মিয়ানমার কী এশিয়ার শক্তিশালী দেশে পরিনত হচ্ছে

সূ চি কে বলা হতো পশ্চিমের ডালিং , মিয়ানমার সফরে সূচি -ওবামা - সংগৃহীত


বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমার। এশিয়ার যেসব দেশে ব্যাপক ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে মিয়ানমার তার একটি। সেনা নিয়ন্ত্রিত এই দেশটিতে চীন, জাপান ও ভারতের মতো পরস্পর বিরোধী দেশগুলো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। বলা যায় দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।


রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্টীর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারনে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় থেকে মিয়ানমার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে যে ধারনা করা হয়েছিলো তা ভুল প্রমানিত হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের সমালোচনা করলেও দেশটির পেছনে এসে দাড়িয়েছে চীন, রাশিয়া ও ভারত। অর্থনৈতিক কারনে এই প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছে জাপান। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি মাত্র কিছুদিন আগে জাপান ও ব্যাংকক সফর করে এসেছেন। এসব সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনার মুখে সূ চি এখন তার দেশের সপক্ষে এশিয়ার ‘বন্ধু’ দেশগুলোর সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।


সূ-চি সেনা নেতৃত্বের মতো মনে করেন ব্রিটেন আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে প্রতারনা করেছে। তার মতে মিয়ানমার আসলে দুইটা মাত্র বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে চীন ও জাপান। এরপর মিয়ানমার যে দেশটির ওপর আস্থা রাখতে পারে সেটি হলো ভারত।


মিয়ানমারর সামরিক কমান্ডার-ইন-চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হলাইঙ জাপানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সম্প্রতি টোকিও সফর করেন। তিনি সেখানে প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবেসহ সরকারের মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাত করেন। অথচ এই জেনারেলের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত ও বিচার করার জন্য জাতিসংঘ-সমর্থিত তদন্ত কমিটি আহ্বান জানিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ঘনিষ্ট মিত্র জাপান এরপরও মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ট সর্ম্পক বজায় রেখে চলছে। মিয়ানমারে জাপানের বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে বাড়ছে।


জাতিসংঘসহ আর্ন্তজাতিক ফোরামে দীর্ঘদিন থেকে চীন মিয়ানমারের অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। বলা যায় মিয়ানমারের সব সময়ের বন্ধু হিসাবে চীনকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মিয়ানমার এখন শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং সেই অবস্থানের বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। দেশটি অসাধারন কূটনৈতিক দক্ষতা ও বানিজ্যক স্বার্থকে কাজে লাগিয়ে আরো বিভিন্ন দেশের বন্ধুত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে এত দিন মিয়ানমার যে বিচ্ছিন্নতা বোধ করতো এখন তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।


জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুটি দেশ চীন ও রাশিয়া এখন মিয়ানমারের ঘনিষ্ট মিত্রে পরিনত হয়েছে। চীন দেশটির পুরানো মিত্র হলেও এখন রাশিয়ার সাথে মিয়ানমারের নিবিড় সর্ম্পক গড়ে উঠেছে । এর প্রধান কারন মিয়ানমারে বিপুল পরিমান সমরাস্ত্র বিক্রি করছে রাশিয়া। যার মধ্যে যুদ্ধ বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ রয়েছে। সম্প্রতি ২০৪ মিলিয়ন ডলারে রাশিয়া থেকে ৬টি সু- ৩০ এস এম ফাইটার জেট কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। রাশিয়ার ভøাদিভস্তকে একটি নৌমহড়ায় মিয়ানমার নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ অংশ নিয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে রাশিয়া থেকে মিয়ানমার সাবমেরিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এছাড়া ভারতের দেয়া রাশিয়ার তৈরি একটি সাবমেরিন ইতোমধ্যে মিয়ানমারের হাতে এসেছে।


রাশিয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের অন্যতম মিত্রদেশে পরিনত হয়েছে ইসরাইল। মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। ইসরাইল মিয়ানমারে বিপুল পরিমান অস্ত্র বিক্রি করছে। যার মধ্যে ড্রোন রয়েছে। ইসরাইলের সাথে শিক্ষা ও কৃষি খাতে মিয়ানমারের একাধিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। রাশিয়া ও ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্টতাকে মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্ব আর্ন্তজাতিক ফোরামে কাজে লাগাচ্ছে। যখনই জাতিসংঘে মিয়ানমারের জেনারেলদের বিচারের প্রশ্নটি আসছে তখন চীনের সাথে রাশিয়াও মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইসরাইলি লবিও মিয়ানমারের জন্য কাজ করে থাকে।


