ভাঙ্গন শুরু হতে পারে কাশ্মীর থেকে

কাশ্মীরে বিক্ষোভ চলছে - আনাদুলু


কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এটা নেহেরু-গান্ধীসহ ততকালীন কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারাও জানতেন ও মানতেন।কেন? কিন্তু অংশই বা করতে হয় কেমন করে? এটা সেই ১৮১৫ সালের রামমোহনের রেনেসাঁ থেকে একাল পর্যন্ত ভারতের কারই জানা হয় নাই। কমবেশি সকলেরই বেকুবি ধারণাটা হল, ব্যাপারটা বোধ হয় বলপ্রয়োগ করেই করার বিষয়।

আমাদের অনেকের ধারণা অবিভক্ত ভারত মানে একটা এককাট্টা প্রশাসনিক এলাকা যা বৃটিশেরা  ১৯৪৭ সালে চলে যাবার সময় একটা অংশ নেহেরু-গান্ধীগংদের ভারত বানাতে দিয়ে যাওয়া হয়  আর অপর অংশ মুসলমানপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র হয়। এই অনুমান-কল্পনা যে অবিভক্ত ভারত মানে একটা এককাট্টা প্রশাসনিক এলাকা এই ধারণাটা ভিত্তিহীন। বাস্তবতা ছিল বৃটিশ-ইন্ডিয়ার আমলের ইন্ডিয়া ছিল প্রধানত তিন ধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থা -তিন প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ), ১৭ টা প্রদেশ আর ৫৫০ এরও বেশি প্রিন্সলি স্টেট (করদ রাজ্য)। আর এদের প্রত্যেকেই ছিল একই কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর (এখন থেকে সংক্ষেপে কোম্পানী লিখা হবে) হেড কোয়ার্টারের অধীনে সরাসরি শাসনে; কিন্তু আলাদা আলাদা ভাবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ আর প্রিন্সলি স্টেটগুলো সকলেই একেকটা বিচ্ছিন্ন আলাদা সত্বা। তবুও এরা আলাদা থেকেই আবার সকলেই একই ফোর্ট উইলিয়াম বা কোম্পানীর প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক অধীনে। প্রিন্সলি স্টেটগুলো আবার আরও জটিল অবস্থা যে সেগুলোর আভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন প্রশাসন আবার কোম্পানীর অধীনেও নয়, তৈরিও নয়। কেবলমাত্র বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি এই বিষয়গুলোই কেবল কোম্পানীর অধীনেও। এসব ইস্যুতে কোম্পানি যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই ফাইনাল, করদ রাজাদের এনিয়ে কিছু বলার নাই। তবে করদ রাজ্যগুলোর আভ্যন্তরীণ পরিচালনা, প্রশাসন ও রাজস্ব আদায় একচেটিয়া রাজাদের হাতে, যদিও রাজারা আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট শেয়ার বৃটিশদেরকে দিতে বাধ্য থাকত। এবিষয়ে প্রত্যেক রাজার সাথেই কোম্পানীর আলাদা আলাদা চুক্তি ছিল। ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম একশ বছর বলতে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনে ছিলাম। আর সিপাই বিদ্রোহ দমনের পর থেকে কোম্পানির জায়গায় লন্ডনের বৃটিশ সরকার সরাসরি কোম্পানির সব কর্তৃত্ব নিজে অধিগ্রহণ করেছিল, শাসন করেছিল ১৯৪৭ আগষ্ট পর্যন্ত।

তাই দেশভাগের সময়ে প্রেসিডেন্সি, প্রদেশগুলোই স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে গেলেও প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বলেই বৃটিশ সরকার বিদায় নিয়েছিল। এই ভুয়া যুক্তিতে যে কোম্পানি বা বৃটিশদের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিতে এমন কিছু লেখা নাই। প্রিন্সলি স্টেট মানে কোম্পানির ভারতে জেঁকে বসার আগে থেকেই যেগুলো অসংখ্য ছোট-বড় রাজার রাজ্য হয়ে ছিল। শুধু তাই না। এদের মধ্যে যেগুলোকে কোম্পানি পরাস্ত করে নিজ প্রশাসনিক দখলে নেয় নাই। কিন্তু কোম্পানির অধীনে করদ রাজ্য চুক্তি করে রেখে দিয়েছিল। প্রশাসন পুরানা রাজার হাতেই রেখে দিয়েছিল।

ভারতের ভাগে পড়া প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে নেহেরু নিজের জন্য যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তা হল, সব প্রিন্সলি স্টেটকে নেহেরুর ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। রাজাদের স্বেচ্ছায় সারেন্ডারে নইলে বলপ্রয়োগ করে নিয়ে নেয়া হবে। এবং বিনা ক্ষতিপুরণে। অর্থাৎ রাজ পরিবারকে কোন খোরপোষ বা ভাতাও দেয়া হবে না। তবে বসত ভিটা বা হাভেলির নামে যা নিতে পারে। নেহেরু, বৃটিশের মত ঘরের ভিতর ঘর হিসাবে ভারতের ভিতরে কোন প্রিন্সলি স্টেট এর ক্যাচাল রাখতে চান নাই। নেহেরু সঠিক ছিলেন এই অর্থে যে দেশভাগের পরের স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ভারতের ভিতরে আবার পকেটে পকেটে রাজার শাসন বা বেমানান মনার্কি বা রাজতন্ত্র কিভাবে থাকবে! একাজটাই তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেলকে দিয়ে। আর ওদিকে নেহেরুর সাথে তুলনায় নতুন পাকিস্তান প্রিন্সলি স্টেট নিয়ে এত সিরিয়াস ছিল না।

আর ঠিক একারণেই আমাদের পাহাড়ি রাজারা পাকিস্তান মুসলমানদের, মানে হিন্দুপ্রধান না হলেও তাদের সাথেই যুক্ত হতে সিদ্ধান্ত নেয়। এনিয়ে সম্প্রতি একটা পিএইচডি গবেষণা হয়েছে যার ফাইন্ডিং-স সেখানেও এই কারণটাই উঠে এসেছে। যা বিবিসি বাংলাতে প্রকাশিত হয়েছিল। কাজেই ইসলামবিদ্বেষী হয়ে বাংলাদেশের যারা তথাকথিত প্রগতিশীলতা বা ভিকটিমহুডের ইমেজ তৈরি করে কাশ্মীরের সাথে পাহাড়ি ইস্যু মিলিয়ে তুলনা করছেন, সেটা ভিত্তিহীন।

আসলে পাহাড়ি রাজারা, রাজা হিসাবে যোগ দিলেও মর্ডান রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভিতরে রাজাগিরি অকেজো – এই বাস্তবতাতেই তা শুকিয়ে গেছে। কেবল পাহাড়িদের পুরানা “১৯০০ সালের ম্যানুয়াল” বলে একটা অকেজো কিছু আছে। আর জমির অনেক অংশই এখন বাঙালিদের কাছে বেদখল হয়ে আছে। কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে যে এঘটনাগুলো কেবল ১৯৭৫ সালের পরের নতুন ঘটনা।, ভারতের প্ররোচনায় পাহাড়িরা আগে-পিছে চিন্তা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেমে তাতে ফেল করার ভুল রাজনীতির পরিণতিতে এতা হয়েছে। যদিও পাহাড়িরা যারা যে জমিতে আগে ছিল তাকে সেখানেই পুনর্বাসন করা সম্ভব, যদি তারা ইতিবাচক পথে ফিরে, সঠিক বন্ধু বাঙালি রাজনীতিকদের খুজে বের করে নিবার যোগ্য হয়।

 

কিন্তু নেহেরু নিজ নীতি ভেঙ্গে ব্যতিক্রম করেন কাশ্মীরের বেলায়। কাশ্মীরের দুর্ভাগ্য যে সে প্রিন্সলি স্টেট। এটা না হয়ে যদি সে সরাসরি কোম্পানির অধীনে কোন প্রদেশ থাকত? এর সোজা মানে হত মুসলমান প্রধান অঞ্চল বলে এই সুত্র অনুযায়ী, তা প্রায় বিনা কথা খরচে কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। কারণ ১৯৪৭ সালের জনসংখ্যা-ডেমোগ্রাফিতে দেখা যায় পুরা জম্মু-কাশ্মীরের কাশ্মীর বা উপত্যাকা অংশে হিন্দু জনগোষ্ঠি নাই বললেই চলে। আর জম্মু অংশেও ৩০% এর বেশি হিন্দু জনগোষ্ঠি নাই। এটা বাদে সারা কাশ্মীরে ৯৫-৯৯% মুসলমান – এটাই হত ওর প্রধান যুক্তি।

কিন্তু এই ডেমোগ্রাফির প্রিন্সলি স্টেট কাশ্মীরের পাঞ্জাবি (হিন্দু) রাজা হরি সিং – তিনি ভারতে্র সামরিক সহায়তা চান এবং ভারতে যোগ দিতে চাওয়ার খায়েস প্রকাশ করাতে নেহেরু প্রলুব্ধ হয়ে উলটা পথে হাটেন। যে নেহেরু প্রিন্সলি স্টেট হায়দ্রাবাদের নিজাম (রাজা) [যিনি একমাত্র মুসলমান রাজা যে বসে বসে জমির খাজনা তুলে খাওয়া আর বাঈজি নাচানো রাজা নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিপুর্ণ বাজারে ইন্ডাস্ট্রির গড়ে এর পণ্য বেচা রাজা] – তাকেও নেহেরু আর্মি পাঠিয়ে উতখাত করেছিলেন। সেই নেহেরু হরি সিংয়ের বেলায় প্রলুব্ধ হলেন।

কাশ্মীরের আর এক বৈশিষ্ট হল সে মূল ভারতের ভিতরের কোন প্রিন্সলি স্টেট নয়। অবস্থান ভারতের উত্তর সীমান্তে তো বটেই তাও আবার বড় আরেক অংশ পাকিস্তানেরও উত্তর সীমান্তে।

 

প্রিন্সলি স্টেটগুলো ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবার যে প্রচলিত চুক্তির রূপ আমরা দেখি একে বলা হয় “ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন” বা “সংযুক্ত হবার (আইনি) উপায়”। হরি সিংয়ের সাথে নেহেরু যে একসেশন চুক্তি করেন তা শর্তযুক্ত। সারকথায় তা – বৃটিশের সাথে প্রিন্সলি স্টেটগুলোর চুক্তিরই অনুরুপ কপি। যা মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদির বিষয়গুলো নেহেরুর ভারতের হাতে দিয়ে দেয়া সাপেক্ষে বাকি ইস্যুতে নিজে করদ রাজা থাকা। কঠিন বাস্তবতা হল, নেহেরু সংখ্যালঘুর সমর্থনপুস্ট রাজা হরি সিংয়ের সাথেই শর্তযুক্ত একসেশন চুক্তি করেছিলেন। কেন? খুব সম্ভবত, মুসলমান অধ্যুসিত কাশ্মীর তো নেহেরুর ভারতেযুক্ত হবার কথাই না। কাজেই পড়ে পাওয়া চার আনা, এই কারণে।

কিন্তু নেহেরু এমন চুক্তির বাস্তবায়ন করেন নাই। অর্থাৎ চুক্তি করলেও কাশ্মীর নেহেরুর ভারতের নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে দাড়ায় নাই। কেন, কীভাবে পেরেছিলেন? নেহেরুর হাতে একাজে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন ন্যশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহ। কাশ্মীর ছিল প্রিন্সলি স্টেট মানে, রাজার রাজ্য ছিল বলে সেখানে বৃটিশ আমল ত্থেকেই রাজনৈতিক দল জমে নাই। রাজনীতি আর রাজা হল জোঁক আর নুনের সম্পর্কের। রাজনীতি থাকলেই তা রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র হওয়ার দিকে রওনা দিবে। যা রাজতন্ত্রের জন্য যম বা মরণকাঠি। তাই রাজার দেশে রাজা – কোন পাল্টা ক্ষমতার চিন্তাভাবনা হিসাবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, জমায়েত এগুলো থাকতে দেয় না। তাই শেখ আব্দুল্লাহর পিঠে হাত রেখে তার ন্যশনাল কংগ্রেসকে নেহেরুর কংগ্রেসের বিকল্প - কাশ্মীরের রাজনৈতিক দল হিসাবে উঠে আসতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। যাতে এই শেখ আব্দুল্লাহর ন্যাশনাল কংগ্রেসই রাজা হরি সিংয়ের মুখে চাটা মারতে পারে। তাই, চুক্তি করলেও কাশ্মীর নয়াদিল্লির নয়া প্রিন্সলি স্টেট হয়ে উঠতেই পারে নাই। কারণ রাজার বিকল্প হিসাবে নেহেরু শেখ আব্দুল্লাহকেই কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসাবে হাজির করে ফেলেন। তবে এটা প্রথম পর্যায়। আর রাজা মনের দুঃখে বনবাসে যাওয়ার অবস্থায়। কালক্রমে রাজা কাশ্মীর থেকে দূরে পুরানা বোম্বাইয়ে বসবাস করতে থাকেন, সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা যান।

কিন্তু নেহেরুর আসল দুঃখ তাতে ঘুচে নাই।

সারা ভারতের যেকাউকে যদি জিজ্ঞাসা করেন কাশ্মীর ভারতের হল কী করে? সকলে একবাক্যে বলবে হরিসিং লিখে দিয়েছে। এটা শতভাগ মিথ্যা কথা। একসেশন চুক্তি অনুযায়ী হরি সিং নেহেরুর ভারতকে কেবল মূলত বৈদেশিক, পররাষ্ট্র, সামরিক ও বাইরের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদির বিষয়গুলো হস্তান্তর করেছেন। যার অর্থ কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রের ভুখন্ড নয় বা ভারতের আইন কনষ্টিটিউশনের অধীন নয়।

তাই এই কথাগুলোই লিখে ভারতের কনষ্টিটুশনে যে অনুচ্ছেদে আনা হয় সেটাই ৩৭০ ধারা।

কিন্তু এরও আগে নেহেরু পরিস্কার করেন জানতেন এই দুর্বলতার কথা যে কাশ্মীর ভারতের অংশ নয়। কিন্তু এই দুর্বলতা কাটাতে গিয়ে তিনি আরেক ভুল করে বসেন। তিনিই প্রথম নিজেই কাশ্মীর ইস্যুকে জাতিসংঘে নিয়ে তুলেন। যদিও এমনিতেও জাতিসংঘ এই বিবাদের ভিতরে ঢুকেই ছিল।

প্রথমত একটা ফ্যাক্টস মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে কী বৈশিষ্ট চেহারা নিয়ে এর প্রধান নির্দেশক স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন সেকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। জাতিসংঘ তাঁরই ইমাজিনেশনের বাস্তব রূপ। যার সারকথাটা হল, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্ব স্ব রাষ্ট্রস্বার্থ নিজে যত বিবাদ এর অনেকগুলোই জাতিসংঘের নীতি কনভেনশন মেনে এর মধ্যস্ততায় বিনা যুদ্ধে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। সেকাজেই জাতিসংঘ গড়া। তাই কাশ্মীরে আপাত থিতু এসেছিল একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান আর্মি আর মাঝখানে জাতিসংঘের (সম্ভবত প্রথম) অবজারভার মিশন– এভাবে। সেকালের জাতিসংঘ মধ্যস্ততা করার জন্যই একপায়ে খাড়া থাকত। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়। কিন্তু জাতিসংঘ বিষয়ে তার  আইডিয়া-নীতি অনুসৃত হয়েছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট হারি ট্রুম্যানের হাতে, ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। এরপরের জাতিসংঘ সম্পুর্ণ আলাদা, মূলত আমেরিকার ব্যাকিং না পাওয়া -কারণ, ততদিনে আমেরিকাও নিজেই তেলের খনি দখলের আমেরিকা হয়ে গেছিল।

 

হরি সিং শর্তযুক্ত একসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭। আর নেহেরু কাশ্মীর-ইস্যু জাতিসংঘ তুলেন ১ জানুয়ারি ১৯৪৮।

প্রথমত নেহেরুর জাতিসংঘে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে কাশ্মীর ভারতের নয়। এছাড়া হরি সিংয়ের সাথে একশেসন চুক্তিটা দুর্বল, এটা যথেষ্ট না নেহেরুর তা বুঝার কথা না। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন হ্যারি ট্রুম্যানের জাতিসংঘ তাঁকে ফেবার করতে পারে। কিন্তু তাঁর অনুমান ভুল। কাশ্মীর ভারতের – এমন রায় নেহেরু জাতিসংঘ থেকে আনতে পারেন নাই। এককথায় তিনি ব্যর্থ। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন কেন?

 

না জানার সুবিধা অনেক। এতে অনেক কিছু করে ফেলা যায়। নাপিত অবলীলায় ফোড়া কেটে দিতে পারে, যা ডাক্তার পারে না।  নেহেরু কতদুর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারি ছিলেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব এনজয় করতেন কী চোখে? নীতি করণীয় ঠিক করতেন কী মানদন্ডে? এসব বিচারে এককথায় ছিলেন একজন কলোনাইজার। তিনি নিজেকে একজন কলোনি শাসকের বাইরে ভাবেন নাই। রাষ্ট্র বলতে তার ইমাজিনেশন বা বুঝ হল এক কলোনি শাসক তিনি। তিনি মর্ডান প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধারণা যাই বুঝে থাকেন না কেন সেটা তার ব্যবহারিক রাষ্ট্রে, প্রধানমন্ত্রীত্বে প্রতিফলিত করতে পারেন নাই।  এটা সবচেয়ে ভাল ধরা পড়েছিল তার এই জাতিসংঘ ধারণায়, জাতিসংঘের কাছে তার আশা-আকাঙ্খার মধ্যে।

তিনি সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই কোন বয়ানের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনা ও বিজয়ীরা তা শেষ করেছিল। যুদ্ধে শেষে দুনিয়া নতুন করে সাজানো হচ্ছিল কোন মৌলিক ভাবনার ভিত্তিতে।

 

“কোন রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠিকে কে শাসন করবে, কীভাবে তা শাসিত হবে তা নির্ধারণের এক্তিয়ার কেবল ঐ জনগোষ্ঠির”। রুজভেল্টের এই প্রস্তাব রাশিয়াসহ সারা ইউরোপ ভিত্তি হিসাবে মানতে রাজি হওয়াতেই রুজভেল্ট হিটলার ঠেকাতে বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। সকলকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়েছিলেন। আর যুদ্ধ শেষের দুনিয়াটা জাতিসংঘসহ সাজানো হয়েছে সেই একই নীতির ভিত্তিতে। যে নীতিটা বলে দিয়েছিল, কলোনি শাসন অবৈধ।

 

রাষ্ট্রের ক্ষমতা কে নিবে, তা নির্ধারিত করবে কেবল স্ব স্ব জনগোষ্ঠি। এই নীতিতে যদি কাশ্মীর ইস্যুর উপর প্রয়োগ করি তাহলে দেখি, হরি সিং কাশ্মীরের কেউ না। কাশ্মীরের জনগণ ঠিক করবে কাশ্মীরের ভাগ্য কী হবে। হরি সিং কোথায় কী সই করেছে, কিছু এসে যায় না; তা মূল্যহীন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মূল মর্ম নেহেরু যদি বুঝতেন তিনি কখনই কলোনি শাসকের আদব কায়দা নকল করতেন না, নিজ চিন্তায় জায়গা দিয়ে নিজেকে সাজাতেন না। পারতেন না। তিনি হরি সিং একসেশন চুক্তিকে বাইবেল জ্ঞান করতেন না। তিনি জাতিসংঘেও যেতেন না, বরং এভয়েড করতেন। কারণ জাতিসংঘের জন্মই হয়েছে রুজভেল্টের ঐ স্ব স্ব জনগোষ্ঠির শাসন নীতিতে। তাই জাতিসংঘে গেলে, সে হরি সিংয়ের চুক্তিকে তেনা মনে করে ফেলে দেওয়ারই কথা। কাশ্মীর জনগোষ্ঠির গণভোটের সিদ্ধান্তেই সবকিছু নির্ধারণের ভিত্তি মানতে বলবে। এটা নেহেরুর জানা থাকত।

