তেল নিয়ে মহাসঙ্কট

কার্টুনটি করেছেন মোহাম্মদ সাবানেহ - কার্টুন মুভমেন্ট ডটকম

এশিয়ার জ্বালানি তেল বাণিজ্যের কেন্দ্র হচ্ছে সিঙ্গাপুর উপকূল। কিন্ত তেল বোঝাই অসংখ্য সুপার ট্যাঙ্কার ভিড়তে পারছে না সিঙ্গাপুর উপকূলে। তেল বোঝাই এসব ট্যাঙ্কার উপকূল থেকে অনেক দূরে নোঙ্গর করে রাখা হচ্ছে। এসব ট্যাঙ্কারে থাকা লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল কবে খালাস হবে তাও কেউ বলতে পারছে না। কারন তেল রাখার কোনো জায়গা নেই।

করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী বন্ধ প্রায় সব কল কারখানা আর হাজারো ধরনের যন্ত্রযান। থেমে গেছে অর্থনীতির চাকা। ফলে অবিশ্বাস্যভাবে কমে গেছে তেলের ব্যবহার। তেলের দাম এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তেল কোম্পানি আর তেল ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা মওজুদ তেল বিক্রি করতে পারছে না। অনেক দেশ তেল নিয়ে পড়েছে মহা বিপদে। কারন তেল রাখার জায়গা নেই। তেলের দাম পানির দরে নেমে আসলেও এসব দেশের তেল মওজুদের যে ব্যবস্থা সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। চাহিদার তুলনায় বাজারে আসা অতিরিক্ত এ জ্বালানি তেলকে বিশ্ব তেলের বাজারে সুনামি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

করোনার কারনে সারা বিশ্বে তেলের চাহিদা কমে গেছে শতকরা ৩০ ভাগ। এ হিসেবে দৈনিক ৩ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। অতিরিক্ত এ তেল এখন গোটা বিশ্বের জন্য বিরাট বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। অথচ এই তেলের জন্য বছরের পর বছর বিশ্বে চলছে কত যুদ্ধ আর সংঘাত। প্রাণ দিয়েছে অগণিত মানুষ। ছার খার হয়েছে একের পর এক অনেক দেশ। ঘরবাড়ি হারিয়ে কোটি কোটি মানুষ হয়েছে উদ্বাস্তু।

তেল লুটপাট আর শোসনের জন্য জন্য বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো যুগের পর যুগ বিভিন্ন দেশে টিকিয়ে রেখেছে পুতুল সরকার। অনেক দেশ ধ্বংস হয়েছে । আবার অঢেল তেলের টাকায় সীমাহীন বিলাসিতার নজীর স্থাপন করেছে আরব বিশ্বের দেশগুলো।

সিঙ্গাপুর উপকূলে তেল মজুদের যে অবকাঠামো তা বর্তমানে পরিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ফলে সেখানে নতুন আসা ট্যাঙ্কারের তেল খালাসের কোনো ব্যবস্থাও করা যাচ্ছে না। এর ফলে সুপার অয়েল ট্যাঙ্কারগুলোই অনেক দিন ধরে ভাসমান তেল মজুদ কেন্দ্র হিসেবে থাকতে হবে। এ চিত্র শুধু সিঙ্গাপুর নয়, বরং সারা বিশ্বের জ্বালানি তেল বানিজ্য কেন্দ্রের একই চিত্র। হঠাৎ করে লকডাউনের কারনে মুহুর্তে কমে গেছে তেলের চাহিদা। ফলে পূর্ব থেকে উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় থাকা তেল নিয়ে তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, রিফাইনার্স এবং ব্যবসায়ীরা হন্যে হয়ে সন্ধান করছেন অপরিশোধিত তেল রাখার জায়গা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ২০ এপ্রিল সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে জ্বালানি তেলের দাম। এদিন ১ ব্যারেল তেলের দাম দাড়ায় ১০ ডলার। এ ছাড়া একই দিন মার্কিন ইতিহাসে ফিউচার অয়েল বিক্রি নেমে আসে শুন্যের নিচে। এক পর্যয়ে তা মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে আসে প্রতি ব্যারেল।

ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডবিøউ টি আই এর মে মাসের জন্য তেল বিক্রি চুক্তি নেতিবাচক রুপ নেয় যা ইতিহাসে প্রথম। এদের তেলের দাম নেমে আসে প্রতি ব্যারেল মাত্র ১২ দশমিক ৭৮ ডলার। আর জুন মাসের জন্য প্রতি ব্যারেলের দাম নেমে ১১ দশমিক ৮৬ ডলারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল মজুদের নতুন আর কোনো জায়গা না পাওয়ার কারনে আশঙ্কা আরো কিছুদিন তেলের দাম কম থাকবে। এমনকি আরো কমে যেতে পারে। ফলে আর্ন্তজাতিক বাজারেও তেলের দামে আরো পতন ঘটতে থাকবে। অনেক তেল কোম্পানী মে মাসের অগ্রিম তেল নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে বিক্রি করতে পারেনি। তারা জানেনা অবিক্রিত তেল নিয়ে তারা এখন কি করবেন।

কার্টুনটির শিরোনাম ‘করোনা ভাইরাস অ্যান্ড দি ওয়েল’। প্রকাশ করেছে আরাবি২১নিউজ
কার্টুনটির শিরোনাম ‘করোনা ভাইরাস অ্যান্ড দি ওয়েল’। প্রকাশ করেছে আরাবি২১নিউজ

 

যেমন নিউ ইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে ডব্লিটিআইর মে মাসের তেল বিক্রির শেষ দিন ছিল ২১ এপ্রিল। কিন্ত শেষ দিনেও তারা অনেক তেল বিক্রি করতে পারেনি। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে মধ্য এপ্রিলে ওকলাহামায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল মজুদ ছিলো । মে মাসে এখানে নতুন কোনো তেল মজুদ করা যাবে না। মার্কিন জ্বালানি তেলের বাজারে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহকে তেলের বাজারে বিপর্যয়ের অন্যতম কারন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেখানে লোকসান এড়াতে প্রতি ব্যারেল তেল গড়ে ৫০ ডলারে বিক্রি করা দরকার সেখানে ব্যারেল প্রতি দাম নেমে এসেছে ১০ ডলারের নিচে।

এশিয়ার দেশগুলোতে তেলের প্রধান ক্রেতা হলেও এসব দেশ একই সমস্যায় পড়েছে। ভারত বিশ্বের তৃতীয় জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। কিন্তু তেলের ঐতিহাসিক দরপতনের পরও দেশটি এ থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারছে না। কারন তাদেরও তেল মজুদের অবকাঠামো নেই। লকডাউনের কারনে ভারতেও তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে আগের তেলই রয়ে গেছে অবিক্রিত। লকডাউন ঘোষণার সময় থেকেই দেশটির তেল মজুদ ক্ষমতা ৯৫ ভাগ পূর্ণ ছিল।

ভারতের তেল মজুদের ক্ষমতা ৩ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল এবং তা দিয়ে দেশটি ৯ দিন চলতে পারে। অপর দিকে চীনের তেল মজুদের ক্ষমতা ৫৫ কোটি ব্যারেল। জাপানের মজুদ ক্ষমতা ৫৩ কোটি ব্যারেল।

তেলের দামের আকস্মিক উত্থান পতনের মাঝেও বিশ্বের বড় বড় সুপার ট্যাঙ্কার বহরের বানিজ্য কিন্তু বেড়েছে। এই ট্যাঙ্কারগুলো প্রিমিয়ামে তেল নিচ্ছে। বেড়েছে সুপার ট্যাঙ্কারের ভাড়ার রেট। যেহেতু উকপূল বা স্থল ভাগে তেল রাখার জায়গা নেই তাই বড় বড় অনেক সুপার ট্যাঙ্কারে সাগরে তেল রাখার চেষ্টা করছেন অনেক ব্যবসায়ী।

