শ্রীলংকার নির্বাচনে চীনপন্থীদের বিজয় : অস্বস্তিতে ভারত

নির্রাাচনে বিজয়ের পর মাহিন্দ্র রাজাপাকসে ও গোতাবায় - সংগৃহীত


শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দল শ্রীলংকা পদুজনা পেরামুনা (এসএলপিপি)’র প্রার্থী গোতাবায়া রাজাপাকসা বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ট সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সমর্থন পেয়েছে রাজাপাকসের দল। চীনপন্থী হিসাবে পরিচিত দলটির বিজয় দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতিকে আগামি দিনে নানা ভাবে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।


শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন দেশের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব গোতাবায়া রাজাপাকসে। এক সময় তামিল টাইগারদের কড়া হাতে দমন করার জন্য দেশে ও বাইরে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। সিংহলিদের কাছে গোতাবায়া এ কারনে বেশ জনিপ্রয়ও ছিলেন। ৫২ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ৭০ বছরের গোতাবায়া। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার ছেলে সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভোট ।


সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্র রাজাপাক্ষের ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন সেনাবাহিনীতে। নব্বইয়ের দশকে এলটিটিই-র বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেরঅবসান হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। এ বছর ইস্টার সানডের হামলার বিষয়টি রাজাপক্ষের নির্বাচনী প্রচারে মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। এ নিয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ক্ষমতাসীন দলের কঠোর সমালোচনা করেছেন। গোতাবায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ থাকলেও শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ধর্মীয় ও জাতীয়তাদী মনোভাব থেকে গোতাবায়াকে বিজয়ী করেছেন। কট্টরপন্থী মনোভাবের জন্য সংখ্যালঘু মুসলিম ও তামিলরা গোতাবায়ার বিজয়ে অস্বস্তিতে আছেন। যদিও গোতাবায়া সবাইকে নিয়ে চলার ঘোষণা দিয়েছেন।


গোতবায়ার বিজয়ে তামিল ও মুসলিমরা কতটা স্বস্তিতে  থাকতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর আগের নির্বাচনে শ্রীলংকার প্রায় ১০ শতাংশ মুসলমান গোতাবায়ার ভাই মাহিন্দ্র রাজাপাকসা সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলো। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসা বা প্রতিরক্ষা সচিব গোতাবায়া রাজাপাকসা আলুথগামায় মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা থামাতে পারেননি। ফলে ২০১৫ সালের নির্বাচনে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে মৈত্রীপালা সিরিসেনাকে ভোট দেয়। এবারের ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে তামিল ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এলাকাগুলোতে রাজাপক্ষের দল খুব কম ভোট পেয়েছেন। সেখানে সাজিদ প্রেমাদাসার দল বেশি ভোট পেয়েছে।


দক্ষিন এশিয়ার অনান্য দেশের মতো শ্রীলংকার নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা আছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ন। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি করাকে কেন্দ্র করে শ্রীলংকার রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। চীনের সাথে ঘনিষ্ট সর্ম্পকের কারিগর সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্র রাজাপাকসে। শ্রীলংকার অর্থনীতি ও অবকাঠামো নির্মানে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আবার শ্রীলংকার রাজনীতিতে ভারত নানা ভাবে কলকাঠি নাড়ছে। শ্রীলংকার সাথে চীনের কৌশলগত সর্ম্পকের কারনে চীনের ভুমিকা বাড়ছে। চীন ও ভারতের সাথে ভারসাম্যমুলক সর্ম্পক বজায় রাখা হবে গোতাবায় সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্রীলংকার নির্বাচনে রাজাপাকসের দলের বিরোধী অবস্থানে যারা থাকেন তারা সাধারনত ভারতের সমর্থন পেয়ে থাকেন। এর প্রধান কারন রাজাপাক্ষের দলের সাথে চীনের ঘনিষ্টতা। এ বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল সাজিথ প্রেমাদাসার দিকেই। গোতাবায় শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বেশ অস্বস্তিতে আছে ভারত। কারণ এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে দেশটিতে চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যেতে পারে। চীন ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বরাবর সেতু হিসাবে কাজ করেছে রাজাপক্ষ পরিবার। গোতাবায়ার জমানায় ভারতের তুলনায় চিন যে বেশি গুরুত্ব পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।


নির্বাচনী প্রচারনার সময় রাজাপাকসে স্পষ্ট করে বলেছেন বিজয়ী হলে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। চীনের কাছে শ্রীলংকা ঋণ নিয়ে আগের সরকারের সাথে বেশ টানাপড়েন ছিলো। শ্রীলংকার রাজনীতিতে যা স্পর্শকাতর বিষয়। ভূরাজনৈতিক ভাবে শ্রীলংকা এখন চীনের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। চীনারা দেশটিতে আধুনিক বন্দর, রেলপথ আর মহাসড়ক তৈরি করে দিয়েছে। শ্রীলংকার হাম্বানতাতো বন্দর চীনের নিয়ন্ত্রনে। মাহিন্দ্র রাজাপাকসের সময় এই বন্দর নির্মান করা হয়েছিলো। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে চীন। চীনের মেরিটাইম সিল্করোডের গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্র শ্রীলংকা। সমুদ্র সীমায় চীনের প্রভাব বিস্তারে কলোম্বো বেইজিংয়ের পাশে দাড়াবে। এছাড়া শ্রীংলংকার আভ্যন্তরিন রাজনীতিতে ভারতের বিভিন্ন সময় হস্তক্ষেপের কারনে দেশটির অনেক মানুষ ভারতের ওপর বিরক্ত। তারা মনে করেন ভারত বিগ ব্রাদারসুলভ আচরন করছে। গোতাবায়ার বিজয়ের পেছনে এটিও একটি ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে। কারন শ্রলীংকার মানুষ মনে করেন ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত ভাবে দাড়াতে পারবেন গোতাবায়া। চীনের সাথে ঘনিষ্টতার কারনে পশ্চিমা বিশ্ব দলটিকে নানা ভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করে আসছে।


শ্রীলংকার নির্বাচনে রাজাপাক্ষের বিজয় দক্ষিন এশিয়ায় ভারতের প্রভাব খানিকটা কমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে ভারত প্রভাব বিস্তারের জন্য নানা চেষ্টা করে থাকে। কিছুদিন আগে মালদ্বীপের নির্বাচনে চীনপন্থী হিসাবে পরিচিত আব্দুল্লাহ ইয়ামিনের দলের পরাজয়ের পর ভারত ছিলো উল্লসিত। আবার নেপালে কেপি শর্মা ওর্লি দল চীনের সাথে ঘনিষ্টতা বাড়িয়ে চলছেন। ভারতের নিকট প্রতিবেশি নেপালে অব্যাহতবাবে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে। ফলে ভারত বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। এরমধ্যে শ্রীলংকায় চীনের সাথে ঘনিষ্ট দলটির বিজয় ভারতের জন্য উদ্বেগের।


শ্রীলংকায় রাজাপকসের দলের বিজয় দেশটিতে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খানিকটা হোচট খেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। সিংহলি জাতীয়বাদী মনোভাবের বিকাশের কারনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কোনঠাসা হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে মুসলিম ও তামিলরা অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। শ্রীলংকার রাজনীতিতে রাজাপাকসের পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী আগামি দিনে এই প্রভাব আরো বাড়তে পারে। এক ধরনের পারিবারিক শাসন প্রতিষ্টা হওয়া বিচিত্র নয়। ২০১৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত মাহিন্দ্র রাজাপাকসে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে।


শ্রীলংকার অনেক মানুষ অস্বস্তিতে আছেন যে রাজাপাকসা পরিবারের শাসন আবার ফিরে আসতে পারে। গোতাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলংকার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রায় দশ বছর শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এবং শ্রীলংকায় তামিলদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ অবসানের কৃতিত্ব দেয়া হয় তাদের। আগামী বছরের শুরুতেই শ্রীলঙ্কায় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তাতে ফের প্রধানমন্ত্রীত্ব ফিরে পেতে মরিয়া চেষ্টা চালাবেন গোতাবায়ার ভাই সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপক্ষ। তিনি জয়ী হলে, রাজাপক্ষ ভাইদের হাতেই উঠবে শ্রীলঙ্কা শাসনের পরিপূর্ন ক্ষমতা। সে পার্লামেন্ট নির্বাচন হলে মাহিন্দ্র হতে পারেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। তাদের আরেক ভাই চমল রাজাপাকসা হতে পারেন স্পিকার। অন্যদিকে পর্দার আড়াল থেকে রাজাপাকসা রেজিমকে সামাল দেয়া বাসিল রাজাপাকসাও একই ধরনের কোন দায়িত্বে থাকবেন। এছাড়া, মাহিন্দা রাজাপাসার ছেলে নমল রাজাপাকসা অপেক্ষায় রয়েছেন উত্তরাধিকার লাভের। গত বছর ভারত সফরকালে মাহিন্দা উত্তরাধিকারী হিসেবে ছেলের নাম উল্লেখ করেছেন।


মহিন্দা এবং তার পরিবার শ্রীলংকার অর্থনীতির ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রন করে থাকেন এমন কথাও চালু আছে। সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা।স্বাভাবকি ভাবে ব্যবসায় বানিজ্য ও প্রশাসনে রয়েছে তাদের একচেটিয়া প্রভাব। আগামি দিনে এই প্রভাব আরো বাড়বে। তবে একথাও সত্য রাজাপাকসের শাসনামলে তামিলদের দমন করে শ্রীলংকায় স্থিতিশীলীতা ফিরে এনেছেন। চীনের সাথে বানিজ্যিক ও কৌশলগত সর্ম্পকের কারনে দেশের অর্থণিিততে বড় ধরনের গতিসঞ্চার হয়েছে। যদিও চীনা ঋনের ফাঁদে পড়েছে বলে সমালোচনা আছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন শুধু জাতীয়তাবাদী আবেগ নয় রাজাপাকসের শাসানমলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সার্বভৌম অবস্থান তাকে শ্রীলংকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় করেছে।


শ্রীলংকায় বিদেশি প্রভাবের কারনে রাজনীতিতে নানা মুখী মেরুকরন তৈরি করে। আগামি দিনেও দেশটি এই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার বাইরে থাকবে না। বিশেষ করে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা দেশটিতে নতুন মাত্রায় দেখা দিতে পারে।