ইমরান খানের নতুন চমক

কর্তারপুর শিখ উপসনালয় - সংগৃহীত


ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিতে আসা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিতে পরিনত হয়েছেন। দেশের মধ্যে বিরোধীরা যখন তার পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করছেন তখন কূটনীতিতে আরেকবার চমক দেখালেন। ভারতের আদালতে যেদিন বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির স্থাপনের রায় দেয়া হলো একই দিন তিনি খুলে দিলেন শিখ সম্প্রদায়ের জন্য কর্তারপুর করিডোর। ভারতের শিখ সম্প্রদায়ের মন শুধু তিনি জয় করেননি পাকিস্তান সর্ম্পকে আর্ন্তজাতিক মহলে তিনি সহনশীলতার এক নতুন বার্তা দিলেন।


পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নারোয়াল জেলায় সীমান্ত থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত করতারপুর গুরুদ্বার শিখদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ধর্মস্থান। এই গুরুদ্বারে জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেছিলেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব। ভারতের পাঞ্জাবের ডেরা বাবা নানক গুরুদ্বারের সঙ্গে পাকিস্তানের করতারপুরের দরবার সাহিব গুরুদ্বারকে যুক্ত করেছে এই করিডোর।


গুরু নানকের ৫৫০ তম জন্মবার্ষিকীর আগে এই করিডোর খুলে দেয়া হয়। এই করিডোর নির্মানের জন্য পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির সময় আলোচনা শুরু হয়। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত এই কার্যক্রম শেষ করা হয়। এই করিডোর খুলে দেয়া উপলক্ষ্যে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে বিশেষ অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় অংশের উদ্বোধন করেন। অপরদিকে পাকিস্তান অংশে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভারতীয়দের আবেগকে সম্মান জানানোর জন্য মোদি ধন্যবাদ জানান ইমরান খানকে। ইমরান খান বলেন, ঐতিহাসিক কর্তারপুর করিডোর খুলে দেওয়া আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে পাকিস্তানের দায়বদ্ধতার প্রমান।


করিডোর খুলে দেয়া উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্টানে শিখ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্রিকেটার ও রাজনীতিক নভোজিত সিং সিধু এবং পাঞ্জাবের কংগ্রেস ও বিজেপির নেতারা। কর্তারপুর করিডোর খুলে দেয়ার পর শিখ সম্প্রদায়ের ৫০০ জন্য দরবার সাহিবের উদ্দেশ্য রওনা হন।


কর্তারপুর করিডোর খুলে দেয়ার মধ্যদিয়ে ইমরান খান উপমহাদেশের রাজনীতিতে যেমন তার ইমেজ বাড়াতে পেরেছেন তেমনি পাঞ্জাবের শিখদের মন জয় করতে পেরেছেন। পাঞ্জাবের শিখরা ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের প্রতি দূর্বলতা অনুভব করেন। শিখ সম্প্রদায়ের আরো কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে পাকিস্তানে। পাঞ্জাবের সাথে পাকিস্তানের সর্ম্পক ভিন্নমাত্রিক। যা আগামি দিনে পাঞ্জাবের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কিভাবে?


ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক এম কে ভদ্রকুমার কর্তারপুর করিডোর উদ্বোধনের প্রভাব সর্ম্পকে লিখেছেন, পাকিস্তান এই প্রকল্পটি শেষ করার ব্যাপারে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের মর্যাদা বাতিল করার মোদি সরকারের আশ্চর্য সিদ্ধান্তে আটকে ছিলো না।। ভারতের সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের পাকিস্তান বিরোধী কথাবার্তা আমলে না নিয়ে ওই কাজটি একাগ্রচিত্তে করে গেছে। উপমহাদেশের অন্তহীন টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তান দারুন কাজ করেছে। তারা রেকর্ড সময়ের মধ্যেই কর্তারপুর প্রার্থনাগাহ ও প্রাঙ্গনটি নির্মাণ করেছে। আশপাশে শিখ তীর্থযাত্রীদের জন্য চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আশা করা হচ্ছে, সারা দুনিয়া থেকে শিখ তীর্থযাত্রীরা এখানে হাজির হবে।


ভদ্রকুমারের মতে , পাকিস্তান কর্তারপুর প্রকল্প শেষ করতে বদ্ধপরিকর এ বিষয়টি যখন পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন মোদি সরকার দোটানায় পড়ে যায়। ভারতের প্রতি শুভেচ্ছা প্রদর্শন করার জন্য পাকিস্তানের জনগণ ক্ষেপে যেতে পারে – এই ভয়ে প্রকল্পটি বন্ধ করা হতে পারে - এমন আশা করছেলিন মোদি কিন্তু বাস্তবে তা তা ফলপ্রসূ হয়নি। পাকিস্তান যদি কর্তারপুর করিডোর খুলে দিতে অস্বীকার করতো তাহলে পাঞ্জাবের রাজনীতিতে ভালো একটি সুযোগ নিতে পারতো বিজেপি।


মোদির জন্য এটি স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। এই প্রকল্পটি শিখ ধর্মের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। বিজেপি পাঞ্জাবে, বিশেষ করে শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের অবস্থান জোরদার করতে চাইছে। এমন অবস্থায় পাকিস্তানের বাড়ানো শুভেচ্ছার হাত অস্বীকার করতে পারছিল না ভারত। কারণ তাতে শিখ সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। এর ফলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।


কিন্তু এই প্রকল্প সফল হওয়ায় পাঞ্জাবের রাজনীতিতে কংগ্রেসের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা ও ক্রিকেটার নভোজিত সিং সিধুর। যিনি পাঞ্জাবে ইমরান খানের বন্ধু হিসাবে পরিচিত। ইমরানের শপথ অনুষ্টানে সিধু উপস্থিত ছিলেন সিধু। এ নিয়ে বিজেপি তার সমালোচনামুখর হয়ে উঠে। সিধু এক সময় বিজেপির রাজনীতি সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। পাঞ্জাব বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ধারনা করা হয় যে আগামি দিনে সিধুর পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


কর্তারপুর করিডোর খুলে দেয়ার মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য সম্প্রতি যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে শান্তির বার্তা দেয়া হয়েছে। যদিও নরেন্দ্র মোদির পক্ষে বার্তায় ইতিবাচক সাড়া দেয়ার সম্ভাবনা নেই। বাবরি মসজিদের রায় ঘোষণার পর ভারতের ভেতর ও বাইরে এমন আলোচনা চলছে দেশটির বিচার বিভাগ হিন্দুত্ববাদ দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের উদার দৃষ্টিভঙ্গি আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। ইমরান খান হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন।


ভারতের পক্ষ থেকে বার বার অভিযোগ করা হয় পাকিস্তানে হিন্দুরা অনিরাপদ এবং দেশটিতে হিন্দু জনসংখ্যা একেবারে কমে গেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর বিপুল সংখ্যক হিন্দু পাকিস্তান থেকে ভারতে পারি জমায়। আবার ভারত থেকে অনেক মুসলমান পাকিস্তান চলে আসে। এতে পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্টীর সংখ্যা কমে যায়।


কর্তারপুর করিডোর খুলে দেয়ার পর পরই ইন্ডিয়া টুডের এক খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সরকার ৪০০ হিন্দু মন্দির হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব মন্দির পরিত্যক্ত অবস্থায় কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে রয়েছে। এসব মন্দির পুর্ননিমান করা হবে যাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের সেখানে ধর্মীয় অনুষ্টান পালন করতে পারে। ভারতে যখন মসজিদ দখল করে মন্দির বানানো হচ্ছে তখন পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যে বিশেষ বার্তা দেয়া হচ্ছে তা অনুধাবন করা কঠিন নয়।


ভারতের সাথে কূটনৈতিক সর্ম্পকের ক্ষেত্রে বেশ পরিপক্ক অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান। ভারতের প্রধামন্ত্রী যখন কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আবেগ ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন তখন চীনের সহায়তায় পাকিস্তান বিষয়টি নিয়ে যায় আর্ন্তজাতিক ফোরামে। তাতে পাকিস্তান বেশ সফল হয়েছে। আবার কর্তারপুর করিডোর নিয়ে দিল্লিকে এড়িয়ে সরাসরি শিখ সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে গেছে।


ভারত যখন পাকিস্তানের সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখতে চাইছে না, তখন ভারতীয়দের পাকিস্তানের মাটিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে ইসলামাবাদ। শুধু তাই নয় বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের একটি তীর্থস্থানে পরিনত হতে যাচ্ছে কর্তারপুর করিডোর। প্রবাসী শিখরা পাঞ্জাবে আসলে ধর্মীয় কারনে কর্তারপুর যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটে থাকা পাকিস্তান কিছুটা হলেও লাভবান হবে। সবচেয়ে বড় লাভ হলো শিখ সম্প্রদায়ের সাথে পাকিস্তানের সর্ম্পক আরো ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো। দিল্লির অপারেশন ব্লু স্টারের ক্ষত এখন শিখদের মনে গেঁথে রয়েছে।