দানবীয় শক্তির সাবমেরিন বানাচ্ছে রাশিয়া

রাশিয়ার দানবীয় শক্তির সাবমেরিন-সংগৃহীত -

  • মেহেদী হাসান
  • ১৪ মার্চ ২০২০, ১৭:০৩
  • রাশিয়া

দানবাকৃতির এক সাবমেরিন ট্যাঙ্কার বানাতে যাচ্ছে রাশিয়া। এর নাম পিলগ্রিম। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় সামরিনের অধিকারী রাশিয়া। এর নাম টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন। কিন্তু পিলগ্রিম নামক নতুন সাবমেরিন ট্যাঙ্কারের কাছে টাইফুনকে মনে হবে ছোট এক বামন। সাগরতলের দৈত্যাকৃতির এ সাবমেরিনে পরিবহন করা হবে তরল গ্যাস। একবারে ১ লাখ ৮০ হাজার টন পন্য বহন করতে পারবে এ ডুবো ট্যাঙ্কার। নির্মিত হলে এটিই হবে বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র সাবমেরিন ট্যাঙ্কার। এ ট্যাঙ্কার হবে পরমানু শক্তিচালিত।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবমেরিন হলো রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল ক্যারিয়ার টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন। টাইফুন ক্লাস সাবমেরিনের সবচেয়ে বড়টির দৈর্ঘ্য ৫৭৬ ফিট। প্রস্থ ৭৫ ফিট। আর নতুন পিলগ্রিম সাবমেরিনের দৈর্ঘ্য হবে ১ হাজার ১৮০ ফিট। প্রস্থ ২৩০ ফিট। এ ট্যাঙ্কার আকারে যেমন হবে বড় তেমনি থাকবে এর ভয়াবহ ক্ষমতা। বরফাচ্ছিদ আর্কটিক অঞ্চলে চলাচল করবে এ সাবমেরিন। বরফ বা পানির উপরে যতই ঝড় ঝাপটা আর খারাপ আবহাওয়া থাকুক না কেন বরফ ভেদ করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলবে এ সাবমেরিন। সাবমেরিনে বহনকৃত তরল গ্যাস সাধারণ ট্যাঙ্কারে করে পৌছে যাবে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
বিশাল আকৃতির এ সাবমেরিণ চলতে প্রয়োজন হবে কমপক্ষে তিনটি পরমানু রিঅ্যাক্টর। প্রতিটি রিঅ্যাক্টর থেকে তৈরি হবে ৩০ মেগাওয়াট বিদু্যুত। সাধারণত বিভিন্ন দেশের পরমানু শক্তি চালিত সামরিক সাবমেরিনে এক থেকে দুইটি পরমানু রিঅ্যক্টর থাকে।

আর্কটিক অঞ্চলের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বহন করা হবে এ সাবমেরিনের সাহায্যে। বর্তমানে এ অঞ্চল দিয়ে তেলবাহী জাহাজকে চলাচল করার ক্ষেত্রে বরফ ভেঙ্গে ভেঙ্গে পথ তৈরি করতে হয় যা অনেক কঠিন কাজ। কিন্তু পিলগ্রিম সাবমেরিন বরফের নিচ দিয়ে পথ অতিক্রম করবে।
সেন্ট পিটার্সবার্গভিত্তিক মালাসিট ডিজাইন ব্যুরো পিলগ্রিম সাবমেরিনের নকশা তৈরি করেছে। ক্ষমতার দিক দিয়ে এটি হবে টাইফূন সাবমেরিনের ৬ গুন বেশি শক্তিশালী। ইতোমধ্যে রাশিয়ার বড় তেল কোম্পানি নোভাটেক এবং গ্যাজপ্রম নতুন এ সাবমেরিন ট্যাঙ্কার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে আর্কটিক অঞ্চলের বরফের নিচ দিয়ে ৫ থেকে ৮টি সাবমেরিন ট্যাঙ্কার চলাচল করবে বলে জানানো হয়েছে পিলগ্রিম সাবমেরিনের নকশাপ্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠান মালাসিটের পক্ষ থেকে। যেহেতু এটি সামরিক সাবমেরিন নয় তার এর ক্রু হবে সংখ্যায় কম। ২৫ থেকে ২৮ জন। মালাসিট রাশিয়ান অনেক সাবমেরিনের নকশা তৈরি করেছে। রাশিয়ান নেক্সট জেনারেশন অ্যাটাক সাবমেরিন লাইকার ডিজাইনও তারা করছে। সাবমেরিনে বানিজ্য পন্য পরিবহনের ফলে পাইরেসি বা জলদস্যুতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার বিভিন্ন পন্যের ওপর অবরোধ আরোপের কৌশল অকার্যকর করে দিতে পারে এই সাবমেরিন।

এদিকে বিশ্বে প্রথমবারের মত রাশিয়া তাদের একটি ফ্রিগেট রণতরি থেকে হাইপারসনিক মিসাইল পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ান নৌবাহিনী বিশ্বের এক মাত্র নৌবাহিনী যাদের রণতরীতে হাইপারসনিক মিসাইল সিস্টেম রয়েছে। রাশিযান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে অ্যাডমিরাল গরসকভ ফ্রিগেট থেকে জারকন নামক হাইপারসনিক মিসাইল ছোড়া হয়েছে।এই মিসাইলের গতি শব্দের চেয়ে ৯ গুন বেশি। এটি ভূমিতে সঠিক লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানে। রাশিয়ান নৌ বাহিনী ব্যারেন্টস সাগরে এ হাইপারসনিক মিসাইল পরীক্ষা চালিয়েছে। এ বছরেই রাশিয়ান সাবমেরিন থেকে হাইপারসনিক মিসাইল পরীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে।
রাশিয়ার নৌ শক্তির প্রতীক আর গৌরব রাশিয়ান সাবমেরিন। সোভিয়েত আমল থেকে বর্তমান রাশিয়া এখন পর্যন্ত যে পরিমান সাবমেরিন নির্মান করেছে তা বিশ্বের সব দেশ মিলেও এখন পর্যন্ত তত সাবমেরিনের অধিকারী হতে পারেনি। সাবেক সোভিয়েত ও বর্তমান রাশিয়া ২৪৮টি সাবমেরিন নির্মান করে। এর মধ্যে ৯১টি ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন। গ্লোবাল পাওয়ার এর তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার ৬৬টি সাবমেরিন বর্তমানে সার্ভিসে রয়েছে । এর মধ্যে ৩৭টি পরমানু শক্তিচালিত । ১১ টি ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে রাশিয়া বেলগোর্ড নামে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সাবমেরিন চালু করে। এর দৈর্ঘ ৬ ফুট । এটি ১ হাজার ৭শ ফুট পানির গভীরে যেতে পারে।
বিশ্বে এখন পর্যন্ত যত সাবমেরিন নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সাবমেরিন হলো রাশিয়ার টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন। সোভিয়েত আমলে সোভিয়েত নৌবাহিনীর জন্য এ সাবমেরিন নির্মিত হয়। মোট ৬টি টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন নির্মান করা হয়। পরমানু শক্তিচালিত এ সাবমেরিন আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র সজ্জিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ক্লাস সাবমেরিনের বিপরীতে নিমান করা হয় এ সাবমেরিন।

টাইফুন ক্লাসের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ সাবমেরিন হলো বোরি ক্লাস সাবমেরিন এবং এটাও রাশিয়ার। সোভিয়েত আমলে নির্মিত ডেল্টা ৩, ডেল্টা ২ এবং টাইফুন সাবমেরিন পুনস্থাপিত করা হবে বোরি ক্লাস সাবমেরিনের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে এর তিনটি চালু হয়েছে। চারটি নির্মান চলছে ।
২০১২ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ান নেভি টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন আধুনিকায়ন কাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এর কারন হিসেবে জানানো হয়েছে একটি টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন আধুনিকায়নে যে খরচ হবে তা দিয়ে দুটি নতুন বোরি ক্লাস সাবমেরিন নির্মান করা সম্ভব। ফলে ৬টি সাবমেরিনের মধ্যে বর্তমানে ১টি টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন সক্রিয় রয়েছে রাশিয়ার নর্দার্ন নৌ বহরে। এর নাম দিমিত্রি দনস্কয়। ১৯৮১ সালে এটি সোভিয়েত নৌ বাহিনীতে যুক্ত হয়। সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য রাশিয়ান এ টরপেডো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজের জন্য এখনো বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারন এ টরপেডো প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে লক্ষ্যে গিয়ে আঘাত করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ান টরপোডের মোকাবিলায় যুদ্ধ জাহাজে মোতায়েন করেছে এন্টি টরপেডো।

এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় আর শক্তিশালী রণতরী কিরভ ক্লাস ব্যাটলক্রুজার । এটি পরমানু শক্তিচালিত গাইডেড মিসাইল ক্রুজার। একে বিশ্বের সবচেয়ে লার্জেস্ট আর হেভিয়েস্ট সারফেস কমব্যাটান্ট রণতরী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নির্মান করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী মোকাবেলায়। আয়তনে বিমানবাহী রণতরীর পরই এর অবস্থান। এতে রয়েছে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম। শক্তিশালী এ রণতরী এস-৩০০, সুপারসনিক মিসাইলসহ বিভিন্ন মাত্রার মিসাইল সিস্টেম রয়েছে । ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এটি নির্মান করা হলেও আজো এটি সমুদ্রে রাশিয়ার প্রয়োজন পুরনে সক্ষম। শক্তিশালী এ রণতরী পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাটল ক্রুজার নামে পরিচিত। রাশিয়া মোট চারটি এ জাহাজ নির্মান করে। বর্তমানে দুটি সক্রিয় রয়েছে। রাশিয়ার কাছে আছে পি-৮০০ একটি সুপারসনিক এন্টি শিপ মিসাইল। এ মিসাইল যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিন, জঙ্গি বিমান এবং ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য। এ মিসাইলের গতি শব্দের চেয়ে তিন গুন বেশি। এটি ৩০০ কিলোমিটার দূর লক্ষ্যে আঘাত করতে পারে।

রাশিয়ার কাছে বর্তমানে তিনটি স্লাভা ক্লাস ক্রুজার রয়েছে। শক্তিশালী এ রণতরীতের রয়েছে গাইডেড মিসাইল সিস্টেম। রাশিয়ার ডেস্ট্রয়ারে রয়েছে এন্টি-সাবমেরিন, এন্টি-শিপ এবং এন্টি- এয়ারক্রাফট মিসাইল সিস্টেম। অপর দিকে তাদের গ্রিসা ক্লাস করভেটেও রয়েছে এন্টি-সাবমেরিন ও সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এর তথ্য অনুসারে রাশিয়ার নৌবাহিনীতে বর্তমানে ৬০৩টি রণতরী রয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় সাবমেরিন ৬২ টি। কিরভ ক্লাসের ব্যাটল ক্রুজার ২টি। স্লাভা ক্লাস ক্রুজার তিনটি। ডেস্ট্রয়ার ১৬ আর ফ্রিগেট ১০টি। বিমানবাহী রণতরী ১টি। করভেট ৮৬টি। ল্যান্ডিং শিপ ২০টি। ল্যান্ডিং ক্রাফট ৩৫টি। বিশেষ জাহাজ ১৮টি।


  • মেহেদী হাসান
  • ১৪ মার্চ ২০২০, ১৭:০৩
  • রাশিয়া