বর্তমানে বিশ্বে ৮১৫টি সুপার ট্যাঙ্কার রয়েছে। এর ১০ ভাগ বুকিং করা হয়েছে গত কয়েক সপ্তাহে। এসব ট্যাঙ্কারে অপরিশোধিত তেল সুমদ্রে রাখা হবে। একটি সুপার ট্যাঙ্কারে ২০ লাখ ব্যারেল তেল রাখা যায়। বিভিন্ন সুপার ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে ২০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সমুদ্রে রাখার চেষ্টা করছেন ব্যবাসায়ীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র উপকূল থেকে দূরে এবং সরু সিঙ্গাপুর প্রণালীর কাছে বর্তমানে ৮০ থেকে ১০০টি সুপার অয়ের ট্যাঙ্কারে তেল মজুদের কাজ চলছে। তেলের ব্যবহার কমে গেলেও তেলের যোগান এখনো বেড়ে চলছে। ফলে অতিরিক্ত এ তেল রাখার জন্য কমপক্ষে আরো ২০০টি সুপার ট্যাঙ্কার দরকার হবে। বিশ্বে ভাসমান অবস্থায় ২৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুদ রাখা সম্ভব। অপর দিকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র উপক‚লে যেসব জ্বালানি তেল মজুদ রাখান স্থান রয়েছে তার ৮৫ ভাগ এপ্রিলের মাঝামাঝি পূর্ণ হয়ে গেছে।

ব্যবসায়ীরা বিকল্প কোনো উপায় না পেয়ে ঊপক‚ল থেকে দূরে সাগরে তেল রাখার দিকে ধাবিত হচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে রকেট গতিতে বেড়েছে অয়েল ট্যাঙ্কারের ভাড়া। ফলে জমজমাট হয়ে উঠছে এ খাতের ব্যবসা। এমনকি মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল মজুদ রাখার ক্ষমতা রয়েছে এমন শিপ ব্রোকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও তাদের জাহাজ লিজ দিয়েছে।

জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেক এবং এর সহযোগী দেশগুলো ১২ এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের উৎপাদন দৈনিক ১ কোটি ব্যারেল কমাতে রাজি হয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি এ চুক্তি করতে অনেক দেরি করে ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আরো আগে এ পদক্ষেপ নিলে বর্তমানে তেল রাখার সঙ্কট এত তীব্র হতো না হয়তো।

জ্বালানি তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য। কিন্তু উৎপাদন কমানোর চুক্তির পর দা তো বাড়েনি বরং করোনার কারনে অব্যহত থাকে দরপতন। উপরন্ত এখন জায়গা হচ্ছে না তেল রাখার। ব্যবসায়ীরা তেলের কোনো ক্রেতাও পাচ্ছেন না।

জ্বালানি তেলের একটি বিরাট অংশ ব্যবহার করা হয় পরিবহন খাতে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মনে করেন করোনার পর মানুষের চলাচল অনেক কমে যাবে। ফলে এ খাতে তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে অনেক সময় লাগবে। এ বছরের শেষ নাগাদ তেলের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে। আর দামও তার আগে স্বাভাবিক হওয়ার কোনো আশা নেই।

চাহিদা কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকে দেশের তেল ক্ষেত্র বন্ধ থাকবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ। ১ কোটির বেশি জনশক্তি নিয়োজিত রয়েছে দেশটির তেল শিল্প খাতে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা করছেন, অনেক তেল কোম্পানি হয় তাদের কর্মচারীদের লম্বা ছুটিতে পাঠাবে নয়তো ছাটাই করতে বাধ্য হবে। অনেক তেল কোম্পানি আর তেল ব্যবসায়ী হয়তো দেউলিয়া হয়েও যেতে পারেন।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন