বিমানবাহী রণতরীর পর ব্যাপক বিধ্বংসী যুদ্ধ জাহাজ নামাল চীন

এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বড় রণতরী চীনের তৈরি নতুন যুদ্ধ জাহাজ- সংগৃহীত -

নৌ আধিপত্য প্রতিষ্টার জন্য ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসূচী নিয়েছে চীন। ডিসেম্বরে নিজেদের তৈরি  বিমানবাহী রনতরী উদ্বোধনের পর এবার ব্যাপক বিধ্বংসী এক যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করল তার নৌবাহিনীতে। গত ডিসেম্বরে চীন সম্পূর্ণরুপে তার নিজের তৈরি প্রথম বিমানবাহি রণতরী নৌবাহিনীতে যুক্ত করে।  এ বছরের  ১২ জানুয়ারি  ব্যপক ক্ষমতাসম্পন্ন টাইপ ০৫৫ গাইডেড মিসাইল ডেসট্রয়ার যোগ হয় নৌবাহিনীতে।

চীনের তৈরি নতুন এ যুদ্ধ জাহাজ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বড় রণতরী। এর নাম ন্যানচ্যাং। চীন এমন এক সময় নৌবাহিনীতে এ দুই রণতরী যোগ করল যখন সাগরে বানিজ্য পথ নিয়ন্ত্রন,দক্ষিন চীন সাগর ও তাইওয়ান নিয়ে ক্রমাগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশের সাথে উত্তেজনা বাড়ছে। 

চীনা নৌবাহিনীতে বিমানবাহী রণতরী ও ব্যাপকবিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যুক্ত হওয়াকে  বিশেষজ্ঞরা মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সম্পূর্ণরুপে দেশে তৈরি এ বিমানবাহী রণতরী আর শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের  মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি হিসবে চীনের নতুন উত্থান হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। টাইপ - ০৫৫ ধরনের বিশ্বে যত রনতরী রয়েছে তার মধ্যে চীনের এ যুদ্ধজাহাজকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিবেচনা করা হচ্ছে । শক্তির দিক দিয়ে  ০৫৫ টাইপের যুদ্ধ জাহাজের অবস্থান  মার্কিন জুমওয়াল্ট ক্লাস রনতরীর পরেই।

চীন প্রথমবারের মত এ  রনতরী আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করল তাদের নৌবাহিনীতে।  চীনা নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একে সামনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুদ্ধ জাহাজের কমিশন উপলক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ শাংডংয়ের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটি কিংদাওয়ে ওইদিন সকালে  জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ খবর দিয়েছে ।

ন্যানচ্যাং যুদ্ধ জাহাজ এয়ার ডিফেন্স, এন্টি মিসাইল, এন্টি শিপ এবং এন্টি সাবমেরিন অস্ত্রে সজ্জিত। এতে রয়েছে উন্নত রাডার, কমিউনিকেশন সিস্টেমসহ আধুনিক প্রযুক্তি ও বিধ্বংসী সব যুদ্ধাযস্ত্র।

গত বছর এপ্রিলে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে  আয়োজিত কুচকাওয়াজের সময়  বিধ্বংসী এ রনতরী প্রথম জনসম্মুখে আনা হয়। গত আট মাস ধরে সাগরে এ রনতরীর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এ জাহাজের ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতা ১২ হাজার টন। ২০১৪ সালে সাংহাইয়ে এ যুদ্ধজাহাজ নির্মান শুরু হয়। এর দৈর্ঘ্য ৫৯০ ফিট  এবং প্রস্থ ৬৫ ফিট।

বেইজিংভিত্তিক নৌ বিশেষজ্ঞ লি জিয়ে বলেন, ন্যানচ্যাং এবং এর ৫টি সিস্টার জাহাজ চীনা বিমানবাহী রনতরী স্ট্রাইক গ্রুপের সাথে মূল ভূমিকা পালন করবে। এটা বিমানবাহী রনতরী বহরের  বড়িগার্ড হিসেবেও ভূমিকা রাখবে। চারটি বিমানবাহী রনতরী স্ট্রাইক গ্রুপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। চীনা নৌবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা জানান পরিকল্পনা করেই তাইওয়ানের নির্বাচনের পরের দিন এ যুদ্ধ জাহাজ নৌবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে কারণ আমরা তাইওয়ানের সাথে উত্তেজনা চাই না।

চীনা নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে চীনের নতুন এ যুদ্ধ জাহাজ ফোর্থ  জেনারেশন ওয়ারশিপ এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন বর্তমানে চীনা নৌবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ এটি। মার্কিন নৌবাহিনীত এ ধরনের যুদ্ধ জাহাজ ক্রুজার নামে পরিচিত।

চীনা নৌবাহিনীতে নতুন এ যুদ্ধ জাহাজ যুক্ত হওয়াকে অনেকে গভীর সমুদ্রে চীনের বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। একই সাথে চীনের স্বার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সৃংসহত করার  ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতি। চীন যে নৌবহরে নতুন বিমানবাহী রনতরী যুক্ত করেছে সেটিও দেশটির নৌশক্তিকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হয়।

২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু করা চীনের নিজস্ব তৈরি বিমানবাহী রণতরী নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে কৌশলগত সামরিক অঙ্গনে। যদিও চীনের তৈরি এ বিমানবাহী রণতরী পারমানবিক শক্তি চালিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সাথে তুলনার কোনো সুযোগ নেই। তবু একে চীনা নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সাগরে বিশেষ করে  প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌ আধিপত্য মোকাবেলা চীনের একটি আধুনিক নৌবাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে একে মাইল ফলক হিসেবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।  দক্ষিন চীন সাগরে চীনের  আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় এ জাহাজ পালন করবে বিশেষ ভূমিকা।  বর্তমানে এখানে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াসহ অনেকের নজর রয়েছে। এছাড়া চীনের জ্বালানী চাহিদার বড় অংশ আসে মালাক্কা প্রনালী দিয়ে।

 চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানী চাহিদা পুরনের এই সামুদ্রিক রুট এখন সবচেয়ে বেশি ঝুকিপূর্ন হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে নৌ আধিপত্য বিস্তারের দিকে চীনের মনোযোগি হওয়া প্রয়োজন। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে সমুদ্র বন্দরগুলোকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যার নাম দেয়া হয়েছে মেরিটাইম সিল্ক রোড। নৌ আধিপত্য প্রতিষ্টার অংশ বিমানবাহী রনতরী নির্মান করা হয়েছে। চীনের  দক্ষিনে হাইনান প্রদেশের সানায়া ঘাটিতে এ বিমানবাহি রণতরীর কমিশন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনের তৈরি এ বিমানবাহী রনতরী সর্বমোট ৪৪ টি  যুদ্ধ বিমান বহন করতে পারে। এটি ১ হাজার ৩৩ ফিট লম্বা এবং ২৪৬ ফট চওড়া।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চায়না পাওয়ার প্রকল্পের সিনিয়র  ফেলো ম্যাথু পি ফুনাইল চীনের সামরিক খাতের উন্নয়ন বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন। চিনের নিজের তৈরি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন বিষয়ে তিনি বলেন, এটি চীনের জন্য একটি মাইলফক। কারণ খুব অল্প দেশের এ ক্ষমতা রয়েছে এবং দুটি বিমানবাহী রণতরীর  মাধ্যমে চীন এখন অভিজাত কাতারে শামিল হলো।

চীন ইতোমধ্যে শাংহাইয়ের নিকট ডকইয়ার্ডে তৃতীয় বিমানবাহিী রণতরী নির্মান শুরু করেছে আর চতুর্থ আরেকটি নির্মানেরও পরিকল্পনা করেছে। চারটি বিমানবাহী রণতরীরর মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান হবে যুক্তরাষ্ট্রের পর। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে ১০টি বিমানবাহি রণতরী সার্ভিস অবস্থায় রয়েছে।

চীনে বর্তমানে যে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা চলছে তার অন্যতম ক্ষেত্র হলো সামরিক খাতের অগ্রগতি। চীন মনে করে অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে যদি সামরিক খাতের উন্নতি না করা যায় তাহলে দেশের শান্তি ও নিরাত্তা ব্যহত হতে পারে বাইরের শক্তি দ্বারা। বিশেষ করে এশিয়ায় অব্যাহত মার্কিন নৌআধিপত্যকে চীন হুমকি হিসাবে দেখে থাকে। কারন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজ্স্ব নৌশক্তি ছাড়াও অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও দক্ষিন কোরিয়ার নৌ বাহিনীর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে দেশটি। চীন তার সমুদ্রসীমাকে নিরাপদ রাখা বড় হুমকি হিসাবে দেখে আসছে। 

প্রেসিডেন্ট শি জিনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনা সামরিক বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আর সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের ক্ষেত্রে  বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে। এর কারন  সাগরে আধিপত্য বিস্তার ও হুমকি মোকবেলা। 

তাইওয়ান ছাড়াও  দক্ষিন চীন সাগরে  তেল ও গ্যাস সম্পদ নিয়ে ক্রমে উত্তাপ বাড়ছে চীনের সাথে অনেক দেশের।  বস্তুত চীন পুরো কৌশলগত জলপথকে নিজের দাবি করছে। এ সমুদ্রপথে বছরে ৫ লাখ কোটি মার্কিন ডলারের বানিজ্য সম্পন্ন হয়। চীনের ক্রমাগত উত্থান মোকাবেলায় জাপান এবং অস্টেলিয়াও নৌশক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব দেশ বিভিন্ন সময় যৌথভাবে নৌমহড়া করেছে। যার উদ্দেশ্য চীনকে বিশেষ বার্তা দেয়া। 

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে এশিয়ায় সাগরে মার্কিন আধিপত্য প্রতিহত করার চেষ্টা করছে চীন। ইতোমধ্যে  চীনের রণতরীর সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ নৌ বাহিনীর অধিকারী চীন। চীন যদিও বলছে উপকূলে নজরদারি এবং বানিজ্য রুটের জন্য তাদের এ বিমানবাহী রণতরী দরকার।  আসলে এর মূল লক্ষ্য হলো  তাইওয়ানের ওপর তাদের দাবি এবং দক্ষিন চীন সাগরে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্টা।