এফ-৩৫ কে চ্যালেঞ্জ করছে ড্রোন বিমান

এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান -সংগৃহীত

আকাশ যুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব আর শক্তিশালী যুদ্ধ বিমান তৈরির ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় শতাব্দি কাল ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক সর্বাধুনিক যুদ্ধ বিমান তৈরি করে যাচ্ছে। একেকটি যুদ্ধ বিমান প্রকল্পের পেছনে তাদের যে বাজেট তা অনেক বড় বড় দেশের গোটা সামরিক বাজেটের সমান। শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে তারা সর্বাধুনিক যুদ্ধ বিমানের পেছনে। কিন্তু এসব যুদ্ধ বিমান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ব্যয়বহুল যুদ্ধ বিমান বানানোর প্রকল্প হলো এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এ বিমানের পেছনে বাজেট ধরা হয়েছে ৪২৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার । অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করছে আরেক ভয়ানক শক্তিশালী বিমান বি-২১। পেন্টাগন ৯৭ বিলিয়ন ডলার বা ৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ বি-২১ বিমান কিনবে। খুব শীঘ্রই এ বিমান মার্কিন বিমান বাহিনীতে যুক্ত হবে। স্টেলথ ফাইটারসহ বিভিন্ন বিমান প্রকল্পের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করছে তখন বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে পাইলটবিহীন যুদ্ধ বিমান নিয়ে। আধুনিক ড্রোন যুদ্ধ বিমান আর ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ দ্রুত উন্নতি লাভ করছে। বিশেষ করে গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের তেল ক্ষেত্রে ড্রোন হামলার পর থেকে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে।

সর্বশেষ সিরিয়ার ইদলিব যুদ্ধে তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তির সাফল্য আবারো আকাশ যুদ্ধে বিশেষ করে ভবিষ্যত এয়ার ওয়ারফেয়ারের ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ড্রোন প্রযুক্তি। অনকের মতে খুব শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে পাইলটযুক্ত যুদ্ধ বিমানের দিন। ফলে অনেক দেশের ব্যয়বহুল অনেক যুদ্ধ বিমান প্রকল্প অকার্যকর হয়ে যায় কি না তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে অনেকের মতে প্রযুক্তি যতই উন্নতি করুক আরো অনেক দশক কার্যকর থাকবে পাইলটযুক্ত যুদ্ধ বিমান।

ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্টের পাইলটযুক্ত যুদ্ধ বিমানের পেছনে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় নিয়ে অনেক আগেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাইলটযুক্ত এবং পাইলটবিহীন যুদ্ধ বিমানের পক্ষে বিপক্ষে চলছে বির্তক। বিশেষ করে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এফ-৩৫ বিমান প্রকল্প নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স এসোসিয়েশন অরলান্ডোতে ২৬ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করে তিনদিনব্যাপী এয়ার ওয়ারফেয়ার সিম্পেজিয়াম। অনুষ্ঠানে অংশ নেন মার্কিন বিমান বাহিনীর উচ্চ পদস্থ সব কর্মকর্তাসহ ৫ হাজারের বেশি বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। এর মধ্যে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস এক্স প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের এলন মাস্ক।

পাইলটযুক্ত এ যুদ্ধ বিমানের ভবিষ্যত কার্যকরারিতা নিয়ে সেখানে বিষ্ফোরক মন্তব্য করেছেন এলন মাস্ক। যিনি একই সাথে খ্যাতনামা প্রক্যেশলী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তার বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। এলন মাস্ক বলেন, প্রচলিত যুদ্ধ বিমানের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন হবে ড্রোন যুগের দিন। তিনি বলেন, স্থানীয় স্বয়ংক্রিয় ড্রোন যুদ্ধ বিমান বর্তমানে যে অবস্থায় আছে সেখানেই আছে আমাদের ভবিষ্যত। অনুষ্ঠানে তিনি স্পেস এন্ড মিসাইল সিস্টেমস সেন্টারের প্রধান লে. জেনারেল জন থমসনকে প্রশ্ন করেন কিভাবে আকাশযুদ্ধে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যায় সে বিষয়ে তাদের কোনো উদ্ভাবনী চিন্তা আছে কি না।


এলন মাস্ক তার বক্তব্যে বিশ্বজড়ে আলোচিত মার্কিন জঙ্গি বিমান এফ-৩৫ কর্মসূচী বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। যুদ্ধ বিমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে খবরের শিরোনাম হওয়ার পরে এলন মাস্ক আরো এক ধাপ এগিয়ে এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, রিমোর্ট কন্ট্রোল দ্বারা পরিচালিত, স্বয়ংক্রিয় একটি ড্রোন ফাইটার প্লেনের বিরুদ্ধে এফ-৩৫ এর কোনো সুযোগ থাকবে না।যুদ্ধ বিমান বিশেষ করে এফ-৩৫ বিমান নিয়ে এলন মাস্ক যে বক্তব্য দেন তাতে মর্মাহত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ, পেন্টাগনসহ যুদ্ধ বিমান নির্মানের সাথে সংশ্লিষ্টরা। পেন্টাগণ প্রধান জেনারেল এরিক ফিক, এলন মাস্কের বক্তব্যের জবাবে বলেছেন এফ-৩৫ বিমানের প্রয়োজনীয়তা বহাল থাকবে দশকের পর দশক ধরে। ভবিষ্যতে পাইলটবিহীন আর পাইলটযুক্ত যে প্রযুক্তিই আসুক না কেন এফ-৩৫ আমাদের প্রয়োজন পুরণ করে যাবে দীর্ঘদিন ধরে। কারন এর রয়েছে সে ধরনের ক্ষমতা।

বিশ্বের শীর্ষ সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন বোয়িংকে পরাজিত করে ২০০১ সালে কাজ পায় এফ-৩৫ বিমান কর্মসূচির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরনো সব এফ-১৫, এফ-১৬ জঙ্গি বিমান এর স্থলে বসাবে এফ-৩৫ বিমান। এফ-৩৫ বিমান অতি ব্যয়বহুল এক প্রকল্প। এ বিমানের আর কোনো প্রতিযোগী বা বিকল্প না রাখা এবং বিশাল ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন এলন মাস্ক। তিনি বলেন, এফ-৩৫ এর প্রতিযোগী বা বিকল্প থাকা উচিত। এফ-২২ কর্মসূচী বাতিল করায় এফ-৩৫ এর আর কোনো বিকল্প নেই। এয়ার কমব্যাট কমান্ডের প্রধান জেনারেল মাইক এলন মাস্কের মন্তব্য বিষয়ে বলেন, প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্টরা এলন মাস্কের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে থাকতে পারে। আমার মনে হয় না এলন মাস্ক বলেছেন এখনই আমাদের সব য্দ্ধু বিমান পরিত্যাগ করতে হবে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের ভবিষ্যতের বিষয়ে এখনই চিন্তা করা উচিত। কারণ সামনে নতুন কিছু আসছে।জেনারেল মাইক বলেন, আমাদের এখনো অনেক দিন পর্যন্ত পাইলটযুক্ত যুদ্ধ বিমান এবং বোমারু বিমানের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে পাইলটবিহীন স্বয়ংক্রিয় বিমান প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উপায় বের করা উচিত। আর আমরা অন্যান্য সব উপায় নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যাব।

জেনারেল মাইক বলেন, এলন মাস্কের প্রশ্ন নিয়ে আমরা পরীক্ষা করব। আমরা কি পুরনো সব বিমানের স্থলে এফ-৩৫ বসাবো না কি এলন মাস্ক যা বলেছেন সে দিকে যাব তা নিয়ে পরীক্ষা করব। এলন মাস্কের বক্তব্যর পক্ষে-বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক চলছে। এলন মাস্কের বক্তব্যের জবাবে মাইকের মন্তব্য অনেকে মনে করেন এফ-৩৫ এর বিকল্প বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। অপর দিকে পেন্টাগন প্রধান এরিক ফিক বলেছেন এফ-৩৫ কর্মসূচী এক পাশে সরে গেছে। এর বিপুল উডডয়ন খরচ বিষয়েও সমালোচনা করেন তিনি। একটি এফ-৩৫ বিমান প্রতিঘন্টা আকাশে ওড়ার খরচ ২৫ হাজার মার্কিন ডলার বা ২১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। তবে ভিন্নমতও আছে। মিসেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক ডগলাস বারকে বলেন, স্বয়ংক্রিয় বিমান প্রযুক্তির উন্নতি সত্ত্বেও আকাশে আধিপত্য রক্ষায় এবং আকশযুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের ক্ষেত্রে পাইলটযুক্ত বিমানের প্রয়োজনীয়তা দশকের পর দশক ধরে অব্যাহত থাকবে। ডগলাস বলেন, তবে এটি ঠিক যে, মার্কিন বিমান বাহিনীর বিমান অনেক পুরনো হয়ে গেছে। বিমানগুলোর গড় বয়স ২৫ বছর হয়ে গেছে। ২০ ভাগেরও কম বিমান আধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তি মোকাবেলায় সক্ষম। সে কারনে এফ-৩৫ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।

আকাশে আধিপত্য রক্ষায় তিনি এফ-৩৫ কর্মসূচিকে মেরুদন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ডগলাস সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় বিমানের যুগ এ বাস্তবতা মেনে নিতে।এফ-৩৫ না ড্রোন যুদ্ধ বিমান কোনটা বেশি আগামি দিনে বেশি কার্যকরী তা নিয়ে এই বিতর্ক আগামি দিনে আরো জোরদার হবে। তবে বিভিন্ন দেশ যেভাবে ড্রোন বিমানের দিকে ঝুকছে তাতে পাইলটযুক্ত যুদ্ধ বিমানের ব্যবহার যে ভবিষ্যতে কমে আসবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।