তুরস্ক কী রাশিয়া থেকে এস-৫০০ মিসাইল কিনতে যাচ্ছে ?

রাশিয়ার তৈরি এস-৫০০ - সংগৃহীত

  • মেহেদী হাসান
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ২৩:১৭


রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে কৌশলগত সামরিক সর্ম্পক দিন দিন ঘনিষ্ট হচ্ছে। ন্যাটোর সদস্য দেশটি হয়ে উঠছে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র ক্রেতা দেশ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েব এরদোগানের মধ্যে গড়ে উঠেছে বিশেষ সর্ম্পক। এবার রাশিয়া থেকে এস-৫০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে তুরস্ক।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর হুমকি আর বাধা উপেক্ষা করে এবার রাশিয়ার কাছ থেকে আধুনিক এস-৫০০ মিসাইল সংগ্রহ করতে যাচ্ছে রাশিয়া। ২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ মিসাইল কেনার করার পর তুরস্কের সাথে সম্পর্কের বেশ অবনিত ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর অন্যান্য কয়েকটি সদস্য দেশের সাথে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে এস-৪০০ মিসাইল যাতে তুরস্ক ব্যবহার না করে। কিন্তু এরই মধ্যে তুরস্ক উদ্যোগ নিয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে আরো এক ধাপ অগ্রসর এস-৫০০ মিসাইল সংগ্রহের। ফলে এতে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আরো কিছু দেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক যে আরো অবনতি ঘটবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কিন্তু তুরস্ক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে নিজেদের রক্ষায় আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর। আর এস-৪০০ কার্যকর না করা বিষয়ে মার্কিন চাপ সম্পর্কে তুরস্ক প্রেসিডেন্ট আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, গুদামে ফেলে রাখার জন্য তারা এগুলো কেনা হয়নি।


এস-৪০০ সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে তুরস্কের এভাবে রাশিয়ার দিকে ঝুকে পড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে দায়ী করছেন অনেক সমর বিশ্লেষক। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিক প্রযুক্তি, মিসাইল ও অন্যান সমরাস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বারবার অনীহা প্রকাশ করে আসছে । রাশিয়ার এস-৫০০ ক্ষেপনাস্ত্র কেনার মাধ্যমে তুরস্ক সামরিক দিক দিয়ে এ অঞ্চলে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এস-৫০০ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যালিস্টিক মিসাইল, হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল এবং জঙ্গি বিমানসহ তীব্র গতিতে ছুটে আসা শত্রু পক্ষের অন্যান্য আকাশ অস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ-১৩৫ মিসাইল সিস্টেমের সমতুল্য আর রাশিয়ার তৈরি এর আগের এস-৪০০ মিসাইলের বর্ধিত সংস্করণ।


ন্যাটো সদনস্য তুরস্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ডিফেন্স সিস্টেম সংগ্রহের বিষয়ে আগ্রহী ছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে অনীহা দেখিয়েছে । শুধু তাই নয় সে তুরস্কের ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করে চলছে যাতে সে রাশিয়ার কাছ থেকে সংগ্রহ করা এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেম প্রয়োগ না করে। অপর দিকে ইউরোপীয় কোম্পানী ইউরোসাম থেকেও এর আগে এসএএমপি নামক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সংগ্রহের ক্ষেত্রে ফ্রান্স বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তুরস্ক।


তুরস্কের সমরাস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর এই বাধার কারনে দেশটি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি রাজনৈতিক কারনে আধুনিক অস্ত্র ও অস্ত্র প্রযুক্তি সংগ্রহে কোনো দেশ বাঁধা দেয় বা অনাগ্রহী হয় তাহলে তারা অপেক্ষা না করে বিকল্প দেশ থেকে কিনবে। সে সব দেশকে গুরুত্ব দেয়া হবে যে সব দেশে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হবে না। তুরস্কের নীতি নির্ধারকরা রাশিয়াকে এ ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে ভাল বিকল্প হিসাবে দেখছেন। রাশিয়া থেকে এস-৫০০ মিসাইল সংগ্রহের বিষয়ে সব কিছু ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছে তুরস্ক।


২০১৮ সালের মে মাসে রাশিয়া ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এস-৫০০ মিসাইল পরীক্ষা চালায়। গত ২৮ ডিসেম্বর রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে ২০২০ সালে তারা তাদের সর্বশেষ এ মিসাইল সিস্টেম আবারো পরীক্ষা চালাবে। এটি সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত করতে পারে। আর আকাশে ৬০০ কিলোমিটার দূরে থাকতেই এটি ব্যালিস্টিক মিসাইলকে আঘাত করতে পারবে । এ ছাড়া শত্রু পক্ষের ছোড়া অন্যান্য অস্ত্র ৫০০ কিলোমিটার দূরে থাকতে আঘাত করে ধ্বংস করতে পারবে। প্রতি ঘন্টায় ১১ থেকে ১৬ হাজার মাইল গতিতে ছুটে আসা শত্রু পক্ষের ১০টি হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল সনাক্ত করে ঠেকাতে বা ধ্বংস করতে সক্ষম রাশিয়ার এস-৫০০ মিসাইল। ১০ চাকার শক্তিশালী সামরিক ট্রাকে বসিয়ে এটি নিক্ষেপ করা যায়।


নিরাপত্তা বিষয়ক তুরস্কের একজন সিনিয়র কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স নিউজকে জানিয়েছেন, তূরস্কের যেসব অস্ত্র দরকার তা যদি পশ্চিমা দেশগুলো দিতে না চায় তাহলে তুরস্ক তা রাশিয়ার কাছ থেকে সংগ্রহের জন্য সম্ভাব্য যা যা করা দরকার তা করবে। এ বিষয়ে তুরস্ক তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
তুরস্ক ন্যাটো মিত্রদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে গত বছর রাশিয়ার কাছ থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার খরচ করে এস-৪০০ মিসাইল সংগ্রহ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের সাথে এফ-৩৫ ফাইটার জেট কর্মসূচী স্থগিত করে। এরপরপরই ২০১৯ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট এরদোগান জানান, তুরস্ক-রাশিয়া যৌথভাবে এস-৫০০ মিসাইল তৈরি করতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান সরবরাহ বন্ধ করার কারনে তুরস্ক আরো বেশি মাত্রায় রাশিয়ার দিকে ঝুকে পড়ছে। এই যুদ্ধ বিমান সংগ্রহের জন্য তুরস্ক বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। তুরস্কের পাইলটরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষন গ্রহন করে। তুরস্ককে এফ-৩৫ সরবরাহের অস্বীকৃতির পর খুব স্বাভাবিকভাবে বিকল্প অনুসন্ধান করা ছাড়া কোনো পথ ছিলো না। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর যুক্তি ছিলো এফ-৩৫ এবং এস-৪০০ পরস্পরবিরোধী। ফলে একই দেশ দু ধরনের অস্ত্র কিনতে পারে না। অপরদিকে তুরস্ক প্রস্তাব দিয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপনাস্ত্র কেনার। শেষ পর্যন্ত সে আলোচনা আর এগোয়নি।


গত ডিসেম্বরে তুরস্ক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হুলুসি আকর বলেন, এস-৪০০ মিসাইলের দ্বিতীয় বহর সংগহের জন্য মস্কোর সাথে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া যৌথভাবে এস-৪০০ মিসাইল তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তৃতীয় কোনো দেশে তুরস্ক কর্তৃক এস-৪০০ মিসাইল রপ্তানির বিষয়েও রাশিয়ার সাথে চুক্তির জন্য আলোচনা চলছে। এটি ছিলো এফ-৩৫ থেকে বাদ দেয়ায় তুরস্কের পাল্টা প্রতিক্রিয়া। এদিকে ইউরোসামের সাথে তুরস্কের এসএএমপি মিসাইল যৌথ উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে ফ্রান্স বাধা সৃষ্টি করলে তুরস্ক ইতালির সাথে এ বিষয়ে চুক্তি করবে বলে জানিয়েছে।


তুরস্ক এখন ক্ষেপনাস্ত্র নির্মানে বিদেশি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠার পরিকল্পনা করছে। ২০০০ সাল থেকে তুরস্ক চেষ্টা করে আসছে দূর পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে দেশটি স্বল্প পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০২১ সাল থেকে হিসার -এ নামক এ ক্ষেপনাস্ত্র তারা পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনে যাবে। এটি সামরিক ঘাটি, নৌ বন্দর, বিমান বন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার সুরক্ষায় উপযুক্ত। এর সর্বোচ্চ ক্ষমতা হলো ক্রুজ মিসাইল ধ্বংস করতে পারা। এ ছাড়া ২০২২ সালে মধ্যে তুরস্ক হিসার - ও নামে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্রও তৈরি করতে যাচ্ছে। নিজ দেশে তৈরি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার এ ক্ষেপনাস্ত্র তৈরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন শক্তি যোগ করবে।


ভূকৌশলগত গুরুত্বপূর্ন দেশ তুরস্ক রাশিয়ার দিকে অব্যাহতভাবে ঝুকে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা উদ্বিগ্ন। তুরস্কের সামরিক উন্থানের একক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জার্মানী ও ফ্রান্সের মতো ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলো নানা ভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু এর ফল হচ্ছে আরো উল্টো। রাশিয়ার সাথে এখন যৌথভাবে সমরাস্ত্র উৎপদানের দিকে যাচ্ছে তুরস্ক। যা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সর্ম্পকের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।