১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমান একটানা আকাশে উড়ে গোটা বিশ্ব পরিভ্রমন করে। ২৪ হাজার ৩২৫ মাইল পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে ৪৫ ঘন্টা ১৯ মিনিট। ১৬ জানুয়ারি দুপুর একটায় ক্যালিফোর্নিয়া ক্যাসল বিমান ঘাটি থেকে আকাশে ওড়ে এ বিমান। বিশ্ব পরিভ্রমন শেষে ১৮ জানুয়ারি সকাল ১০টা ১৯ মিনিটে প্রথম বিমানটি অবতরণ করে ক্যালিফোর্নিয়ার মার্চ এয়ার ফোর্স ঘাটিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ মিশনের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াসহ গোটা পৃথিবীকে এ বার্তা প্রদান করা যে, পৃথিবীর যেকোনো স্থানে হাইড্রোজেন বোমা হামলার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। তাই এ মিশনের নাম ‘অপারেশন পাওয়ার ফ্লাইট।’
যে বিমানের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বিশ্বভ্রমন মিশন পরিচালনা করে তার নাম বি-৫২ বম্বার। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঠান্ডা লড়াই চলাকালে পারমানবিক বোমা বহন করা এবং পারমানবিক বোমা হামলা প্রতিরোধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্মান করে বিস্ময়কর এ বিমান। বিমানটির নকশা তৈরি ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং । ৬৭ বছর আগে ১৯৫২ সালের ১৫ এপ্রিল এ দৈত্য বিমান প্রথম আকাশে ওড়ে। ১৯৫৫ সাল থেকে মার্কিন বিমান বাহিনী ব্যবহার করে আসছে এ বিমান। ১৯৫৬ সালের ২১ মে বি-৫২ বম্বার থেকে সর্ব প্রথম পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয় মার্শাল আইল্যান্ডের একটি কোরাল প্রাচীরে যার নাম বিকিনি এটোল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড ওয়ার, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধে মূল ভূমিকা পালন করে এ বম্বার। চীন, রাশিয়াসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শত্রু রাষ্ট্রের কাছে এখনো ভীতিকর এ বোমারু বিমান।
ঠান্ডা লড়াই চলাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬১ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পরিচালনা করে অপারেশন ক্রোম ডোম। সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমানবিক বোমা হামলা ঠেকাতে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক এয়ার কমান্ড দিনে রাতে ২৪ ঘন্টা বি-৫২ বিমান আকাশে ভাসিয়ে রাখে পারমানবিক বোমা সজ্জিত করে। এ অপারেশনে তখন এক ডজন বি-৫২ বিমান ব্যবহার করা হয়।
বোয়িং এখন পর্যন্ত ৭৪৪টি বি- ৫২ বম্বার তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমানে ৭৬টি বি-৫২ বম্বার সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশের বিমান বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো দেশে বিক্রি করে না এ বিমান। এয়ারফোর্স গ্লোবাল স্ট্রাইক ফোর্সেও জন্য নির্ধারিত এটি। আকাশ দানব এ বিমানে ইঞ্জিনের সংখ্যা আটটি। এটিই এখন একমাত্র ৮ ইঞ্জিন বিশিষ্ট বোমারু বিমান যা সক্রিয় রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে।
একটি বি-৫২ বিমান ৩২ হাজার কেজি ওজনের সমরাস্ত্র বহন করতে পারে এবং পুনজ্বালানি সংগ্রহ ছাড়া টানা ৮ হাজার ৮শ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে। শুধু বিমানটির ওজন ৮৩ হাজার ২৫০ কেজি। এটি ১৫৯ ফিট লম্বা এবং ৪০ ফিট উচু । সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৬৫০ মাইল।
পারমানবিক ও প্রচলিত বোমা, স্মার্ট উইপনস, মাইনস ও মিসাইল বহন করতে পারে এ বিমান। একটি বি-৫২ বম্বার পারমানবিক বোমা বহনকারী ২০টি মিসাইল বহন করতে পারে। বি -৫২ বিমানের ‘এ’ থেকে ‘এইচ পর্যন্ত’ আটটি মডেল রয়েছে।
১৯৫২ সালে নির্মিত বিমান এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য এক বম্বার। এর কারন হলো প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন ও সংস্কার করা হচ্ছে এ বিমান। ১৯৬২ সালে সর্বশেষ বি-৫২ এইচ মডেলের বিমান নির্মান করে বোয়িং। এর পর আর কোনো বি-৫২ বিমান নির্মান করা হয়নি। সে হিসেবে সবচেয়ে কম বয়সী বিমাটির বয়স এখন ৫৭ বছর ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর পরিকল্পনা ২০৫০ সাল পর্যন্ত এ বিমান ব্যবহার করা। অর্থাৎ টানা ১০০ বছর পর্যন্ত সার্ভিসে থেকে আকাশে উড়বে এ বিমান। এখন পর্যন্ত প্রাচীন এ বিমান গৌরবের সাথে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মার্কিন বিমানবাহিনী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানের মেরুদন্ড বলা হয় বি-৫২ বম্বারকে।
বি-৫২ বম্বার যেন বিমান নয় বরং আকাশের এক বিশাল দানব। এ দৈত্য বিমানের ডানা প্রায় তার দেহের সমান লম্ব। এর ডানা এত বড় যে, তাতেও রয়েছে চাকা। ল্যান্ড করা অবস্থায় এর দীর্ঘ ডানা কিছুটা বাকা হয়ে থাকে। দীর্ঘ ডানা দেখলে যে কারোর মনে প্রশ্ন জাগবে এত বড় লম্বা আর ভারী ডানা নিয়ে মনে হয় এর পক্ষে আকাশে ওড়া সম্ভব নয়। কিন্তু উডডয়নের সময় ঠিকই সোজা হয়ে যায় এর ঝুলে থাকা বিশাল ডানা। ১৯৫৭ সালে বিশ্ব পরিভ্রমনে বের হওয়ার আগে ১৯৫৬ সালের ২৪ ও ২৫ নভেম্বর আটটি বি -৫২ বম্বার টানা ৩১ ঘন্টা ৩০ মিনিট আকাশে ওড়ে। এসময় এ বিমানগুলো ১৫ হাজার ৫৩০ মাইল পথ অতিক্রম করে। একটানা উড়ে বিশ্ব পরিভ্রমনের পর একের পর এক রেকর্ড করতে থাকে বি-৫২ বম্বার। ১৯৫৮ সালে একটি বি -৫২ বম্বার ঘন্টায় ৫৯৭ মাইল গতিতে ওড়ার বিশ্ব রেকর্ড করে। ১৯৬০ সালে পুনজ্বালানী সংগ্রহ ছাড়া টানা ১৯ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আকাশে উড়ে আরেকটি বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করে। এসময় এক টানা ১০ হাজার ৭৮ মাইল অতিক্রম করে।
১৯৫৫ সালে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পরই মার্কিন স্ট্রাটেজিক এয়ার কমান্ড সিদ্ধান্ত নেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল এবং আধুনিক সেনাবাহিনীকে মোকাবেলায় ব্যবহার করা হবে এ বিমান। পুরো ঠান্ডা লড়াই চলাকালে বি-৫২ বোমারুসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কৌকশলগত বোমারু বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমানবিক হামলার হুমকি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সীমান্ত বরাবর আকাশের সব সময় টহলরত থাকত বি-৫২ বোমারু বিমানসহ অন্যান্য বম্বার। সোভিয়েত ইউনিয়নের যে কোনো পারমানিক হামলার উদ্যোগের ক্ষেত্রে এ বিমান যাতে আগেই হামলা পরিচালনা করতে পারে সে জন্য প্রস্তত থাকত বি-৫২ বম্বার। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি আগে পারমানবিক হামলা করে। সাথে সাথে যেন উপযুক্ত জবাব দেয়া যায় সেজন্য সোভিয়েত সীমান্ত বরাবর আকাশে এ বিমান প্রস্তুত থাকত।
হেড স্টার্ট, ক্রোম ডোম, হার্ড হেড, রাউন্ড রবিন এবং জায়ান্ট ল্যান্স প্রভৃতি কোড নামে বি-৫২ বোমারু বিমান আকাশে টহল দিতো।
১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য শক্তিশালী মিসাইল উদ্ভাবনের কারনে ঝুকিতে পড়ে আকাশের অতি উচুতে অবস্থানরত বি-৫২ বিমান। ফলে পরবর্তী সময়ে কয়েকবার বি-৫২ বিমান আধুনিকায়নকরন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সব আবহাওয়ায় এবং অতি নিচ দিয়েও এ বিমানের ওড়ার সক্ষমতা যোগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের মার্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে শুরু করে অপারেশন রোলিং থান্ডার। এজন্য আগেই প্রস্তুত করা হয় ৭৪টি বি-৫২ বোমারু বিমান। ১৮ জুন অপারেশন আর্ক লাইট নামে প্রথম অভিযানে অংশ নেয় ৩০টি বি-৫২ বম্বার। এ বিমান থেকে বৃষ্টির মত নির্বিচারে বোমা নিক্ষেপ করা হয় ভিয়েতনামে। বোমা হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মূল্যায়নে বলা হয় ৫০ শতাংশের বেশি বোমা লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত করে। বাকী বোমা লক্ষ্যবস্তুর বাইরে পড়ে।
১৩ ঘন্টার এ অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে তখন এত বেশি বোমা নিক্ষেপ করে যে, আকাশে তখন দুটি বি-৫২ বোমারু বিমান মুখোমুখি সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয় প্রথম দফা হামলার সময়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মোট ৩১টি বি-৫২ বিমান খোয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ১১টি বিধ্বস্ত হয়। ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে শুরু করে অপারেশন লাইনব্যাকার -২। ১২ দিনের এ অপারেশনে হ্যানয়সহ আরো কয়েকটি স্থানে ১৫ হাজার ২৭৩ টন বোমা নিক্ষেপ করা হয় বি-৫২ বিমান থেকে। ৪৪টি বি-৫২ বোমারু বিমান অংশ নেয় এ অপারেশনে। এসময় ১৫টি বিমানে গুলি করে ভিয়েতনামী যোদ্ধারা। এতে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারা যায় ২৫ পাইলট। অবশ্য উত্তর ভিয়েতনামের দাবি তারা ৩৪টি বিমান তারা ভূপাতিত করে।
১৯৯১ সালের ১৬ জানুয়ারি শুরু হওয়া ইরাকের বিরুদ্ধে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বি-৫২ বোমারু বিমান। এ অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা থেকে উড়ে গিয়ে ইরাকে বোমা হামলা চালিয়ে কোনো বিরতি ছাড়া আবার ফিরে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এসময় টানা ৩৫ ঘন্টা আকাশে ওড়ে এ বিমান। অতিক্রম করে মোট ১৪ হাজার মাইল। টানা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশ্ব রেকর্ড। সাতটি বি-৫২ বিমান অংশ নেয় ইরাক অভিযানে। সৌদি আরব, দিয়েগো গার্সিয়া, যুক্তরাজ্য এবং স্পেন থেকেও ইরাকে অভিযান পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র। একটানা দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারার কারনে সমুদ্র অভিযান ও সমুদ্র সীমার নিরাপত্তা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এ বিমান।