করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে। বিমানবাহী রণতরী থিওডর রুজভেল্ট সৈনিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় আকস্মিক এক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। উদ্বিগ্ন মার্কিন সামরিক সদরদপ্তর পেন্টাগন । বিমানবাহী রণতরী থিওডর রুজভেল্টে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থানের সময় নৌ সেনাদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। শতাধিক নৌ সেনা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় শক্তিশালী এ রণতরী গুয়াম দ্বীপে গ্রাউন্ড করে রাখা হয়েছে । আপাতত এ রণতরী মার্কিন আধিপত্য রক্ষার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আর এতে করে ঐতিহাসিক এক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে চীনের জন্য।
প্রশান্ত মহাসগার, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিন চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ভারতসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে। সম্প্রতি এ লড়াই তীব্র আকার ধারন করেছে। করোনা ভাইরাসের কারনে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থিওডর রুজভেল্ট গ্রাউন্ডেড করায় এ অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় চীনের জন্য বড় ধরনের এক সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ একে আঞ্চলিক সমুদ্র রাজনীতির পালাবদলের ক্ষেত্রে সিসমিক শিফট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে এ অঞ্চলে স্বল্প সময়ের জন্যও যদি মার্কিন নৌ উপস্থিতিতে বিঘœ ঘটে তবে চীন সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবে। বাস্তবতা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের কারনে মার্কিন নৌ অনুপস্থিতির ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। ফলে ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসগর ও দক্ষিন চীন সাগর ঘিরে সমুদ্র কেন্দ্রিক আধিপত্য লড়াইয়ে বড় ধরনের পালাবদল ঘটতে পারে।
বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাটিতে সৈনিকদের মধ্যে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এশিয়ার বিশাল অংশসহ দক্ষিন চীন সাগর পর্যন্ত মার্কিন স্বার্থ এবং আধিপত্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে মার্কিন নেভির ইন্দো-প্যাসেফিক কমান্ড । এই ইন্দো-প্যাসেফিক কমান্ডের নৌ সেনাদের মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।
হোয়াইট হাউজ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পেন্টাগনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বিদেশি ঘাটিতে নিয়োজিত মার্কিন সৈন্য এবং সম্পদ দেশে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় কাজে লাগানোর জন্য। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য এবং শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধকালীন আইন ডিফেন্স প্রডাকশন অ্যাক্ট কার্যকর করেছেন। এর আওতায় মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে অতি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে করোনা ভাইরাস কিটস, ভেন্টিলেটর এবং বডিব্যাগ উৎপাদন ও সরবরাহ করা। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে । হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত বেড। অসংখ্য করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে এসে ফিরে যাচ্ছে বেড ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের মধ্যে দ্রুত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় পেন্টাগনের প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনকে মোকাবেলায় এশিয়ার বিভিন্ন মিত্র দেশের সাথে যৌথ সামরিক কার্যক্রম, মহড়া নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সিএনএন এর খবরে বলা হয়েছে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত ৭১৬ জন সৈনিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে একজন। একই সময় পেন্টাগন থেকে বলা হয়েছে মার্কিন আর্মিতে মোট ১ হাজার ৮৭ জনের মধ্যে করোনার লক্ষন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ৬৩৩ জন সৈনিক।
প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে বিশ্বব্যাপী সকল ঘাটিতে মার্র্কিন কমান্ডারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সৈনিকদের মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের তথ্য যেন প্রকাশ্যে প্রকাশ বা প্রচার করা না হয়। গত ২৭ মার্চ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্ক এসপার এ আদেশ জারি করেন। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র জোনাথন হফম্যান এ আদেশ জারির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষা নেতৃবৃন্দ উদ্বিগ্ন যে, শত্রু রাষ্ট্র এর সুযোগ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আর্মিতে ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশিত হলে চীন, রাশিয়া এবং ইরান এ দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বলে উদ্বিগ্ন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ। মার্চের শেষের দিকে মার্ক এসপার মার্কিন আর্মির জন্য ব্যাপকভিত্তিক ভ্রমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ৬০ দিন পর্যন্ত বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ফিলিপাইনসহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব নির্ধারিত অনেক যৌথ কার্যক্রম বাতিল হতে পারে। এসপারের এ অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী মার্কিন আর্মির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
থিওডর রুজভেল্ট রণতরীতে নাবিকদের মধ্যে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের ঘটনা ঘটে মার্চের শেষের দিকে। এরপর জাহজের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রজিয়ার নেভির উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত এক চিঠিতে দ্রুত সৈনিকদেও উদ্ধারের আহবান জানানা। চিঠিতে বলা হয় ধীরে ধীরে অন্য নাবিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস। দ্রুত তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা না হলে নাবিকরা মারা যাবে। চিঠিতে ক্যাপ্টেন জানান, জাহাজে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। কোয়ারেন্টিন এবং আইসোলেশনও ব্যবস্থা নেই। ফলে এটি ঠেকাতে ব্যর্থ হলে জাহাজে বেদনাদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। জাহাজটিতে ৪ হাজার নাবিক, ক্যাপ্টেনসহ ৫ হাজার জনবল ছিলো।
থিওডোর রুজভেল্ট রনতরীতে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের খবর গনমাধ্যমে প্রকাশ করার কারনে জাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রজিয়ার কে বরাখাস্ত করা হয়। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। ন্যাটে সুপ্রিম এলাইড কমান্ডার সাবেক এডমিরাল জেমস স্টাভারডিস সানফ্রান্সিকো ক্রনিক্যালকে এক সাক্ষাতকারে বলেন, আরো রণতরীতে এ ধরনের ঘটনার খবর বের হতে পারে। কারন করোনা ভাইরাসের পারফেক্ট প্রজনন ক্ষেত্র হলো এ ধরনের রণতরী।
বিশ্লেষকদের মতে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ আর এশিয়া যখন করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত তখন চীন উদ্যোগ নিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কাজে লাগানোর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অনুপস্থিতিতে বিতর্কিত স্কারবরো এলাকা নিয়ন্ত্রন নিতে পারে চীন।
চীন এ অঞ্চলে একটি ডিফেন্স আইডেনটিফিকেশন জোন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে। যা দক্ষিন চীন সাগরে দেশটির আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করবে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিন চীন সাগরে চীন তাদের কৃত্রিম দ্বীপে সামরিক অবস্থান সংহত করেছে। বাড়িয়েছে আধা সামরিক সৈন্য সংখ্যা।
২০১৩ সাল থেকে চীন স্প্রাটলি আইল্যান্ড এবং প্যারাসেল আইল্যান্ডে দ্বীপে অবকাঠামো নির্মান কাজ শুরু করে। চীনের এ পদক্ষেপে সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তর্যা ও ফ্রান্স মিলে দক্ষিন চীন সাগরে ফ্রিডম অব নেভিগেশন অপারেশন পরিচালনা করে।
দক্ষিন চীন সাগরে কিছু দ্বীপ আর সমদ্র সীমা নিয়ে চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, ফিলিপাইন, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনামের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। মার্কিন নৌ অনুপস্থিতিতে এসব ক্ষেত্রেও চীন তার অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ফিলিপাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে। এতে দক্ষিন চীন সাগরে মার্কিন উপস্থিতি বিপত্তির মুখে পড়েছে । ফিলিপাইনের সাথে মার্কিন নিরাপত্তা চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য ফিলিপাইনের মাটিতে অবস্থান করতে পারত। ফিলিপাইনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নৌ ঘাটি সুবিক এবং ক্লার্ক থেকে মাত্র ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত স্কারবোরো শোল দ্বীপ।
স্কারবোরো শোল দক্ষিন চীন সাগরে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ। ফিলিপাইন, তাইওয়ান এবং চীন প্রত্যেকে নিজেদের বলে দাবি করছে দ্বীপটি । এ দ্বীপ নিয়ে ২০১২ সালে ফিলিপাইন-চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা দেখা দেয়। ২০১২ সালের আগে দ্বীপটিতে ফিলিপাইনের প্রশাসনা ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে সেখানে চীন রণতরী পাঠিয়ে তাদের প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৬ সালে হেগের আদালত এ দ্বীপ নিয়ে ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু চীন এ রায় অগ্রাহ্য করে এবং স্কারবোরো শোলসহ এখানে চীনের অন্যান্য দ্বীপে আরো অধিকসংখ্যক রণতরী মোতায়েন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের নিরাপত্তা চুক্তি বাতিল আর করোনা ভাইরাসের কারনে মার্কিন সামরিক অনুপস্থিতির সুযোগে চীন এ এলাকা পুরোপুরি দখলে নিতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্র সমুদ্র। বানিজ্য রুট, সমুদ্র সীমা, সমুদ্র সম্পদকে কেন্দ্র করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে। আর নতুন এ লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ভারত মহাসগর, প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিন চীন সাগর। এ অঞ্চল ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে চলছে ব্যাপক সমরসজ্জার আয়োজন। কিন্তু এখন করোনা ভাইরাস পুরো পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে।