পাকিস্তান-ভারতের শত্রু-মিত্র

পাক-ভারতের শত্রুতা ও বন্ধুত্ব নিয়ে সঙ্কট বাড়ছে -

  • আলফাজ আনাম
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৯


দক্ষিন এশিয়ায় দুই পারমানবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ নতুন নয়। ১৯৪৭ সালে দেশ দুটি স্বাধীন হওয়ার পর দুবার বড় আকারের যুদ্ধে জড়িয়েছে। সীমান্তে ছোট আকারের যুদ্ধ হয়েছে একাধিকবার। ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান তার পূর্বাঞ্চল হারিয়েছে। উদ্ভব হয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পেছনে ছিলো ভারতের বড় ধরনের সহায়তা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটি ছিলো ভারতের বড় বিজয়।এরপর দুদেশ সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে। দুদেশের হাতে আছে পারমানবিক অস্ত্র।


আর্ন্তজাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন পারমানবিক যুদ্ধের সবচেয়ে ঝুকিপূর্ন এলাকা হচ্ছে দক্ষিন এশিয়া। যে কোনো যুদ্ধে বৃহত কিংবা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। যেমন ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত পূর্ন সমর্থন পেয়েছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিশে^ ক্ষমতাধর দেশ হিসাবে উন্থান ঘটেছে চীনের। ভারত এর আগে ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো। সে যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় হয়েছিলো ভারতের। এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার আর অস্ত্র বানিজ্যকে কেন্দ্র করে হচ্ছে নতুন মেরুকরন।


ভারতের জনমানসে পাকিস্তানের সাথে লড়াইয়ে যে ধরনের উত্তেজনা থাকে চীনের সাথে লড়াইয়ের প্রশ্ন এলে তাতে আবেগের মাত্রা কমে যেতে থাকে। এর কারণ ভারতের দু’টি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে ভারত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। চীন এখন বিশে^র এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সামরিক দিক দিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। কিন্তু এর পরও ভারতের মধ্যে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাসনা গোপন থাকে না। এর প্রকাশ শুধু পাকিস্তানের সাথে বিরোধের মধ্যে ঘটে থাকে তা নয়, ভিয়েতনামের সাথে চীনের সামরিক সম্পর্ক কিংবা আসিয়ান দেশগুলোর সাথে ভারতের সর্ম্পকের মধ্যে ফুটে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হওয়ার পর ভারতের আমলাতন্ত্র ও নন-স্টেট অ্যাক্টরদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে, আঞ্চলিক শক্তি থেকে ভারতকে সুপার পাওয়ার ভাবতে শুরু করেছে। ভারতের এই মনোভঙ্গি চীন ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এর ফল হিসেবে ভারত যতটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, চীন ততটাই পাকিস্তানের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে।


২০১৫ সালের জুন মাসে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১০ বছরের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে দুই দেশের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের ব্যাপারে দুই দেশ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথে পাকিস্তান জানিয়ে দেয় চীনের সাথে একই ধরনের চুক্তি আগেই পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর থেকে কাশ্মিরের সীমান্ত ঘেষা গিলগিট বাল্টিস্থান হয়ে চীনের কাশগড় পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন নিয়ে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ভারত মনে করে বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর থেকে চীন যে রাস্তা নির্মাণ করছে এর সামরিক গুরুত্ব ভারতকে কোণঠাসা করে ফেলবে। ভারতের এই উদ্বেগ নরেন্দ্র মোদির পাকিস্তান নীতিকে প্রভাবিত করছে। অপরদিকে পাকিস্তানকে চাপে রাখতে ভারত বসে নেই।


পাকিস্তান দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করে আসছে, ভারত বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়ে আসছে। বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা শুধু পাকিস্তান নয় চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানে চীন যে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে তার বড় অংশ বেলুচিস্তানকেন্দ্রিক। এ ছাড়া বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর থেকে চীন সহজে আরব সাগরে প্রবেশের সুযোগ পাবে। তবে বেলুচিস্তানে ভারতের অস্থিরতা সৃষ্টির কৌশল নানা জটিলতার সৃষ্টি করছে। বেলুচিস্তানে অস্থিরতায় ভারতের ভূমিকায় ইরান উদ্বিগ্ন। কারণ বেলুচিস্তানের একটি অংশ ইরানে। স্বাধীন বেলুচিস্তানের যেকোনো প্রচেষ্টা ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি। বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন পাকিস্তানের সাথে চীনের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের পথকে শুধু এগিয়ে নেয়নি, ইরানের সমর্থন পাচ্ছে।


শুধু বেলুচিস্তান নয় ভারত এখন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সাংবিধানিক অধিকার হরনের পর সেখানে ব্যাপক সেনা নিপীড়ন চালানো হয়েছে। এই উপত্যকায় ৭ লাখের বেশি সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চীন নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একাংশও ভারত দাবি করেছে। ফলে চীন ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে চীন বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক ফোরামে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনায় চীন অগ্রনী ভুমিকা পালন করেছে।


চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবিলার জন্য ভারত যেমন পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সর্ম্পক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তেমনি রাশিয়ার সাথে ভারসাম্যপূর্ন সর্ম্পক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাশিয়া বেশ কৌশলী ভুমিকা নিয়েছে। রাশিয়া একদিকে এশিয়ায় সমরাস্ত্র বিক্রি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীনকে পাশে রেখে এশিয়া নীতি নির্ধারন করছে। পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার সাম্প্রতিক সর্ম্পক এর বড় প্রমান।