মিয়ানমারের বিপুল বানিজ্য সম্ভাবনার কারনে বিশ্বের বড় দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটি এড়িয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে চীন, ভারত ও জাপনের যে বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা চলছে সে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে মিয়ানমারের জেনারেলরা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই সূ চি ও সেনা নেতৃত্ব মিয়ানমারকে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী দেশে পরিনত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে উগ্র বৌদ্ধ চিন্তার প্রভাব কাজ করছে।


মিয়ানমার রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে। এই প্রদেশকে ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো প্রকল্প। রাখাইনে ভারত ও চীন উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। ভারত সিত্তুই বন্দর ব্যবহার করার জন্য মিয়ানমারের সাথে একটি চুক্তিতে সই করেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য এই বন্দরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে। এই বন্দরের মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে চীন একটি তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন পরিচালনা করছে। এটি চীনা কুনমিং পর্যন্ত গেছে।
চীন ও মিয়ানমার কিয়াকপিউ বন্দর প্রকল্প নিয়ে চুক্তি সই করেছে। গভীর এই সমুদ্রবন্দরটি ৭৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ তেল ও গ্যাস পাইপলাইনটির সাথে যুক্ত হবে। এটি হবে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর ও চীনের বৃহত্তর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশবিশেষ। ভারত মহাসাগরের উপকূলের এই বন্দরটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বড় তেল ট্যাঙ্কারগুলো ব্যবহার করতে পারবে এবং এটার সাথে চীনের মূল ভূমির তেল ও গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ থাকবে। মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যে নৌ রুট রয়েছে, এটাকে বেইজিং তার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে, কারণ মালাক্কার উপর বহু দেশের প্রভাব রয়েছে।


সিত্তুই ছাড়াও মিয়ানমারের সাথে কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টে সই করেছে ভারত। এর মাধ্যমে উত্তরপূর্ব ভারতের সাথে মিয়ানমারের সড়ক যোগযোগ স্থাপিত হবে এবং বঙ্গোপসাগরে আসার সুযোগ পাবে। অপরদিকে জাপান ইয়াঙ্গুন থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে স্পেশাল ইকোনমিক জোনের পাশে নতুন কন্টেইনার টার্মিনাল চালু করেছে। যেখানে বছরে ২লাখ ৪০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং করতে পারবে। মূলত চীনের সাথে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই এই প্রকল্পগুলো নিচ্ছে জাপান।
বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো যেভাবে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করছে তাতে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতবাচক প্রভাব পড়ার কথা থাকলেও মিয়ানমারকে নিয়ে নানা মুখী শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির সেনা নেতৃত্বের রয়েছে উচ্চাভিলাষ ও জাতিগত ঘৃনা ছড়ানোর প্রবনতা। যার চড়া মুল্যদিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মিয়ানমারের জেনারেলদের অপারধের ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রতিবেশি প্রভাবশালী বন্ধু দেশ গুলো এখন চোখ বুজে রয়েছে।


ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে মিয়ানমারের জেনারেলরা সাফল্যের সাথে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। ভারত ও চীন এই সুযোগ ব্যবহার করতে চাইছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে চীন মধ্যস্থতার উদ্যেগ নিলেও তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এখন মিয়ানমার আর্ন্তজাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য উল্টো বাংলাদেশকে দোষারোপ করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে ভারতের সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক বেড়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের আচরণ নিয়ে ভারত কখনও কড়াভাবে সমালোচনা করেনি। মিয়ানমার সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোভিন্দ রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কোন উদ্বেগ জানাননি।


মিয়ানমারে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নানামাত্রিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জাপান ও ভারতের বিনিয়োগ নিয়ে চীনের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এছাড়া সেনা নেতৃত্বের একটি অংশ চীনের প্রভাব বলয়ের বাইরে আসতে চান। ভারতীয় সাবমেরিন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সেটা বোঝা গেছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে সাবমেরিন বন্দর তৈরির ক্ষেত্রে কোন চীনা ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হবে না, বা চীনা সাবমেরিনের সাথে সেগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এ ছাড়া অব্যাহতভাবে রাশিয়ার সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে মিয়ানমার। যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারন হিসাবে দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় মিয়ানমার পরিস্থিতির দিকে বাংলাদেশের গভীর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। কারন মিয়ানমার এখন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তার ঝুকি তৈরি করছে। যেভাবে মিয়ানমার সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে তাতে এ অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।