পারমানবিক বোমা মোতায়েন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের পারমানবিক সাবমেরিন-সংগৃহীত

পারমানবিক বোমা মোতায়েন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । পরমানু শক্তিচালিত একটি সাবমেরিনে এ পারমানবিক বোমা মোতায়েন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল ট্রাইডেন্ট -২ যুক্ত রয়েছে সাবমেরিনে। আর সাবমেরিনে যুক্ত এ ট্রাইডেন্ট-২ মিসাইলে বসানো হয়েছে নতুন পারমানবিক বোমা।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদর দফরত পেন্টাগন পারমানবিক বোমা মোতায়েনের এ খবর নিশ্চিত করেছে। ৪ ফেব্রুয়ারি এ খবর দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স নিউজ। এর কয়েকঘন্টা আগে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসও এ খবর প্রকাশ করেছে।

নতুন ডিজাইনের মোতায়েনকৃত পারমানিব বোম ডব্লিউ ৭৬-২ , ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধে তৈরি করা হয়েছে। বোমাটি স্বল্প ক্ষমতার। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে রাশিয়াকে মোকাবেলার জন্য এ বোমা তৈরি এবং মোতায়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মনে করেন প্রথমে পারমানবিক বোমা হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার কৌশল রয়েছে রাশিয়ার । দেশটি যাতে এ ধরনের চিন্তা থেকে সরে আসে সে কারনে যুক্তরাষ্ট্র এ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন এ পারমানবিক বোমা মোতায়েনের মাধ্যমে পারমানবিক অস্ত্র বিষয়ে মার্কিন নীতির ব্যাপক পরিবর্তনের বাস্তবায়ন শুরু হলো। কারণ ওবামা প্রশাসনের নীতি ছিল পারমানবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।

অপর দিকে নতুন এ পারমানবিক বোমা মোতায়েনে বিশ্বব্যাপী পূর্ণ মাত্রায় পারমানবিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক বিশ্লেষক। মার্কিন ডেমোক্র্যাটরাও নতুন বোমা মেতায়েনকে ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়াবাড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ডিফেন্স নিউজের পক্ষ থেকে পারমানবিক বোমা মোতায়েন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগনের একজন মুখপাত্র বলেন, বিদেশে পারমানবিক বোমার উপস্থিতি বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হলো স্বীকার বা অস্বীকার কোনটাই না করা। আন্ডার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স ফর পলিসি জন রোড এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন নৌবাহিনী বোমাটি মোতায়েন করেছে।
ডিফেন্স নিউজের খবরে বলা হয়েছে মোতায়েনকৃত এ বোমা স্বল্প ক্ষমতার। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে কম শক্তিসম্পন্ন। এটা ডব্লিউ ৭৬-১, পারমানবিক বোমার পরবর্তী সংস্করণ। এ বোমা বানানো হয়েছে ব্যালিস্টিক মিসাইল ট্রাইডেন্ট-২, নিক্ষেপ উপযোগী করে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন রাশিয়াকে সঠিক ভাবে মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরো একটি স্বল্প ক্ষমতা সম্পন্ন পারমানবিক বোমা তৈরি করা দরকার । রাশিয়া গত এক দশকে পারমানবিক বোমার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যাপকভিত্তিক বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বিশ্বাস করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সংঘাতে ঢুকে পড়া থেকে বিরত রাখার জন্য মস্কোর একটি ছোট পারমানবিক বোমা ব্যবাহারের সম্ভাবনা আছে। এটা হবে ‘এসকেলেট টু ডিএসকেলেট’ মতবাদের অধীনে। এ ধরনের আক্রমনের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যদি পাল্টা বৃহত্তর কৌশলগত ব্যবস্থা থাকে তবে রাশিয়া এ ধরনের হামলার বিষয়ে দ্বিধায় থাকবে।
পারমানবিক বোমা মোহায়েনের বিরোধীরা এ মতবাদের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন । বিশেষ করে ডব্লিউ৭৬-২ বোমার বিষয়ে তারা উদ্বেগ প্রকশা করেছেন। একই সাবমেরিনে স্বল্প ও ব্যপক ক্ষমতাসম্পন্ন পারমানবিক বোমার মোতায়েনের ফলে প্রতিপক্ষ জানতে পারছে না কোনটি ব্যবহার করা হবে। ফলে প্রতিপক্ষ ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন পারমানবিক বোমা মোকাবেলারই প্রস্তুুতি নেবে এবং নিক্ষেপ করবে।

সাবমেরিনের যে ট্রাইডেন্ট ২ মিসাইলে এটি মোতায়েন করা হয়েছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তমহাদেশীয় বা ব্যালিস্টিক মিসাইল। এ সাবমেরিন স্টেলথ ক্ষমতার হওয়ায় সাগরে চলাচল সনাক্ত করা যায় না। স্বল্প ক্ষমতার পারমানবিক বোমা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যব্যস্থা সহজে ভেদ করতে পারে।
পরমানু অস্ত্র মুক্ত বিশ্ব এবং পারমানবিক বোমার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা ছিল ওবামা প্রশাসনের নীতি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সে নীতি থেকে এখন সরে আসল। এ বোমা মেতায়েন মার্কিন পারমানবিক বোমার নীতির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন বলে মনে করছেন অনেকে।

বার্তা সংস্থা এপিকে পেন্টাগনের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, এ বোমা মোতায়েন মার্কিন নাগরিকদের অধিকতর নিরাপদ করবে এবং পারমানবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাও কমিয়ে দেবে। অপরদিকে ডেমোক্র্যাটরা একে বিপজ্জনক, বাড়াবাড়ি আখ্যায়িত করে বলেছেন এটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে। সমালোচকদের মতে এ বোমার উৎপাদন ও মোতায়েন পৃথিবীকে আরো অনিরাপদ করলো এবং পূর্ণমাত্রায় পারমানবিক যুদ্ধের ঝুকি বাড়িয়ে দিল। আন্ডার সেক্রেটারি জন রোড এপিকে বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে ঘোষিত নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে চলবে। এ বোমা মোতায়েন রাশিয়ার সীমিত পারমানবিক যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকে নস্যাত করতে সহায়তা করবে।

ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন পরমানু অস্ত্র কর্মসূচীকে ব্যাপকভিত্তিক, ব্যয়বহুল এবং আধুনিক করার বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর স্বল্প ক্ষমতার এ পারমানবিক বোমা তৈরির মাধ্যমে পরমানু অস্ত্রাগার শক্তিশালী করা বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষনায় শক্তি জোগালো।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র দক্ষতায় গ্যাপ তৈরি হয়েছে বলে রাশিয়ার ভূল ধারনার জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র স্বল্প পাল্লার এ বোমা উৎপাদন এবং মোতায়েন করেছে। ইউরোপে প্রথমে স্বল্প ক্ষমতার পারমানবিক বোমা হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করা যাবে রাশিয়ার এমন চিন্তা থেকে সরিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বোমা তৈরির কর্মসূচী গ্রহণ করে। ইউরোপে ইউরোপে রাশিয়ার স্বল্প ক্ষমতার পারমানবিক বোমা হামলার পরিণতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো পূর্ণ মাত্রায় পারমানবিক যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে।

ডব্লিউ৭৬-২ পারমানবিক বোমা কম ক্ষমতার বলা হলেও আসলে এর প্রকৃত ক্ষমতা বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এটি হতে পারে ৫ কিলোটন ক্ষমতার অথবা হিরোশিমায় ফেলা আনবিক বোমা লিটল বয়ের তিনভাগের এক ভাগ ক্ষমতার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সম্পর্কের বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মার্কিন অস্ত্রাগারে যোগ হলো নতুন পারমানবিক বোমা। ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ ফুরানোর আগে নিউ স্টার্টস অস্ত্র নিয়ন্ত্রন চুক্তি বাড়নোর মস্কোর প্রস্তাব ট্রাম্প গ্রহণ করবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে পরমানু অস্ত্র নিয়ন্ত্রন বিষয়ে এটিই এখন বিদ্যমান একমাত্র চুক্তি। পেন্টাগনের দাবি স্বল্প ক্ষমতার নতুন পারমানবিক অস্ত্র নির্মানের মাধ্যমে আমেরিকার পারমানবিক বোমার সংখ্যা বাড়ায়নি। অধিক ক্ষমতার বোমার স্থলে নতুন বোমা রাখা হয়েছে অস্ত্রাগারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স নিউক্লিয়ার উইপনস এর একজন কর্মকর্তা বলেছেন রাশিয়া সাইবার অস্ত্রসহ পারমানবিক বোমা থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। স্বল্প ক্ষমতার পারমানবিক বোমার ব্যবহারের পরিবর্তে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোকে ভয় দেখানোর জন্য তারা বেসামরিক আর্থিক, জ্বালানি এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় আঘাত করে অকার্যকর করার পরিকল্পনা করছে।

হাউজ আর্মড সার্ভিস কমিটি নতুন এ অস্ত্রের মোতায়েন বিরোধীতা করা হয়। রোড আইল্যান্ড ডেমোক্রেট সিনেটর জ্যাক রিড এ বিষয়ে বলেছেন, নতুন এ বোমা আমাদের জাতীয় নিরপত্তা বৃদ্ধি করবে না বরং ভুল হিসাব নিকাশের ঝূকিই কেবল বৃদ্ধি করবে যার পরিণতি ভয়াবহ। পারমানবিক বোমা কখন কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেন জন রোড। তিনি বলেন এটি অতি গোপনীয়।

তবে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট গোপন সূত্রের বরাতে জানায় ২০১৯ সালের শেষ সপ্তাহে ইউএসএস টেনেসির আটলান্টিকে এ বোমা মোতায়েন করা হয়েছে। এ বোমা বানানোর খবর গত ২৯ জানুয়ারি ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট প্রকাশ করে। নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে পরমানু শক্তি চালিত ওহাইয়ো ক্লাস সাবমেরিনের অঘোষিত নাম্বারের ট্রাইডেন্ট২ ব্যালিস্টিক মিসাইলে এ পরমানু বোমা মোতায়েন করা হয়েছে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট জানায় ওয়াশিংটনের বাঙ্গোর, জর্জিয়ার কিংস উপসাগরে এ সাবমেরিন বহর রয়েছে।