শীতল যুদ্ধের সময় ভারতের সবচেয়ে পরীক্ষীত বন্ধু ছিলো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবস্থানকে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলো রাশিয়া। রাশিয়ার সাথে ভারতের এই বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়েছে এমন নয়। তবে সুতোতে যে টান পড়েছে তাও অদৃশ্য নয়।
এখন পর্যন্ত ভারতের প্রধান অস্ত্রসরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। ভারতের বিমান বাহিনী গড়ে উঠেছে রাশিয়ার যুদ্ধ বিমান দিয়ে। নৌশক্তিতে ভারত যথেষ্ট শক্তিশালী এর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে রাশিয়া। ভারতের সাবমেরিন বহরে রাশিয়ার সাবমেরিনের সংখ্যা বেশি। এখন রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে ভারত। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতকে সর্তক করে দেয়া হয়েছে। এস-৪০০ কিনলে ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।


রাশিয়ার সাথে পুরানো সামরিক সর্ম্পকের মধ্যে ভারত পশ্চিমের সাথে ঘনিষ্টতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বেসরকারি পর্যায়ের পারমানবিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। ফ্রান্সের কাছ থেকে যুদ্ধ বিমান কেনার চুক্তি করেছে ভারত। ভারতের এই পশ্চিমমুখি প্রবনতায় রাশিয়ায় কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ভারতের শত্রু দেশ পাকিস্তানের সাথে সামরিক সর্ম্পক বাড়াচ্ছে। যা ছিলো এক সময় অবিশ্বাস্য। ইতোমধ্যে দুদেশের সেনাবাহিনী যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। সেনা প্রধানরা একাধিক বৈঠক করেছেন।


২০১৪ সালের নভেম্বরে রাশিয়া ও পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর পর থেকে পাকিস্তান রাশিয়া থেকে সমরাস্ত্র কিনতে শুরু করেছে। বেশ কিছু এমআই হেলিকপ্টার ও ট্যাংক কেনার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। চীন ও পাকিস্তানের কৌশলগত সর্ম্পকের চাপে থাকা ভারতের জন্য পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা আরো বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া জাতিসংঘ রেজ্যুলিউশন ও দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আহবান জানায়। রাশিয়ার এই অবস্থান ভারতের জন্য ছিলো হতাশাজনক। পশ্চিমা বিশ্ব, চীন ও রাশিয়ার সাথে ভারসাম্যমুলক অবস্থান নির্ধারন করা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে ক্ষমতাধর দেশগুলোর নানা বিষয়ে টানপড়েন অস্বাভাবিক বিষ নয়। কিন্তু এরপরও ক্ষমতাধর দেশগুলোর নির্ভরযোগ্য মিত্র প্রয়োজন হয়। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো ভারতের এধরনের মিত্র। আবার পাকিস্তানের মিত্র চীন। ভারতও আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে এমন একটি মিত্র দেশ পেয়েছে। যে দেশের সাথে ক্ষমতাসীনদের সাথে ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন ধর্মবাদী দলের এক ধরনের আদর্শিক মিল আছে। ভারতের সেই মিত্র দেশটি হচ্ছে ইসরাইল। যে দেশটি এখন প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ভারতের পাশে এসে দাড়াচ্ছে।


ভারতের সাথে ইসরাইলের সর্ম্পক বেশ পুরানো হলেও তা ছিলো অনেকটা গোপনীয়। দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সর্ম্পক স্থাপিত হয় ১৯৯২ সালে। এখন এই সর্ম্পক নতুন উচ্চতায় গেছে। দুদেশে উগ্রপন্থী ধর্মবাদী দল ক্ষমতায় থাকায় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয় সামরিক সহযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম জনগোষ্টী দমনে ইসরাইলের নীতি ভারত অনুসরন করছে এমন অভিযোগ এখন উঠেছে। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সামরিক সম্পর্ক অনেক সুদৃঢ়। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায় গত কয়েক বছরে দেশ দুটির অস্ত্র বাণিজ্য ছয় বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। রাশিয়ার পর ইসরাইল ভারতের প্রধান অস্ত্র বিক্রেতা দেশ।


শুধুমাত্র ২০১৮ সালেই ভারত সরকার ৭৭৭ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে ইসরাইলের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সর্ম্পকের বিষয়গুলো বিশ্লেষন করে যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাতে বড় ভূমিকা রাখছে ইসরাইল। ইসরাইল থেকে আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইলসহ বিভিন্ন প্রকার সমরাস্ত্র কিনে থাকে ভারত।


২০১৭ সালে ভারত ইসরাইলে সবচেয়ে বড় অস্ত্রবাজার ছিলো ভারত। ইসরাইলি কৌশল ভারতের জন্য বিপজ্জনক ধারা তৈরি করতে পারে। ভারত বড় দেশ বিভিন্ন জনগোষ্টীর বাস। যেখানে ধর্মীয় ছাড়াও বর্ন ও জাতিগত বিভেদ প্রকট। এমন দেশে ইসরাইলের সমর নির্ভর নীতির কৌশল প্রয়োগ করা হলে তা জটিল রুপ নিতে পারে। এছাড়া ভারতের দু পাশে রয়েছে পারমানবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ। ব্রাসেলসের গবেষক শৈরি মালহোত্রা ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-দুদদেশের সর্ম্পক প্রসঙ্গে লিখেছেন “ভারত-ইসরাইলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বিজেপি এবং লিকুদ পার্টির রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে।

 


  • আলফাজ আনাম
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৯