দিল্লির শাহীনবাগে নারীদের আন্দোলন

দিল্লির শাহীনবাগে এনআরসি''র বিরুদ্ধে নারীদের আন্দোলন-সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক প্রান্তে শাহীনবাগে গত প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন। শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন মহল বিব্রত ও ক্ষুদ্ধ। জমায়েত কিভাবে বন্ধ করা যায় তার নানা কৌশল গ্রহন করা হচ্ছে। আবার আর্ন্তজাতিক গনমাধ্যমে এই আন্দোলন পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। কারন এই আন্দোলন করছেন দিল্লির নারীরা।

সারা ভারত জুড়ে নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু শাহীনবাগের আন্দোলন একেবারেই ব্যতিক্রম। শাহীনবাগের খুব কাছেই দিল্লির ঐতিহ্যবাহী জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। জামিয়া থেকে রোজ শাহীনবাগের জমায়েতে যোগ দিতে আসেন অনেক ছাত্র- ছাত্রী। কিন্তু আন্দোলনের সূচনাটা তারা করেননি। এ এলাকার একদল সাধারন নারী শুরু করেছিলেন প্রতিবাদ। অনেকটা আকস্মিকভাবে, কোনও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে গত ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে পুলিশ ঢুকে যখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালায়, সেটির প্রতিবাদেই সহসা পথে নেমে আসে শাহীনবাগ। সেই প্রতিবাদ আজও চলছে।

শাহীনবাগের আন্দোলনের ধরনটা ব্যতিক্রম। প্রতিবাদকারীরা টানা অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন শান্তিপূর্ণভাবে। মঞ্চে এসে নানা মানুষ গান গাইছেন, শের-শায়েরি বা কবিতা পড়ছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন, এমন কী রাজনীতিকরাও কেউ কেউ আসছেন। কিন্তু কোথাওই কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যানার নেই। এই আন্দোলনে শুদু দিল্লি নয় ভারতের নানা অঞ্চলের কবি সাহিত্যিকরাও যোগ দিচ্ছেন। সেখানে গান ও কবিতা আবৃত্তি করছেন।

দিল্লি শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা মোড়ে চলছে এই আন্দোলন। শাহীনবাগ দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী নয়ডার সংযোগকারী একটি প্রধান রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। বহু মানুষকে এজন্য কিছুটা ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। কিন্তু তবু বেশিরভাগ লোকই হাসিমুখে সেই অসুবিধা মেনে নিচ্ছেন। দেড় মাস ধরে এই আন্দোলন চললেও তাতে কোনো ভাটা পড়ার লক্ষন নেই প্রতিদিন মানুষ আসছেন। সমাবেশ করছেন। সংহতিও জানাচ্ছেন। ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি নতুন পথ তৈরি করছে শাহীনবাগ।

দিন যতই যাচ্ছে শাহীনবাগ নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। কিভাবে এই আন্দোলন থেকে মানুষকে দূরে সরে রাখা যায় তার নানা কৌশল গ্রহন করা হয়েছে। বিজেপি প্রথমে সাম্প্রদায়িক কৌশল গ্রহন করে। এটি কিছু মুসলমানের আন্দোলন বলে উপেক্ষার নীতি গ্রহন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাহীনবাগকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে
বিজেপি প্রথম দিকে শাহীনবাগ-কে উপেক্ষা করার নীতি নিয়ে চললেও এখন এই আন্দোলনকে হেয় করার কোনও চেষ্টাই বাদ দিচ্ছেন না। শহরের এক বিজেপি এমপি ঘোষণা করেছেন, দিল্লির নির্বাচনে জিতে এলে তারা ‘এক ঘণ্টায় শাহীনবাগের খালি করে দেবেন। এরমধ্যে একজন শাহিনবাগে চলমান বিক্ষোভে গুলি চালিয়েছে এক বন্দুকধারী।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ওই চলা বিক্ষোভে ১ ফেব্রুয়ারি বিকালে এ গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময় বন্দুকধারীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের দেশে কেবল হিন্দুরাই থাকবে।’ কপিল গুজ্জা নামের ওই বন্দুকধারীকে পরে আটক করে পুলিশ। শাহিনবাগের বিহার সাইড ব্যারিকেড থেকে বিক্ষোভকারীদেরকে উদ্দেশ্য করে দুই দফায় গুলি ছোড়ে হামলাকারী।সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আটকের সময় ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল ওই বন্দুকধারী।

শাহিনবাগের ঘটনার আগে গত বৃহস্পতিবার দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে ১৯ বছরের এক তরুণ। ‘আজাদি চাই; এই নে আজাদি’ বলেই সেখানকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

শাহিনবাগের অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই কড়া ভাষায় কথা বলেছেন বিজেপি নেতারা। কেন সেখানে দিনের পর দিন রাস্তায় বসে বিক্ষোভ চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। দিল্লির আসন্ন নির্বাচনেও ইস্যু হয়েছে শাহিনবাগের নাগরিকত্ব আইন বিরোধী বিক্ষোভ। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন শাহীনবাগ নিয়ে বিজেপির মধ্যে অস্থিরতার প্রকাশ ঘটছে। শেষ পর্যন্ত বিজেপি বল প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের রাজপথ থেকে তুলে দেয়ার চেষ্টা করবেন। আন্দোলনকারীরা যে বিষয়টি বোঝেন না তা নয়। কিন্তু নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন থেকে তারা সরে দাড়াতে রাজি নন।

নাগরিকত্ব আন্দোলন নিয়ে পুরো ভারত জুড়ে আন্দোলন হয়েছে। তবে শাহীনবাগের আন্দোলন যতটা আর্ন্তজাতিক গনমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে তা বিজেপি সরকারের জন্য ছিলো সবচেয়ে বিব্রতকর। দুনিয়া জুড়ে গনতান্ত্রিক ভারতের চেহারাটা অনেকটা বদলে গেছে। এর প্রতিফল পাওয়া গেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে। সম্প্রতি এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রতিবাদীদের জন্য ভারত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বিবৃতিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের বিদ্বেষী বক্তব্যের সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, ‘সহিংসতা থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ।’

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাস করে ভারত। এতে ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে গেলে তাকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়। তবে ওই তালিকায় মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়। একারণে একে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। উত্তর প্রদেশে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে প্রান হারিয়েছে অন্তত ২১ জন। ওই বিক্ষোভকারীদের দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে গুলি করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরসহ ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা। এরপরই দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহিনবাগে নাগরিকত্ব বিরোধী গুলি চালায় বন্দুকধারীরা। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি।

ব্রিটিশ ওই মানবাধিকার সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ- প্রতিবাদ চলছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক অভিনাশ কুমার বলেছেন, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষী বক্তব্য’ দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা।

নাগরিকত্ব বিরোধী আন্দোলন নিয়ে ভারতের নানা অঞ্চলে কম বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্যনাথ বিক্ষোভকারীদের গুলি করার জন্য গর্ববোধ করছেন। আবার পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসনও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কাজ করছে। অ্যামনেস্টির রিপোর্টে ভারতের এমন কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে।

সম্প্রতি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বারানসিতে তথ্য অনুসন্ধান চালিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি। এতে দেখা গেছে, অনেক বিক্ষোভকারী আহত হলেও নিকটবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভয় পাচ্ছে। আটক হওয়ার আশঙ্কায় তারা দূরবর্তী এলাকায় চিকিৎসা নিচ্ছে।
অ্যামনেস্টির ভারতের প্রধান অভিনাশ কুমার বলেন, ‘নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের পাস করা বিভাজনমূলক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। এমন অবস্থায় ওইসব উসকানিমূলক বক্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য।’

অ্যামনেস্টি আশঙ্কা করছে, এই আইনের ফলে ভারতজুড়ে অনেক মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারে। অভিনাশ কুমার বলেন, ‘দেশের নাগরিকের শান্তিপূর্নভাবে প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে। তবে ওই আইন পাস হওয়ার পর থেকে শান্তিপূর্ন বিক্ষোভকারীদের ভীতি প্রদর্শন, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, দেশবিরোধী আখ্যা, গ্রেফতার ও সহিংসতা ঘটছে। এইগুলো ক্রমেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন বিজেপি ভারতকে যেভাবে ধর্মীয় ভাবে বিভক্ত করে ফেলছে তাতে দেশটির গনতান্ত্রিক প্রতিষ্টানগুলো দূর্বল হয়ে পড়ছে। আভ্যন্তরিন রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিতে গিয়ে আর্ন্তজাতিকভাবে ভারত যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।