কেন দূর্ঘটনায় পড়ছে বোয়িং

বোয়িং উড়োজাহাজ-সংগৃহীত -

বোয়িং নামটি অনেকটা জড়িয়ে আছে বিমানে উড়ার সাথে। কোনো দেশে যখন নতুন বিমান কেনার কথা উঠে তখন অবধারিতভাবে বোয়িংয়ের নামটি সবার আগে চলে আসে। আর যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সামরিক ও বেসামরিক জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে বোয়িংয়ের নাম। অনেকের হয়তো অজানা যে বোয়িং শুধু যাত্রীবাহী বা পরিবহন বিমান বানায় না। এই সংস্থাটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল সব যুদ্ধ বিমান বানিয়ে থাকে। এমনকি মাহকাশ যান ও সমুদ্র যান নির্মানের সাথে জড়িত বোয়িং।

বোয়িং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকাশ যান নির্মান সংস্থা। বানিজ্যিক উড়োজাহাজ, যুদ্ধ জাহাজ, এবং মহাকাশ যান নির্মান করে থাকে এই কোম্পানিটি। এছাড়া আরো অনেক গুরুত্বপূর্ন প্রতিরক্ষা সামগ্রী নির্মানের সাথে জড়িত রয়েছে বোয়িং। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রফতানি শিল্প প্রতিষ্টানগুলোর একটি। এই কোম্পানি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরিন বিমান তৈরি করে না। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ গুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের বিমান তৈরি করে থাকে। হতে পারে তা যুদ্ধ বিমান কিংবা পরিবহন বিমান। বিশ্বের অন্তত ১৫০ টি দেশ বোয়িংয়ের ক্রেতা। বোয়িং মিলিটারি এয়ারক্রাফট, স্যাটেলাইট, বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র, এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের আকাশ যান নির্মানের ক্ষেত্রে বোয়িং একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্থাও বটে। যেটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে। আকাশ যান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেছে। যাত্রীবাহী বানিজ্যিক বিমানের বহু ধরনের ডিজাইন ও কারিগরি ক্ষেত্রে আধুনিকায়নে সব সময়ে মনোযোগী থেকেছে প্রতিষ্টানটি। আর এ কারনে বিমান নির্মান ও বাজারজাত করনে একশ বছর ধরে বিশ্বের সেরা প্রতিষ্টান হিসাবে টিকে আছে বোয়িং। বোয়িংয়ের কর্পোরেট অফিস যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৫৬টি দেশে ১ লাখ ৫৩ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করেন। এরমধ্যে ৫০ হাজার লোক বিভিন্ন কারাখানায় কাজ করেন। আর প্রতিষ্টানটির ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করেন ৪৫ হাজার। মোটাদাগে তিন ভাগে প্রতিষ্টানটি পরিচালনা করে থাকে। একটি হচ্ছে কমার্শিয়াল এয়ারপ্লেন। যারা বিভিন্ন ধরনের যাত্রীবাহী ও পরিবহন বিমান নির্মান ও বিক্রি করে থাকে। দ্বিতীয়টি স্পেস অ্যান্ড সিকিউরিটি যে বিভাগটি যুদ্ধ বিমান, মহাকাশ যান ও বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ উপকরন নির্মান ও বিক্রি করে থাকে। এবং গ্লোবাল সার্ভিসেস। এই বিভাগের কাজ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বোয়িং এর সাথে সর্ম্পকিত কোম্পানি ও প্রতিষ্টানের সাথে আর্থিক লেনদেনের দিকগুলো দেখাশোনা করা। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোগাম ম্যানেজমেন্ট, অ্যাডভান্স ডিজাইন এবং ইনফরমেশন টেকনোলজির নানা দিক দেখার জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ রয়েছে।

যাত্রীবাহী বড় বিমান বলতে আমরা অনেকে বোয়িংকে বুঝে থাকি। কিন্তু যাত্রী পরিবহন ছাড়াও মানুষ মারার আকাশ যান নির্মানেও দক্ষতা আছে বোয়িংয়ের। আবার স্পেস স্যাটেলাইন আর মহাকাশে পাঠানো রকেটও বানায় বোয়িং। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা যে বিমানটিতে ভ্রমন করেন সেটিও বোয়িংয়ের বানানো।