নেহেরু তাই জাতিসংঘের প্রস্তাব অমান্য করে এরপর তা পরিপুরণে করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে আরো বেশি করে হরি সিঙ্ঘের উপরে তুললেন। আর এখান থেকে জন্ম নিল আর্টিকেল ৩৭০। যার সারকথাটা হল, একসেশন চুক্তি যেন ভারতের কনষ্টিটিউশনের বিরোধী না হয়ে যায় এর সমন্বয় করা। আমাদের দেশি ভাষায় বললে, হালাল করে নেয়া। কিন্তু একসেশন চুক্তি আসলেই তো কনষ্টিটুশন বিরোধী। কারণ কাশ্মীরের মুখ্য প্রতিনিধি বলতে কাশ্মীরের জনগণ নয়, কোথাকার এক রাজাকে জনগোষ্ঠির প্রতিনিধি বলে স্বীকার ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোন রিপাবলিকের চোখে রাজা এমন গুরুত্ব পেতেই পারে না। কোন রাজা বা রাজতন্ত্রের চিন্তাকে প্রজাতন্ত্র স্বীকার করতেই পারে না। তবু নেহেরু একসেশন চুক্তিকে হালাল করে নিতে কনস্টিটুশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা আনেন।

ভারতের কনষ্টিটিউশন ড্রাফট যারা করেছেন এর মূল ভুমিকায় ছিলেন প্রথম আইনমন্ত্রী ডঃ অম্বেদকার। নেহেরু তাকে অনুরোধ করেন হবু ৩৭০ ধারা ড্রাফট করতে। অম্বেদকার তা করতে অস্বীকার করেন।

বৃটিশ আমলে শাসক হিসাবে হরি সিংকে কাশ্মীর এক বড় রাজত্বই চালাতেন। ফলে রাজ-আমলারা যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন। পাশে বৃটিশরা থাকাতে এরা টেনিং পেত সেখান থেকে। এমনকি স্বয়ং হরি সিং স্বল্প বয়সে বাবার পরে কাকাও মারা যাওয়াতে রাজা হতে হয়েছিল। যার তাবত একাদেমিক শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিং বৃটিশদের হাতে হয়েছিল। রাজার মুখ্য আমলা যাকে প্রধানমন্ত্রী বলা হত তিনি হলেন বৃটিশ ট্রেইনড গোপালস্বামী আয়াঙ্গার, এক মাদ্রাজি বা তামিল ব্যক্তি। এই আয়াঙ্গার আর শেখ আবদুল্লাহ মিলে ৩৭০ ধারা ড্রাফট করেছিলেন।

এখন ৩৭০ ধারা কী? আপনার লাখ টাকা আমি নিয়ে নিলাম। এরপর আমি এই টাকা ফেরত দেওয়ার সময় একটা দলিল করলাম। দলিলে লিখলাম যে, ১. আমি আপনাকে লাখ টাকা দিলাম। ২. আপনি এই টাকা এখন আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে সে মোতাবেক খরচ করবেন। ৩. আপনার বাসায় কাউকে বসবাস করতে দিবেন না। আমার বাসা থেকে কেউ গেলেও না। তবে কাকে দিবেন না দিবেন সেটা আপনাকে ঠিক করার অনুমতিটা আমিই আপনাকে দিলাম।

 এই তিনটা ধারার প্রথম দুইটা মিলে হল ৩৭০ ধারা, পাশ হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। আর তৃতীয় ধারাটা হল ৩৫এ, যারা প্রেসিডেন্টের আদেশ ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়েছিল।

 

তাহলে এখন মোদী-অমিত কী করল?

তারা বলল এখন আর আপনার টাকাই আপনাকে দেয়ার দলিল না। দলিল বাদ। এইবার খোদ আপনি পুরাটাই এখন আমার।

এইটাই “দ্যা কনষ্টিটয়িউশন (এপ্লিকেশন টু জম্মু ও কাশ্মীর) অর্ডার ২০১৯” এই নামে ০৫ আগষ্ট এক প্রেসিডেন্ট আদেশ জারি করা হয়। এতে বলা হয় যে এটাই “আগের ৩৫এ কে সুপারসিড” করল। সুপারসিড এর বাংলা বলতে পারি, আগে যাই থাক সেটা ছাড়িয়ে এখন থেকে এটাই ওর জায়গা নিল।

তাহলে আগে দলিলে যে লেখা ছিল “আমার ইচ্ছা আর আপনার ইচ্ছা দুটাই মিলে গেলে” তবেই, সেটার কী হল? এছাড়া, ৩৭০ ধারা বাতিলের আগে কাশ্মীরীদের মত নেয়া হল কীভাবে?

