দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দুই বিমানবাহী রণতরীকে কাগুজে বাঘ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে চীন। চীনের দাবি, তারা চাইলে এসব রণতরি সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে। আসলেই চীনের এ ধরনের ক্ষমতা রয়েছে কি না এ নিয়ে সামরিক অঙ্গনে এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরের অধিকাংশ এলাকা চীন নিজেদের বলে যে দাবি করছে তা অবৈধ। চীনের এ দাবিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘গায়ের জোরে’ দাবি হিসেবে আখ্যায়িক করেছে এবং এটা সে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্রন্ত্রী মাইক পম্পেও ঘোষণা দিয়েছেন দক্ষিণ চীন সাগরের অধিকাংশ এলাকা চীন নিজেদের বলে যে দাবি করছে তা বেআইনী। লিখিত এবং দীর্ঘ এক বিবৃতির মাধ্যমে এ ঘোষণা দেন তিনি। এ ঘোষণায় একই সাথে দক্ষিণ চীন সাগরে বিভিন্ন দ্বীপ ও দ্বীপ সংলগ্ন পানি সীমায় চীনের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ চীন সাগরের সম্পদ ও বিভিন্ন দ্বীপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অধিকার ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানিয়ছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের দাবির বিরোধীতা করলেও এই প্রথমবারের মত লিখিতভাবে একে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিবৃতিতে মাইক পম্পেও বলেন, দক্ষিন চীন সাগরের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে অফসোর এলাকার সম্পদ নিজের বলে চীন যে দাবি করছে তা বেআইনী। আর এসব এলাকা তাদের দখলে রয়েছে মর্মে তারা ভূয়া প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরকে চীনের সমুদ্র সাম্রাজ্য হিসেবে মেনে নেবে না বিশ্ব। আমেরিকা দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ার মিত্র দেশ এবং অংশীদারদের পাশে থাকবে। আর এসব দেশের অফসোর রিসোর্স এর ওপর সার্বভৌম দাবি ও অধিকার রক্ষা করবে। আর এটা হবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী।
যুক্তরাষ্ট্র বলতে চাচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগরে কোন দ্বীপের মালিক কারা এ বিষয়ে সে নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে। কিন্তু চীনের অবৈধ দাবি বিষয়ে দেশটি নীরব থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণা চীনের জন্য ক‚টনৈতিকভাবে একটি বড় আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষনা ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনের জন্য সহায়ক হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপের মিত্রদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে এ বিষয়ে মুখ খোলার জন্য।
পুরো দক্ষিণ চীন সাগরের চীনের দাবিকে অবৈধ বলে যুক্তরাষ্ট্র যে বিবৃতি দিয়েছে তার পক্ষে ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে ২০১৬ সালের জাতিসংঘ আদালতের একটি রায়। দক্ষিণ চীন সাগরে স্কারবোরো শোলে দ্বীপে ২০১২ সালের আগে ফিলিপাইনের প্রশাসন ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে চীন রণতরি পাঠিয়ে সেখানে তাদের প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে । ফিলিপাইন জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয় ২০১৩ সালে। হেগের আদালত ২০১৬ সালে নাইন ড্যাশ লাইনসহ পুরো দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবিকে বাতিল করে দেয়। একই সাথে দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি দেয়। কিন্ত চীন এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করে এবং শক্তি বৃদ্ধি করে স্কারবোরো শোল ও স্পার্টলি আইল্যান্ডে।
দক্ষিণ চীন সাগরের আয়তন ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এবং এর প্রায় পুরোটা চীন তাদের নিজেদের দাবি করছে। চীন চেষ্টা করছে তীর থেকে ২০০ মাইল পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নিজেদের সমুদ্র এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। একই ভাবে দক্ষিণ চীন সাগরের পুরো বা আংশিক দাবি করছে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া এবং তাইওয়ান।
এ এলাকায় অন্য অনেক দেশের দাবি রয়েছে এবং তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক জোনও রয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের এ দাবি ঠেকাতে চাচ্ছে। মাইক পম্পেও বলেছেন, চীন সমুদ্র সীমা বিষয়ে যে দাবি করছে তা আইনগতভাবে টিকবে না। বিশেষ করে স্কারবোরো রিফ এবং স্পার্টলি আইল্যান্ড বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় হলো এটা ফিলিপাইনের মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া মিসচিফ রিফ এবং সেকেন্ড থমাস শোল বিষয়েও চীনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে পম্পেও বলেন, উভয় এলাকা ফিলিপাইনের সার্বভৌম এলাকায় পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে মালয়েশিয়া থেকে ৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে জেমস শোল, ভিয়েতনাম থেকে দূরে ভ্যানগার্ড ব্যাঙ্ক, মালয়েশিয়া থেকে দূরে লুকোনিয়া শোল, ব্রুনাই অর্থনৈতিক জোন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে দূরে নতুনা বেসার পানি সীমায় চীনের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে ।
ওয়াশিংটনের এই বিবৃতির পর চীন অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সাগরে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং তারা সংঘাতের ইন্ধন যোগাচ্ছে। স্থিতিশীলতা রক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র পেশি শক্তি প্রদর্শন করছে, উত্তেজনা জাগিয়ে তুলছে এবং এ অঞ্চলে সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান ওয়াশিংটনের বিবৃতিকে দায়িত্বহীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রাবল মেকার এবং বিনাসী হিসেবে উল্লেখ করেন ঝাও।
দক্ষিণ চীন সাগরের বিবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান ছিল জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এ বিবৃতিতে তাদের পূর্বের নীতি পরিবর্তন হলো এবং এ বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে চীনের সাথে দ্বন্দ্ব আরো তীব্র রুপ নিতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগরে শক্তি প্রদশনের মহড়া দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ মহড়ায় অংশ নেয় ইউএসএস নিমিটজ ও ইউএসএস রোনাল্ড রিগান বিমানবাহিনী রণতরী। ২০০১ সালের পর দক্ষিন চীন সাগরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় মহড়া। এর আগে এ ধরনের মহড়ার আয়োজন করে ২০১৪ সালে। মহড়ায় লুইজিয়ানা থেকে সরাসরি উড়ে এসে অংশ নেয় বি-৫২ বমার।
দক্ষিন চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহি রণতরীকে কাগুজে বাঘ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে চীনা সরকার সমর্থিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস।
গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দক্ষিণ চীন সাগর পুরোপুরি চীনা আর্মি পিএলএ’র কব্জায়। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো বিমানবাহী রণতরির আনাগোনা পিএলএ ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারি করছে । আর এসব রণতরি মোকাবেলার জন্য চীনের কাছে রয়েছে ডিএফ-২১ ডি এবং ডিএফ-২৬ মিসাইল। ঊভয় মিসাইল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কিলার নামে পরিচিত। এরপর গ্লোবাল টাইমসের টুইট বার্তায় লেখা হয়েছে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো রণতরির আগমন পিএলএর জন্য আনন্দের বিষয়। পিএলএ চাইলে এসব রনতরি মিসাইল আক্রমন চালিয়ে ডুবিয়ে দিতে পারে এবং সে ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
গ্লোবাল টাইমসের এ হুমকি বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী চীন ডুবিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে কি না। চীন এ ধরনের আক্রমন করবে কি না এবং এর পরিণতি কি সেটা অনেক কঠিন হিসাব নিকাশের বিষয়। তবে এটি সত্য যে দক্ষিন চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি চীনা মিসাইলের আওতায় রয়েছে। আর চীনের এসব মিসাইল তৈরি করা হয়েছে একটি মিসাইল আক্রমন চালিয়ে একটি বিমান বাহী রণতরী ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে। আর সে কারনে এটা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় মাত্রার হুমকি।
বিশ্লেষকদের মতে বিমানবাহী রণতরীতে সরাসরি মিসাইল আক্রমনের পরিনতি কী তা সহজেই বোঝা যায়। এসব মিসাইল যদি কোনো বোমা বহন না করে তবু সরাসরি মিসাইল রণতরিতে আঘাত করলে সাগরে এ রণরতী ধ্বংস হয়ে যাবে। তারওপর এ মিসাইল যদি হয় হাইপারসনিক তথা শব্দের চেয়ে ৫গুন বেশি গতির তবে তা ঠেকানো অনেকটা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের হামলা মোকাবেলা এবং পাল্টা আক্রমনের লক্ষ্যে এসব বিমানবাহী রণতরীর বহরে সজ্জিত রাখে ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজারসহ শক্তিশালী অনেক রণতরী। বিশ্লেষকদের মতে চলমান রণতরিতে সঠিকভাবে আঘাত করতে হলে চীনা মিসাইলের প্রিসিশন-গাইডেন্স সিস্টেম থাকতে হবে এবং ট্রাক করে আঘাত করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তা করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের এ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের জন্য বড় হুমকি নয়।
তবে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উভয় দেশের এ সক্ষমতার অনেক কিছ‚ গোপন রয়েছে । যুক্তরাষ্ট্র নেভি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে মাল্টি লেয়ার্ড ডিফেন্স সিস্টেম তৈরিতে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে লেজার উইপন এবং জ্যামিং সিস্টেম । জ্যামিং সিস্টেমের মাধ্যমে তীব্র গতিতে ছুটে আসা মিসাইল যেমন থামিয়ে দেয়া সম্ভব তেমনি তার গতিপথ এবং নিশানাও পরিবর্তন করে দেয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের নেভিতে রয়েছে এসএম-৬ মিসাইল এবং ইভলভড সি স্প্যারো মিসাইল ব্লক-২। এসব মিসাইলকে সফটঅ্যয়ার এবং সেন্সর আপগ্রেড করা হচ্ছে মুভিং টার্গেটকে ধ্বংস করার জন্য। চীনের দাবি তাদের মিসাইলের কারনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী অকেজো । কিন্তু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারনে এসব রণতরি একইভাবে চীনের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। আর সে কারনেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নেভি কর্মকর্তারা বলে থাকেন বিশ্বের যে কোনো সমুদ্র এলাকায় তারা সফল অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। ফলে সাগরে দুই দেশের যুদ্ধ উভয় দেশের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে