মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কিনছে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার-সংগৃহীত - -

 

বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কিনছে। এ খবর নিশ্চিত করেছে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং। জেনস ডিফেন্স উইকলির এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ছাড়াও বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধ বিমান, মিসাইলসহ আরো বেশ কিছু সমরাস্ত্র কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বলে , আন্তর্জাতিক বিভন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। জেনসের খবরে বলা হয়েছে বোয়িং নিশ্চিত করেছে যে, তাদের এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার নির্বাচিত করেছে বাংলাদেশ । সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচীর জন্য বাংলাদেশ এ হেলিকপ্টার কিনছে। বোয়িংয়ের গ্লোবাল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিষয়ক সিনিয়র ম্যানেজার টেরি জেমিসন বলেন, মার্কিন ফরেন মিলিটারি সেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে এ কর্মসূচী এগিয়ে চলছে। তিনি জানান, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ হেলিকপ্টার কিনছে। যেখানে বোয়িং অন্য প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে ছিলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কেনার মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে সামরিক বন্ধন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বলা হয়েছে জেনসের খবরে। এদিকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কেনার খবর দিয়ে ডিফেন্স কানেক্ট ডট কম জানিয়েছে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বহুমুখী যুদ্ধবিমান, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল এবং লিফট হেলিকপ্টারসহ আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। ডিফেন্স কানেক্ট ছাড়াও আরো বেশ কিছু গণমাধ্যমে এ খবর বেরিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারসহ অন্যান্য সমরাস্ত্র সংগ্রহের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার দুটি চুক্তি করতে সম্মত হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ এক বছর আলোচনার পর হেলিকপ্টারসহ সমরাস্ত্র কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।

 

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে। অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সংগ্রহের ফলে যেকোনো অভিযানের সময় শত্রুপক্ষের পদাতিক বাহিনীকে মোকাবিলায় আকাশ থেকে স্থল বাহিনীকে সহায়তা করতে পারবে। ঢাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের সাথে বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশের উচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনা।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধ বিমান ক্রয় সংক্রান্ত সংক্রান্ত খবরে বলা হয়েছে বিমান বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী যুদ্ধ বিমানগুলো হতে হবে সম্পূর্ণ নতুন এবং বহুমুখী কার্যক্ষমতার অধিকারী। যখন চুক্তি সাক্ষর হবে তার পরে এগুলো নির্মান করতে হবে। এগুলো হতে হবে দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট । এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে একই সাথে স্থল, সমুদ্রেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। আরেক খবরে বলা হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আটটি আধুনিক যুদ্ধ বিমান কেনার চেষ্টা করছে।

অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট। এর ককপিটে দুই জন পাইলট বসতে পারে। এএইচ-৬৪ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের রয়েছে চেইন গান, রাডার সিস্টেম, এজিএম-১১৪ হেলফায়ার মিসাইল, হাইড্রা-৭০ রকেট বহন ক্ষমতা এবং এয়ার টু এয়ার আক্রমন সক্ষমতা। প্রতিটি হেলফায়ার মিসাইল একটি করে ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে। ১৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের একটি ব্যাটালিয়ন মোট ২৮৮টি হেলফায়ার মিসাইল বহন করতে পারে। অ্যাপাচি হেলিকপপ্টার মানুষবিহীন আকাশ যান বা রোবটিক ড্রোন বিমান নিয়ন্ত্রন করতে পারে।

১৯৯১ সালে ইরাক অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ব্যাপক বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করে। স্থল বাহিনীর অভিযান পরিচালনার সময় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার মাথার ওপর অবস্থান করে প্রতিপক্ষ পদাতিক বাহিনীর আক্রমন থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ভুমিকা পালন করতে পারে।
পানামা ও পারস্য উপসাগর সংঘাত, কসোভো, আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধে অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। লেবানন এবং গাজা সংঘাতে ইসরাইল এ হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে। আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধে বৃটিশ ও ডাচ এর পক্ষ থেকেও অ্যাপাচি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় অর্ধেক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সৌদি আরবে মোতায়েন করে।
১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি শুরু হওয়া অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের প্রথম আক্রমনে অংশ নেয় ৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। প্রথম আঘাতেই ইরাকের রাডার সিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। ১০০ ঘন্টার এ অপারেশনে মোট ২৭৭টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার অংশ নেয় এবং ইরাকের ২৭৮টি ট্যাংকসহ অন্যান্য সমরাস্ত্রবাহনকারী যানবাহন ধ্বংস করে। ২০০১ সালে আফগান অভিযানেও মাকিন যুক্তরাষ্ট্র অ্যাপাচি হেলিকপ্টর মূল ভূমিকা পালন করে।

২০০৩ ও ২০১১ সালে ইরাক অভিযানেও অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মাকিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিযানে বিপুলসংখ্যক অ্যাপচি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয় প্রতিপক্ষের রকেট ও মর্টার হামলায়। এ ছ্ড়াা আফগানিস্তানে ফ্রেন্ডলি ফায়ারে কয়েকটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়।
২০১৫ সালের পর থেকে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হলে ইয়েমেন অভিযানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। এ সময় উভয় দেশের বেশ কয়েকটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয় প্রতিপক্ষের আক্রমনে। ইসরাইল লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ বিরোধী অভিযানের সময় অনেকবার অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে। এতে বহু বেসামরিক লোক নিহত হয়। হামাস ও হিজবুল্লাহর অনেক শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে হেলফায়ার মিসাইল আক্রমন চালিয়ে। এর মধ্যে রয়েছেন আহমেদ ইয়াসিন, আব্দুল আজিজ আল রানতিসি ও আদনান আল গাউল। 

বোয়িংয়ের দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে ১৫টি দেশে বোয়িং কোম্পানীর অ্যাপাচি হেলিকপ্টার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে বর্তমানে ১ হাজার ১৮০টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার রয়েছে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারের প্রধান ব্যবহারকারী দেশ। এ ছাড়া গ্রিস, জাপান, ইসরাইল, নেদারল্যাল্ড, মিশর, সিঙ্গাপুর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও অ্যাটাক হেলিকপ্টার অ্যাপাচি এএইচ-৬৪ রয়েছে।

সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য , নেদারল্যান্ড, এবং দক্ষিন কোরিয়ার হাতে এ হেলিকপ্টার রয়েছে। ভারত ২০১৫ সালে ২২টি এ এইচ -৬৪ ই অ্যাটাক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কেনার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সাক্ষর করেছে। ২০১৯ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৯ সালেল ৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই পরিবেশিত খবরে বলা হয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ২০১৭ সালে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ছয়টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ক্রয়ের অনুমোদন দেয়।

 


বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়া মরক্কোর কাছে ২৪টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া অষ্ট্রেলিয়ার কাছে ২৯টি আপাচি হেলিকপ্টার বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে বোয়িং। গত ডিসেম্বরে ফিলিপাইন জানায় বোয়ি তাদেরর কাছেও অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিক্রির অফার দিয়েছে।
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৭৫ সালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে এ হেলিকপ্টার যুক্ত হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর এই হেলিকপ্টার আরো আধুনিকায়ন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জন্য আধুনিক অ্যাটাক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার প্রথম নির্মান করে হগস হেলিপ্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এটি তখন এএইচ কোবরা হেলিকপ্টারের বদলে ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ওয়াই এ এইচ -৬৪ নামক অ্যাটাক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে। সেনাবাহিনী এটা তখন বাছাই করে এবং ১৯৮২ সালে পূর্ণ উৎপাদনের অনুমোদন দেয়।  

১৯৮৪ সালে ম্যাকডোনাল্ড হগলাস হগস হেলিকপ্টার কিনে নেয়ার পর এ এইচ -৬৪ হেলিকপ্টার নির্মান অব্যাহত রাখে এবং ১৯৮৬ সালে মার্কিন আর্মি এটা ব্যবহার শুরু করে। অ্যাপচি হেলিকপ্টারের আধুনিক ভার্সন এএইচ ৬৫ ডি অ্যাপাচি লংবো হেলিকপ্টার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করা হয় ১৯৯৭ সালে।
১৯৯৭ সাল থেকে অ্যাপচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার নির্মান শুরু করে বোয়িং। এখন পর্যন্ত এর নির্মানের দায়িত্ব তাদের হাতে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২ হাজারের অধিক এ অ্যাটাক হেলিপ্টার নির্মান করে বোয়িং। ২০১৪ সালের তথ্য অনুসারে একটি এ এইচ -৬৪ই অ্যাপচি হেলিকপ্টারের দাম ২শ ৯৭ কোটি টাকা।