প্রায় ৭০ বছর আগের একটি যুদ্ধ বিমান নতুন করে রাশিয়ার বিমান বাহিনীর অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। একই সাথে এ বিমান রাশিয়ার শত্রুদের কাছে এসেছে সতর্ক বার্তা নিয়ে। কারন এ বিমান ভয়ঙ্কর শক্তির পারমানবিক বোমা বহনে সক্ষম। বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী পারমানবিক বোমা রাশিয়া নিক্ষেপ করে এ বিমান থেকে।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বর্তমান রাশিয়ার সামরিক শক্তির প্রতীক, পরিচিতি আর গৌরব এ যুদ্ধ বিমান। বিমানটির নাম টুপোলেভ টিইউ -৯৫। এটি একটি কৌশলগত পারমানবিক বমার। ন্যাটো এর নাম দিয়েছ বিয়ার বা ভালুক। যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো স্থানে পারমানবিক বোমা হামলার সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা থেকে সোভিয়ত ইউনিয়ন তৈরি করে এ বিমান।
১৯৫২ সালে প্রথম আকাশে ওড়ে এ বিমান। সোভিয়েত এয়ারফোর্সে যুক্ত হয় ১৯৫৬ সালে। রাশিয়ান এরোস্পেস ফোর্স কমপক্ষে ২০৪০ সাল পর্যন্ত এ ভারী বমার ব্যবহার করবে।
বিমনাটি চার ইঞ্জিন বিশিষ্ট । টুপোলেভ টিইউ-৯৫ হলো বিশ্বের একমাত্র প্রোপেলার পাওয়ারড কৌশলগত বমার যা এখনো চালু রয়েছে। এর প্রপেলার বেøডের ঘোরার গতি শব্দের গতির চেয়েও বেশি। ফলে বিশ্বে এটি সবচেয়ে বেশি শব্দ সৃষ্টিকারী বিমান।
ব্যতিক্রমী এ বিমান রাশিয়া ছাড়া আর কারো কাছে নেই। ইউক্রেন যখন রাশিয়ার অন্তর্গত ছিল তখন ইউক্রেন এয়ার ফোর্সের কাছে ছিল এ বিমান। বর্তমানে রাশিয়ান বিমান বাহিনীর শাখা এরোস্পেস ফোর্স ব্যবহার করছে এ বিমান। এর আগে সোভিয়েত নেভি এবং সোভিয়েত এয়ারফোর্স ব্যবহার করেছে শক্তিশালী আর ভারী এ বোমারু বিমান। সোভিয়েত ইউনিয়ন ৫০০ বেশি টিই-৯৫ বমার নির্মান করে ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধে পুরো সময়জুড়ে রাশিয়ার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ বিমান। বিশেষ করে সমুদ্রে টহল, যুদ্ধ জাহাজ ও এন্টি সাবমেরিন মিশনে অংশ নেয় এ বমার।
১৯৬১ সালের ৩০ অক্টোবর রাশিয়া পরীক্ষা চালায় হাইড্রোজেন বোমার। এর নাম জার বম্বা। বিশ্বে আজ পর্যন্ত এত শক্তিশালী পারমানবিক বোমার পরীক্ষা কেউ চালায়নি। বিশ্বের এ যাবতকালের সবচেয়ে শক্তিশালী এ জার বম্বা নিক্ষেপ করা হয় টুপোলেভ টিইউ-৯৫ বিমান থেকে। নোভায়া জেমলিয়ার আর্কটিক আইল্যান্ডে নিক্ষেপ করা হয় জার বম্বা।
১৯৬০ এর দশকের শুরুতে এবং মাঝামাঝি রাশিয়া সিরিজ পারমানবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। আকাশ থেকে এ বোমা নিক্ষেপে ব্যবহার করা হয় টিইউ-৯৫ বমার। এটি একটি বহুমুখী বোমরু বিমান। জার বম্বা ছাড়া এ বিমান ৪২ কিলোটন শক্তি উৎপাদনকারী আরটিএস -৪ তাতায়ানা, আরডিএস ৬এস থার্মোনিউক্লিয়ার বম্ব, আরডিএস ৩৭ মেগাটন থার্মোনিউক্লিয়ার বম্ব নিক্ষেপে ব্যবহার করা হয়।
রাশিয়া বর্তমানে অনেকগুলো টিইউ -৯৫ আধুনিকায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে টিইউ -৯৫ এমএস। সংস্কার করা এ বিমান ১৬টি ক্রুজ মিসাইল বহন করতে পারে। প্রতিটি মিসাইল ২০০ কিলোটান শক্তির একটি করে পারমানবিক বোমা বহন করতে পারে। ২০০ কিলোটনের একটি বোমা নাগাসাকিতে ফেলা এটম বোমার চেয়ে ১০ গুন বেশি শক্তিশালী।
পুন জ্বালানি ছাড়া এ বিমান ৯ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে। ২০১০ সালে দুটি টিইউ-৯৫ টানা ৪৩ ঘন্টা আকাশে ওড়ার রেকর্ড স্থাপন করে। এ ধরনের বোমারু বিমানের ক্ষেত্রে এটা বিশ্ব রেকর্ড। আটলান্টিক, আর্কটিক, প্যাসিফিক এবং জাপান সাগরের ওপর দিয়ে এ সময় ৩০ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে। টিইউ-৯৫ বিমানের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য এ মিশন পরিচালনা করে রাশিয়া।
৫০ এর দশকে এ বিমান শত্রুপক্ষকে যে বার্তা দিয়েছে আজো একই বার্তা দিতে সক্ষম। বিমান প্রকৌশলীদের মতে জেট ইঞ্জিনের চেয়ে প্রপেলার ইঞ্জিন কম জটিল এবং অনেক আধুনিক বিমানে এখনো প্রপেলার ব্যবহার করা হচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো দেশগুলোর আকাশে নিয়মিত টহল পরিচালনা করত এ বিমান।
প্রায় ৭০ বছর পরও টিইউ-৯৫ আকাশে রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য অংশ। একই সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার অতীত সামরিক শক্তি আর গৌরবের প্রতীক এ ভারী বমার। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের মাধ্যমে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৯১ সাল থেকে টিইউ বমারের মিশন পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ বছর পর ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন আবার এ বিমান মিশন পরিচালনা শুরু করবে। ঘোষণা অনুযায়ী দীর্ঘ পাল্লার টহল শুরু করে টিইউ-৯৫ বমার।
টিইউ-৯৫ এর মিশন পরিচালনার সময় আকাশ সীমা রক্ষায় ন্যাটো যুদ্ধ বিমান আকাশে অবস্থান নেয়। কারন এ বিমান প্রায়ই ন্যাটা আর যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সীমার কাছাকাছি টহল দেয়া শুরু করে। ২০০৮ সালে ফ্রান্স এবং স্পেনের উপকূল বরাবর নৌ মহড়ায় অংশ নেয় টিইউ-৯৫ বমার।
২০০৮ সালের অক্টোবরের মহড়ায় টিইউ-৯৫ লাইভ ক্রুজ মিসাইল ছোড়ে । ১৯৮৪ সালের পর প্রথম বারের মত এ লাইভ ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয় এ বিমান থেকে।
২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর সিরিয়া যুদ্ধে বোমা বর্ষনে অংশ নেয় টিইউ-৯৫। ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর সিরিয়ার বিভিন্ন অবস্থানে ক্রুজ মিসাইল আক্রমন পরিচালনা করা হয় এ বিমান থেকে।
২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় অবতরণ করে দুটি টুপোলেভ টিইউ-৯৫ বমার। এসময় প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিনে টহল মিশন পরিচালনায় অংশ নেয় এ বিমান।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পর ইউক্রেন উত্তরাধিকার সূত্রে ২৯টি টিউ-৯৫ বমারের মালিক হয়। পারমানবিক বোমা বহনে সক্ষম শক্তিশালী এ বমার থাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো তখন উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস ঋন মওকুফের অংশ হিসেবে ৩টি বমার রাশিয়াকে ফেরত দেয় ইউক্রেন। বাকী বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করে ধ্বংস করে ফেলে ইউক্রেন। ১৯৯২ সালে কাজাখস্তান স্বাধীন হওয়ার পর রাশিয়াকে ফেরত দেয় তাদের কাছে থাকা টিইউ-৯৫ বমার।
টিইউ-৯৫ এর দৈর্ঘ্য ১৫১ ফিট ৭ ইঞ্চি। উচ্চতা ৩৯ ফিট। ইউং স্প্যান বা দুই ডানার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মাঝের দূরত্ব ১৬৪ ফিট। শুধু বিমানটির ওজন ৯০ টন। সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৫৩০ মাইল। এ বিমানের নকশাপ্রস্তু করেছেন আন্দ্রে নিকোলাভিচ টুপোলেভ। তিনি টুপোলেভ ডিজাইন ব্যুরোর প্রতিষ্ঠাতা । আন্দ্রে টুপোলেভ সোভিয়েত এরোনটেক্যিাল ইঞ্জিনিয়ার ।
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমানবিক বোমা হামলা পরিচালনা এবং রাশিয়ার পারমানবিক বোমা হামলা প্রতিরোধে সক্ষম একটি কৌশলগত বোমারু বিমান নির্মাণের উদ্যোগ নেয় । নির্মাণ করে বিস্ময়কর বি-৫২ কৌশলগত বোমারু বিমান। আশ্চর্যের বিষয় হলো রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র পারমানবিক বোমা হামলা চালাতে সক্ষম একটি কৌশলগত পারমানবিক বোমারু বিমান উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেয় ১৯৫০ সালে। আর যে বছর যুক্তরাষ্ট্র বি-৫২ আকাশে ওড়ায় ঠিক একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়নও আকাশে ওড়ায় তাদের টিইউ-৯৫। যুক্তরাষ্ট্রের বি-৫২ আকাশে ওড়ে ১৯৫২ সালের ১৫ এপ্রিল আর রাশিয়ার টিইউ-৯৫ আকাশে ওড়ে ওই বছর ১২ নভেম্বর।
ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বি-৫২ বমারের মিশনের পাল্টা মিশন পরিচালনায় রাশিয়া ব্যবহার করে এ বিমান। বি-৫২ বমারের মত টিইউ-৯৫ ও পুনজ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে অনির্র্দিষ্টকাল আকাশে অবস্থান করতে পারে। বি-৫২ বমারের টানা আকাশে ওড়ার রেকর্ড ৪৫ ঘন্টা আর টিইউ-৯৫ এর টানা আকাশে ওড়ার রেকর্ড ৪৩ ঘন্টা। কেউ কেউ রাশিয়ার টিইউ-৯৫ কে যুক্তরাষ্ট্রের বি-৫২ বমার আখ্যায়িত করে থাকেন।
তবে বি-৫২ বমারের চেয়ে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে টিইউ-৯৫ এর। টুপোলেভ টিইউ -৯৫ এর একটি আধুনিক সংস্করনের নাম টিইউ-১৪২। এ বমার রাশিয়া ব্যবহার করে মেরিটাইম টহল এবং এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার হিসেবে।
টিইউ-১৪২ প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৬৮ সালে । সোভিয়েত ইউনিয়ন ১০০টি টিইউ-১৪২ নির্মান করে। রাশিয়ান নেভিতে বর্তমানে যুক্ত রয়েছে শক্তিশালী এ বমার। সাগরে কয়েক ঘন্টা ধরে বিভিন্ন সাবমেরিনের গতিবিধি অনুসরণ করতে সক্ষম এ বিমান। প্রায় সারা বিশ্বের সাগরে সোভিয়েত এ টিইউ-১৪২ বমার তাদের নিজেদের এবং শত্রæ রাষ্ট্রের সাবমেরিনের গতিবিধি নিয়মিত অনুসরণ করত।
১৯৮৪ সালে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে আটটি টুপোলেভ টিইউ-১৪২ বিমান ক্রয় চুক্তি করে। ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ১৯৮৮ সালের ৩০ মার্চ প্রথম তিনটি টিইউ-১৪২ বমার ভারতে অবতরণ করে। ওই বছরই বাকী ৫টিও বুঝে পায় ভারত। তবে ভারতীয় নেভিতে বর্তমানে এগুলো আর সক্রিয় নেই। ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত তিনটি টিইউ ১৪২ সক্রিয় ছিল। টিইউ-৯৫ এর আরেকটি সংস্করণ হলো টিইউ-১১৪। এটি যাত্রীবাহী বিমান। টিইউ-১১৪ একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত গতির যাত্রীবাহী বিমান। এ বিমান প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৫৭ সালে।
প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে