ব্রিটেনের পরমাণু শক্তি অর্জনের গোপন কথা

ব্রিটেন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-সংগৃহীত

যুদ্ধোন্মাদ দেশের প্রসঙ্গ উঠলেই, যৌক্তিক বা অযৌক্তিক যেভাবেই হোক, পশ্চিমা বিশ্বের ঠোঁটের আগায় চলে আসে এশিয়ার ক'টি দেশের নাম। এর মধ্যে অগ্রগণ্য পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া। একটি বাস্তবে না-হলেও কাগজে-কলমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র, আর অপরটি হাড়ে-মজ্জায় কমিউনিস্ট দেশ। দুই বিপরীত আদর্শিক মেরুর এ দু' দেশকে পশ্চিমারা প্রায়ই এক পাল্লায় মেপে থাকে। তাদের বড় 'অপরাধ', তারা পশ্চিমা ধনী দেশ না-হয়েও পরমাণু অস্ত্রশক্তি অর্জন করেছে। এ ক্ষমতা অপব্যবহার করে তারা পৃথিবীর একটা বিরাট অংশ মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে, কেড়ে নিতে পারে কোটি মানুষের প্রাণ - এমনই আশঙ্কা পশ্চিমা দুনিয়ার, যারা নিজেরাই বিপুল পরমাণু অস্ত্রের মালিক।

পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে আমরা সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই সামনে রাখি। তাদের পরমাণু অস্ত্রের একটি ভুল বাটনে টিপ পড়লে এই সুন্দর পৃথিবীটা মুহূর্তেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে। কিন্তু আমরা কি জানি, মার্কিনীদের পরম বন্ধু ব্রিটেনও তলে তলে এমন শক্তি সঞ্চয় করেছে যে, চাইলে তারাও এক মুহূর্তেই কয়েক শ' কোটি মানুষকে মেরে ফেলতে পারে! আমরা জানি বা না-জানি, ব্যাপারটা আসলে তেমনই। ব্রিটেনের রয়েছে চারটি ব্যালাস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের একটি বহর। এর ক্ষমতা রয়েছে বিশ্বের একটা বিরাট অংশকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দেয়ার।

দেশটির এ ক্ষমতা অর্জনের গল্পটিও বেশ মজার। আজ থেকে ৫০ বছর আগে বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি হয়েছিল ব্রিটেনের। ওই চুক্তিতে ব্রিটেনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উইপন সিস্টেম দেয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের,  যা কিনা ব্রিটেনের পরমাণু অস্ত্রের ভিত্তিমূল হওয়ার কথা ছিল। সেসময় হঠাৎ কী মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি বাতিল করে দেয়। তার ৫০ বছর পর  আজ নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের একক অধিকর্তা ব্রিটেনের মিসাইল সাবমেরিন ফোর্স নিজেই। শুধু পরমাণু হামলা করা নয়, হামলা ঠেকানোর বিশাল ক্ষমতাও রয়েছে তাদের।

১৯৬০এর দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটেনের পরমাণু ক্ষমতা প্রধানত নির্ভরশীল ছিল তথাকথিত ''ভি-ফোর্স'' স্ট্র্যটেজিক বম্বাসের ওপর। সেগুলো হলো অ্যাভরো ভালকান, হ্যান্ডলে পেজ ভিক্টর ও ভিকার্স ভ্যালিয়েন্ট। এই বোমারু বিমানগুলোকে স্কাইবোল্ট এয়ার-লাঞ্চ ব্যালাস্টিক মিসাইল দিয়ে সজ্জিত করার কথা ছিল। কাজটি সম্পন্ন হলে এই বিমানগুলো ঘণ্টায় সাড়ে নয় হাজার মাইল গতিতে তৎকালীন সোভিয়েতের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে পারতো। এসময় ব্রিটেনের কপালে হঠাৎ দুর্ভাগ্য নেমে আসে। একদিকে স্কাইবোল্টে কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়, অন্যদিকে ১৯৬২ সালে মিসাইল চুক্তি বাতিল করে মার্কিন সরকার।

এ চুক্তি বাতিলের ফলে ব্রিটেনের পুরো পরমাণু ক্ষমতাই হুমকির মুখে পড়ে যায়। এ অবস্থায় একটা সমাধানে পৌঁছতে চায় দু'দেশ। এক পর্যায়ে ব্রিটেনকে স্কাইবোল্টের পরিবর্তে সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপ করা যায় এমন পোলারিশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এ ক্ষেপণাস্ত্র বহনের উপযোগী সাবমেরিনই তখন ছিল না ব্রিটেনের। আবার এ সাবমেরিনও আমেরিকা দেবে না, ব্রিটেনকেই বানিয়ে নিতে হবে।

পরমাণু হামলা ঠেকানোর নির্ভরযোগ্য সামর্থ্য অর্জন করতে কী করতে হবে তা নিয়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক সমীক্ষা চালায়। এরপর তারা সিদ্ধান্তে  উপনীত হলো  ফ্রান্সের মতো ব্রিটেনেরও থাকতে হবে কমপক্ষে পাঁচটি ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন।  পরে অবশ্য সংখ্যাটি পাঁচ থেকে চার-এ নেমে আসে। সাবমেরিনগুলো হতে হবে মার্কিন নৌবাহিনীর লাফায়েতে-ক্লাস ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের মতো। এর পালের পেছনে দুই সারিতে থাকবে আটটি করে ক্ষেপণাস্ত্র। থাকবে আরো নানা আধুনিক ব্যবস্থা।

সাবমেরিনগুলোর বেশিরভাগই নির্মিত হলো ব্রিটেনে। আর মিসাইল, মিসাইল লঞ্চ টিউব এবং আগুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নির্মিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিটি সাবমেরিনে রইল ১৬টি পোলারিস এ-৩ সাবমেরিন-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল। পোলারিসের আওতা হচ্ছে আড়াই হাজার মাইল। এটি মূলত একটি ব্রিটিশ ওয়্যারহেড দিয়ে সজ্জিত ছিল।

১৯৬৪ সালে প্রথম সাবমেরিনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় আর চালু করা হয় ১৯৬৭ সালে। এর নামকরণ করা হয় এইচ এম এস রেজুল্যুশন। পরের বছর ১৯৬৮ সালে আসে আরো দু'টি - রিপালস ও রিনাউন। সর্বশেষ ১৯৬৯ সালে আসে রিভেঞ্জ। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্লোরিডার উপকূল থেকে প্রথম বারের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে এইচ এম এস রেজুল্যুশন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ব্যয় ও সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পুর্ন উল্টো পরিস্থিতি। বানানো হচ্ছে আরো বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র।

১৯৮০এর দশকের গোড়ার দিকে স্পষ্ট হয়ে যায়, এইচ এম এস রেজুল্যুশন দিয়ে আর চলবে না। এর বদলে চাই নতুন আরেকটা। স্নায়ু যুদ্ধ শেষ, সোভিয়েত ইউনিয়নও বিলুপ্ত। এত ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সমরসজ্জার প্রয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু ব্রিটেন অনমনীয়, তারা আবারও চারটি সাবমেরিন বানাবেই এবং এতে সংযোজন করবে আমেরিকান মিসাইল। দেশটির এমন  একগুঁয়ে অবস্থানের কারণেই নির্মিত হলো চারটি ভ্যানগার্ড-ক্লাস সাবমেরিন । ১৯৯৩ সালে চালু হয়  ভ্যানগার্ড , ১৯৯৫ সালে চালু হয় ভিক্টোরিয়াস ১৯৯৬ সালে ভিজিল্যান্ট ও ১৯৯৯ সালে ভেনজেন্স। ১৯৯৪ সালে ভ্যানগার্ড প্রথম বারের মতো ট্রাইডেন্ট-২ মিসাইল নিক্ষেপ করে এবং পরের বছর প্রথম অপারেশনাল টহল শুরু করে।

পূর্বসূরি রেজুল্যুশন-এর চাইতে নতুন সাবমেরিন ভ্যানগার্ড-এর বহনক্ষমতা দ্বিগুণ; ১৫ হাজার টন। যদিও প্রতিটি সাবমেরিনে ১৬টি করে লঞ্চ টিউব আছে, তার ওপর ২০১০ সালে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রতি সাবমেরিনে আটটি করে মার্কিন-নির্মিত ট্রাইডেন্ট-২ ডি-৫ সাবমেরিন লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল স্থাপন করা হবে। ট্রাইডেন্ট-২ ডি-৫ চার হাজার ছয় শ' মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতেতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর মানে দাঁড়ালো, ব্রিটেন চাইলে সহজেই ইউরোপিয়ান রাশিয়ায় হামলা চালাতে পারবে।

ব্রিটেনের প্রতিটি সাবমেরিনে থাকে দু'জন করে ক্রূ। কন্টিনিউয়াস অ্যাট সী ডেটারেন্স বা সি এ এস ডি কর্মসূচির অধীনে কমপক্ষে একটি সাবমেরিন সবসময় টহলরত থাকেই। একটির থাকে টহল বিরতি। একটি টহলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে এবং আরেকটি থাকে মেরামত কারখানায়। কোথাও কোনো ত্রূটি আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার কাজে। ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর মতে, গত ৪৮ বছরে তাদের সাবমেরিন টহল এক দিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়েছে, তারা নতুন প্রজন্মের পরমাণু শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন আনবে। ড্রেডনাট ক্লাসের এ সাবমেরিনের নাম হবে 'সাকসেসর'।  ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীই এসব সাবমেরিন নির্মাণ করছে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এ গুলোর নির্মাণকাজ শুরুও হয়ে গেছে। এর প্রতিটির ওজন হবে ১৭ হাজার ২০০ টন। আগের ১৬টির পরিবর্তে এখন প্রত্যেকটিতে থাকবে ১২টি করে মিসাইল টিউব। ২০৩০ সালের মধ্যে ড্রেডনাট বোটও চলে আসার কথা, যার আয়ুষ্কাল হবে ৩০ বছর। নতুন সাবমেরিনগুলোর পেছনে ৩০ বছরে খরচ হবে ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। থার্ড জেনারেশন ড্রেডনাট ক্লাস চালুর ফলে ২০৬০ সাল পর্যন্ত  ব্রিটেন পরমাণু হামলা ঠেকানোর ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিধর দেশে পরিণত হবে।

এক সময় সমুদ্রের কোথাও-না-কোথাও ব্রিটেনের কমপক্ষে ৬৪টি পরমাণু অস্ত্র আদেশ পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে। এগুলো যে কোনো আকস্মিক হামলা ঠেকাতেও সক্ষম হবে। পরমানু অস্ত্র নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের বৈপরিত্যর এক নজির হচ্ছে ব্রিটেনের পারমানবিক সাবমেরিন বানানোর প্রতিযোগিতা।