এর জবাবে অমিত শাহ বলছেন, বুঝলেন না? কাশ্মীরী মানে তো স্থানীয় প্রাদেশিক পার্লামেন্ট,

তাই তো। ঘটনা হল এখন পার্লামেন্ট নাই, প্রেসিডেন্ট শাসনে আছে। তার মানে প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা মত মানেই তো কাশ্মীরীদের মতামত। তাই ঐ প্রেসিডেন্টের আদেশে শুরুর বাক্যটা হল  এভাবে – আমি আমার সাথে একমত হয়ে .........এই আদেশ জারি করলাম।

আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো পরের লেখায় আনা যাবে হয়ত। কেবল দুটা বাক্য দিয়ে এখন শেষ করব।

সোশাল মিডিয়ায় দেখলাম সবাই আশা করছে কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান বন্ধু দেশ গ্রুপ ব্যক্তির সামরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো। মানে মিলিটারি পদক্ষেপই এর একমাত্র সমাধান। এই অনুমান ভিত্তিহীন। এছাড়া যুদ্ধে যেতে চাইলেও অন্তত ভারত-পাকিস্তান কারই যুদ্ধে যাবার অর্থনৈতিক সামর্থ নাই।

ইস্যুটা মূলত লিগাল দিকসম্পন্ন। সেটাই মুখ্য হয়ে উঠবে। ভারতের পক্ষে পাঁচ ভেটো সদস্যের একজনকে যদি পেতে হয় সেটা হতে পারে আমেরিকা। কিন্তু সেটা ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে পাকিস্তানের গলা চড়ানি পদক্ষেপে। আমেরিকার দূরে চলে যাচ্ছে ভারতের হাত সে যতটুকু আড়ালে ধরেছিল সেটা ছেড়ে। ফলে পাকিস্তানের কূটনীতি একটা বিরাট ভুমিকা আছে। যতটুকু করেছে তাতেই ভারত ইতোমধ্যেই ব্যাকফুটে। ভারতের বিবৃতিগুলোতে তা পরিস্কার।

ওদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল বিরুদ্ধে চলে যাবে ধীরে ধিরে যেটা অলরেডি উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। ওআইসি ধরণের আন্তর্জাতিক বডিগুলোতে ব্যাপক লবি লাগবে কারণ সৌদি ধরনের বাদশাগুলো পিছলে যেতে পারে।

ভারতের সুপ্রীম কোর্ট জনমত শক্ত হয়ে না উঠলে মামলাটাই নিবে না, পিছলাবে। যদিও গত ২০১৮ সালের অক্টোবরে এক মামলায়, আদালতের রায় হল ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না। ওদিকে রাজ্যগুলোও ভয় পেয়েছে। কারণ ভারতরাষ্ট্র মানে এক তথাকথিত ভুতুরে ক্ষমতার কেন্দ্র। কে তাকে কী ক্ষমতা দিয়েছে, এই ক্ষমতার উতস কী, কেউ জানে না। কিন্তু এই ক্ষমতা চাইলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কাল থেকে বিধানসভা বলে কোন প্রাদেশিক এসেম্বলি নাই এমন ঘোষণা করে দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গকে এক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। এটাই কাশ্মির ইস্যুতে রাজ্যগুলো দেখল। এব্যাপারে সবচেয়ে আগে ভীত শঙ্কিত হয়েছে নাগাল্যান্ড ধরণের  ট্রাইবাল ছোট রাজ্যগুলো।

সবমিলিয়ে নেতিবাচক দিক থেকে দেখলে ব্যাপারটা ভুতুড়ে ক্ষমতার ভারত রাষ্ট্রের ভেঙ্গে টুকড়া হয়ে যাওয়া। আর ইতিবাচকভাবে দেখলে এর মুরোদ থাকলে এই ভাঙ্গাটাই পুনরায় আমেরিকার মত এক ফেডারল ভারতের পুনর্গঠন হিসাবে আবির্ভাব হতে পারে। তবে বলাই বাহুল্য সবার আগে হিন্দুত্ব চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। তোবা করে, অজু করে ফেডারল রাষ্ট্র বিষয়ক পাঠ সম্পন্ন করতে হবে। কাশ্মীর তাই আসলে বিরাট ধবংস ও পতনের আইসবার্গ, দেখতে পাওয়া উপর মাথাটা কেবল!     

 

গৌতম দাস

 

[email protected]