৬১ বছর আকাশে উড়বে যুক্তরাষ্ট্রের সুপারসনিক বম্বার বি-১

সুপারসনিক বম্বার বি-১ বোমারু বিমান- সংগৃহীত

রাশিয়ার সাথে সম্ভাব্য যে কোনো পারমানবিক যুদ্ধ মোকাবেলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্মান করে বি-১ বোমারু বিমান। এটি একটি সুপারসনিক বম্বার। কোনো বিরতি ছাড়া পৃথবীর যে কোনো প্রান্তে হামলা পরিচালনা করে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পারে এ বিমান। বি-১ বোমারু বিমান পারমানবিক বোমা বহনে সক্ষম। ২৪টি পরমানু বোমা বহন করতে পারে একটি বি-১ বিমান। এ বিমানের একমাত্র ব্যবহারকারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিমাবাহিনীর শক্তিশালী এ যুদ্ধ বিমানের পুরো নাম বি-১ল্যান্সার। তবে এটি ‘বোন’ বিমান নামে পরিচিত । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে তিন ধরনের কৌশলগত শক্তিশালী বোমারু বিমান রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো বি-১ ল্যান্সার। অপর দুটি কৌশলগত বোমারু বিমান হলো বি-২ স্পিরিট এবং বি-৫২ বম্বার। বি-২ এবং বি-৫২ বিমানও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপর কোনো দেশে বিক্রি করে না।  বি-১ ল্যান্সার প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর। মার্কিন বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় ১৯৮৬ সালের ১ অক্টোবর। ২০৩৬ সাল পর্যন্ত এ বিমান ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনীর।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঠান্ডা লড়াই চলাকালে সম্ভাব্য পারমানবিক হামলা মোকাবেলার জন্য তৈরি করা হয় শক্তিশালী এ বোমারু বিমান। মোট ১০৪টি বি-১ ল্যান্সার বিমান তৈরি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় যুদ্ধ, কসভো যুদ্ধ, অপারেশন ডেজার্ট ফক্স, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া প্রভৃতি অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে এ বিমান। বি-১ ল্যান্সার বম্বার বিমানের নির্মাতা রকওয়েল ইন্টারন্যাশনাল। রকওয়েল ইন্টারন্যশনাল বর্তমানে বোয়িং কোম্পানীর অংশ। একটি বি-১ বিমানটির ওজন ৮৭ টন। বিমানটি ১শ ২৫ টন ওজনের বোমা বহন করতে পারে। এর মধ্যে দেহের বাইরে ৫০ হাজার পাউন্ড এবং অভ্যন্তরে ৭৫ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা বহন করতে পারে। বোমাসহ বিমানটির সর্বোচ্চ ওজন বহন ক্ষমতা ১শ ২৯ টন। বি-১ ল্যান্সারের সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৮৩০ মাইল। শব্দের চেয়ে ১ দশমিক ২৫ গতিতে চলতে পারে সুপারসনি এ বোমারু বিমান। ৪০ হাজার ফিট আকাশে ওড়া ছাড়াও অতি নিচ দিয়েও তীব্র গতিতে উড়তে সক্ষম এ বিমান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অপারেশনাল দ্রুত গতির যুদ্ধ বিমান হলো বি-৫৮ হাসলার। সুপারসনিক এ বিমানের গতি শব্দের চেয়ে দ্বিগুন। অপর দিকে সবচেয়ে ভারি বোমারু বিমান হলো বি-৫২। বি-১ ল্যান্সার নির্মান করা হয়েছে এ দুই বিমানের সমন্বয়ে। পারমানিক যুদ্ধের জন্য এ বিমান নির্মান করা হয়েছিল রাশিয়ার সাথে ঠান্ডা লড়াই চলার সময়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর এ বিমানের ব্যবহার নিয়ে সমস্যায় পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে পারমানবিক বোমা বাহনকারী এ বিমানকে প্রচলিত বোমারু বিমানে রুপান্তরের জন্য পরবর্তীতে ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রচলিত যে কোনো ধরনের বোমা বহনে সক্ষম করার পর এ বিমান পরিণত হয় আরেক শক্তিশালী বহুমুখী যুদ্ধ বিমানে। বি-১ ল্যান্সর দুই ধরনের বিমান রয়েছে। বি-১ এ এবং বি-১ বি। ১৯৮৬ সালে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর এ যুদ্ধ বিমান যুক্ত করা হয় স্ট্রাটেজিক এয়ার কমান্ডে। স্ট্রাটেজিক এয়ার কমান্ড গঠন করা হয় সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঠান্ডা লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমানিবক স্ট্রাইক ফোর্সের তিনটি শাখার একটি হলো স্ট্রাটেজিক এয়ার কমান্ড। পরবর্তীতে এ বিমান যুক্ত করা হয় মার্কিন এয়ার কমব্যাট কমান্ডে। ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বি-১বি বিমানের পরমানু বোমা বহন ক্ষমতা বন্ধ করে। এরপর রাশিয়ার সাথে পরমানু অস্ত্র সীমিতকরন চুক্তি করার পর ২০১১ সালে এ বিমানকে সম্পূর্ণরুপে পরমানু বোমা বহনে অক্ষম করা হয়। এ চুক্তির আওতায় রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল প্রতি বছর এ বিমান পরিদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মেনে চলছে কি না তা দেখার জন্য।

১৯৯৮ সালে ইরাকে পরিচালিত মার্কিন অপারেশন ডেজার্ট ফক্সে প্রথম অংশ নেয় বি-১ বোমারু বিমান। এরপর ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর অধীনে কসভো যুদ্ধে অংশ নেয় এ বিমান। এসময় ইউগোস্লাভিয়ায় বোমা হামলা পরিচালনা করে এ বিমান । তবে এ বিমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তান এবং ইরাক অভিযানে।
২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে পরিচালনা করে অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম। এরপর ২০১৫ থেকে সর্বশেষ তালেবানদের সাথে চুক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত চলে অপারেশন ফ্রিডম’স সেন্টিনেল। এরপর ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক দখলের সর্বাত্মক এক অভিযান পরিচালনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরাক আগ্রাসনে অংশ নেয় যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং পোল্যান্ড। ১ লাখ ৭৭ হাজার সৈন্য পাঠানো হয় এ অভিযানে। বিমান ও স্থল বাহিনীর সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে স্বল্প সময়ে ইরাক দখলের অভিযান সমাপ্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। ২০০৩ সালের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ইরাক দখল অভিযানের প্রথম পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১ লাখ ৩০ হাজার এবং বৃটেনের ৪৫ হাজার সেনা অংশ নেয়। পরবর্তীতে আরো ৩৬টি দেশ অংশ নেয় ইরাক দখলদারিত্ব বজায় রাখার অংশ হিসেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তান এবং ইরাক উভয় অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল বি-১ বম্বার। আফগানিস্তানে অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডমের প্রথম ৬ মাসে আকাশ থেকে ৪০ শতাংশ বোমা ফেলা হয় বি-১ বম্বার থেকে। ৮টি বি-১ বিমান অংশ নেয় এ অপারেশনে। সাদ্দাম হোসেন এবং তার দুই পুত্রকে হত্যার অভিযানে অংশ নেয় এ বিমান। এসময় জেডিএএম বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তবে সেবার এ অভিযান সফল হয়নি। আফগানিস্তান এবং ইরাক উভয় অভিযানে এ বিমান ব্যবহার করা হয় জেডিএএম অস্ত্র নিক্ষেপের জন্য। ইরাক অভিযানে একটি বি-১ ল্যান্সার বিমান সব সময় আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় রাখা হয়।
একটানা দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারে এই যুদ্ধ বিমান। ভারী বোমা নিয়ে দ্রুত গতিতে ওড়ার ক্ষমতার কারনে বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী বি-১ বম্বার। ১৯৯৩ সালে তিনটি বি-১ বিমান দীর্ঘ পথযাত্রার অভিযানে বের হয় এবং রেকর্ড স্থাপন করে। পৃথবীর যে কোনো প্রান্তে বোমা হামলা পরিচালনা করে কোনো বিরতি ছাড়া আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পারে এ বিমান। মার্কিন বি-২, বি-৫২ বম্বারেরও রয়েছে এ ক্ষমতা। ২০১২ সালে আফগানিস্তানে ৬ মাসের এক অভিযানে অংশ নেয় ৯টি বি-১বি বম্বার। এ সময় ৯টি বিমান ৯ হাজার ৫০০ ঘন্টা আকাশে ওড়ে এবং একটি বিমান সবসময়ের জন্য আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় রাখা হয়। এ বিমানের রয়েছে দূর পাল্লার এন্টি শিপ মিসাইল ছোড়ার ক্ষমতা। দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারার কারনে এ বিমান সমুদ্রে টহলেও অংশ নিতে পারে।

২০১৪ সাল থেকে সিরিয়া যুদ্ধ, সিরিয়া এবং ইরাকে অপারেশনেও অংশ নেয় বি-১ বম্বার। সিরিয়ায় আইএস বিরোধী অভিযানে এ বিমানের বোমা হামলায় ১ হাজারের বেশি আএইস সদস্য নিহত হয়। সিরিয়ায় কয়েক হাজার বোমা নিক্ষেপের পর ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায় এ বিমান। ২০১৮ সালে আবার সিরিয়ায় মিসাইল হামলায় অংশ নেয় এ বিমান।
২০১৭ সালের ৮ জুলাই ২টি বি-১ বিমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার আকাশ সীমান্তে উড়ন্ত অবস্থায় রাখে। ওই বছর ৪ জুলাই উত্তর কোরিয়া আন্তমহাদেশীয় বা ব্যালেস্টিক মিসাইল পরীক্ষা চালায়। এ মিসাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় আঘাত পরিচালনা করতে সক্ষম। এ মিসাইল পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সেখানে পাঠায় শক্তিশালী এ বম্বার। ২০১৫ সালে সব বি-১বি বম্বার এয়ার কমব্যাট কমান্ড থেকে গ্লোবাল স্ট্রাইক কমান্ডে নিযুক্ত করা হয়।