ভারত মহাসাগরে চীনের হানা

ছবি - সংগৃহীত

  • মেহেদী হাসান
  • ০১ মে ২০২০, ২১:৪৮

করোনা ভাইরাস দুর্যোগের সুযোগে এবার ভারত মহাসাগরে হানা দিয়েছে চীন। করোনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এর আগে চীন তাইওয়ান প্রণালীতে বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে। এবার ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জলজ ড্রোন পাঠিয়েছে চীন। এ ধরনের এক ডজন জলজ ড্রোন সনাক্ত করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী।

প্রশান্ত এবং ভারত উভয় মহাসাগর অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের মধ্যেও চীনের তাদের এ কার্যক্রমের গতি কমায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিপক্ষ দেশগুলো কিছুটা সঙ্কটে পড়ায় চীন প্রভাব বিস্তারের নানা কৌশল বাস্তবায়ন করছে। বাড়িয়েছে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম। করোনার কারনে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ সংঘাত যখন থেমে গেছে তখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। একের পর এক দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে এখানকার দৃশ্যপট। এ অঞ্চলে দ্রুত পট পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।

ভারত মহাসাগরে চীনা জলজ ড্রোন মোতায়েন বিষয়ে এশিয়া টাইমসের এক বিশ্লেষনে বলা হয়েছে, চীনের সমর পরিকল্পনাবিদরা যদি মনে করে থাকে যে করোনার সুযোগে ভারত মহাসাগরে বেইজিং অভিযানের বিষয় গোপন করতে পারবে। কিন্তু তারা ভুল করেছে। কারন ভারত করোনায় আক্রান্ত হলেও ভারতীয় নেভি আক্রান্ত নয়।

১৪ এপ্রিল ভারতীয় নেভির এক বিবৃতিতে বলা হয় ইস্টার্ন নেভল কমান্ড এর ডরনিয়ার স্কোয়াড্রন সমুদ্র টহল মিশন অব্যাহত রেখেছে এবং যে কোনো মিশন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

চীন ভারত মহাসাগরের পূর্বে অনেকগুলো জলজ রোবট যান মোতায়েন করেছে। ভারতীয় নেভি এগুলো পর্যবেক্ষন করেছে। গুরুত্বপূর্ন নৌ এলাকায় তারা এক ডজন জলজ রোবটের সন্ধান পেয়েছে।


চীন যে জলজ ড্রোন পাঠিয়েছে তার নাম আনম্যানড আন্ডার ওয়াটার ভেহিক্যালস বা ইউ ইউ ভি। মানুষবিহীন এসব জলজ ড্রোন সাধারণত গভীর সমুদ্রে সাইন্টিফিক রিসার্চ এবং অন্যান্য বানিজ্যিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া সাবমেরিনের গতিবিধি বা চলাচলের ক্ষেত্রেও সহায়তা করতে পাওে এসব ড্রোন। যুদ্ধের সময় সমুদ্র তলের মাইন অকার্যকর করার কাজেও ব্যবহার করা যায় এসব জলজ ড্রোন।

চীনা এসব রোবট যান পুন: জ্বালানি ছাড়া কয়েক মাস পর্যন্ত অভিযান চালাতে পারে। অভিযানে থাকা অবস্থায় মূল রণতরীতে বার্তা পাঠাতে পারে । চীনের শানডং প্রদেশে এ ধরনের একটি মাদারশিপ মোতায়েন রয়েছে। এর নাম জিয়াংইয়াংহং-০৬। শিভান -১ নামে চীনের আরেকটি জাহাজ ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পানি সীমায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে সম্প্রতি কার্যক্রম শুরু করে । ভারতীয় নেভি বাধা দেয়ার পর সেটি ভারতীয় পানি সীমা ত্যাগ করে।

গত কয়েক বছর ধরে পরমানু শক্তিচালিত চীনা সাবরেরিন আনা গোনা করছে ভারত মহাসাগরের মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। ভারতীয় নেভির তথ্য অনুসারে চার থেকে পাঁচটি চীনা গবেষণা জাহাজ ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে মাপঝোক চালিয়ে যাচ্ছে।
নয়াদিল্লি ভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক অবজারভার রির্সাচ ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভারত যখন করোনায় বিধ্বস্ত তখনো চীন গবেষণা জাহাজ, রোবট যান এবং সাবমেরিন চলাচল বন্ধ করেনি। এ সংস্থার পক্ষ থেকে বল হয়েছে বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসে কাবু তখন এ সুযোগে চীন যদি ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তার কার্যক্রম চালায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এই পর্যবেক্ষন বাস্তবে ঘটছে। এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত এবং চীন উভয়ের কাছে বর্তমানে খূবই গুরুত্বপূর্ণ হলো মালদ্বীপ। আর চীন ইতোমধ্যে মালদ্বীপে মেডিকেল সহায়তা পাঠিয়েছে । মালদ্বীপ চীনা সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এ সহায়তা তাদের প্রয়োজনও ছিল।

২০১৮ সালের নির্বাচনে মালদ্বীপে পরাজিত হয় চীনা পন্থী নেতা এবং জয়লাভ করে ভারতপন্থী নেতা। মালদ্বীপে চীনা সহায়তার পর ভারত দ্রুত দেশটিতে চার টন ঔষুধ পাঠায়। এভাবে করোনা সঙ্কটে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য চালু হয়েছে সহায়তার রাজনীতি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে চীন। কারন তাদের রয়েছে ব্যাপক সম্পদ আর সক্ষমতা। রণতরীর সংখ্যা , জনবল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় নেভি অনেক অগ্রসর হলেও চীন দ্রুত এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে করোনা দুর্যোগের মধ্যেও।
শুধু ভারত মহাসাগরে নয়, প্রশান্ত মহাসাগারেও একই ধরনের তৎপরতা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে চীন। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন গ্রহণ করেছে ‘টু-ওশেন স্ট্রাটেজি’। এর আওতায় দেশটি নৌ বাহিনীকে সজ্জিত করছে। এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষনে বলা হয়েছে চীনের এসব পদক্ষেপ নয়াদিল্লিতে ত্রাস সৃষ্টি করছে ।
সম্প্রতি দক্ষিন চীন সাগরে অবস্থিত ৮০টি ছোট বড় দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে। এ দ্বীপ গুলোকে বেইজিং প্রশাসনিক জেলা হিসেবে অভিহিত করেছে। মালয়েশিয়ার পানি সীমায় চীনা জাহাজ জরিপ কাজ পরিচালনা করছে। সর্বশেষ চীনা এসব উদ্যোগের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে রণতরী পাঠিয়েছে। এর আগে চীন তাইওয়ান প্রণালীতে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর পরও যুক্তরাষ্ট্র গুয়াম দ্বীপে ১২টি বি-৫২ বম্বার রানওয়েতে নামায়। আর এসবই প্রমান করছে চীন বৃহত্তর এশিয়ায় অঞ্চলে তার নৌ আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।

ভারত মহাসাগরে চীনা আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ পায় ২০১৩ সালে। ওই বছর অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি ইন্দোনেশিয়া সফরকালে ভারত মহাসাগরে মেরিটাইম সিল্ক রোড এর কথা জানান। ২০১৭ সালে চীন আফ্রিকার জিবুতিতে নৌঘাটি স্থাপনের মধ্যদিয়ে ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের পথে হাটতে শুরু করে। এছাড়া পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং মায়ানমারের কিয়াউকপিউতে নির্মিত চীনা বানিজ্যিক বন্দর ভবিষ্যতে সামরিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। মালদ্বীপসহ ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ রাষ্ট্রকে নানা ধরনের ঋন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে চীন।

জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বার্ষিক মালাবার যৌথ মহড়া চালিয়ে ভারত এর জবাব দেয়ার চেষ্টা করছে। এ তিনটি দেশেরই নৌবাহিনী চীনকে তাদের সম্ভাব্য শত্রু হিসাবে বিবেচনা করছে। তবে এ বছর করোনার কারনে এ মহড়া অনুষ্ঠিত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত বছর মে মাসে ভারত মহাসাগরে ফ্রান্সের সাথে যৌথ মহড়ার আয়োজন করে ভারত। এসময় ফ্রান্সের একমাত্র পরমানু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী চার্লস ডি গল অংশ নেয়। কিন্তু এ বছর তা সম্ভব হবে না। কারন এ রণতরীর ১ হাজার নৌ সেনার মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। ভূমধ্যসাগরে মিশন পরিচালনায় যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে এবং পরে যাত্রা পথ পরিবর্তন করে ফ্রান্সে এই বিমানবাহী রনতরী ফিরিয়ে আনা হয় । সহসা এ রনতরী কোনো মিশন পরিচালনায় সক্ষম নয় ।
ভারত মহাসাগরের বিশাল অংশ রয়েছে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রনে। জনবসতি এবং জনবসতিহীন বেশ কয়েক দ্বীপপুঞ্জের ওপর ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রন রয়েছে। রিইউনিয়ন এন্ড মায়োটো, কারেগুলেন, ক্রজেট দ্বীপপুঞ্জ, সেন্ট পল এবং আমস্টারডামে ফ্রান্স নিয়মিতভাবে সেনা এবং বৈজ্ঞানিক নৌযান মোতায়েন করে থাকে।
অপরদিকে বহির্বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাটি রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ। এ দ্বীপের মালিক বৃটেন হলেও লীজ নেয়ার মাধ্যমে এটি বর্তমানে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে। বিশ্বের অন্যতম গোপনীয় সামরিক স্থান হিসেবে পরিচিত এ দ্বীপে রয়েছে শক্তিশালী নৌ ও বিমান ঘাটি। রয়েছে অত্যাধুনিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের ব্যবস্থা।

ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য বিস্তারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে শি জিনপিংয়ের পুর্ব ঘোষিত মেরিটাইম সিল্ক রোডের আওতায়। ২০১৩ সালে চীন এ পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এতে এ অঞ্চলে বৃহৎ নৌ শক্তিতে পরিণত হওয়ার বিষয়ে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। যার মূল কথা হলো ভারত মহাসাগর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন থাকবে চীনের হাতে। এ অঞ্চলে চীনের চেয়ে বড় কোনো শক্তি থাকতে দেবে না।