বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী আর ভয়ঙ্কর হেলিকপ্টার গানশিপ হিসেবে পরিচিত রাশিয়ার এলিগেটর এবং যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি। তবে অনেকে রাশিয়ার এলিগেটরকে অ্যাপাচির চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।
অ্যাপাচি ও এলিগেটর হেলিকপ্টারের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এন্টি শিপ মিসাইল এবং এয়ার টু এয়ার মিসাইল ছোড়ার ক্ষমতা। এ ছাড়া ইঞ্জিনের শক্তি এবং গতির দিক দিয়েও অ্যাপাচির তুলনায় এগিয়ে রয়েছে রাশিয়ান এলিগেটর। তবে এপাচিতে যুক্ত হয়েছে ড্রোন বিমান নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা যা নেই এলিগেটরে।
অ্যাপাচি ও এলিগেটর হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে সামরিক অঙ্গনে নানা ধরনের বির্তক আছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশের কাছে রয়েছে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। সে কারনে এ হেলিকপ্টার সাধারন মানুষের কাছে বেশি পরিচিত ।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের পুরো নাম এ এইচ-৬৪। এ এইচ-৬৪ প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের আর্মিতে যুক্ত হয় ১৯৮৬ সালে।এ এইচ -৬৪ এ থেকে এফ পর্যন্ত ৬টি মডেল রয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৪০০টি এ এইচ-৬৪ হেলিকপ্টার নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে এর নির্মাতা বোয়িং।
রাশিয়ার এলিগেটর হেলিকপ্টারের সক্ষমতা নিয়ে সমরঙ্গানে আলোচনার শেষ নেই। যদিও এই হেলিকপ্টারের নাম অ্যাপাচির মতো ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু এটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিধ্বংসী একটি হেলিকপ্টার। আসুন আমরা জেনে নেই এই হেলিকপ্টার সর্ম্পকে কিছু তথ্য
রাশিয়ান এলিগেটরের পুরো নাম কে এ -৫২ এলিগেটর। এটি রাশিয়ার অ্যাটাক হেলিকপ্টার কামভ কে এ -৫০ বা ব্লাক শার্ক এর নতুন সংস্করন । কামভ কে এ -৫০ প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৮২ সালের ১৭ জুন। আর এর নতুন সংস্করণ কে এ -৫২ এলিগেটর প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৯৭ সালের ২৫ জুন। রাশিয়া এখন পর্যন্ত ৩২টি বøাক শার্ক এবং ১০০টি কে এ -৫২ এলিগেটর নির্মান করে। ২০১৮ সালে রাশিয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় আরো ১১৪টি এলিগেটর সংগ্রহর কথা জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচির ইঞ্জিন সংখ্যা ২টি। দুটি টারবোশ্যাফট ইঞ্জিনের শক্তি ৩ হাজার ৭৮৪ হর্সপাওয়ার একত্রিত শক্তির সমান। অপর দিকে রাশিয়ার এলিগেটরও ২ ইঞ্জিন চালিত। দুটি ইঞ্জিনের শক্তি ৪ হাজার ৮শ হর্সপাওয়ার শক্তির সমান। একটি ইঞ্জিন নষ্ট হলে অপর ইঞ্জিন দিয়ে চলতে পারে এটি। অ্যাপাচির সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ১৮২ মাইল। এলিগেটরের গতি ঘন্টায় ১৯৬ মাইল। অ্যাপাচির ম্যাক্সিমাম টেকঅফ ওয়েট ১০ হাজার ৪৩০ কেজি। রেঞ্জ ২৯৬ মাইল। কমব্যাট রেঞ্জ ৩০০ মাইল।
