আফগানিস্তান আশাবাদী, ভারত অস্বস্তিতে, পাকিস্তান উল্লসিত

তালিবান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি সম্পাদিত হয় দোহা চুক্তি - আনাদুলু

আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে সেদেশের যুদ্ধরত তালিবান এবং দখলদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি সম্পাদিত দোহা চুক্তিকে অনেকে বলেন, এটি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের দলিল। তারা এখন যে কোনোভাবেই হোক, আফগান রণাঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এ চুক্তি তারই একটা রোডম্যাপ মাত্র।


সমালোচকরা তো কত কথাই বলে। তাদের কথাই যে সর্বাংশে সত্য হবে, তা মোটেই নয়। আর ভবিষ্যতে কী হবে, সেটাও ভবিষ্যতেরই ব্যাপার। আসুন, দেখা যাক বর্তমানে কী হচ্ছে, কারা কী ভাবছে। দেখা গেছে, তালিবান-মার্কিন চুক্তিটি দক্ষিণ এশিয়ায় নানা রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। চুক্তিটি নিয়ে পাকিস্তান উল্লসিত, ভারত অস্বস্তিতে আর আফগানিস্তান সতর্ক আশাবাদী।


আফগানিস্তানে শান্তি এলে ভারত কেন অস্বস্তিতে ভুগবে? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কারণ আছে। কারণটা হলো, আফগানিস্তানে ইতিমধ্যে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের মতো পুঁজি বিনিয়োগ করেছে ভারত। এদিকে তালিবান-মার্কিন চুক্তির ফলে নিকট-ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরবে তালিবান - এমন সম্ভাবনা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। ভারতের দুর্ভাবনা হলো, তেমনটি হলে তার বিশাল বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তো!


এদিকে ভারত যখন তার বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্বস্তিতে ম্রিয়মান, পাকিস্তান তখন চাপা উল্লাসে ফেটে পড়তে চাইছে। কারণ, আফগানিস্তানের তালিবানের সাথে পাকিস্তানের বন্ধুত্বের কথা সবাই জানে। তাই তালিবান যদি আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরে, তবে পাকিস্তান ওই দেশের ওপর তার হারানো প্রভাব ফিরে পাবে। পাশাপাশি তার পশ্চিম সীমান্তও নিরাপদ হবে।


কাবুলে তালিবান সরকার গঠিত হলে দেশটির ওপর থেকে নিজের প্রভাব খর্ব হবে - শুধু এমন আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন নয় ভারত। তারা এর সাথে এও ভাবছে, কাবুল-ইসলামাবাদ মিলিত শক্তির প্রভাবে ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের আকাশেও কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে পারি ভারতের ''হিন্দুস্তান টাইমস''-এর একটি প্রতিবেদনের কথা। এতে বলা হয়, ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল গত বছরের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন প্রধানমন্ত্রী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতভুক্ত করে নেন।


তালিবান-মার্কিন চুক্তির পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে - এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে গোয়েল তখন আরো বলেছিলেন, চুক্তি সম্পাদনে সহায়তার পুরস্কারস্বরূপ পাকিস্তানকে আবার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়া শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। আর তখন পাকিস্তান আবার কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ দিতে শুরু করবে। দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার এ মতামত পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে বিতর্কিত অঞ্চলটিকে ভারতভুক্ত করে নেয়।


ভারতের অস্বস্তি ফুটে ওঠে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শংকরের একটি তুলনায়। তিনি তালিবান-মার্কিন চুক্তিটিকে তুলনা করেছেন ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া বোম্বাইর ''পাকিজা'' সিনেমার সাথে। সিনেমাটির কাহিনীর পটভূমি ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের রাজধানী, সংস্কৃতি ও সভ্যতার জন্য বহুল পরিচিত লখনৌ। ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে নিষিদ্ধ পল্লীর এক প্রেমাকাঙ্ক্ষী নারীকে নিয়ে। পরিচালক দীর্ঘ ১৬ বছর সময় নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই হিট করে অর্থাৎ বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ছবিটি মুক্তির কয়েকদিন আগেই এর নায়িকা মীনা কুমারীর মৃত্যু হয়। ''পাকিজা'' ছবির প্রসঙ্গ তুলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ''দোহায় আমরা যা দেখলাম, তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। সবাই জানতো যে এসবই হতে যাচ্ছে। বহুদিন ধরে এরকমই বলাবলি হয়ে আসছিল। এটা অনেকটা পাকিজা ছবির ১৭টি ট্রেলার দেখার পর মূল ছবি দেখার মতোই''।


পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাতেই ফুটে ওঠে তালিবান-মার্কিন চুক্তিতে ভারত কতোটা হতাশ। এ অবস্থায় নয়া দিল্লিতে অনেকে বলছেন, ভারতের উচিত, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালিবানের সাথে যোগাযোগের একটা চ্যানেল খোলা। তবে ভারতের সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ভারত এ মুহূর্তে ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ অর্থাৎ অপেক্ষা করা ও দেখা এবং কাবুলের বন্ধুদেরকে সমর্থন দিয়ে যাওয়াটাকেই বেস্ট পলিসি বলে মনে করছে। নয়া দিল্লির এ নীতির প্রতিধ্বনি শোনা যায় কাবুলে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অমর সিনহার কথায়। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে তালিবানের সাথে যোগাযোগ করা মানে পুরনো বন্ধুদের হারানো। এর কোনো অর্থ হয় না। তাছাড়া তালিবানের নীতি ব্যাপকভাবে পাকিস্তান-প্রভাবিত, পাক-তালিবান দোস্তি আলগা না-হওয়া পর্যন্ত ভারতের কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে অর্থহীন।

 

সাবেক এ ভারতীয় কূটনীতিক আরো বলেন, আমরা একটি নিরাপদ ও নিরপেক্ষ দেশ। আমরা তালিবান বা অন্য কারো জন্যই হুমকি নই। আফগান যুদ্ধে কারা জয়ী হলো আর কারা হেরে গেলো, তা-ও আমাদের দেখার বিষয় নয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আফগানিস্তানের বর্তমান ও অতীতের শাসকরা এমনকি ক্ষমতায় আসার আগেও ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি, সাবেক প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ কিংবা সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই - যার কথাই বলুন না কেন, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের জীবনের কোনো-না-কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভারতে বছরের পর বছর বসবাস করেছেন। এসব কথা মাথায় রেখে নয়া দিল্লির এখনকার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কাবুল সরকারের প্রতিপক্ষের সাথে হাত মেলানোটা কোনো কাজের কথা হবে না।


অনেকের ধারণা, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে বিনিয়োগের কারণে আফগান যুবসমাজ, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ভারতের প্রতি শুভেচ্ছার মনোভাব জন্ম নিয়েছে। সিনহা মনে করেন, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর এ মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে তালিবানের গত মাসের এক বিবৃতিতে। তারা বলেছে যে তারা চাবাহার প্রকল্প চালিয়ে যাবে এবং আফগানিস্তানে ভারতীয় বিনিয়োগের সুরক্ষা দেবে।


ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যামশরণ কাবুলের ক্ষমতায় তালিবানের আগমন ঠেকাতে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানিয়েছেন নয়া দিল্লির প্রতি। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান শাসকদের প্রতি সামরিক সহযোগিতাও। তবে শ্যামশরণের সাথে একমত নন পাকিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত জি. পার্থসারথী। তিনি কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন এবং তালিবানের সাথে একটা যোগসূত্র গড়ে তোলার পক্ষপাতী।


তাঁর মতে, ১৯৯৪-২০০১ মেয়াদে তালিবান ক্ষমতায় থাকাকালে পাকিস্তান, সউদি আরব, আমীরাত - কেউই আফগানিস্তানকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেনি। কাজেই ভবিষ্যতের তালিবান সরকারকেও নয়া দিল্লির ওপর নির্ভর করতেই হবে।


এদিকে আরেকটি শঙ্কার কথা তুলেছেন ভারতের সাবেক সংসদ সদস্য ও স্ট্র্যাটেজিক এক্সপার্ট মানবিন্দর সিং। ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ আইন আফগানদের ক্ষুব্ধ করেছে। কারণ, এ আইনে আফগানিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে। আফগানিস্তানে ভারতের সবচাইতে বড় সম্পদ হচ্ছে আফগান জনগণের শুভেচ্ছা। এ আইন সেটাকেই পুড়িয়ে শেষ করে দেবে।


এদিকে তালিবান-মার্কিন দোহা চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ মোহাম্মদ খান বলেছেন, ২০০২ সালের গোড়ার দিকে তালিবান ও আল কায়েদাকে এক পাল্লায় তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ভুল করেছিল, দোহা চুক্তি করে তা থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে এসেছে। অথচ ৯/১১এর ঘটনায় তালিবান জড়িত ছিল না। দোহা চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো যে, পাকিস্তানের অবস্থানই ছিল সঠিক।


তিনি মনে করেন আন্তঃআফগান সংলাপ হবে খুবই চ্যালেঞ্জিং। এখানে জড়িত পক্ষগুলোকে নিজ নিজ ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রিয়াজ খান আন্তঃআফগান সংলাপে বিদেশী রাষ্ট্রের ব্যাপক ভূমিকা পালনের সুযোগ রাখারও অনুরোধ জানান।


এবার দেখা যাক, দোহা চুক্তিকে অন্যরা কিভাবে দেখছেন। রয় গুটম্যান তাঁর ''হাউ উই মিসড দ্য স্টোরি : ওসামা বিন লাদেন, দ্য তালিবান অ্যান্ড দ্য হাইজ্যাকিং অব আফগানিস্তান'' বইতে লিখেছেন, ১৯৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন জাতিসংঘ-দূত বিল রিচার্ডসন তালিবানের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, দোহা চুক্তিও ঠিক তার মতোই। ওই চুক্তিতেও তালিবান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। রাজি হয়েছিল সহশিক্ষা ছাড়াই নারীদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করার এবং নারীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের অনুমতি দেয়ার। তারা আফগানিস্তানে আফিম চাষ বন্ধেরও ওয়াদা করেছিল। এর অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত পালিত হয়নি।


এদিকে অনেকেই ২০২০ সালের তালিবান-মার্কিন চুক্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৬৯ সালের ভিয়েতনাম নীতির ছায়া বলে মনে করছেন। তাদের মতে, সত্তর দশকের গোড়ার দিকে প্রেসিডেন্ট পদে পূণঃ নির্বাচিত হয়ে আসার লক্ষ্যে এ রকম খেলাই খেলেছিলেন রিচার্ড নিক্সন। এ খেলার অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে গোপনে চীন সফরে যান তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার। স্থির হয়, পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে ভিয়েতনাম থেকে পুরোপুরি সৈন্য প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে চীনকে কিসিঞ্জার এ অঙ্গীকারও দেন যে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর যদি সায়গনে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারের পতন হয়, তাতেও যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না।


এর পরের ঘটনাগুলো ঠিক সেভাবেই ঘটে চলে। ১৯৭২ সালের ফেব্রূয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীন সফরে যান। তিনি বলেন, এ সফর বিশ্বে শান্তি আনার সফর। একই বছরের নভেম্বরে সহজে প্রেসিডেন্ট পূণঃ নির্বাচিত হন নিক্সন। এরপর ভিয়েতনামের কমিউনিস্টরা সায়গন সরকারকে উৎখাত করে। ওয়াদামাফিক এতে কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র। মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো, নিক্সন স্টাইলে একই খেলা খেলছেন না তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের গর্ভে।