নতুন লড়াইয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র : করোনা ভাইরাস প্রথম পাওয়া যায়

চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে গুরুতর অভিযোগ - সংগৃহীত


নতুন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি চীন-যুক্তরাষ্ট্র। এবার নতুন এ লড়াই আর দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে করোনা ভাইরাস। বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অনেক দিন ধরে তীব্র ঠান্ডা লড়াই আর দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এবার ভাইরাস কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল তা নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এই ভাইরাস কিভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তার উৎস নিয়ে চীনা গণমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের অনুসন্ধান আর বিশ্লেষণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে নানা প্রশ্ন।


বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক প্রভাবসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে করোনা ভাইরাস। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্ম্পককে মারাত্নকভাবে প্রভাবিত করছে। ওয়াশিংটন আর বেইজিংয়ের মধ্যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে নতুন আরেক লড়াই। ইতোমধ্যে এই ভাইরাস একের পর এক বিধ্বস্ত করে চলছে বিভিন্ন জনপদ। তবে চীন ইতোমধ্যে আগের জায়গায় ফিরে গেছে। পার করে এসেছে ভাইরসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। প্রেসিডেন্ট শি পরিষ্কার করেছেন তার অবস্থান। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিং এর সংস্কার শুরুর পর এই প্রথম বারের মত বেইজিং প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।


চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং ইয়ে এক মাস আগে জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার করেছেন। এসময় চীন ভাইরাসের বিরুদ্ধে তার সর্বোচ্চ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। বেইজিং সাবধানে এবং ধীরে ধীরে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করছে। সেটি হলো করোনা ভাইরাস আক্রমনের শুরু থেকেই চীনা নেতৃবৃন্দ এটা জানত যে, একটি হাইব্রিড ওয়ার অ্যাটাকের অধীনে এটি ঘটছে। প্রেসিডেন্ট শি’র পরিভাষা এ বিষয়ে একটি প্রধান ক্লু। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন যে, এটা ছিল একটি যুদ্ধ। আর এর পাল্টা আক্রমন হিসেবে একটি পিপল’স ওয়ার বা জনযুদ্ধ শুরু করতে হয়েছিল।


শুধূ তাই নয়, তিনি এ ভাইরাসকে দানব ও শয়তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রেসিডেন্ট শি কনফুসিয়ান চিন্তা ধারণ করনে। চীনা অন্যান্য অনেক চিন্তাবিদদের থেকে কনফুসিয়াসের চিন্তা কিছুটা ভিন্ন। অনেকে মনে করেন অতি প্রাকৃতিক শক্তি বা মৃত্যুর পরে বিচার বিষয়ক আলোচনায় রাজি ছিলেন না কনফূসিয়াস। চীনা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ডেভিল বা শয়তান মানে সাদা শয়তান বা বিদেশী শয়তান বোঝানো হয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট শি’র এ মন্তব্য ছিল খুবই শক্তিশালী ।


চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, এটা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। যারা উহানে এ মহামারি নিয়ে এসেছে। কোনো সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এটা ছিল প্রথম বিষ্কোরক মন্তব্য। আর এর মাধ্যমে বেইজিং স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙ্গুল তুলেছে।


২০১৯ সালের অক্টোবরে উহানে অনুষ্ঠিত হয় সামরিক মহড়া। যেখানে ৩০০ মার্কিন আর্মি সদস্য অংশ নেয়। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সরাসরি ভাইরাস ছড়ানোর সাথে এই সামরিক মহড়ার সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তিনি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন মার্কিন সিডিসি পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ডের একটি বক্তব্য। গত সপ্তাহে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ময়না তদন্তের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা প্রমানিত হয়েছে কি না। তিনি জবাব দেন, আসলে কয়েকটি ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝাও এরপর চূড়ান্ত বিষ্ফোরক মন্তব্য করেন: চীনের উহানে ছড়ানোর আগে ভাইরাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর ছিল।  আরো একটি বিষয় সামনে এসেছে আর তা হলো ইরান এবং ইতালীতে যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তার জাত উহানের ভাইরাসের জাত থেকে আলাদা। ইরান এবং ইতালীর ভাইরাসের জেনম ভিন্নতাগুলো ক্রমানুসারে তৈরি হয়েছিল।


গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অনিরাপদ সামরিক জীবানু অস্ত্র ল্যাবরেটির ফোর্ট ডেটরিক বন্ধ করা হয়। অক্টোবরে উহানের সামরিক মহড়ায় ৩০০ মার্কিন সৈন্যের অংশ নেয়া এবং এরপরে উহানে এটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া ঘটনাগুলো যুক্ত করে চীনা গণমাধ্যমে নানা ধরনের প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আর উত্থাপিত এসব প্রশ্ন বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।


২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত অস্বচ্ছ ‘ইভেন্ট ২০১’ নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মরণঘাতি একটি ভাইরাস দ্বারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া রোগের বিষয়ে মহড়া হয়েছিল সেখানে। আর মহড়ার এ ভাইরাসটি ছিল করোনা ভাইরাস। আর এই কাকতালীয় ঘটনাটি ঘটে উহানে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঠিক এক মাস আগে।
ইভেন্ট ২০১ মহড়ার আয়োজনে সহায়তা করেছে বিল এন্ড মেলিন্ডা গেঁটস ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম, সিআইএ, ব্লুমবার্গ, জন হপকন্সি ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘ। আর ঠিক এ মহড়ার দিনই উহানে শুরু হয় ওয়ার্ল্ড মিলিটারি গেমস যেখানে অংশ নেয় ৩০০ মার্কিন সৈন্য। এশিয়া টাইমসের এক বিশ্লেষনে পেপে এসকোবার লিখেছে, ট্রাম্প একে যতই চীনা ভাইরাস বলে টুইট করুক না কেন এর উৎস এখনো পরিষ্কার নয়। আর এ করোনা ভাইরাস জীবানু রাজনীতি আর জীবানু সন্ত্রাসের বড় ধরনের হুমকির ক্ষেত্র তৈরি করছে।


গত সপ্তায় প্রেসিডেন্ট শি মাস্ক পরে সফর করেছেন উহান। আর এর মাধ্যমে সারা বিশ্বকে তিনি বার্তা দিয়েছেন কিভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে পিপলস ওয়ার বা জনযুদ্ধ জয়লাভ করছে। অপর দিকে সৌদি আরবের সাথে রাশিয়ার তেলযুদ্ধের ফলে তেলের দাম অনেক কমে গেছে। আর এ সস্তা তেল চীনা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে। এভাবেই কৌশলগত অংশীদার রাশিয়া দাড়িয়েছে চীনের পাশে। বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী হলো চীন।


দাবার গুটি খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। করোনা ভাইরাসকে জীবানু অস্ত্র আক্রমন হিসেবে চিহ্নিত করার পর রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়ে চীন ঘোষণা করেছে পিপলস ওয়ার। করোনার কারনে বিশ্ব নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বেইজিং পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করবে ।


চীন ইতালিতে প্লেন পাঠিয়েছে ভাইরাস প্রতিরোধী উপকরণ বোঝাই করে। চীন বলছে আমরা একই সমুদ্রের তরঙ্গ, একই গাছের পাতা আর একই গাছের ফুল। চীন ইরানেও মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। আর চীন এ ত্রান পাঠিয়েছে এককভাবে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ইরানের মাহান এয়ার লাইনে করে।
সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভূসিক খুব স্পষ্ট করে বলেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র যে দেশটি আমাদের সহায়তা করতে পারে সেটা হলো চীন। এখন আপনারা সবাই বুঝতে পারছেন যে, ইউরোপীয় সংহতি কাজ করছে না। এটা কাগজে লেখা রুপকথার গল্প ছাড়া আর কিছূ নয়।


কঠোর অবরোধ আর চিরকালের জন্য শয়তান আখ্যায়িত কিউবা এখনো সক্ষম করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার বিষয়ে। এন্টি ভইরাল হাবেরন অথবা আলফা ২বি করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ব্যাপক সাফলতার সাথে ব্যবহার করা হয়েছে। চীনে যৌথ উদ্যোগে এ এন্টি ভাইরাল তৈরি হচ্ছে এবং ১৫টি দেশ ইতোমধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে এটি কেনার বিষয়ে।


ট্র্ম্পা প্রশাসন শুধূমাত্র তার নিজের দেশের লোকদের জন্য করোনা বিরোধী ভ্যাক্সিন তৈরির জন্য জার্মান বিজ্ঞানীদের ১ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাব তুলে ধরে পেপ এসকোবার লিখেছেন, এর ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ব কেবল মাত্র অনুধাবন করতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি একটি গুপ্ত, অদৃশ্য সার্কিট ব্রেকার দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে। এর ভবিষ্যত প্রভাব হবে মহুমাত্রিক। অনেকের মতে চলমান করোনা ভাইরাস পুরোপুরি বদলে দিতে পারে আগামী বিশ্বব্যবস্থা।