ভবিষ্যত যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি আর প্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন সমরাস্ত্রের মাধ্যমে। এ ধরনের সমরাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার। এছাড়া হাইপারসনিক, মেশিন লার্নিং, ন্যানোটেকনোলজি এবং রোবোটিক্স সমরাস্ত্র। বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সমরাস্ত্র শিল্প প্রতিষ্টানগুলো যখন এসব প্রযুক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন সমরাস্ত্রকে কিভাবে এসব প্রযুক্তি নির্ভর করা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের হেলিকপ্টার। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন উদ্ভাবিত এসব হেলিকপ্টার এখন এমনসব ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হচ্ছে যা আগে থেকে কল্পনাও কর যায় না। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুনভাবে উদ্ভাবিত এসব সমরাস্ত্র প্রযুক্তির নাম এক্স২ টেকনোলজি।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন করপোরেশনের মালিকানাধীন আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো সিকরস্কি। সিকরস্কি গত ১০ বছর ধরে চেষ্টা করছে এক্স২ টেকনোলজির মাধ্যমে সামরিক হেলিকপ্টার উদ্ভাবনের। এ পর্যন্ত তারা চারটি হেলিকপ্টারের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে।
চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি এক্স২ টেকনোলজির দুটি হেলিকপ্টারের সফল উডয়ন পরীক্ষা চালায় লকহিড মার্টিন করপোরেশন। এ দুটি হেলিকপ্টার হলো এসবি-১ ডিফায়ান্ট এবং এস-৯৭ রেইডার। এসবি-১ ডিফায়ান্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার অ্যাটাক রিকনিস্যান্স এয়ারক্রাফট বা ফারা কর্মসূচীর আওতায় বানানো হয়। অপর দিকে এস-৯৭ রেইডার দ্রুত গতির অ্যাটাক কমপাউন্ড হেলিকপ্টার।
সিনেটর টামি ডাকওয়ার্থ এবং সেক্রেটারি অব দি আর্মি রায়ান ম্যাককার্থি এসব হেলিকপ্টারের উডডয়নের সময় উপস্থিত ছিলেন। এসবি-১ ডিফায়ান্ট উদ্ভাবন করা হয়েছে লকহিড মার্টিন করপোরেশনের সিকরস্কি আর বোয়িং এ দুই প্রতিষ্ঠানের মেধার সমন্বয়ে যাতে এ আকাশ যান ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়। এ দুটি হেলিকপ্টার চলতি বছর জুড়ে আরো অনেকবার উডডয়ন পরীক্ষা অব্যাহত রাখা হবে একে নিখুত পর্যায়ে পৌছাতে। সিকরস্কি উদ্ভাবিত এক্স২ টেকনোলজির অপর দুটি হেলিকপ্টার হলো এস ডেমোনেস্ট্রটর এবং রেইডার এক্স। গত বছর মার্চে পরীক্ষা চালানো হয় রেইডার এক্স হেলিকপ্টার। অন্ধকার ঝড়ের রাতেও অত্যন্ত নীচ দিয়ে দ্রুত গিতে উঠতে সক্ষম এসব হেলিকপ্টার।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রধান জেনারেল জেমস ম্যাক কনভিল গত বছর বলেছেন, আমরা আমাদের যুদ্ধের ধরণ পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। যেসব সমরাস্ত্র আমরা ব্যবহার করি তার কয়েকটি পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমরা আমাদের লোকদের পুনরায় প্রশিক্ষন দিচ্ছি যাতে করে তারা ধারনা লাভ করতে পারে ভবিষ্যতে তাদের কী ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে সে বিষয়ে।
লকহিড মার্টিন করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছেএই পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে নেক্সট জেনারেশন হেলিকপ্টার। যুদ্ধক্ষেত্রে এসব হেলিকপ্টার এখন যে ভূমিকা পালন করছে তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিক পালন করবে নতুন ধরনের এসব হেলিকপ্টার । এর মধ্যে একটি হবে হেলিকপ্টারের সাপোর্ট সিস্টেম।
মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে এসব হেলিকপ্টার অপারেশন পরিচালনা করতে পারে। জয়েন্ট ফোসের্স থেকে এগুলোকে আলাদা করার উপায় নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন হেলিকপ্টার ব্যাপকভিত্তিক ভূমিকা পালন করেছে । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের অভিযানের বদলে যাচ্ছে। যেমন কোয়ালিশন ফোর্সের নাগালের বাইরে ইরাকি মরুভূমি ভেদ করা এবং আফগানিস্তানের পাহাড়বেষ্টিতে স্থল বাহিনীকে সরবরাহ পরিচালনা করা এখনকার হেলিকপ্টারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। সেজন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে আরো অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার উদ্ভাবনের।
কমান্ডারদের মতে নেক্সট জেনারেশন হেলিকপ্টারকে হতে হবে আরো গ্রতি সম্পন্ন, আরো অস্ত্র সজ্জিত, আরো ভয়ঙ্কর এবং স্বয়ক্রিয় আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর। লকহিড মার্টিনের মালিকানাধীন সিকরস্কি গত ১০ বছর ধরে কাজ করছে হেলিকপ্টার আধুনিকায়নের জন্য ভবিষ্যতের প্রয়োজনের চিন্তা মাথায় রেখে।
সাবেক মার্কিন যোদ্ধা পাইলট এবং সিকরস্কির চিফ প্রজেক্ট পাইলট বিল ফেল বলেন, এক্স২ টেকনোলজি বর্তমানে হেলিকপ্টারের গতির চেয়ে দ্বিগুন গতির। এটা ভবিষ্যত আর্মির জন্য খুবই দরকার। বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টারে এ প্রযুক্তি সমন্বয় করা যায়। ফলে মিশন পরিচালনায় এসব হেলিকপ্টার বহুমুখী সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। লকহিড মার্টিন ছোট আকারের হেলিকপ্টারে এ প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাচ্ছে। বিল বলেন, গত ১০ বছরে আমরা এক্স২ প্রযুক্তির চারটি হেলিকপ্টার উদ্ভাবন করেছি এবং আকাশে উড়িয়েছি। এসব হেলিকপ্টার পর্বত সঙ্কুল এলাকায় দ্রুত এবং অতি নিচ দিয়ে উড়ত পারে যা বড় ধরনের অগ্রগতি যোদ্ধাদের জন্য।
এক্স২ টেকনোলজি হেলিকপ্টারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত তৎপর ক্ষমতা। কম গিততেও এটি বিভিন্ন মুখী দ্রুত বাক পরির্তন করতে পারে যা একজন যোদ্ধা পাইলটের আত্মরক্ষাসহ বহুমুখী কাজে লাগে। এক্স২ টেকনোলজির আরেকটি দিন হলো ভার্টিক্যাল লিফট। এ ধরনের হেলিকপ্টার হলো রেইডার এক্স । লকহিড মার্টিন জানায় এ বছরের মাঝামাঝি মার্কিন আমি রেইডার এক্স এর দুটি মূল মডেল বাছাই করবে । রেইডার এক্সকে গেম চেঞ্জার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
লকহিড মার্টিন এসবি-১ ডিফায়ান্ট এবং এস-৯৭ ছাড়াও আরো একটি হেলিকপ্টারের পরীক্ষা চালায় । তৃতীয় এ হেলিকপ্টারের নাম সারা। তৃতীয় হেলিকপ্টার সারাও সিকরস্কি পরিবারের উদ্ভাবন। ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথমে ডিফায়ান্ট, পরে রেইডার এবং তারপরে সারা আকাশে ওড়ে।
ভয়েস ওভার-৪
সিকোরস্কি-বোয়িং বা এসবি-১ ডিফায়ান্ট প্রচলিত হেলিকপ্টারের চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে উড়তে সক্ষম। এটি মাত্র ৫০ থেকে ১০০ ফিট উপর দিয়েও ২০০ নটস গতিতে উড়তে পারে। শীঘ্রই এর এর গতি ২৫০ নটে পৌছবে বলে দাবি করা হয়েছে। জয়েন্ট মাল্টি রোল টেকনোলজি ডেমনসট্রেটর কর্মসূচীর জন্য এ হেলিকপ্টার নির্মান করা হয়েছে।
সিকোরস্কি প্রেসিডেন্ট ড্যান শুলজ বলেন, গত এক দশক ধরে আমাদের যে উদ্ভাবন , তার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে রেইডার এক্স হেলিকপ্টার নির্মানে। গত ১০ বছর ধরে ডিফায়ান্টের পেছনে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, লকহিড মার্টিন করপোরেশনের সমস্ত শক্তি কাজে লাগিয়ে আমরা মার্কিন সেনাদের একমাত্র সমাধান বের করব যা যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রয়োজন পূরণ করে শ্রেষ্ঠ প্রমান করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার অ্যাটাক রিকনিস্যান্স এয়ারক্রাফট বা ফারা কর্মসূচীর জন্য তৈরি রেইডার এক্স ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সর্বাধিুনক সমরাস্ত্রে সজ্জিত থাকবে। এর থাকবে দ্রুত তৎপর ক্ষমতা, প্রাণঘাতি, টিকে থাকার সক্ষমতা। এছাড়া লো স্পিড হোভার, অফ এক্সিস হোভার যুদ্ধ ক্ষেত্রে ভার্টিক্যাল লিফট ডমিন্যান্স আর প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে অপারেশন পরিচালনা সক্ষমতার কারনে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। হেলিক্টারগুলোর এমন কিছূ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা যুদ্ধবিমানের ভূমিকা পালন করতে পারে।
লকহিড মার্টিন বলছে বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এই হেলিকপ্টারের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলো এই হেলিকপ্টার তাদের বাহিনীতে যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।