বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৌশলগত সামরিক পরিবহন বিমান সি-৫ এম সুপার গ্যালাক্সি। বিমানটির নির্মাতা বিশ্বের সবচেযে বড় সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন । এ পরিবহন বিমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে দ্রুত ভারী সমরাস্ত্র এবং সৈন্য বহন করতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আর ভারী যুদ্ধবিমান হলো সি-৫ এম সুপার গ্যালাক্সি। একই সাথে সি-৫ সুপার গ্যালাক্সি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র সামরিক কৌশলগত এয়ারলিফটার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র আর্মির যেসব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো সি-৫ গ্যালাক্সি বিমান। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে এ বিমান। বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র আর্মির অপরিহার্য অংশ এবং গৌরব সি-৫ গ্যালাক্সি।
১৯৬৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এ বিমান ব্যবহার করে আসছে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের ১৩১টি পরিবহন বিমান নির্মান করেছে যুক্তরাষ্ট্র । এ বিমানের একমাত্র ব্যবহারকারী দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অনেক ধরনের শক্তিশালী যুদ্ধ বিমান বিক্রি করে থাকে। কিন্তু কয়েক প্রকার যুদ্ধ বিমান যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের কাছে বিক্রি করে না। এ ধরনের একটি বিমান হলো সি-৫ এম সুপার গ্যালাক্সি । এছাড়া আরো যেসব যুদ্ধ বিমান যুক্তরাষ্ট্র বিক্রি করে না তার মধ্যে রয়েছে, বি-১, বি-২ এবং বি-৫২ বম্বার। এ ছাড়া সুপারসনিক বম্বার বি-৫৮ হাসলার এবং বি-৭০ যুদ্ধ বিমানও অন্য কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্র বিক্রি করেনি ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সব বড় বড় অপারেশনের সঙ্গী ছিলো সি-৫ গ্যালাক্সি যুদ্ধ বিমান। এই পরিবহন বিমানে ছোট যুদ্ধ বিমান, হেলিকপ্টার, এম৬০ মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক, সাজোয়ান যানসহ বিভিন্ন ধরনের ভারী সমরাস্ত্র বহনে ব্যবহার করা হয়।
একসাথে ৫টি হেলিকপ্টার বহন করতে পারে একটি সি-৫এম সুপার গ্যালাক্সি। এ ছাড়া দুর্যোগ কবলিত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশে মানবিক সহায়তা এবং ত্রানসামগ্রী পৌছানোর ক্ষেত্রে নিয়মিত অংশ নেয় এ বিমান। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচীতেও অংশ নেয় এ বিমান। এ বিমানের ঝুলিতে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে ৮৯টি এরোনটিক্যাল ওয়ার্ল্ড রেকর্ড।
সি-৫ গ্যালাক্সির অনুকরনে লকহিড মার্টিন পরবর্তীতে নির্মান করেছে সি-১৪১ বিমান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অপর সমরাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং সি-৫ গ্যালাক্সির অনুকরনে তৈরি করেছে সি-১৭ গেøাবমাস্টার নামে সামরিক পরিবহন বিমান। তবে এ জাতীয় বিমানের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে বড় সামরিক পরিবহন বিমান সি-৫এম সুপার গ্যালাক্সি। সি-৫ এম সুপার গ্যালাক্সি যুদ্ধ বিমান সি-৫ গ্যালিক্সর নতুন সংস্করন। সি-৫ গ্যালাক্সি প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৬৮ সালে।
সি-৫ গ্যালাক্সি প্রথম মিশন পরিচালনায় অংশ নেয় ১৯৭০ সালের ৬ জুলাই ভিয়েতনাম যুদ্ধে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছোট যুদ্ধ বিমান, ভারী ট্যাঙ্কসহ বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র এবং সৈন্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এ বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল ভিয়েতনাম যোদ্ধারা দখল করে দক্ষিন ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গন। সায়গন পতনের কয়েক দিন আগে থেকে ব্যাপক উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয় সি-৫ গ্যালাক্সি। এসময় বিধ্বস্ত হয় একটি সি-৫ গ্যালাক্সি। এতে নিহত হয় ১৪০ জন।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় তার মিত্র অনেক দেশের সমর্থনে ব্যবহার করেছে সি-৫ গ্যালাক্সি। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মিশর এবং সিরিয়ার নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু হয় ইসরাইলের বিরুদ্ধে। মিশর এবং সিরিয়ার আকস্মিক আর দুই দিক থেকে হামলায় হতবিহবল হয়ে পড়ে ইসরাইল। এ যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি হয় ইসরাইল। ইসরাইলীরা দিন গুনতে থাকে যে কোনো সময় আরবদের দখলে চলে যাবে ইসরাইল।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের তখনকার প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মায়ার আকুল আবেদন জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের দেশ রক্ষার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরাইলের আহবানে সাড়া দিয়ে টানা ৩২ দিন পর্যন্ত ইসরাইলে শক্তিশালী ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার, আর্টিলারিসহ বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র প্রেরণ করে। এসময় মোট ২ কোটি ২১ লাখ পাউন্ড ওজনের সমরাস্ত্র ইসরাইলে বহন করা হয়।
দ্রুত ইসরাইলে এসব সমরাস্ত্র পৌছে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে সি-৫ গ্যালাক্সি পরিবহন বিমান। যুদ্ধ চলাকালে বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রের এসব তড়িত অস্ত্র প্রেরনের কারনে শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধে জয়ী হয় ইসরাইল। শোচনীয় অবস্থায় পড়ে আরবরা। আর ইসরাইলের এ জয়ের পেছনে ভূমিকা পালন করে সি-৫ গ্যালাক্সি বিমান। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে ইসরাইলে অস্ত্র পাঠানো অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন নিকেল গ্রাস’। ইসরাইলে এ অস্ত্র পাঠানোকে কেন্দ্র করে তখন রাশিয়ার সাথেও যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের আশাঙ্কা তৈরি হয়। কারন মিশরের তখন অস্ত্রের মূল যোগানদাতা ছিল রাশিয়া।
১৯৮৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১৩১টি সি-৫ গ্যালাক্সি তৈরি করে। ১৯৮৯ সালের পর নতুন কোনো সি-৫ গ্যালাক্সি বিমান তৈরি হয়নি। তবে সি-৫ গ্যালাক্সির নতুন সংস্করন সি-৫ এম সুপার গ্যালিক্স আরো অনেক বেশি শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ৫২টি সি-৫ গ্যালাক্সিকে সি-৫এম সুপার গ্যালাক্সিতে রুপান্তর করেছে। আসুন আমরা জেনে নেই সি-৫ গ্যালাক্সি সর্ম্পকে আরো কিছু তথ্য
সি-৫ গ্যালাক্সি বিমানের দৈর্ঘ্য ২৪৭ ফিট। উচ্চতা ৬৫ ফিট। শুধু বিমানটির ওজন ১৭২ টন। বিমানটির পেলোড ক্ষমতা ১৩০ টন । জ্বালানি তেল বহন ক্ষমতা ১৫০ টন। মেক্সিমাম টেকঅফ ওয়েট ৪১৭ টন। সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৫৩২ মাইল। বিমানটি চার ইঞ্জিন বিশিষ্ট। বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ারে রয়েছে ২৮টি চাকা। উইংস্প্যান বা বিমানটির দুই ডানার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মাঝের দূরত্ব ২২৩ফিট। ১ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড ওজন নিয়ে আকাশে পুন জ্বালানি সংগ্রহ ছাড়া বিমানটি টানা ৫ হাজার ৫২৪ মাইল উড়তে পারে। আর পুন জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে অনির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে সামরিক এ পরিবহন বিমান।
সি-৫ গ্যালাক্সির গঠন, আকৃতি, শক্তি একে দান করেছে রাজকীয় সৌন্দর্য। ৫০ বছর আগের তৈরি এ বিমান এখনো যে কোনো আধুনিক বিমানের কাছে ঈর্ষনীয় বিষয়। ১৯৯০-৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় যুদ্ধে সমরাস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে সি-৫ গ্যালাক্সি সামরিক পরিবহন বিমান। এসময় একটি সি-৫ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এসময় ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সমরাস্ত্র বহনের রেকর্ড তৈরি করে কয়েকটি সি-৫ গ্যালাক্সি বিমান।
রাশিয়ার সাথে ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রায় পুরো সময় জুড়ে ইউরোপে মিশন পরিচালনায় অংশ নেয় এ বিমান। প্রতি বছর ন্যাটোর বার্ষিক মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ বিমানে বহন করা হয় সমরাস্ত্র। সি-৫ গ্যালাক্সি প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গীর ভূমিকা পালন করে । প্রেসিডেনশিয়াল মটরকেড বহনের জন্য অ্যাডভান্সড এয়ার ফোর্স ব্যবহার করা হয় সি-৫ গ্যালাক্সি বিমান।
১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যলিস্টিক মিসাইল পরীক্ষা চালায়। এ সময় একটি সি-৫ গ্যালাক্সি ৩৯ টন ওজনের একটি মিনিটম্যান মিসাইল ফেলে প্রশান্ত মহাসাগরে।
সি-৫ গ্যালাক্সি একমাত্র সামরিক পরিবহন বিমান যা ১৯৮৯ সালে এন্টার্কটিকা গমন করে অপারেশন ডিপ ফ্রিজ এর সমর্থনে। এসময় এ বিমান বরফ রানওয়েতে অবতরন করে। বিজ্ঞানীদের এন্টার্কটিকা গবেষণার সময় এ বিমান সেখানে হেলিকপ্টার, ৭২ জন যাত্রী এবং বিপুল পরিমান পন্য সামগ্রী বহন করে। ২০৪০ সালেরও পর এ বিমান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এয়ার ফোর্সের।
প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে