ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে নেপাল

নেপালের রাষ্ট্রপতির সাথে চীনের রাষ্ট্রপতি - সংগৃহীত


ভারত ও চীনের মাঝখানে ভূমি বেষ্টিত দেশ নেপাল। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিশেষ করে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভাবে দেশটি ভারত নির্ভর। কিন্তু এই নির্ভরতা কাটিয়ে উঠে অনেকটা চীন মুখী হয়ে পড়ছে নেপাল। চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং ভারত সফর শেষ করে চলে যান নেপাল। তার এই সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এরমধ্যে প্রধান ছিলো চীনের সাথে সংযোগ স্থাপন।


চীনের নিকট প্রতিবেশি দেশ নেপাল। কিন্তু নেপাল-চীন সর্ম্পকে এক ধরনের দুরত্ব ছিলো। এর বড় কারন নেপালের আভ্যন্তরিন রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। বেশ কয়েক বছর ধরে এই অবস্থা বদলে যাচ্ছে। ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেড়িয়ে নেপাল এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ন অবস্থান গ্রহনের চেষ্টা করছে। ২২ বছর পর চীনের কোনো সরকার প্রধান নেপাল সফর করলেন। স্বাভাবিকভাবে এই সফরটি ছিলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কাঠমান্ডুতে নেপালের নেতাদের সাথে নৈশভোজে বলেছেন আমরা নেপালকে ল্যান্ড লকড কান্ট্রি থেকে ল্যান্ড লিংক কান্ট্রিতে পরিনত করতে চাই।


শি জিনপিংয়ের সফরে যেসব চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে তাতে দুদেশের মধ্যে সংযোগের দিকটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এরমধ্যে চীনের তিব্বত থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটারের রেলপথ নির্মান। যা হিমালয় পাহাড়ের ভেতর দিয়ে তৈরি করা হবে। এছাড়া কাঠমান্ডু থেকে চীন সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের জন্য একটি টানেল নির্মান করা হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্প দুটির সাম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের আওতায় এই রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এই প্রকল্প হবে বেল্ট অ্যান্ড রোডের ব্যায়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি। নেপালের নেতারা আশা করছেন চীনের সাথে সংযোগ স্থাপনের এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশটির অর্থনীতি বদলে যাবে। বিশেষ করে পন্য আমদানির জন্য ভারতের ওপর যে নির্ভরশীলতা তা আর থাকবে না। এর ফলে নেপালের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে নেপাল ও চীনের মধ্যে পানি সম্পদ, বিদ্যুত, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষন ও ট্রাডিশনাল মেডিসিন সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতার জন্য ২০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট দেশটির প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন।
বৃহত প্রতিবেশীর ওপর অবিশ^াস আর হতাশার কারনে নেপাল চীনমুখী নীতি গ্রহন করে। ফলে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলেও, দূর্বল কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে শুধু ভারত নয়, চীনের সাথে সর্ম্পক বাড়ানোর উদ্যেগ নিয়েছে দেশটি। ভারতের বিশ্লেষকরাও নেপালের পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তনকে দেখছেন ভারতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে উত্তরের প্রতিবেশি চীনের দিকে ঝুকে পড়া হিসাবে।


নেপালের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য ভারত বিভিন্ন সময় দেশটির ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। ভারতপন্থী মাধেসি জনগোষ্টীকে বিশেষ সাংবিধানিক সুবিধা দেয়ার জন্য নেপালের ওপর ২০১৬ সালে ভারত অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে। সে সময় জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় নেপালের জনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সরকার মাধেসীদের কিছু দাবি দাওয়া মেনে নিতে বাধ্য হয়। নেপালের আভ্যন্তরিন রাজনীতি নিয়ে ভারতের এই চাপ প্রয়োগের নীতি দেশটির সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।


এমনকি সে সময় সংবিধান পরিষদে ভারতপন্থী হিসাবে পরিচিত নেপালি কংগ্রেসের সদস্যরাও ভারতের সমালোচনা করেন। কাঠমান্ডুতে টানা ভারত বিরোধী বিক্ষোভ চলে। এ সময় নেপালের নেতারা চীনের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্বটা আবারো নতুন করে উপলদ্ধি করে। বলা যায় ভারতপন্থী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে নেপালকে অনেক বেশি মাত্রায় চীনের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। অবরোধ চলাকালেই নেপাল - তিব্বত সীমান্ত পথ মেরামত করে চীন থেকে জ্বালানী আমদানি শুরু করে নেপাল। ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর ব্যাপারে নেপালের ভেতর থেকে এক ধরনের জনমত তৈরি হয়।


এ সময় নেপালে ক্ষমতায় ছিলেন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টির কো চেয়ারম্যান খাগড়া প্রাসাদ ওলি। যিনি কেপি শর্মা ওলি নামে বেশি পরিচিত। তিনি মুলত চীনের সাথে সর্ম্পক জোরদার করার নীতি গ্রহন করেন। ভারতের অবরোধের মধ্যে তিনি চীন সফরে যান। এ সময় ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন থেকে সীমিত আকারে জ্বালানী সরবারহ করা হয়। এতে তার জনিপ্রয়তাও বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। দায়িত্ব গ্রহনের পর ফের চীন সফর করেন। মুলত কেপি শর্মা ওলির সরকার নেপালের পররাষ্ট্রনীতির বাঁক বদলের এই উদ্যেগ গ্রহন করেন । নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাতে সমর্থন দেয়।


ভারত- নেপাল সর্ম্পকে যে অবিশ^াসের সৃষ্টি হয়েছে তাতে কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লির মধ্যে দিন দিন দূরত্ব বাড়ছে। বলা যায় দীর্ঘদিন থেকে ভারতের প্রভাব বলয়ে থাকা দেশটি সম্পুর্নভাবে চীনের দিকে মুখ ঘুড়িয়ে নিচ্ছে। ফলে দু দেশের অশ^স্তিকর সম্পর্ক এখন এক ধরনের অস্থিরতায় রুপ নিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে কাঠমান্ডুতে শি জিনপিংয়ে এই সফর কী বিশেষ কোনো বার্তা দিচ্ছে ?


নেপালের সাথে চীনের অর্থনৈতিক সর্ম্পকের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে। নেপালের সেনা প্রধান একাধিকবার চীন সফর করেছেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির প্রথম দফা বেইজিং সফরে চীনের সাথে যে ট্রানজিট চুক্তি হয় তার আওতায় নেপাল চীনা বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনার সুবিধা দেয়া হয়। ভুবেষ্টিত নেপালের কোনো বন্দর সুবিধা নেই। কলকাতা বন্দর ব্যবহার করে নেপাল সাধারনত পন্য আমদানি করে থাকে। যদিও ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে রাতারাতি চীন থেকে পন্য আমদানি শুরু হবে এমনটা কেউ মনে করছে না। এ সময় রেল ও সড়ক সংযোগ প্রতিষ্টার বিষয় আলোচনা হয়। যা এখন বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে।


নেপালে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে । দেশটির বিদ্যুত , অবকাঠামো, শিল্প ও পর্যটন খাতে চীন বিনিয়োগ করছে। নেপালের শিল্প মন্ত্রণালয়ের হিসাবে জুলাইয়ে শেষ হওয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হিমালয়ান দেশটি যে বিদেশী বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে তার অর্ধেকেরও বেশি পাওয়া গেছে উত্তরের প্রতিবেশি দেশটি থেকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নেপাল গত অর্থবছরে ২১৬ মিলিয়ন ডলার এফডিআই প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এর মধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১১৪ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। শি জিনপিংয়ের সফরের পর এই বিনিয়োগের পরিমান বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।


ভারতের একেবারে পূর্বসীমান্তের কাছে নেপালে চীনের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে তাতে ভারত যে অশ্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন নেপালে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারত ততটা উদ্বিগ্ন নাও থাকতে পারে। বিমানবন্দর নির্মান বা অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের সামর্থ্যর অভাব রয়েছে। এছাড়া ভারতেও চীনের বিনিয়োগের পরিমান একেবারেই কম নয়।


কিন্তু চীন-নেপাল ট্রানজিট বা সড়ক ও রেল যোগাযোগ ভারতকে উদ্বিগ্ন করবে। এতে নেপালে ভারত যে বানিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে তা ধীরে ধীরে খর্ব হতে পারে। নেপালে ভারতীয় মুদ্রা এখনো চলছে। ভারতীয় নাগরিকরা অবাধে নেপালে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় করতে করছে। নেপালের মতো ভারতের ঘনিষ্ট প্রতিবেশি ও ছোট দেশ কেন চীনের প্রভাব বলয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে ভারতে কম আলোচনা হচ্ছে না। অনেকে বিষয়টিকে দেখছেন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা হিসাবে।


নেপালের রাজনৈতিক দল ও সাধারন মানুষ ভারতের প্রভাব বলয় থেকে এখন যে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে এর পেছনে ভারতের ভুলনীতি দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিন এশিয়ার প্রায় সব দেশে ভারত কোনো একটি গোষ্ঠী বা দলের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। শুধু নেপাল নয় মালদ্বীপ ও শ্রীলংকায় একই ঘটনা ঘটেছে। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে এসব দেশের আভ্যন্তরিন বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে দিল্লী।


স্বাভাবিকভাবে এসব দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ভারতের নীতিতে হতাশ হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তা বিক্ষোভে রুপ নেয়। প্রতিবেশি দেশগুলোতে হাতমুচড়িয়ে সুবিধা নেয়ার ভারতীয় এই কৌশল শেষ বিচারে টেকসই হচ্ছে না। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ তার প্রমান। নেপাল-চীন সম্পর্কে ভারতের বিশ্লেষকরা এরমধ্যে পাকিস্তানÑচীন সম্পর্কের ছায়া দেখলেও বাস্তবতা হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বভৌম অবস্থান নিয়ে টিকে থাকতে হলে নেপালের সামনে এছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।