আমেরিকায় সুপার এলিটদের অন্তরালের লড়াই

সুপার এলিটদের এক অংশের পছন্দ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অপর দিকে এবছর অন্যদের নিরুপায় পছন্দ হলো নড়বড়ে প্রার্থী জো বাইডেন। দুজনেই অন্যের পুতুল - ইন্টারনেট

  • মেহেদী হাসান
  • ১৫ জুন ২০২০, ২৩:৪৫

যুক্তরাষ্ট্রে উঁচুতলায় বসে যারা রাষ্ট্রের কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন যারা তাদের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয় ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে। এ বিভক্তি তৈরি হয় ট্রাম্পের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে উঁচুতলার এ সুপার ধনীদের অন্তরালের লড়াই এখনও আছে। ট্রাম্পের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রায় সব আমেরিকানদের অবস্থা গত চার বছর ধরে অনেক নাজুক। সহসা এ থেকে পরিত্রানেরও কোনো পথ দেখছেন না।

অনেক আমেরিকান মনে করেন, করোনা এবং কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা কেন্দ্র করে চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রুপ বেড়িয়ে আসছে। ট্রাম্পের পক্ষে আর বিপক্ষে সবারই অবস্থা শোচনীয়। ট্রাম্পের বিপরীতে ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনকে একজন নড়বড়ে আর ফ্যাকাশে ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের বিরোধী সুপার ধনী আর সাধারণ মানুষও অনেকটা নিরুপায় হয়ে তাকে সমর্থন করছেন। কিন্তু ক্ষমতায় যেই আসুক তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বর্তমান দুরবস্থা থেকে বের করে আনতে পারেবন কি না তা নিয়ে অনেকে শঙ্কিত। অনেকের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরো কঠিন আর ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়ন অনেক মানুষকে ধাধায় ফেলে। কারণ এর আছে জানুস মূর্তির মতো দুই দিকে মুখ। এর এক দিকের চেহারা প্রকাশ্যে থাকে তো আরেক পাশ থাকে অন্ধকারে বা পেছনে। তবে দুই চেহারাই নিয়ন্ত্রণ করে একটি মাথা। অনেকে এ দ্বিমুখী মাথাকে ডিপ স্টেট বলে থাকেন। এমনকি ডিপ স্টেট নিজেকেও ‘ডিপ স্টেট ইন এ ডাবল ফেক’ হিসেবে অভিহিত করে। তার মানে এটা মানুষকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে। ডিপ স্টেটের অনেক নাম দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে তার মধ্যে এখানে শুধু একটি নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। সেটা হলো ‘পাওয়ার এলিট’। এরা উচু তলার, সুপার ধনী। তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওয়াল স্ট্রিট, গোয়েন্দা সংস্থা, করপোরেট মিডিয়া, ইন্টারনেট, মিলিটারি এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করে।

এরা হলো ধনী আর পরকালে অবিশ্বাসী। নিজেদের ছাড়া বাকী বিশ্বের জন্য একফোটা দরদও নেই এদের। এরা কাজ চালায় গোপনে। এরা নিজের দেশের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্য প্রতিষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পভৃতি। তাদের রক্তধারার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ আর যুদ্ধের প্রস্তুতি। আর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক লুন্ঠন। তবে সব ধনীরা তাদের এই প্রক্রিয়ার অংশ নয়। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই এই অপরাধ আর মুনাফার সহযোগী এবং ভাগীদার।

এই পাওয়ার এলিট সব সময় শ্রেণিযুদ্ধ লাগিয়ে রাখে তাদের আধিপত্য এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য। এখন পর্যন্ত তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে বর্ণবাদ ভীতি। আর এটা করছে তাদের শ্রেণিযুদ্ধকে আড়াল করার জন্য। আর এটা শেষ পর্যন্ত তারা নিয়ে যেতে চায় মার্শাল ল বা সামরিক শাসন জারি করার দিকে। শীঘ্র তারা ফিরে আসবে করোনা ভাইরাস প্রতারণায়।

লকডাউনের কারণে অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। কোটি কোটি মানুষের জীবন জীবিকার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। আর ব্যাপক মাত্রায় নেমে এসেছে দারিদ্র্য। আসতে পারে অনেক বড় দুর্ভিক্ষ আর আরো বেশি মৃত্যু। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ আবেদন করেছে বেকার ভাতার জন্য। আর চাকরি হারানোর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে মহামন্দার সময়কে।
বর্তমানে যে শ্রেণী যুদ্ধের চেষ্টা চলছে তা নতুন নয়। কিন্তু বর্তমানে এটা দ্রুত গতিতে ঘটছে কারন এই এলিট পাওয়ারের হাতে রয়েছে প্রযুক্তি এবং এ প্রযুক্তি তাদের ক্ষমতা আরো অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এটা ঘটছে রিপাবলিকান বনাম ডেমোক্রেট ছাদ্মাবরনে। আশা জিইয়ে রাখা হলো তাদের মূল কৌশল। আর তাদের গেম পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বর্ণবাদ।

এই সুপার এলিটদের এক অংশের পছন্দ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অপর দিকে এবছর অন্যদের নিরুপায় পছন্দ হলো নড়বড়ে প্রার্থী জো বাইডেন। দুজনেই অন্যের পুতুল। সাধারণ মানুষ যুদ্ধে লিপ্ত এদের মধ্যে কে ভাল সে তর্ক নিয়ে। এরা বাস করে ডলস হাউস বা পুতুলের বাড়িতে।

অনেকের মতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র হলো এমন এক জায়গা যেখানে ভ্রান্তি দখল করে আছে বাস্তবতার পরিবর্তে। চলছে ২৪ ঘন্টা ধরে প্রপাগান্ডা। জর্র্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনায় অনেক ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় বের হয়ে আসে। অভিযোগ রয়েছে ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশকারী পুলিশ ব্যাপক লুটপাট শুরু করে। পরিকল্পনামাফিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কৃষ্ণাজ্ঞাহত্যা নিয়মিত ঘটছে। অনেকের অভিযোগ এ ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কেউ একজন একটি সুইচ অন করেছে। কারণ এ ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার একদিন আগেও মানুষ করোনার ভয়ে মাস্ক আর ঘরবন্দী ছিল। আবার অনেকের আছে ভিন্নমত যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত কৃষাজ্ঞ হত্যার ঘটনা ঘটলেও সর্বশেষ হত্যার সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটি করোনায় বিধ্বস্ত আর কোটি কোটি মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত। তারও বহিপ্রকাশ ঘটছে রাস্তায় জর্জ ফ্লয়েড হত্যার জের ধরে। এ ছাড়া দীর্ঘ বর্ণবাদী বিরোধী তীব্র ক্ষোভ তো রয়েছেই মানুষের মধ্যে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিক্ষোভের পেছনে কারন যাই থাকুক না কেন সামনে আরো বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বলে অনেকের বিশ্বাস। একের পর এক আশ্চর্যজনক ঘটনার অবতারণা হতে পারে বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়ন অনেক মানুষকে ধাধায় ফেলে। কারণ এর আছে জানুস মূর্তির মতো দুই দিকে মুখ। এর এক দিকের চেহারা প্রকাশ্যে থাকে তো আরেক পাশ থাকে অন্ধকারে বা পেছনে। তবে দুই চেহারাই নিয়ন্ত্রণ করে একটি মাথা। অনেকে এ দ্বিমুখী মাথাকে ডিপ স্টেট বলে থাকেন-ইন্টারনেট
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়ন অনেক মানুষকে ধাধায় ফেলে। কারণ এর আছে জানুস মূর্তির মতো দুই দিকে মুখ। এর এক দিকের চেহারা প্রকাশ্যে থাকে তো আরেক পাশ থাকে অন্ধকারে বা পেছনে। তবে দুই চেহারাই নিয়ন্ত্রণ করে একটি মাথা। অনেকে এ দ্বিমুখী মাথাকে ডিপ স্টেট বলে থাকেন-ইন্টারনেট

 

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে থেকে ডিপ স্টেট দুই ভাগে বিভক্ত হয় এবং তাদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা নিয়ে। এ লড়াইয়ে একটি দল পক্ষ নেয় ট্রাম্পের এবং আরেকটি দল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তখন বিস্মিত হয়েছে আমেরিকানরা।

ডিপ স্টেটের যারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তারা মর্মাহত। সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিপ স্টেটের মধ্যে অন্তরালে লড়াই চলছে। ট্রাম্প বিরোধী ডিপ স্টেট ট্রাম্পকে উৎখাত করতে না পারলেও অন্তত দেখাতে চাচ্ছে যে, তারা কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পকে ইমপিচমিন্ট এর চেষ্টা করা হয়েছে।

ডেমোক্রেটদের মিডিয়া জোট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিরন্তর লেগে আছে। তবে এ আক্রমন ছিল খুবই হালকা আর অগভীর। কোটি কোটি মানুষ বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্যক্ত বিরক্ত, ক্ষুব্দ, হতাশ আর ক্রোধে ফেটে পড়ার অবস্থায় রয়েছে। যারা ট্রাম্পের পক্ষে আর বিপক্ষে উভয় পক্ষের মানুষ গত চার বছর ধরে একই দশায় রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প বিরোধীরা ট্রাম্পকে চিত্রায়িত করেছে একজন অশুভ ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্প এখনো চ‚ড়ায় বসে আছেন, পরিকল্পিতভাবে। উঁচুতে তুলে ধরে আছেন বাইবেল। ট্রাম্প দারুণ একজন অভিনেতা। যেমনটি তার করার কথা তেমনটিই সে করে যাচ্ছে। ক্ষোভ আর নির্বুদ্ধিতা উস্কে দিচ্ছে। যেমনটা মুসোলিনির স্টাইল। তবে তার সেই অদ্ভুত চুল, বিরক্তিভাব ছাড়াও এখানে আছে চাতুরী।

আর তার এই নীতিতে কারা লাভবান হচ্ছে? অবশ্যই সেই সুপার ধনীরা, পাওয়ার এলিট। যারা ‘কেয়ারস এ্যাক্টে’র নামে ৬ থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেহাত করেছে। এটা ছিল রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে দ্বি পাক্ষিক ব্যাঙ্ক ডাকাতি। আর এটা করা হয়েছে কোভিড-১৯ এর ছত্রছায়ায়। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া আর মারা যাওয়ার ঘটনাকে তারা ব্যবহার করেছে মানুষকে ভীত আর ঘরবন্দী থাকার জন্য। আর রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট ব্যাঙ্ক ডাকাতারা সমস্বরে চিৎকার করে কেবল বলেছে ‘উই কেয়ার’। আমরা আপনাদের পাশে আছি আপনাদের রক্ষার জন্য।

বিশ্লেষক এডওয়ার্ড কার্টিন লিখেছেন, ২০০৯ সালে বারাক ওবামাও এভাবে ওয়াল স্ট্রিট আর ধনী ব্যাঙ্কারদের বাঁচিয়ে দিয়ে কালোদের বঞ্চিত করে আমাদের যত্ন নিয়েছিলেন। ওবামা ছিলেন সাদা হ্যাটের নিচে কালো ব্যক্তি। আর ট্রাম্প হলেন কালো হ্যাটের নিচে সাদা ব্যক্তি।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে