আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী মিনি বিমানবাহী রণতরী। এর নাম ইউএসএস বনহোম রিচার্ড। এটি একটি এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ। আগামী ১০ বছরের জন্য মিনি এ বিমানবাহী রণতরী চীনকে মোকাবেলায় প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ লক্ষ্যে বনহোম রিচার্ডকে আপগ্রেড করা হয় এফ-৩৫ বিমান অপারেশন পরিচালনার জন্য। কিন্ত মোতায়েনের আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে এ রণতরী। বনহোম রিচার্ড ধ্বংস ইউএস নেভির জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো নেভাল জেটিতে ১২ জুলাই সকালে আগুন লাগে বনহোম রিচার্ডে। ৪ দিনের বেশি সময় লাগে এ আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে। ইউএস নেভি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এটি মেরামত করে আবার ব্যবহারের আশা করেছেন। তবে আগুনে ক্ষতির যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তাতে নেভির সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, এর একমাত্র গন্তব্য এখন জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। অর্থাত এটি ভেঙ্গে ফেলতে হবে।
বনহোম রিাচর্ডকে ফিফথ জেনারেশন স্টেলথ ফাইটার এফ-৩৫ ওঠা নামার উপযুক্ত করার জন্য গত ২ বছর ধরে আপগ্রেড কার্যক্রম চলছিল সান দিয়াগো জেটিতে। এ কাজ একেবারে শেষের দিকে ছিল এবং এ বছর শেষেই এটি প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে ভারত ও প্রশান্ত মহাসগারে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ ফাইটার জেট মোতায়েনের পরিকল্পনা বড় ধরনের হোচট খেয়েছে।
বনহোম রিচার্ডে আগুন লাগার ক্ষতি পরিদর্শনের দায়িত্ব দেয়া হয় চিফ অব নেভল অপারেশন এডমিরাল মাইকেল গিলডকে। পরিদর্শন শেষে তিনি তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, ১৪ টি ডেকের মধ্যে ১১টি ডেক পুড়ে গেছে। আগুন লাগার পর একের পর এক বিষ্ফোরণ ঘটে আর এসময় ১ হাজার ২০০ ডিগ্রি মাত্রার আগুন বিরাজ করে। আগুনে ব্যাপকভাবে পুড়ে গেছে জাহাজটি।
ফ্লাইট ডেকের আইল্যান্ড প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ফ্লাইট ডেকের অনেক জায়গা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। এ কারণে নিচের ছয়টি ডেক ভেঙে গেছে। আগুনে বিধ্বস্ত হয়েছে ফরওয়ার্ড মাস্তুল।
আগুন লাগার পর তীব্র বাতাস আর একের পর এক বিস্ফোরণে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রণতরীতে। চার দিনের বেশি সময় লাগে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে। গিলডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগুন লাগার পর জাহাজের মধ্যে একের পর এক বিস্ফোরনের শব্দ ১৩ মাইল দূর থেকে শোনা গেছে। তবে জাহাজটির ভবিষ্যত কী সে বিষয়ে কিছু বলেননি মাইকেল গিলড।
ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ পুনঃ ব্যবহারযোগ্য করা এবং সে জন্য বিপুল অর্থ খরচের রেকর্ড রয়েছে ইউএস নেভির। তবে বনহোম রিচার্ডে যে মাত্রায় ক্ষতি হয়েছে তাতে শত শত মিলিয়ন ডলার নেভি খরচ করবে কি না সেটা পরিষ্কার নয়। এছাড়া এই রনতরীর বয়স হয়েছে ২২ বছর।
নেভির সাবেক অনেক কর্মকর্তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন বনহোম রিচার্ড ভেঙ্গে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও হেডলাইন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নেভি তাদের বড় আর অন্যতম শক্তিশালী একটি রণতরী হারাতে যাচ্ছে। আর একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র নেভির ইতিহাসে এটা হবে সবচেয়ে বড় আর শক্তিশালী রণতরী যা আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় কোরাল সাগরে ডুবে যাওয়া লেংজিনটন রণতরী বনহোম রিচার্ডের চেয়ে অল্প বড় ছিল।
বনহোম রিচার্ডের দৈর্ঘ্য ৮৪৪ফিট। ওজন ৪০ হাজার টন। আর লেংজিনটনের দৈর্ঘ্য ছিল ৮৮৮ ফিট এবং ওজন ৪৭ হাজার টন। ফেডারেশন অব আমেরিকান সাইন্টিস্ট এর তথ্য অনুসারে বনহোম রিচার্ড নির্মানে খরচ হয়েছে ১০১ কোটি ১০ লাখ ইউএস ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ হলো ওয়াসপ ক্লাস এসল্ট শিপ। আর বনহোম রিচার্ড হলো ওয়াসপ ক্লাসের অন্যতম এসল্ট শিপ। যুক্তরাষ্ট্রের চারটি এমফিবিয়াস এসল্ট শিপে এফ-৩৫ বিমান অপারেশন পরিচালনায় সক্ষম। বনহোম রিচার্ড ছিল তার মধ্যে একটি।
ওয়াস ক্লাসের এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো মেরিন কপর্স এর মেরিন এক্সপিডিশনারী ইউনিট পরিবহন করতে পারে শত্রু ভূখন্ডে। একই সাথে পালন করতে পারে বিমানাহী রণতরীর ভূমিকা। ওয়াসপ ক্লাস এসল্ট শিপ মূলত ল্যান্ডিং হেলিকপ্টর ডক। ওয়াসপ ক্লাসের মোট আটটি এমফিবিয়াস নির্মান করা হয়। এর প্রথমটির নাম ইউএসএস ওয়াসপ এবং এটি ইউএস নেভিতে যুক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। বনহোম রিচার্ড ইউএস নেভিতে যুক্ত হয় ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট।
বনহোম রিচার্ড বাদে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি বিগ ডেক এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ রয়েছে। এসব এসল্ট শিপের মধ্যে বর্তমানে তিনটিতে এফ-৩৫ বিমান অপারেশন পরিচালনা করতে পারে। অপরগুলোতে ছোট যুদ্ধ বিমান ওঠানামা করতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত নেভি ক্যাপ্টেন বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, আগুনে জাহাজের মধ্যে যে পরিমান তাপ সৃষ্টি হয়েছে তাতে স্টিল দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ার কথা। আর যেহেতু জাহাজটির বয়স ২৩ বছর হয়ে গেছে তাই এর ক্ষতি আরো বেশি হওয়ার কথা। আর আগুন যদি ইঞ্জিন রুম এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর এলাকায় পৌছে থাকে তবে তা ধ্বংস হয়ে যাবার কথা।
যেহেতু দীর্ঘ সময় জাহাজটিতে আগুন জ্বলছে তাই জাহাজটির ভেতরে অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে। বনহোম রিচার্ডে ফিফথ জেনারেশন স্টেলথ ফাইটার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানের অপারেশন পরিচালনার জন্য ইউএস নেভি ২০১৮ সালে ২১৯ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে জেনারেল ডাইনামক্সি এবং স্টিল এন্ড শিপ বিল্ডিং কোম্পানির সাথে।
বোনহোম রিচার্ড ধ্বংস হওয়ায় ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে ফিফথ জেনারেশন ফাইটার জেট অপারেশন পরিচালনায় সক্ষম বিমানবাহী রণতরীর সঙ্কটে পড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্র নেভিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্যাসেফিক অঞ্চলে এফ-৩৫ বিমান মোতায়েনের ক্ষেত্রে এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা। কারন একটি ফরওয়ার্ড ডেপ্লয়মেন্টের জন্য কমপক্ষে তিনটি রণতরীর লাগে। একটি জরুরি মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখতে হয় , আরেকটি রক্ষনাবেক্ষনে এবং আরেকটি প্রি ডেপ্লয়মেন্ট ওয়ার্কআপস অবস্থায় থাকতে হয়।
একটি এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ সব সময় মোতায়েন রাখার জন্য তার পেছনে এ ধরনের তিনটি রণতরীর সমর্থন লাগে। ২০২০ সালের শেষে বনহোম রিচার্ড আগামী ১০ বছরের জন্য মোতায়েন করার কথা ছিল প্যাসেফিক অঞ্চলে। আর এর উদ্দেশ্য চীনকে মোকাবেলা।
সাবেক নেভি ক্যাপ্টেন জেরি হেনড্রিক্স বলেন, বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল। এর প্রভাব অনেক বেশি। কারন প্রশান্ত মহাসাগরে এফ -৩৫ বিমান মোতায়েনের কেন্দ্রে ছিল বনহোম রিচার্ড। তিনি বলেন, আমরা চাইলেই যে কোনো সময় এমন আরেকটি বনহোম রিচার্ড তৈরি করে ফেলতে পারবো না। বনহোম রিচার্ড নির্মান করে ইনগালিস শিপবিল্ডিং। বর্তমানে এটি হান্টিংটন ইনগালিস ইন্ডাস্ট্রির অংশ।
প্রায় ২ হাজার মেরিন সেনা অবস্থান করতে পারে বনহোম রিচার্ডে। ২০টি এফ-৩৫ বিমান ধারন ক্ষমতার উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল বনহোম রিচার্ড। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডমে অংশ নেয় বনহোম রিচার্ড।
এরপর ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি শুরু হওয়া অপারেশন ইরাকি ফ্রিডমে অংশ নেয় বনহোম রিচার্ড। অপারেশন ইরাক ফ্রিডমের সময় বনহোম রিচার্ড বিপুল সংখ্যক মেরিনা সেনা, হেলিকপ্টার, সমর যান বহনের কাজ করে কুয়েতে। এরপর কুয়েত উপক‚ল থেকে দূরে অবস্থান করে বিমানবাহী রণতরীর ভ‚মিকা পালন করে। অপারেশন ইরাক ফ্রিডমে বনহোম রিচার্ড থেকে ৮০০ ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
২০০৪ সালে সুনামীতে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় রিলিফ অপারেশনের পর বনহোম মোতায়েন করা হয় গুয়াম দ্বীপে। যুক্তরাষ্ট্রের এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ মূলত শত্রুভূমিতে মেরিন সেনা পরিবহন, ল্যান্ডিং হেলিকপ্টার ডক হিসেবে ব্যবহার, সমর যান পরিহন এবং ছোট যুদ্ধ বিমান ওঠা নামায় ব্যবহার করা হয়। তবে সম্প্রতি চারটি এমফিবিয়াস এসল্ট শিপকে পরিণত করা হয় এফ-৩৫ বিমান অপারেশন পরিচালনার উপযুক্ত। বনহোম রিচার্ড সংস্কার করা অবস্থায় আগুন লাগায় এতে সেসময় মাত্র ১৬০ জন নৌ সেনা ছিল । ফলে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে ৬৭ জন আহত হয় এবং প্রাণহানি থেকে রক্ষা পায়।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে