যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রাশিয়ার সাহায্যর নেপথ্যে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পতাকা- সংগৃহীত

  • মেহেদী হাসান
  • ২১ এপ্রিল ২০২০, ১১:৩৬

করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত ইতালি আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাহায্য পাঠিয়েছে রাশিয়া । এ নিয়ে চলছে নানা ধরনের বিতর্ক। দানা বাঁধছে নানা ধরনের সন্দেহ আর রহস্য। রাশিয়া ইতালিতে চিকিৎসাকর্মী, ভেন্টিলেটর, মাস্ক আর প্রটেকটিভ স্যুট পাঠিয়েছে। যেসব লরিতে করে এসব পাঠানো হয়েছে সে লরিতে লেখা রয়েছে ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’। লরি ছাড়াও রাশিয়ার দুটি সামরিক পরিবহন বিমানে করে পাঠানো হয়েছে বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী। সামরিক বিমান দুটির গায়েও স্টিকার লাগানো রয়েছে ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’।

অভিযোগ উঠেছে করোনা ভাইরাস নিয়ে রাশিয়া ইউরোপে অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে । করোনা বিষয়ে ইউরোপ সম্পর্কে একের পর এক মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যম। অপর দিকে ইতালী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ত্রান পাঠানো বিষয়ে বলা হচ্ছে রাশিয়া নি:স্বার্থভাবে এসব ত্রান সামগ্রী পাঠায়নি। এর প্রথম উদ্দেশ্য ইউরোপকে খুসী করা যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়া। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরো বিভিন্ন সংস্থা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে। বহিষ্কার করা হয় জি-৮ থেকে। রাশিয়ার ভিটিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে কোস্টিন যুক্তরাষ্ট্রের সিএনবিসি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন রাশিয়া ইতালীতে যে সহায়তা পাঠিয়েছে তার কোনো বিনিময় রাশিয়া চায় না।

আন্দ্রে কোস্টিন বলেন, আমরা শত্রু নই। আমরা ইউরোপ ও আমেরিকার বন্ধু। অবশ্যই আমরা ইতালী ও অন্যান্য দেশের সমস্যা সমাধান করতে পারব না। কিন্তু যেখানে আমরা আমাদের সমর্থন দেখাতে পারি এবং প্রকৃত সহায়তা করতে পারি সেখানে আমরা তাদের সমস্যা সমাধানে এক সাথে কাজ করতে পারি।
তবে রাশিয়ার এ কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। ইতালীর লা স্টাম্পা পত্রিকায় লেখা হয়েছে রাশিয়ার পাঠানো ৮০ ভাগ সরঞ্জাম ব্যবহারযোগ্য নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রাজনীতিকের বরাত দিয়ে এ তথ্য পরিবেশন করে পত্রিকাটি। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। একে রাশিয়া বিরোধী ভূয়া খবর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়।

ইতালির পক্ষ থেকে রাশিয়াকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে জরুরি সহায়তার জন্য। তবে একই সাথে সংবাদ মাধ্যমের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিও সংহতি প্রকাশ করেছে ইতালী। ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে যে, রাশিয়ার এ সহায়তা নি:স্বার্থ নয়। বরং ক্রিমিয়া বিষয়ে রাশিয়ার ওপর থেকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবরোধ তুলে নেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া এ সহায়তা পাঠিয়েছে। এর মাধ্যমে সে ইউরোপকে খুসী করার চেষ্টা করছে।
ইতালীকে এখনো রাশিয়ার অনেকটা ভাল মিত্র মনে করা হয়। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করার ঘটনায় ইতালী রাশিয়ার পক্ষ নেয়। ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার পক্ষে অভ্যূত্থানেও সমর্থন দিয়েছে ইতালী । ক্রিমিয়া ঘটনায় রাশিয়ার ওপর ইউরোপের আরোপ করা অববরোধ তুলে নেয়ার পক্ষে ইতালি।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন , রাশিয়ার এ করোনা সহায়তা শুধুমাত্র অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য নয়। বরং বৃহত্তর প্রপাগান্ডার অংশ। বহির্বিশ্বে রাশিয়ার খারাপ ইমেজ পুনরুদ্ধার এবং নির্দিষ্ট কোনো কোনো দেশের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টার অংশ মাত্র। ইতালির বর্তমান ক্ষমতাসীন ডানপন্থী লেগা পার্টিকে রাশিয়া পন্থী দল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ দল যাতে আগামী নির্বাচনে ভাল ফল করতে পারে সেজন্য ইতালীতে রাশিয়াপন্থী জনমত ধরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া।

শুধু ইতালী নয় রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে একটি সামরিক পরিবহন বিমান পাঠিয়েছে চিকিৎসা সামগ্রী দিয়ে। এ বিমানের গায়ে লেবেল লাগানো ছিল ‘হিউম্যানিটারিয়ান এইড’। ক্রেমলিন মনে করছে এতে দেশেও পুতিনের জনপ্রিয়তা বাড়বে।
রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে ভেন্টিলেটর পাঠিয়েছে তা তৈরি করা হয়েছে রসটেকের সহায়তায়। রাশিয়ার এই সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠান রসটেকের ওপর রয়েছে মার্কিন নিষেধাপজ্ঞা। আমেরিকার বিপদের সময় রাশিয়া এ কৌশল গ্রহনের মাধ্যমে প্রমান করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের নিষেধাজ্ঞা নিজেই ভঙ্গ করেছে।
অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন রাশিয়ার এ কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ রাশিয়াতেও করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর নিজেরই এসব সামগ্রীর প্রয়োজন হতে পারে। রাশিয়ায় যদি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ মারা যায় তারা তা গোপন রাখতে পারবে না। তখন রাশিয়ার ইমেজ বৃদ্ধিকারী এসব লাভ স্টিকার কাজে আসবে না। পাবলিক তখন ক্ষেপে যাবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিযোগ করেছে রাশিয়ান মিডিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারনায় নেমেছে। এ প্রচরানার উদ্দেশ্য হলো করোনা ভাইরাসের কারনে সৃষ্ট পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করা, আতঙ্ক সৃষ্টি করা আর অবিশ্বাসের বীজ বপন করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি ডকুমেন্টে এ ধরনের ৮০টি ঘটনা সংগ্রহ করা হয়েছে। যেখানে জানুয়ারির পর থেকে করোনা ভাইরাস নিয়ে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে রাশিয়ান মিডিয়ায়। রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাজ্য অভিযোগ করেছে বরিস জনসনের অসুস্থতা নিয়েও রাশিয়ার গণমাধ্যম মিথ্যাচার করছে। রাশিয়ান মিডিয়ায় লেখা হয়েছে বরিস জনসন ভেন্টিলেটরে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বরিস জনসনকে ইনটেনসিভ কেয়ারে রাখা হয়েছে । কিন্তু তিনি সচেতন রয়েছেন এবং তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়নি।
রাশিয়ার জনসংখ্যা সাড়ে ১৪ কোটি। প্রতিবেশি ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় রাশিয়ায় করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। দেশটিতে লকডাউনও কার্যকর করা হয়েছে অনেক পরে। তবে অনেকের বিশ্বাস রাশিয়ায় করোনা আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে যদি ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা হয়।
রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ বছর ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক ২০২০ সালে দেড় থেকে দুই শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশা করেছে। কিন্তু ৩০ মার্চ সেন্ট্রাল ব্যাংক জানিয়েছে সামনের মাসগুলোতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিম্মমুখী হতে যাচ্ছে করোনা ভাইরাস আর তেলের দরপতনের কারনে।
করোনা পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না আসলে কোন দেশের ক্ষতির মাত্রা কি পরিমান হতে পারে। কারন বিশ্বে এই প্রথমবারের মত অর্থনৈতিক কোনো কারনে নয় বরং একটি ভাইরাসের কারনে মহামন্দর কবলে পড়তে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। আর এর প্রভাব থেকে কেউই রক্ষা পাবে না এবার। এটা আরো যত বেশি দিন বিদ্যামান থাকবে ক্ষতির পরিমান ততই বাড়তে থাকবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে রাশিয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের অবসান ঘটানের জন্য। করোনা ভাইরাসের কারনে পৃথিবী যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে তাতে দুই বিশ্ব পরাশক্তির দ্বন্দ্ব সংঘাত ভবিষ্যতে কারোর জন্যই মঙ্গল হবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম সিএনবিসির এক প্রবন্ধে আহবান জানানো হয়েছে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে এক সাথে কাজ করার পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য। সে লক্ষ্যে এখনই দুই রাষ্ট্রকে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় যৌথ পদক্ষেপ গ্রহনের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া করোনা উত্তর পরিস্থিতি অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠা এবং পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্র -রাশিয়কে একত্রে কাজ করার আহবান জানানো হয়েছে। দুই দেশ যাতে ভবিষ্যতে একত্রে বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে সেজন্য একটি প্লাটফর্ম গঠনেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

সিএনবিসির প্রবন্ধে বলা হয়েছে ৭৫ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেমন দুই রাষ্ট্রের সৈন্যরা কাধে কাধ মিলিয়ে পাশপাশি থেকে এক ও অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় অর্জন করেছে তেমনি ভবিষতেও এ দুই দেশকে বিভিন্ন বিষয়ে এক সাথে কাজ করতে হবে। বর্তমানে মানবজাতি যে হুমকির মুখে দাড়িয়েছে তাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দুই দেশের সৈনিকদের পাশপাশি অবস্থান করে যুদ্ধের ছবিগুলো দুই দেশের ঐক্যের প্রতীক বলে মন্তব্য করা হয়েছে সিএনবিসিরি লেখায়।