কর্মাশিয়াল এয়ার প্লেন বা যাত্রীবাহী বিমান নির্মানে বোয়িং অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রতিষ্টানে পরিনত হয়েছে। বোয়িংয়ের অনেকগুলো মডেলের বিমান এখন দুনিয়া জুড়ে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্টানটি যেসব কমার্শিয়াল এয়ার প্লেন নির্মান করেছে তারমধ্যে রয়েছে বোয়িং -৭৩৭, বোয়িং ৭৪৭, বোয়িং ৭৬৭, বোয়িং ৭৭৭ এবং বোয়িং-৭৮৭। বোয়িং নতুন তিন ধরনের বিমান এনেছে এগুলো হচ্ছে বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ৭৩৭ ম্যাক্্র এবং ৭৭৭ এক্্র। বোয়িং বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা যান ও মহাকাশ যান নির্মান ও বিক্রি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য যুদ্ধ বিমান ও হেলিকপ্টার নির্মান করেছে বোয়িং। এরমধ্যে কেসি ৪৬ এরিয়াল রিফেুলিং এয়ার ক্রাফট, এ এইচ-৬৪ অ্যাপাচে হেলিকপ্টার। এ এইচ লাইট অ্যাটাক হেলিকপ্টার, বি -১ বি ল্যান্সার. বি -৫২ বোমারু বিমান, সি এইচ-৪৭ চিনুক হেলিকপ্টার, এফ এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধ বিমান, এফ-১৫, মেরিটাইম সার্ভেইল্যান্স এয়ার ক্রাফট,সহ বহু ধরনের যুদ্ধ যান নির্মান করছে প্রতিষ্টানটি। মাহাকাশ যানের মধ্যে অটোনমাস ইকো ভয়েজার, সিএসটি-১০০ স্টারলাইনার স্পেসক্রাফট রয়েছে। প্রতিনিয়ত বোয়িং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন, স্পেসলঞ্চ সিস্টেম নির্মানের সাথে বোয়িং সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্টের বিমান বহরের বিমান তৈরি করছে বোয়িং। যা এয়ারফোর্স-১ নামে পরিচিত। সময়ে সময়ে এই বিমানের আধুনিকায়ন হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প বোয়িং ৭৪৭ -২০০ বিমান ব্যবহার করে থাকেন। যেটি বিশাল ও অত্যাধুনিক। বোয়িংয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই বিমান দীর্ঘ সময় ভ্রমন করতে পারে। আকাশে জ্বালানী নিতে পারে। বিশ্বের যে কোনো বিমানবন্দরে এটি উঠানামা করতে পারে। এয়ার ফোর্স ওয়ান প্রেসিডেন্টের অফিস হিসাবে কাজ করে। বিমানটি ভেতরের আয়তন চার হাজার বর্গফুট। বিমানে আছে কনফারেন্স ও ডাইনিং রুম। প্রেসিডেন্ট ও ফার্সলেডির থাকার জায়গা। সিনিয়র স্টাফদের অফিস এরিয়া। জরুরি চিকিৎসা সুবিধার কক্ষ। বাকি অংশে প্রেসিডেন্টের অন্যান্য স্টাফ, গনমাধ্যম কর্মী ও ক্রুদের থাকার জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই বিমানে থাকে সব ধরনের স্যাটেলাইট যোগযোগ ব্যবস্থা।

আকাশ যোগাযোগ আর আকাশ যুদ্ধ বদলে দেয়া এই প্রতিষ্টানটি কিভাবে যাত্রা শুরু করেছিলো তা নিয়ে জানার আগ্রহ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিভাবে শুরু হয়েছিলো বোয়িংয়ের এর যাত্রা।
পৃথিবী বিখ্যাত বিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্টানটির আনুষ্টানিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯১৭ সালে। এর প্রতিষ্টাতা উইলিয়াম এডওয়ার্ড বোয়িংয়ের জন্ম ১৮৮১ সালের ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েডে। মা অস্ট্রিয়ান আর বাবা জার্মান। আট বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর মা তাকে পাঠিয়ে দেন সুইজার‌্যান্ডে। তিনি আমেরিকায় ফিরে আসেন ১৯০০ সালে। ১৯০৩ সালে তিনি বাবার কাঠের ব্যবসায় শুরু করেন। কিন্তু উড়োজাহাজের প্রতি তার অদম্য আগ্রহ বিমান চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি চিন্তা করেন বিমান তৈরি করার কথা। বিমান চালানোর প্রশিক্ষনের সময় বন্ধুত্ব হয়ে যায় আরো কয়েকজন বৈমানিকের সাথে। ১৯১৬ সালের ১৫ জুন তৈরি করেন বি অ্যান্ড ডব্লিউ বিমান। জর্জ কনরাডের সাথে যখন এই সি প্লেনটি তৈরি করেন তখন এর নাম ছিলো প্যাসেফিক এরো প্রোডাক্ট কোম্পানি। সফলভাবে নিজেই প্রথম উড়োজাহাজটি আকাশে উড়ান বোয়িং । এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে। দ্বিতীয় প্রকল্প ছিল একটা সি-ফোর বিমান। সেটাও সফলভাবে শেষ হয়। ১৯১৭ সালে তিনি কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে দ্য বোয়িং কোম্পানি রাখেন। এরপর মার্কিন নৌবাহিনীর কাছ থেকে ৫০টি বিমান তৈরির অর্ডার পান। এরপর বাড়তে থাকে তার ব্যবসায়। মনোযোগি হন বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ নির্মানের দিকে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বোয়িংয়ের ব্যবসায় আরো সম্প্রসারিত হয়। কারন এরপর থেকে বহু ধরনের যুদ্ধ বিমান বানায় বোয়িং। ১৯৫৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ৭৪ বছর বয়সে মারা যান উইলিয়াম বোয়িং। এরপর কোম্পানিটি তার পারিবারিক ব্যবসায়ে আরো সমৃদ্ধ হয়। শুরু থেকে মিলিটারি ইন্ড্রাস্টিয়াল কমপ্লেক্্েরর সাথে জড়িত ছিলো বোয়িং।

শতাব্দী প্রাচীন এই বিমান সংস্থাটি এখন বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। এই কোম্পানির তৈরি বিমান ৭৩৭ ম্যাক্্র। ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, কেসি ৫৬ পেগাসাস, নাসা স্টারলাইনার এবং স্পেস লঞ্চ সিস্টেমে একের পর এক নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহীকে পদ থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণা দিতে হয়েছে।
বোয়িং-৭৩৭ ম্যাক্্র উড়োজাহাজ ২০১৯ সালে মার্চ মাসে বড় ধরনের দূর্ঘটনায় পড়ে। ইথিওপিয়ার বিমান সংস্থার এই বিমানটিতে ১৫৭ জন যাত্রী ছিলো। যারা সবাই মারা যায়। এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ার লায়ন এয়ারের আরেকটি ম্যাক্্র ৭৩৭ দূর্ঘটনায় পড়ে ১৮৯ জন মারা যায়। পাঁচ মাসের মধ্যে পরপর দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে বোয়িংয়ের এই মডেল। এসব দুর্ঘটনার পর এই মডেলের উড্ডয়ন বন্ধ করা হয়। এক পর্যায়ে উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেয় বোয়িং। বোয়িংয়ের এই মডেলের বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশে এটির উড্ডয়ন স্থগিত করে। প্রতিষ্টানটি জানায়, তারা বিশ্বব্যাপী এই মডেলের ৩৭১টি উড়োজাহাজ তুলে নেবে। বোয়িং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ আবার উৎপাদনে যাবে তারা। আমেরিকার অ্যাভিয়েশন অথোরিটি ১৩ মার্চ বলেছে, স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে উভয় দুর্ঘটনার মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। এরপর ইউরোপ ও আমেরিকার আকাশে ম্যক্্র ৭৩৭ উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়। ব্যর্থতার জন্য প্রতিষ্টানটির প্রধান নির্বাহী ডেনিস মুইলেনবার্গের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়। প্রতিষ্টানটির আতœবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে বছরের শেষে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মুইলেনবার্গ। বোয়িং জানায় যে প্রতিষ্টানটির ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।