অস্ত্র আমদানি থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পতাকা- সংগৃহীত -

অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হতে দ্রুত অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে অস্ত্র আমাদনি বন্ধ করা এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিজস্ব অস্ত্রে সজ্জিত করা । ইতোমধ্যে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অনেক অস্ত্র নিজেদের তৈরি । বর্তমানে ১১টি দেশে বিমান রপ্তানি করছে ইন্দোনেশিয়া। উদ্বোধন করেছে নিজেদের তৈরি সাবমেরিন।
ইন্দোনেশিয়া দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। দেশটির জনসংখ্যা ২৬ কোটি। সামরিক শক্তির দিক দিয়েও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী একটি দেশ। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুসারে সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ১৩৮টি দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ১৬ তম। মোট সেনা সংখ্যা ৮ লাখ। এর মধ্যে ৪ লাখ সক্রিয় আর ৪ লাখ রিজার্ভ।

এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৬ লাখ। ২০১৮ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোনো কোনো সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী সামরিক দিক দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এশিয়ায় পাকিস্তান ও ইসরাইলের আগে।
ইন্দোনেশিয়ার সমসরাস্ত্র শিল্প অনেক শক্তিশালী পর্যায়ে পৌছেছে এবং শুরু করেছে অনেক ধরনের অস্ত্র রপ্তানি। ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে অ্যাসল্ট রাইফেল বিক্রি করে। ব্রুনাই, পাকিস্তান এবং তিমুরে বিক্রি করে সাজোয়া যান। আর ফিলিপাইনে দেশটি বিক্রি করেছে যুদ্ধ জাহাজ। ইন্দোনেশিয়া মুসলিম বিশ্বের দুটি দেশ তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে নানা ধরনের সমরাস্ত্র তৈরি করা থেকে। এছাড়া দক্ষিন কোরিয়ার সাথে যৌথভাবে সমরাস্ত্র উৎপাদন করে থাকে ইন্দোনেশিয়া।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিমান শিল্পের নাম দিরগানতারা ইন্দোনেশিয়া। এ প্রতিষ্ঠানের নির্মিত বিমান ইতোমধ্যে তারা ১১টি দেশে রপ্তাানি করেছে। এ দেশগুলো হলো দক্ষিন কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালওয়েশিয়া, সযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সেনেগাল, ভেনিজুয়েলা, নেপাল এবং বুরকিনি ফাসাও।

২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়া ২৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমরাস্ত্র রপ্তানি করে। আর নিজ দেশের সেনাবাহিনীর কাছে তারা বিক্রি করেছে সাড়ে ৫ লাখ কোটি ইন্দোনেশিয়ান রুপির অস্ত্র। খুব শীঘ্রই দেশটি অস্ত্র আমদানির পরিবর্তে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রপ্তানিকারক একটি দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য ২০২৯ সালের পর আর কোনো সমরাস্ত্র আমদানি না করা। দেশটির প্রয়োজনীয় সব ধরনের সমরাস্ত্র নিজেরাই তৈরির পরিকল্পনা এবং কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে দেশটি ক্রমে কমিয়ে আনছে সমরাস্ত্র আমদানি। গড়ে তুলছে শক্তিশালী সামরিক শিল্প। ২০১০ সালে তারা এ লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে দেশটি সামরিক খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় । ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়া সামরিক খাতে ৮ বিলিয়ন ডলার বাজেট বরাদ্দ দেয় যা এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক বাজেট। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে এবং ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত নেয়া হবে। এর মধ্যদিয়ে এ অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া হবে সর্বোচ্চ সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্দের দেশ।
২০১২ সালে ইন্দোনেশিয়ায় আইন পাস করা হয় সামরিক বাহিনীর জন্য যথাসম্ভব দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সমরাস্ত্র কিনতে হবে। ২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ঘোষণা দেয় সমরাস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবহারে দেশটি স্বয়ংসর্ম্পুন হওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এ লক্ষ্যে ২০২০-২৪ প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি তরান্বিত করার উদ্যোগ নেয়া হয। প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় তাদের প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র ক্রয়ের জন্য দেশীয় সমরাস্ত্র প্রতিষ্ঠানের সাথে একের পর এক চুক্তি করে যাচ্ছে।

স্টকহোম পিস রিসার্স ইনস্টিটিউ এর তথ্য অনুসারে ২০১৭ সালে শীর্ষ ১০টি অস্ত্র আমদানির তালিকায় নাম ছিল ইন্দোনেশিয়ার। কিন্তু এ সংস্থার ২০১৮ সালের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক ১০ দেশের তালিকায় ইন্দোনেশিয়ার নাম নেই। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্স ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া ১ হাজার ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র আমাদিন করে। ২০১৮ সালে তা কমে দাড়ায় মাত্র ৩৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

একদিকে ইন্দোনেশিয়ার সমরাস্ত্র আমদানি কমছে, অপর দিকে দ্রত বাড়ছে অস্ত্র রপ্তানির পরিমান। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টম্বর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রি ৫শ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে দেমটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রি করেছে। ইন্দোনেশিয়া যেসব দেশে অস্ত্র রফতানি করে থাকে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, দক্ষিন আফ্রিকা, জাপান এবং বেলজিয়াম।

২০১৯ সালের প্রথম ৯ মাসে ইন্দোনেশিয়া বিভিন্ন দেশে কমব্যাট ভিহিক্যাল বিক্রি করেছে ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এটি এর আগের বছরের তুলনায় ৩৮ ভাগ বেশি। স্টাটিসটিক্স ইন্দোনেশিয়ার সূত্র উল্লেখ করে এ খবর দিয়েছে জাকার্তা পোস্ট।
ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র নির্মান প্রতিষ্ঠান হলো পিনদাদ। এটি স্থল বাহিনীর সমরাস্ত্র নির্মান করে। সম্প্রতি তুরস্কের সাথে যৌথভাবে কাপলান নামে ট্যাঙ্ক নির্মান করছে এ প্রতিষ্ঠান । এ প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ট্যাঙ্ক রপ্তানির প্রক্রিয়াও শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া।

ইন্দোনেশিয়ার সরকারি জাহাজ নির্মান প্রতিষ্ঠানের নাম পিএএল। রাষ্ট্রীয় এই জাহাজ নির্মান প্রতিষ্টানটির সাবমেরিন নির্মান উদ্বোধন করা হয় ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল। এটি ডিজেলচালিত। পিএএল দক্ষিন কোরিয়ার সাথেও যৌথভাবে সাবমেরিন নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে। অপর দিকে বিমান শিল্প দিরগানতারা তাদের বিমান বাহিনীর জন্য হেলিপ্টার নির্মানের লাইসেন্স পেয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর একটি। সেনা নৌ বিমান বাহিনী এবং মেরিন করপস নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী গঠিত। দেশটিতে রয়েছে বিশাল উপকূলভাগ। এর দৈর্ঘ্য ৫৪ হাজার ৭১৬ কিলোমিটার। ইন্দোনেশিয়া অনেক ধরনের সমরাস্ত্র তৈরি করলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমরাস্ত্র দেশটি ব্যবহার করে।

ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনীতে মোট বিমানের সংখ্যা ৪৬২টি। এর মধ্যে যুদ্ধ বিমান ৮০টি। পরিবহন বিমান ৫৪টি। প্রশিক্ষন বিমান ১০৯টি। হেলিকপ্টার ১৯৩টি। দেশটিতে ব্যবহারযোগ্য বিমান বন্দরের সংখ্যা ৬৭৩টি। ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ২৫টি এফ-১৬ বহুমুখী জঙ্গি বিমান রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার তৈরি এসইউ-৩০ বিমান ১১টি, এসইউ-২৭ ৫টি , যুক্তরাজ্যের হক ২০০ বিমান রয়েছে ২৪টি। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার রয়েছে ৮টি। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, কানাডা, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশের শক্তিশালী অনেক যুদ্ধ বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে দেশটির বিমান বাহিনীতে।

ইন্দোনেশিয়ার স্থলবাহিনীতে ট্যাঙ্ক রয়েছে ৩১৩টি। সাজোয়া যান ১ হাজার ১৭৮টি। সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি ১৫৩টি। রকেট প্রজেক্টর ৩৬টি। ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে জামার্নির তৈরি ১০৩টি লিওপার্ড ট্যাঙ্ক। সাজোয়াযানের মধ্যে প্রায় ৬শ ইন্দোনেশিয়ার তৈরি।
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে মোট রণতরীর সংখ্যা ২৮২টি। ফ্রিগেট ৭টি। সাবমেরিন ৫টি। করভেট ২৪টি। মূল যদ্ধ জাহাজ ১০টি। বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ার নেই। ইন্দোনেশিয়ার ৫টি সাবমেরিনের ২টি জার্মানির । অপর তিনটি ইন্দোনেশিয়া দক্ষিন কোরিয়ার যৌথভাবে তৈরি।

ইন্দোনেশিয়া ২০১৯ সালে আরো তিনটি সাবমেরিন ক্রয়ের চুক্তি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ফ্রিগেট যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ড থেকে কেনা। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর সাতটি ফ্রিগেটের দুইটি ইন্দোনেশিয়া-নেদারল্যান্ড যৌথভাবে তৈরি। অপর ৫টি নেদারল্যান্ডের তৈরি। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে রয়েছে ১৫টি র্ফাস্ট মিসাইল বোট যেগুলোর অধিকাংশ তাদের নিজেস্ব তৈরি। এছাড়া ১৫৬টি টহল জাহাজের প্রায় সবই ইন্দোনেশিয়ার তৈরি।