও আইনের শাসনই সামনে এগোনোর পথ’। হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের মন্তব্যের জেরে দেশটির রাষ্ট্রদূত আলী চেগেনিকে তলব করে ভারত। এনডিটিভির খবরে বলা হয় জানিয়েছে, দিল্লিতে নিযুক্ত চেগেনিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তবে এ ব্যাপারে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া সম্পুর্ন ভিন্নপন্থা গ্রহন করে। দেশটিতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দিল্লির ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। শুধু যে মুসলিম দেশগুলো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা নয় ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন কিংবদন্তি রক ব্যান্ড পিংক ফ্লয়ডের সহপ্রতিষ্টাতা রজার ওয়াটার্স। দিল্লি বিক্ষোভকারীদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে লন্ডনে সংহতি জানিয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত গীটারিস্ট রজার।

ভারতে সম্প্রতি নাগরিকত্ব আইন পাস হওয়ার পর পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে সিএএ’র বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত গীটারিস্ট রজার বলেন, ‘ভারতে মোদি সরকারের নেতৃত্বে সিএএ নামক ফ্যাদিবাদী আইন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ওই আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চারে প্রতিবাদ করছেন।’ এরপরই একটি কাগজ হাতে তুলে নেন রজার। তিনি বলেন, ‘এটি ভারতের এক তরুণ কবির লেখা। আমরা হয়তো তাকে চিনি না। তার নাম আমির আজিজ। তিনিও একজন আন্দোলনকারী।’ এরপরই মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমির আজিজের কবিতা আবৃত্তি করেন তিনি। বিভিণœ দেশ ও ব্যক্তি ছাড়াও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ভারতের এমন পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন আগেই সর্তক করেছিলো। এ ঘঁনার পর এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে ঘৃণাবাদী বক্তব্য দিয়ে ভারতের যেসব রাজনৈতিক নেতা সহিংস পরিবেশ তৈরি করছে তাদের অবিলম্বে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানায়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মতো নেতারা সিএএ ইস্যুতে ঘৃণাবাদী বক্তব্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু কোনও নেতার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভারত আঞ্চলিক শক্তি থেকে পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু দেশটির আভ্যন্তরিন পরিস্থিতির কারনে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে উদারনৈতিক দেশগুলোতে ভারতের ভাবমর্যাদা দারুনভাবে ক্ষুন্ন করছে। বিশ্ব পরিসরে ভারতের প্রভাব আরো সঙ্কুচিত করে ফেলছে।