নীরবে শক্তি বাড়াচ্ছে মিয়ানমার

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষন - সিএনএন


মিয়ানমার দীর্ঘ সময় আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। এক সময় মিয়ানমারের বন্ধুরাষ্ট্র বলতে শুধু চীনকে বোঝাতো। কিন্তু পরিস্থিতি এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মিয়ানমারের ঘনিষ্ট মিত্রে পরিনত হয়েছে ভারত ও জাপানের মতো দেশ। নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পরও মিয়ানমার সামরিক দিক দিয়ে নিজের অবস্থান সংঘত করছে। দেশটির সর্বেবাচ্চ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও মিয়ানমারের সামরিক শক্তি অর্জনের পথে তা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।


২০১৬ সালের অক্টোবরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তখন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের নেতাদের সমালোচনা করছেন। দেশটির বিরুদ্ধে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করেছে।

[ এই লেখার ভিডিও রুপ দেখতে ক্লিক করুন ইউটিউ লিংকে ]


মিয়ানমারের রাজনীতিবিদ ও সামরিক নেতৃবৃন্দ রাখাইন রাজ্যে সঙ্ঘটিত অপরাধ স্বীকার করতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে, যেটাকে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জাতিগত নিধন অভিযান বলে উল্লেখ করেছে। অতীতের মতো এখনও মিয়ানমার সময় ক্ষেপনের নীতি অবলম্বন করে সব দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।


এরমধ্যে মিয়ানমার নীরবে যে কাজটি করে যাচ্ছে তাহলো দেশটির সামরিক শক্তি বাড়ানো। নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মিয়ানমার ও তাদের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সমালোচনা, তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও মিয়ানমার প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে নিজেদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং তাতমাদাও এখনও আধুনিক অস্ত্র কেনা অব্যাহত রেখেছে।


মিয়ানমারের সবচেয়ে পুরানো মিত্র চীন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন জাতিগোষ্টীর সাথে চীন সর্ম্পক বজায় রেখে চলে। ফলে মিয়ানমারের নীতি নির্ধারনে বাইরের শক্তি হিসাবে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে। দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সর্ম্পক ছাড়াও সামরিক নেতৃত্বের সাথে চীনের রয়েছে বিশেষ সর্ম্পক।দক্ষিন এশিয়ায় আরেক প্রভাবশালী দেশ ভারত এখন মিয়ানমারের অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশের ঘনিষ্ট মিত্র ভারত শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয় মিয়ানমারের সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।


মিয়ানমারে ২০১১ সালে ‘সীমিত গণতন্ত্রের’ নামে অংসান সূচিকে সামনে আনা হয়। এরপর থেকে, চীন দেশটির কাছে দুটো জিঙ্ঘু-২ শ্রেণীর ফ্রিগেট, ৭৬টি টাইপ-৯২ সাঁজোয়া যান, ১২টি সিএএসসি সিএইচ-৪ মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন এবং ১৬টির মতো সিএসি পিএসি জেএফ-১৭ জঙ্গি বিমান বিক্রি করেছে। যেগুলোর মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এই সব অস্ত্রাদির বেশিরভাগ এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়ে গেছে। প্রথম চারটি জেএফ-১৭ বিমান মিয়ানমারের বিমানবাহিনী এরই মধ্যে বহরে যুক্ত করেছে। ২০১৬ সাল থেকে মিয়ানমারের বিমান বাহিনী ১২টি ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০ জঙ্গি প্রশিক্ষন বিমান কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে। আরও চারটি তারা হাতে পাবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে মিয়ানমারের বিমান বাহিনীর চারটি মিল মি-২৪পি হেলিকপ্টার গানশিপের মেরামত করা হয় রাশিয়ায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, রাশিয়ার কাছ থেকে ছয়টি সুখোই সু-৩০ বহুমুখী জঙ্গি বিমান কেনার জন্য চুক্তি করে মিয়ানমার। প্রায় ২০৪ মিলিয়ন ডলারে এই চুক্তিটি হয়েছে বলে জানা গেছে।মিয়ানমার একই সাথে প্রতিরক্ষা কূটনীতিও জোরেসোরে চালিয়ে যাচ্ছে। তাতমাদাওয়ের সিনিয়র কর্মকর্তারা দেশের বাইরে সফর করছেন এবং বাইরের দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও মিয়ানমার সফর করেছেন।


মিয়ানমার প্রতিবেশী দেশ ও আঞ্চলিক জোটের সাথে বেশ কিছু নৌ মহড়াতেও অংশ নিয়েছে। ২০১৭ সালে চীনের সাথে, একই বছর আসিয়ানের সাথে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ভারতের সাথে নৌ মহড়ায় অংশ নেয় তারা। চীন, ভারত ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজগুলো মিয়ানমার সফর করেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে, ভিয়েতনাম ও ব্রুনাইয়ের ফ্রিগেট মিয়ানমারে ‘শুভেচ্ছা সফর’ করেছে। মার্চে, মিয়ানমারের একটি নৌ জাহাজ চীনের পিএলএ নেভির ৭০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।


মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হোক না কেন প্রতিবেশিদের কাছে ভূকৌশলগত ও বাণিজ্যিক বিবেচনার জায়গায় সেগুলো কোন বাধা হয়নি। রোহিঙ্গাদের সাথে খারাপ আচরণের কারণে তাতমাদাওয়ের বিরুদ্ধে যত কঠোর সমালোচনাই হোক না কেন, সেটা ভারত বা চীনকে খুব একটা নাড়া দেয়নি। আবার মুনাফার সুযোগ আছে বলে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ইসরাইল এখনও মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আসুন আমরা জেনে নেই কোন দেশ মিয়ানমারে অস্ত্র রফতানি করে থাকে।


পরিসংখ্যানে দেখা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কেনে রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে। এ ছাড়া ভারত, ইসরায়েল, ইউক্রেনও মিয়ানমারের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ বিমান কিনেছে চীনের কাছ থেকে। চীন থেকে ১২০টি যুদ্ধ বিমান কিনেছে মিয়ানমার। রাশিয়া থেকে ৬৪, পোল্যান্ড থেকে ৩৫টি, জার্মানি থেকে ২০টি, সাবেক যুগোশ্লেভিয়া থেকে ১২টি, ভারত থেকে ৯টি।
এই সময় পর্যন্ত মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হলো রাশিয়া। রাশিয়া থেকে মিয়ানমার কিনেছে ২ হাজার ৯৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র। এরপরেই রয়েছে চীন। চীনের কাছ থেকে কিনেছে ১ হাজার ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র। বেলারুশ থেকে ১০২টি, বুলগেরিয়া থেকে ১০০টি ও ইউক্রেন থেকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারকে প্রথমবারের মতো একটি কিলো-ক্লাস সাবমেরিন দিতে যাচ্ছে ভারত। ভারতের সাবমেরিন আইএনএস সিন্ধুবীর প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করবে মিয়ানমার নৌবাহিনী। মিয়ানমারকে সাবমেরিন সরবরাহের ভারতের সাথে চুক্তি এ অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্যর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।


ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে মিয়ানমারের জেনারেলরা সাফল্যের সাথে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। পশ্চিম বিশ^ মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও কার্যকর কোনো ভুমিকা পালন করতে পারছে না। মুলত চীন এক্ষেত্রে কৌশলী ভুমিকা নিয়েছে। অংসান সূচিকে সামনে আনার পর পশ্চিমা বিশ^ আশা করেছিলো দেশটিতে প্রভাব বাড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পুর্ন উল্টে গেছে। সূচি এখন সেনা নেতৃত্বের মুখপাত্রে পরিনত হয়েছেন। সূচির সাথে ভারতের ঘনিষ্টতা অনেক পুরানো।


নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে সামনে রেখে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের নীতি ও অগ্রাধিকারের ব্যাপারে অনঢ়। নিজেরাই ঠিক আন্তর্জাতিক মতামত যাই থাকুক না কেন তা আমলে নিতে নারাজ। বিশেষ করে জাতিসংঘ ও অন্যান্য জায়গায় মিয়ানমার চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাচ্ছে, ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ে বড় ধরনের কোনো চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না। রোহিঙ্গা প্রশ্নে সেখানে রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামর্থ্য সীমিত হয়ে পড়েছে।


আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যে বিচারের কথা বলছেন তা খুব একটা এগুবে বলে মনে হয় না। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার যে মোটেও আন্তরিক নয় তা স্পষ্ট হলেও এ নিয়ে দেশটির ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। উচ্চাকাঙ্খী সামরিক শক্তি অর্জনের জন্য তাতমাদাওয়ের তহবিলের কোন অভাব হচ্ছে না। মিয়ানমার সেনাবাহিনী অব্যাহত ভাবে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে।


মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ২দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ করার অনুরোধ করে। উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল মিয়ন্ত নউই পার্লামেন্টে বলেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী তিনটি জাতীয় স্বার্থ তথা ইউনিয়নের বিচ্ছিন্নতারোধ, জাতীয় সংহতি বিনষ্টের চেষ্টা প্রতিরোধ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য আরো শক্তিশালী, আরো যোগ্য, আরো আধুনিক, সামরিক বাহিনী গড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবয়ন করছে। ২০১১ সালে আধা-বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাজেট নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হয়। এর ধারবাহিকতা এখনও চলছে।