অপরদিকে এলিগটেরর ম্যাক্সিমাম টেক অফ ক্ষমতা ১০ হাজার ৮০০ কেজি। রেঞ্জ ৩৩৯ মাইল। কমব্যাপ রেঞ্জ ২৯০ মাইল। অ্যাপাচিতে রয়েছে ফোর ব্লেড একটি রোটর। তবে লেজে আরেকটি রোটর রয়েছে। এলিগেটর গানশিপে রয়েছে তিন ব্লেড বিশিষ্ট উপরে নিচে দুটি রোটর। এলিগেটর ১৮ হাজার ৪৪ ফিট উপরে উঠতে পারে। অ্যাপাচির মিসাইলের আওতা ৫ থেকে ৮ মাইল। এলিগেটরের মিসাইলের আওতা ৫ থেকে ৬ মাইল। অ্যাপাচি ও এলিগেটর উভয় গানশিপের রয়েছে এয়ার টু এয়ার, এয়ার টু গ্রাউন্ড, এন্টি ট্যাঙ্ক ও এন্টি শিপ মিসাইল ছোড়ার ক্ষমতা। একটি এপাচি হেলিকপ্টার গানশিপ ১৬টি হেলফায়ার মিসাইল এবং আড়াই ইঞ্চি ব্যাসার্ধের ৭৬টি রকেট বহন করতে পারে । এর সাথে অন্যান্য সমরাস্ত্রও বহন করতে পারে।
অ্যাপচি হেলিকপ্টারেরএকটি হেল ফায়ার মিসাইল একটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করতে পারে। হেলফায়ার মিসাইলকে থার্মোবারিক বোমা বহনেও ব্যবহার করা যায়। অ্যাপাচি হেলিকপ্টারে রয়েছে অতিরিক্ত একটি ফুয়েল ট্যাঙ্কার বহন ক্ষমতা। এর ফলে এ হেলিকপ্টার যুদ্ধ ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় মিশন পরিচালনা করতে পারে। অ্যাপাচির মেইন ল্যান্ডিং গিয়ারের মাঝে যুক্ত রয়েছে ৩০ মিলিমিটার এম২৩০ চেইন গান যা প্রতি মিনিটে ৬২৫ রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে।
এপাচির হার্ড পয়েন্ট চারটি। অর্থাৎ মিসাইল বহনের জন্য এর তলায় চারটি পেলন স্টেশন রয়েছে। এজিএম-১১৪ হেলফায়ার মিসাইল, হাইড্রা ৭০ রকেট ছাড়াও এআইম ৯২ স্টিঙ্গার, স্পাইক মিসাইল, এজিএম-১২২ সাইড আর্ম এন্টি রেডিয়েশন মিসাইল এবং এমডিডিএ ব্রিমস্টোন মিসাইল বহন করতে পারে। হেলফায়ার মিসাইল এবং হাইড্রা ৭০ রকেট উভয়ই আকাশ থেকে ভ‚মিতে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র। কিন্ত এ আই এম ৯২ মিসাইল আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল। আসুন এবার আমরা জেনে নেই অ্যাপাচি ও এলিগেটর হেলিকপ্টার সর্ম্পকে আরো কিছু তথ্য
অ্যাপাচির তুলনায় এলিগেটরের ফায়ার পাওয়ার বেশি। একই সাথে এত রয়েছে অ্যাপাচির তুলনায় বিভিন্ন ধরনের অধিকতর মিসাইল বহন ক্ষমতা। এলিগেটরের এন্টি শিপ মিসাইল এবং এয়ার টু এয়ার মিসাইল ক্ষমতা অ্যাপাচির চেয়ে বেশি। দিনে রাতে প্রতিকুল আবহাওয়ায়ও অভিযান পরিচালনায় সক্ষম এলিগেটর।
এলিগেটর গানশিপ কেএইচ -৩৫ এন্টি শিপ মিসাইল ৮০ মাইল দূরের লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত করতে পারে। এ ছাড়া এলিগেটরের অটোমেটিক গান প্রতি মিনিটে ৫৫০ রাউন্ড ফায়ার করতে পারে। এলিগেটরের হার্ড পয়েন্ট তথা অস্ত্র বহন স্টেশন ৬টি। চারটি দেহের তলায় এবং দুটি পাখায়।
এলিগেটরে এস-৮, এস-১৩ রকেট, লেজার গাইডেট টেকটিক্যাল এয়ার টু গ্রাউন্ড মিসাইল রয়েছে। এপাচির মত এলিগেটরও একটি অতিরিক্ত ফুয়েল ট্যাঙ্কার বহন করতে পারে। এ ছাড়া প্রতিটি আড়াইশ কেজি ওজনের ৪টি বোমা বহন করতে পারে এলিগেটর। এলিগেটরে রয়েছে ২টি থ্রি ব্লেড কাউন্টার রোটেটিং রটর। এলিগেটর ঘটনাস্থলে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত টার্ন নিতে পারে মর্মে দাবি রাশিয়ার। এলিগেটরের হার্ড পয়েন্ট ৬টি। ৪টি এর তলায় এবং দুটি পাখায়। এলিগেটরে রয়েছে ৩০ মিলিমিটার ক্যানন ৪৬০ রাউন্ড গুলিসহ।
এলিগেটরে রয়েছে ব্যতিক্রমী ইজেকশন সিস্টেম। যার ফলে উভয় পাইলট একই সাথে তাদের আসনসহ অটোমেটিক্যালি হেলিকপ্টার থেকে উপরে উঠে যেতে পারেন। এরপর ওপেন হয় প্যারাস্যুট। এটি এলিগেটরের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট যা অন্য কোনো হেলিকপ্টারে নেই। এর ফলে বিপদ মুহূর্তে পাইলটের জীবন রক্ষা সহজ হয়েছে। এলিগেটরের এন্টিনা ২টি। একটি আকাশ টার্গেট এবং আরেকটি গ্রাউন্ড টার্গেটের জন্য। এপাচির মত এলিগেটরেও রয়েছে হেলমেট মাউন্টেড এবং হেড আপ ডিসপ্লে সিস্টেমএতে রয়েছে ইলেকট্রনিক জ্যামার, রাডার ওয়ার্নিং রিসিভার, লেজার ডিটেকশন সিস্টেম। উভয় গানশিপে যুক্ত রয়েছে ইলেকট্রনিক ওয়ার ফেয়ার ক্ষমতা, উন্নত রাডার, সেন্সর, নেভিগেশন, জ্যামার সিস্টেম।
অ্যাপাচি এ এইচ-৬৪ হেলিকপ্টারের রয়েছে অনেকগুলো মডেল। এ এইচ-৬৪ এ থেকে এ এইচ-৬৪ এফ পর্যন্ত মোট ৬টি মডেল রয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় এ এইচ-৬৪ হেলিকপ্টারে ইসরাইলের তৈরি স্পাইক এনএলওস মিসাইল যুক্ত করেছে। এলিগেটরেরও ৬টি বিভিন্ন ধরেন মডেল রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হলো কাটরান ও এরদোগান। আসুন আমরা জেনে নেই কোন দেশ কোথায় এই হেলিকপ্টার গুলো ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্মির কাছে বর্তমানে ২ হাজার অ্যাপাচি হেলিকপ্টার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আর্মি ছাড়া, যুক্তরাজ্য, গ্রিস, জাপান, ইসরাইল, নেদারল্যান্ড, সিঙঙ্গাপুর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, দক্ষিন কোরিয়া এবং তাইওয়ানের কাছে এ হেলিকপ্টার রয়েছে।
রাশিয়ার কাছে বর্তমানে ১০০টি এলিগেটর গানশিপ রয়েছে। রাশিয়া ছাড়া মিশরের কাছে রয়েছে কে এ-৫২। এর নাম কে এ -৫২ নাইল ক্রোকোডাইল। ২০১৫ সালে মিশর ৪৬টি কে এ -৫২ হেলিকপ্টার ক্রয়ের চুক্তি করে এবং ২০২০ সালের মধ্যে এ হেলিকপ্টার সরবরাহ শেষ করার কথা । তবে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের রয়েছে অপারেশন পরিচালনার বিশাল অভিজ্ঞতা।
পানামা, পারস্য উপসাগর, কসোভো, আফগানিস্তান, ইরাক এবং ইসরাইল লেবানন সংঘাতে এ হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম এ এইচ -৬৪ হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। ২০০২ সালে আফগানিস্তানে অপারেশন আনাকোন্ডায় মূল ভ‚মিকায় নামানো হয় এ হেলিকপ্টার। ২০০৩ সালে অংশ নেয় অপারেশন ইরাক ফ্রিডমে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এ অভিযান।
১৯৯০ সালের ইরাকের কুয়েত দখলের পর কুয়েত মুক্ত করার অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র আর্মির অর্ধেক এপাচি হেলিকপ্টর মোতায়েন করা হয়। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি শুরু হয় অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম বা কুয়েত মুক্তকরন অভিযান। ১০০ ঘন্টার এ অভিযানে ২৭৭টি এপাচি হেলিকপ্টার অংশ নেয়। এ সময় এপাচি হেলিকপ্টারের আক্রমনে ইরাকের ২৭৮টি ট্যাঙ্কসহ বিপুলসংখ্যক সাজোয়া যান এবং অন্যান্য সামরিক যানবাহন ধ্বংস করা হয়। রাশিয়ার এলিগেটর গানশিপ ব্যবহার করেছে সিরিয়া যুদ্ধে।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে