এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানের অজানা রহস্য

এফ-৩৫ বিমান - সংগৃহীত -

মানুষ বিজ্ঞান- প্রযুক্তিতে যত উন্নত হচ্ছে, যত বেশি 'সভ্য' বলে দাবি করছে নিজেকে, ততোই তারা হয়ে উঠছে আরো বেশি উগ্র, কলহপরায়ণ ও কর্তৃত্ববাদী। আর এ মনোভাব থেকেই তারা একের পর এক বানিয়ে চলেছে মানববিধ্বংসী অস্ত্র এবং প্রতিদিন সেই অস্ত্রকে করে চলেছে উন্নত থেকে উন্নততর। এরই সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে এফ-৩৫ নামের একটি জঙ্গি বিমান।

আজকাল 'নতুন প্রজন্মের বিমান' কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। উড়োজাহাজের বেলায় এই 'প্রজন্ম' কথাটি চালু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যখন প্রথমবারের বারের মতো সাবসনিক জেট বিমান নির্মিত হয়। এরপর থেকে জঙ্গি বিমানের যত নতুন প্রজন্ম এসেছে, তার প্রতিটিই আগের প্রজন্মের চাইতে প্রযুক্তি ও সামর্থ্যর দিক দিয়ে প্রাগ্রসর।
এফ-৩৫ লাইটনিং ২ হচ্ছে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমান। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি আরো শব্দবিহীন এবং একই ধরনের অন্য বিমানের সাথে সমন্বিত। এর রয়েছে সেন্সর ফিউশন ও উন্নততর লজিস্টিক সাপোর্ট, যা কিনা জঙ্গি বিমানের ইতিহাসে সবচাইতে শক্তিশালী ও ব্যাপক । এবার জঙ্গি বিমানটি নিয়ে কিছু ছোটখাট তথ্য -
এ পর্যন্ত ৪৩৫টির বেশি এফ-৩৫ নির্মাণ ও সরবরাহ করা হয়েছে। সারা বিশ্বের ১৯টি ঘাঁটিতে এটি অবতণ করে থাকে। এ জঙ্গি বিমানের পাইলটসংখ্যা ৯১০ জনের বেশি , রক্ষণাবেক্ষণকারী ৮,৩৫০ বেশি।

এই সুপারসনিক মাল্টিরোল জঙ্গি বিমানটি চলে নিঃশব্দে আর এটির রয়েছে এমন ক্ষমতা যে অন্য জঙ্গি বিমান শত্রূর যে আকাশসীমায় প্রবেশের কথা ভাবতেও পারে না, এটি সেখানেও ঢুকে যেতে পারে। কারণ, এ বিমানের প্রাগ্রসর স্টিলথ রেডারকে ফাঁকি দিতে পারঙ্গম। আগের জঙ্গি বিমানগুলোর পক্ষে এটা সম্ভবই ছিল না।
এফ-৩৫ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, পুরো যুদ্ধক্ষেত্রটিই থাকে এর নখদর্পণে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দিয়েছে নতুন ক্ষমতা ও স্বস্তি । কেননা, ইলেকট্রনিক হামলা কিংবা স্টেলথ - এরকম যে কোনো একটি ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ যুদ্ধে সফল হওয়া বা টিকে থাকা যাবে না, তা এ দেশগুলো ভালো করেই জানে।
স্পেশালাইজড এয়ারক্র্যাফটগুলোর প্রচলিত অভিযানের ধরন ছিল - আকাশযুদ্ধ, আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা, ইলেকট্রনিক হামলা, গোয়েন্দাগিরি, নজরদারি এবং শত্রূ এলাকা পরিদর্শন। এখন এর সবক'টি কাজই এফ-৩৫এর একটি স্কোয়াড্রনের পক্ষে করে ফেলা সম্ভব। এফ-৩৫এ থাকে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম। এর সাহায্যে জঙ্গি বিমানটির পাইলট শত্রূসৈন্যরা কোথায় আছে তা নির্ণয় করতে, রেডার জ্যাম করতে এবং শত্রূর হামলা ঠেকাতে পারেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়।
জঙ্গি বিমানটির অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এর পাইলট জানতে পারেন, ঠিক কখন তাকে আকাশযুদ্ধে ঢুকতে হবে। বিমানটির আছে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরার ক্ষমতা। এর সবচাইতে অনন্য ক্ষমতাটি হলো, এটি কৌশলগত পরিবেশের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানটির সেন্সর যেসব ডেটা সংগ্রহ করে, তা মুহূর্তের মধ্যেই অন্য কম্যান্ডারদের জানিয়ে দেয়া হয়, তা তারা জল-স্থল-আকাশ যেখানেই থাকুন না কেন। এছাড়া এ জঙ্গি বিমানটির পাইলটরা শত্রূর সুরক্ষিত লক্ষ্যস্থলেও হামলা চালাতে এবং তাদের রেডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

এ জঙ্গি বিমানে চড়ে এর পাইলট কিভাবে আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা চালাবেন? আগেই বলা হয়েছে, এর আছে স্টেলথ বা নিঃশব্দে চলার ক্ষমতা। ফলে পাইলট অতি সুরক্ষিত আকাশসীমায়ও নিরাপদে ঢুকে পড়তে পারেন। তার জঙ্গি বিমানটিকে কেউ, এমনকি চতুর্থ প্রজন্মের রেডারও দেখতে পায় না। এর আগের জঙ্গি বিমানগুলোর পক্ষে এটা মোটেই সম্ভব ছিল না। স্টেলথ ফিচার সংযোজন, অ্যাকটিভ ইলেক্ট্রনিক্যালি-স্ক্যানড অ্যারাই রেডার প্রযুক্তি এবং সব অস্ত্র ও জ্বালানি বহনের সক্ষমতা এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানকে দিয়েছে এমন ক্ষমতা যে এর পাইলট সহজেই সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে আকাশে থেকেই ভূমিতে বহু দূরের টার্গেটেও হামলা চালাতে পারেন। আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা চালাতে পাইলট ব্যবহার করেন প্রেসিশন গাইডেড মিউনিশন এবং এয়ার-টু-এয়ার রেডার গাইডেড মিসাইল।
এ বিমানটির সমন্বিত সেন্সর এবং তথ্য ও অস্ত্রব্যবস্থা অন্যান্য জঙ্গি বিমানের হুমকি থেকে একে অনেক বেশি সুরক্ষা দেয়। এবার দেখি আকাশ থেকে আকাশে কিভাবে যুদ্ধ করে এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান।

এফ-৩৫ এর তুলনায় প্রচলিত জঙ্গি বিমানগুলোতে আছে বেশ বড় আকারের রেডার ক্রস সেকশন। এর মানে হলো, শত্রূর রেডার এগুলোকে সহজেই দেখে ফেলবে। আকাশযুদ্ধে একটা বিষয় দেখা যায় তা হলো, প্রচলিত জঙ্গি বিমানগুলোর একে অন্যকে শনাক্ত করার এবং মোকাবিলা প্রযুক্তি দু'পক্ষেরই প্রায় একই রকম। পক্ষান্তরে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলোর পাইলট শত্রূর বিমানগুলোকে আগেই দেখে ফেলেন এবং তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক দূর থেকেই শত্রূর ওপর হামলা চালান। দূর থেকে শত্রূকে দেখতে পাওয়া এবং শত্রূর দৃষ্টির বাইরে থাকতে পারার এই ক্ষমতাই আকাশযুদ্ধে দুই প্রজন্মের জঙ্গি বিমানের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করেছে।
শব্দবিহীনভাবে চলার সুবিধা এবং অত্যাধুনিক সেন্সর ও ডেটা ফিউশনের কারণে এফ-৩৫এর পাইলটরা গোয়েন্দাগিরি, নজরদারি ও শত্রূ এলাকা পরিদর্শন করতে পারেন। এ কাজগুলো তাদের জন্য সহজ হয়ে । আগের কোনো জঙ্গি বিমানের পক্ষে এ কাজ করা সহজে সম্ভব হতো না। কারণ, পূর্ব প্রজন্মের কোনো জঙ্গি বিমানে এত শক্তিশালী ও ব্যাপকভাবে সমন্বিত সেন্সর প্যাকেজ কখনোই ছিল না।

এফ-৩৫কে এই বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন করার কাজটি করেছে একটি কোর প্রসেসর। এই কোর প্রসেসরটি প্রতি সেকেন্ডে ৪০০ বিলিয়নের বেশি অপারেশন করতে পারে। এটি শ্ত্রূর রেডার কোথায় আছে এবং কোথায় ইলেকট্রনিক যুদ্ধ শুরু হচ্ছে তা জানতে ক্লাসিফায়েড ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট থেকে তথ্য নেয়। পাইলটের ৩৬০ ডিগ্রি বাঁক নেয়ার যে ক্ষমতা, তা-ও এই কোর প্রসেসরেরই অবদান।

সত্যি বলতে কী, এফ-৩৫এর যে নিঃশব্দে চলার ক্ষমতা, সেটি কৌশলগত বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। সমন্বিত এয়ারফ্রেম ডিজাইন, অত্যাধুনি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি এফ-৩৫কে শত্রূর রেডারের ধরাছোঁয়ার বাইরেই নিয়ে গেছে। এ জঙ্গি বিমানটি নিয়ে সবরকম পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে অতীতের সকল জঙ্গি বিমানের তুলনায় এর শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেখা গেছে, এফ-৩৫ই সকল জঙ্গি বিমানের নেতা।

এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটি অন্য জঙ্গি বিমানগুলোকে দেখতে পায় এবং সেগুলোর কাছে নিজের সংগৃহীত ডেটা শেয়ার করতে পারে। যে কোনো মিশনে এটি শুধু অন্য এফ-৩৫কে সাহায্য করতে পারে তা-ই নয়, প্রচলিত অন্যান্য জঙ্গি বিমানকে সাহায্যও করতে পারে।

এরকম একটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গি বিমান, এগুলো একেকটা বানাতে কী বিপুল খরচই না পড়ে! হ্যা, খরচ তো বিপুলই। তবে এ বিমানের নির্মাণব্যয় দ্রতই কমে আসছে। প্রথম এফ-৩৫ লাইটনিং ২ জঙ্গি বিমানটি বানাতে যে খরচ পড়েছিল, সর্বশেষটি বানাতে খরচ লেগেছে তার চাইতে প্রায় ৬০ শতাংশ কম। মার্কিন সরকার, লকহীড মার্টিন কম্পানি এবং এফ-৩৫ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিম জঙ্গি বিমানটি বানানোর খরচ আরো কমিয়ে আনতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানটির আরো কয়েকটি লট বানানোর লক্ষ্যে লকহীড মার্টিন কম্পানির সাথে চুক্তি করেছে পেন্টাগন অর্থাৎ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ। প্রতি লটে থাকবে ১২, ১৩ কিংবা ১৪ টি এফ-৩৫। এয়ারক্র্যাফট, ইঞ্জিন ও ফী-সহ একটি এফ-৩৫এ জঙ্গি বিমানের দাম ৮৯.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।