নৌশক্তিতে নতুন উচ্চতায় তুরস্ক : ৫ বছরে ৬ সাবমেরিন বানাচ্ছে

তুরস্ক নৌবাহিনীতে সাবমেরিন-সংগৃহীত -

পাঁচ বছরে ছয়টি সাবমেরিন যুক্ত হতে যাচ্ছে তুরস্ক নৌবাহিনীতে। ২০২২ থেকে ২০২৭ সালে প্রতি বছর একটি করে এ নতুন সাবমেরিন পাবে তুরস্কের নৌবাহিনী। আর এর প্রতিটি সাবমেরিন তুরস্কের নিজেদের তৈরি। অপর দিকে তুরস্কের তৈরি এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জাহাজ বা বিমানবাহী রণতরী এ বছরের শেষ দিকে যুক্ত হতে যাচ্ছে তুরস্ক নৌবাহিনীতে।

টিসিজি আনাদুল নামে তুরস্কের নৌবহরে একটি শক্তিশালী যুদ্ধ জাহাজ যুক্ত হচ্ছে। এই যুদ্ধ জাহাজ আধুনিক বিমানবাহী রণতরীর ভূমিকা পালন করবে। এই যুদ্ধ জাহাজ নৌবহরে যোগ হওয়ার মধ্যদিয়ে এ বছর তুরস্ক যোগ দিচ্ছে অভিজাত বিমানবাহী রণতরী ক্লাবে। আর একই সাথে তুরস্কের নৌবাহিনী পৌছে যাবে নতুন উচ্চতায়। তুরস্কের তিন দিকে সমুদ্রবেষ্টিত।

ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্রীস সাইপ্রাসসহ অনেক দেশের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা চলছে তুরস্কের। এ পরিস্থিতিতে তুরস্ক তার নিজ দেশের নিরাপত্তা, সমদ্রসীমা ও সমুদ্র সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বমানের নৌবাহিনী অর্জনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা পরনির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশে শক্তিশালী রণতরী নির্মান ও আধুনিক নৌ প্রযুক্তি অর্জনের কর্মসূচী গ্রহণ করে। বাড়ানো হচ্ছে শক্তিশালী রণতরীর সংখ্যা। ২০২৩ সালে তুরস্ক পালন করবে প্রজতন্ত্রের শততম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী । এ সময়ের মধ্যে তারা নৌ বাহিনীতে ২৪টি শক্তিশালী নতুন রণতরী যুক্ত করবে।


নিজ দেশে তৈরি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ তথা বিমানবাহী রণতরী আনাদলুকে তুরস্কের গৌরব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আনাদুল আর সাবমেরিন বহর তুরস্ক নৌবহরে যুক্ত হওয়া নিয়ে তুরস্কে ব্যাপক জল্পনা চলছে। নৌ ক্ষেত্রে এ পদপেক্ষ ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণ সাগরে ষোল শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের যে আধিপত্য ছিল সে অবস্থায় বর্তমান তুরস্ককে নিয়ে যাবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

নৌ-শক্তিতে গুরুত্ব প্রদানের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকর বলেছেন, ইতিহাস আমাদের দেখায় যে, যে দেশ নৌশক্তিতে শক্তিশালী সে দেশ সর্বদা সর্বোচ্চ শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয়। আর যে দেশের নৌ-শক্তি নেই সে দেশ দুর্বল। আরো আগে আমাদের এ শক্তি অর্জন করা দরকার ছিল। কিন্তু এখন আমরা এই শক্তি অর্জন করতে যাচ্ছি। আগামি দিনে এই নৌশক্তি আরো সমৃদ্ধ করা হবে। তুরস্ক নেভিতে নতুন যুক্ত হতে যাওয়া ছয়টি সাবমেরিনের মধ্যে চারটি বর্তমানে নির্মানাধীন রয়েছে। পঞ্চম আরেকটির নির্মানকাজ গত মাসে উদ্বোধন করা হয়েছে।


তুরস্কের নৌবাহিনীর জন্য নির্মানাধীন যে চারটি সাবমেরিন রয়েছে তার মধ্যে প্রথমটির নির্মান শুরু হয় ২০১৫ সালে। এর নাম পিরিরাইস। এটির নির্মান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২ সালে এটি তুরস্ক নৌহরে যুক্ত হবে । তুরস্কের উত্তরাঞ্চলে গোলকোক শিপইয়ার্ডে পিরিরাইস সাবমেরিনটি পানিতে নামানো হয় নির্মানের পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করার জন্য।

এ উপলক্ষে সেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই অনুষ্ঠানে এ প্রকেল্পর পঞ্চম সাবমেরিনের নির্মান কাজ উদ্বোধন করেন এরদোয়ান। পঞ্চম সাবমেরিনের নাম সাইদাইআলিরাইস। ছয়টি সাবমেরিন বহরের অপর যে তিনটি নির্মানাধীন রয়েছে সেগুলোর নাম হিজিরাইস, মুরাতরাইস এবং আইদিনরাইস। এ তিনটি পর্যায়ক্রমে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ছয়টি সাবমেরিনের এই বহরের সাবমেরিনগুলো টাইপ-২১৪-এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালসন। এগুলো নির্মানের জন্য জার্মানির থাইসেন ক্রাপ মেরিন সিস্টেমের সাথে ২০০৯ সালে চুক্তি করে দেশটি। তুরস্কের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি প্রেসিডেন্সি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

সাবমেরিনগুলোতে থাকবে উচ্চ গতিসম্পন্ন টরপেডো ও গাইডেড মিসাইল নিক্ষেপের ক্ষমতা। গাইডেড মিসাইল সাগর ও স্থলে আক্রমন পরিচালনা করতে পারবে। প্রতিটি সাবমেরিনের দৈর্ঘ্য ২২৪ ফুট । প্রতিটির মধ্যে ৪০ জন সেনা অবস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে।

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে তুরস্ক তাদের প্রথম তৈরি এয়ার টু এয়ার মিসাইল সফলভাবে পরীক্ষা চালিয়েছে। পরীক্ষার সময় এটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম হয়। কৃষ্ণসাগর প্রদেশ সিনোপে এ মিসাইল পরীক্ষা চালানো হয়। তুরস্ক প্রথমবারের মত গকদোয়ান ও বজদোয়ান নামে দুটি এয়ার টু এয়ার মিসাইল তৈরি করছে। প্রথম পরীক্ষা চালানো গকদোয়ান মিসাইলটি স্বল্প পাল্লার। অপর বজদোয়ান হবে দূর পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র।

এ মাসের শুরুতে আঙ্কারায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (এসএসবি) ঘোষনা দেয় তুরস্ক সশস্ত্র বাহিনীতে এ বছর বেশ কিছু আধুনিক সমরাস্ত্র যোগ হবে যা নিজস্ব তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে টিসিজি আনাদলু, স্বল্প উচ্চতার হিসার-এ নামক মিসাইল, প্রথম তৈরি মেরিটাইম মিসাইল আতমাকা, টি-১২৯ হেলিকপ্টারের নতুন ভার্সন এবং আকিনচি নামক সশস্ত্র ড্রোন বিমান । নতুন যোগ হওয়া এসব সমরাস্ত্র আকাশ, স্থল এবং সাগরে তুরস্কের সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি করবে বলে জানানো হয়েছে। এসএসবি প্রধান ইসমাইল দামির জানান, আনাদুল যুদ্ধজাহাজ ২০২১ সালে ডেলিভারি দেয়া কথা থাকলেও এটি তার আগেই এ বছরের শেষ দিকে পাওয়া যাবে।
বিমানবাহী রণতরী আনাদুলর নির্মান শুরু হয় ২০১৬ সালে। এটি হবে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী। একবারের জ্বালানি দিয়ে এটি সাড়ে ১৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারবে। এ বিমানবাহী রণতরী থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫বি যুদ্ধ বিমান ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম। আকিনচি ড্রোন সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে দামির জানান, গত ডিসেম্বরে এর সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ২৪ ঘন্টা আকাশে অবস্থানে সক্ষম এ ড্রোন দেড় টন পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।

ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তাতে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ন খেলোয়াড়। ইতোমধ্যে তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইল, মিশর ও গ্রিস ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। পেছনে সমর্থন দিচ্ছে আরব আমিরাত। ভ’মধ্যসাগরে বিপুল জ্বালানীভান্ডরের নিয়ন্ত্রন এর প্রাথমিক লক্ষ্য। এজন্য তুরস্ককে মোকাবিলা করতে ইসরাইল ও মিশরের মতো দেশের নৌশক্তিকে।

ভূমধ্যসাগরের উপকুলে প্রভাবশালী দেশগুলোর নৌবাহিনীর মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা চলছে। তুরস্ক, গ্রীস, মিশর ও ইসরাইলকে ওই অঞ্চলের শক্তিশালী নৌ-শক্তি বলে মনে করা হয়। নানা রকম অস্ত্র ও সমর সরঞ্জাম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসছে লেবানন ও দক্ষিণ সাইপ্রাস।  ইসরাইলি নৌবাহিনীর তিনটি ঘাঁটি রয়েছে এ অঞ্চলে। বড় রণতরী আছে ১৩টি। এছাড়াও অ্যাসাল্ট ও টহল বোট আছে ৩০টি । তাদের মূল স্ট্র্যাটেজিক সরঞ্জাম হচ্ছে জার্মানির টাইপ ৮০০ ডলফিন ক্লাস ডিজেল ইলেক্ট্রিক সাবমেরিনগুলো। ২০০৬ সালে দেশটি আরো উন্নত ডলফিন ক্লাস সাবমেরিন কেনার অর্ডার দেয়, যেগুলো সম্প্রতি ইসরাইলে পৌঁছেছে। এসব সাবমেরিন এয়ার ইনডিপেন্ডেন্ট প্রপালসন দিয়ে সজ্জিত। এর সাহায্যে এসব সাবমেরিন অন্য যে কোনো সাবমেরিনের চাইতে বেশি সময় পানির তলায় ডুবে থাকতে পারে।

ইসরাইলি নৌবাহিনী একটি জার্মান অস্ত্র নির্মাতা কম্পানিকে পাঁচটি ডলফিন ক্লাস সাবমেরিনের অর্ডার দিয়েছিল ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে। এর মধ্যে তিনটি সাবমেরিনের দাম পরিশোধ করে জার্মান সরকার।


মিশরীয় নৌবাহিনীর প্রধান যুদ্ধসরঞ্জাম হচ্ছে চারটি এফএফজি ৭ ক্লাস ফ্রিগেট। ১৯৮১ সালে এগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হয়। এর বাইরে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী আরো পুরনো দু'টি এফএফ নক্স, দু'টি চাইনিজ চিয়াংহু এবং স্পেনে তৈরি দু'টি দেসকিউবিয়ের্তা ক্লাস ফ্রিগেট। আরো আছে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, চীন ও ফ্রান্সের তৈরী ৫০টির বেশি অ্যাসাল্ট বোট।

২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিশরের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো অস্ত্রসজ্জিত এবং আধুনিকায়নের ধুম পড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সাথে অসংখ্য বড় বড় অস্ত্র ক্রয় চুক্তি হয় মিশরের। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দু'টি মিস্ত্রাক-ক্লাস ডকড ল্যান্ডিং জাহাজ কেনার চুক্তি। ২০১৪ তার নৌবাহিনীর জন্য একটি এফআরইএমএম ফ্রিগেট এবং বিমানবাহিনীর জন্য ২৪টি রাফায়েল জঙ্গি জেট বিমান কেনার চুক্তি করে। মিশর তার সাবমেরিন ক্ষমতা উন্নয়নেও নজর দিয়েছে। তারা পুরনো দিনের সাবমেরিন বদলে ফেলে অত্যাধুনিক সাবমেরিন সংগ্রহ করেছে এবং আরো করছে।