চীন-ভারতের প্রতিযোগিতায় বিপন্ন বাংলাদেশ

দিল্লিতে মিয়নমারের সেনা প্রধান -


মিয়ানমারে আর্ন্তজাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুকির মুখে পড়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিপীড়নের শিকার হয়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীর বোঝা যেমন বহন করতে হচ্ছে তেমনি দেশটি অব্যাহতভাবে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। দীর্ঘ সময়ে সেনা শাসনে থাকা দেশটি আর্ন্তজাতিক আইন ও মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কা না করলেও এশিয়ার দুই প্রভাবশালী দেশ চীন ও ভারত বানিজ্যিক স্বার্থে মিয়ানমারের ব্যাপারে চোখ বন্ধ করার নীতি নিয়েছে।


মিয়ানমারের সবচেয়ে পুরানো মিত্র চীন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন জাতিগোষ্টীর সাথে চীন সর্ম্পক বজায় রেখে চলে। ফলে মিয়ানমারের নীতি নির্ধারনে বাইরের শক্তি হিসাবে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে। দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সর্ম্পক ছাড়াও সামরিক নেতৃত্বের সাথে চীনের রয়েছে বিশেষ সর্ম্পক। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নৃত্তাত্বিক জনগোষ্টীর সাথে সংঘাত কিংবা আলোচনায় চীনের ভুমিকা থাকে। চীনের সাথে এই সর্ম্পক আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে।


মিয়ানমারের বড় আকারের অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীন। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রকল্প হচ্ছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের একটি অংশ হচ্ছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। ১৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মান প্রকল্প চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করবে। মিয়ানমারের প্রানকেন্দ্র মান্দালয়, বানিজ্যক রাজধানী ইয়াঙ্গুন হয়ে রাখাইন প্রদেশের কিয়াকপিউ বিশেষ অথনৈতিক জোন পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। কিয়াকপিউয়ে মিয়ানমার একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান করছে।


রাখাইন স্টেটকে ঘিরে চীনের যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তাতে এ অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়নের বিষয়টি চীনের অজানা ছিলো না। পরবর্তীতে দেখা গেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ও নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের সেনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে চীন মিয়ানমারের নীতিকে সমর্থন করেছে। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় চীন সম্পৃক্ত হলেও তা এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। এর প্রধান কারন ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকার পাবেন কিনা সে ব্যাপারে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যেমন স্পষ্টভাবে কিছু বলছে না তেমনি চীনও এ ব্যাপারে নীরব। ফলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আরেকটি বন্দি শিবিরে যেতে মোটেই আগ্রহ দেখাচ্ছে না।


মিয়ানমারে সেনা শাসকদের সাথে শুধু চীন গভীর সর্ম্পক রাখছে এমন নয়। দক্ষিন এশিয়ায় আরেক প্রভাবশালী দেশ ভারত এখন মিয়ানমারের অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশের ঘনিষ্ট মিত্র ভারত শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয় মিয়ানমারের সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করলেও কোনো কথাই বলেনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ মিয়ানমার সফর করলেও রোহিঙ্গা বিষয়ে নীরব ভুমিকা পালন করেন। যা বাংলাদেশকে হতাশ করে।
মিয়ানমারের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক সর্ম্পক জোরদার হচ্ছে। মিয়ানমারের সিত্তাওয়ে ভারত একটি বন্দর পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় এই বন্দরের সাথে উত্তর পূর্ব ভারতের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। চীনের মতো বিশাল আকারের অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের সামর্থ্য ভারতের না থাকলেও চীনের সাথে মিয়ানমারে প্রতিযোগিতায় নামতে চায় ভারত। এ ক্ষেত্রে ভারত মিয়ানমারের সাথে সামরিক সম্পকর্ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে।


সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা সর্ম্পক ঘনিষ্ট হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দেশ দুটি। মিয়ানমারের ডিফেন্স সার্ভিসের কমান্ডার ইন চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দিল্লি সফর করেন। তিনি এমন এক সময় এই সফর করেন যখন পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।


চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে মিয়ানমারের নৌবাহিনীকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি টর্পেডো দিয়েছে। এই পুরো প্রকল্পটি ছিল ৩৭.৯ মিলিয়ন ডলারের। সামর্থ্য বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ভারত চলতি মাসের গোড়ার দিকে মিয়ানমারকে ‘সায়েনা’ নামের এডভান্সড লাইট টর্পেডো সরবরাহ করে। ২০১৭ সালে এ ব্যাপারে ৩৮ মিলিয়ন ডলারের রফতানি চুক্তি হয়। ভারত ডিনামিক্স লি. (বিডিএল) এই টর্পেডো তৈরি করে।


মিন অং লাইং দিল্লিতে থাকা অবস্থায় ভারত জানায় মিয়ানমারকে প্রথমবারের মতো একটি কিলো-ক্লাস সাবমেরিন দেবে ভারত। দেশীয়ভাবে মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের শেষ দিকে এটি মিয়ানমারে পাঠানো হতে পারে। আগামীতে নিজস্ব সাবমেরিন বহর তৈরির চেষ্টা করছে মিয়ানমার। ভারতের সাবমেরিন আইএনএস সিন্ধুবীর প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করবে মিয়ানমার নৌবাহিনী।
মিয়ানমারকে প্রথমবারের মতো একটি কিলো-ক্লাস সাবমেরিন দিতে যাচ্ছে ভারত। ভারতের সাবমেরিন আইএনএস সিন্ধুবীর প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করবে মিয়ানমার নৌবাহিনী। মিয়ানমারকে সাবমেরিন সরবরাহের ভারতের সাথে চুক্তি এ অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্যর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশকে দুটি রিফারভিশড টাইপ ০৩৫জি বা মিং ক্লাস সাবমেরিন সরবরাহ করে চীন।


এ ব্যাপারে দেশ দুটির মধ্যে ২০৩ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। ভারত এই চুক্তিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। ভারতের গনমাধ্যমে চীনের ওপর বাংলাদেশ অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এরপর মিয়ানমান নৌ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভারতের দিকে ঝুকে পড়ে। আগামীতে নিজস্ব সাবমেরিন বহর তৈরির চেষ্টা করছে মিয়ানমার।


ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে মিয়ানমারের জেনারেলরা সাফল্যের সাথে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। পশ্চিম বিশ্ব মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও কার্যকর কোনো ভুমিকা পালন করতে পারছে না। মুলত চীন এক্ষেত্রে কৌশলী ভুমিকা নিয়েছে। অংসান সূচিকে সামনে আনার পর পশ্চিমা বিশ্ব আশা করেছিলো দেশটিতে প্রভাব বাড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পুর্ন উল্টে গেছে। সূচি এখন সেনা নেতৃত্বের মুখপাত্রে পরিনত হয়েছেন। সূচির সাথে ভারতের ঘনিষ্টতা অনেক পুরানো। মিয়ানমারের সাথে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান আমলে নিতে রাজি নয় ভারত। মিয়ানমারের ডিফেন্স সার্ভিসের কমান্ডার ইন চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইংয়ের ওপর পশ্চিমা দেশের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও দিল্লিতে তার সফর ছিলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ন। মিয়ানমারের জেনারেলরা ভূকৌশলগত সুবিধাকে সামরিক শক্তি বাড়ানোর কৌশল হিসাবে বেছে নিয়েছেন। মিয়ানমারে ভারত-চীন ছাড়াও বিভিন্ন দেশের অস্ত্র বিক্রির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কেনে রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে। এ ছাড়া ভারত, ইসরায়েল, ইউক্রেনও মিয়ানমারের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ বিমান কিনেছে চীনের কাছ থেকে। চীন থেকে ১২০টি যুদ্ধ বিমান কিনেছে মিয়ানমার। রাশিয়া থেকে ৬৪, পোল্যান্ড থেকে ৩৫টি, জার্মানি থেকে ২০টি, সাবেক যুগোশ্লেভিয়া থেকে ১২টি, ভারত থেকে ৯টি।


এই সময় পর্যন্ত মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হলো রাশিয়া। রাশিয়া থেকে মিয়ানমার কিনেছে ২ হাজার ৯৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র। এরপরেই রয়েছে চীন। চীনের কাছ থেকে কিনেছে ১ হাজার ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র। বেলারুশ থেকে ১০২টি, বুলগেরিয়া থেকে ১০০টি ও ইউক্রেন থেকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে মিয়ানমার।


বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য হচ্ছে ভারত এবং চীন উভয়ই ঘনিষ্ট মিত্র হিসাবে দাবি করে। মিয়ানমারে সেনা নিপীড়নের শিকার হয়ে যারা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের ফিরে নেয়ার ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভুমিকা গ্রহন করছে না। পশ্চিমা চাপ মোকাবেলার জন্য মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে আগ্রহ দেখালেও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হচ্ছে না। চীনের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা কার্যত ব্যর্থ হতে চলছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা আরো বেশি রহস্যজনক। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো আসামে বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষির নাগরিকত্ব হরন করছে। যাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হতে পারে এমন উদ্বেগ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে। মুলত এ অঞ্চলে ভুরাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশ গিনিপিগে পরিনত হয়েছে।