গৃহযুদ্ধের দিকে আমেরিকা

জর্জ ফ্লয়েডের সম্মানে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে হাত উঁচু করে জনতার স্লোগান - চন্দন খানা, এএফপি

  • মেহেদী হাসান
  • ০৯ জুন ২০২০, ১৭:৩৯

বিশৃঙ্খল বিপর্যয়ে নিমজ্জিত বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাস ধরে করোনায় বিধ্বস্ত গোটা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চলছে প্রতিবাদ বিক্ষোভ । কৃষ্ণাজ্ঞ জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ গলা টিপে হত্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ রুপ নেয় অন্যায় অবিচার আর শোষন লুন্ঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে। অনেকের মতে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ রুপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দানা বেধে উঠছে অনিবার্য গৃহযুদ্ধের পরিবেশ।

করোনার কারনে আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভেঙে পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন । সে কারনে ট্রাম্প প্রশাসন অনেক আগেই সেনাশাসন জারির সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আর বর্তমানে চলমান বিক্ষোভ দমনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনা মোতায়েনের জন্য জোর চেষ্টা করছেন। বিক্ষোভ দমনে ন্যাশনাল গার্ড ও পুলিশের অ্যাকশনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা চলছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে নেতৃত্বের ব্যর্থতার। এমনকি তিনি আমেরিকানদের বিভক্ত করার কাজে লিপ্ত বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার বিক্ষোভ কবলিত এলাকাকে ঘোষণা করেছেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। পরে অবশ্য তিনি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ট্রাম্পের সেনা মোতায়েনেরও বিরোধিতা করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল জেমস ম্যাটিস বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকানদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করছেন। তিনি আমেরিকাকে উপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। জেমস বলেন, আমার জীবনে দেখা ট্রাম্প হলেন আমেরিকার কোনো প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ রাখার কোনো চেষ্টা করছেন না। উল্টো তিনি আমেরিকানদের বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। গত তিন বছর ধরে তার এ চেষ্টা এবং অনুপযুক্ত নেতৃত্বের ফল এখন দেখতে পাচ্ছি। বিক্ষোভ দমনে সেনা ব্যবহারেরও নিন্দা জানান তিনি।

ম্যাটিস বলেন, নিজ দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য সেনাবাহিনীকে আদেশ করা হবে এটা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। প্রেসিডেন্টকে ছাড়াই আমেরিকানদের একত্রিত হতে হবে। ট্রাম্প সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পর ২০১৮ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন জেমস ম্যাটিস।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে সক্রিয় সৈন্য মোতায়েনের হুশিয়ারি দেন । এ ছাড়া রাজ্য গর্ভনরদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন যাতে ন্যাশনাল গার্ডের মেতায়েন করা হয়। কিন্তু গর্ভনররা তাতে খুব একটা সাড়া দেননি। এতে ট্রাম্প অনেক গর্ভনরের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিক্ষোভ দমনে সক্রিয় সৈন্য এবং ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন বিষয়ে ট্রাম্পের চাপ সৃষ্টি নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে সামরিক সদর দফতর পেন্টাগন।

ট্রাম্প যখন সেনা মোতায়েন নিয়ে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন এমন অবস্থায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়ে দেন তিনি সক্রিয় সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধে। ফলে সেনা মোতায়েন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। মার্ক এসপার ৩ জুন বলেছেন তিনি চলমান বিক্ষোভ দমনে সক্রিয় সৈন্য নামানো সমর্থন করেন না। পেন্টাগনে সাংবাদিকদের মার্ক এসপার বলেন, কেবলমাত্র ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েনের কথা চিন্তা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে তেমন অবস্থা বিরাজ করছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় মনে করছে চলমান বিক্ষোভ দমনে সেনা মোতায়েন হিতে বিপরীত হতে পারে। এটা সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তা সঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান নেতা প্যাট রবার্টসন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন সেনা মোতায়েনের হুমকি এবং বিক্ষোভ দমনে তার কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে।

রবার্টসন বলেন, যখন শান্তির বানী শোনানো দরকার তখন ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, আই এ্যম দি প্রেসিডেন্ট অব ল এন্ড অর্ডার। তিনি ট্রাম্পকে এ থেকে বিরত থাকার আহবান জানান। রবাটর্সনের এ সমালোচনাকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন অনেকে। কারন তিনি হলেন শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাম্পের একজন ঘোরতর সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্টার যে অন্দোলন তা দেশটির গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরছে না বলেও অভিযোগ আছে।

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক পেপ এসকোবার লিখেছেন এ বিপ্লব টিভিতে প্রচারিত হবে না। কারন এটা কোনো বিপ্লব নয়। অন্তত এখন পর্যন্ত। লুটপাট আর আগুন সামান্য ঘটনা। কেউ এখনো পেন্টাগন, এফবিআই, নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ, ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট, সিআইএ এবং ওয়াল স্ট্রিটের বাড়ি ঘর টার্গেট করেনি। প্রকৃত লুটেরা শাসক শ্রেনী সুরায় চুমুক দিতে দিতে পরিস্থিতি দেখতে টেলিভিশনের ক্যামেরায় চোখ রাখছে।

হোয়াইট হাউজের কাছাকাছি বিক্ষোভকারীরা সড়কচিহ্নর ওপর লাফিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ছবিটি তোলা হয়েছে ৩১ মে- এএফপি
হোয়াইট হাউসের কাছাকাছি বিক্ষোভকারীরা সড়কচিহ্নর ওপর লাফিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ছবিটি তোলা হয়েছে ৩১ মে- এএফপি

 

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলা বিক্ষোভকে এসকোবার দেখছেন বর্ণবাদ বিরোধী যুদ্ধের পরিবর্তে এক ধরনের শ্রেনীযুদ্ধ হিসাবে। কিন্তু সেটাকে শুরুতেই হাইজ্যাক করে কেবল বর্ণবাদী রুপ দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অহরহ কৃষ্ণাজ্ঞ হত্যার ঘটনা ঘটে শ্বেতাঙ্গদের হাতে। অনেক ক্ষেত্রেই এর কোনো বিচার হয় না । বিচার হলেও তেমন কোনো সাজা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে হয় নামে মাত্র শাস্তি। সামান্য ঘটনায় যখন তখন শ্বেতাঙ্গদের হাতে কৃষ্ণাজ্ঞ হত্যার ঘটনা ঘটলেও সবক্ষেত্রে বড় আকারে কোনো প্রতিবাদ হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের এবনরমাল সমাজে এটাই নরমাল ঘটনা। জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনাও হয়তো নরমাল ঘটনা হিসেবে সবাই মেনে নিত। কিন্তু করোনা, লকডাউন, মানুষের বন্দীত্ব, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, ট্রাম্প প্রশসানের সাবির্ক অব্যবস্থাপনা, নৈরাজ্য আর বিশঙ্খলার কারনে ক্ষুব্ধ মানুষ এ ঘটনার জের ধরে রাস্তায় নেমে এসেছে। এ প্রতিবাদ কেবল মাত্র একটি হত্যা ঘটনার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। কেবল মাত্র বর্ণবাদ বিরোধী প্রতিবাদেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং সার্বিক শোষন বৈষম্য, উচু মহলের লুটপাট, দুর্ণীতি, অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক নেতৃতের¡ ব্যর্থতার বিরুদ্ধে শ্রেণী লড়াই।

এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত প্রবন্ধে পেপ এসকোবার লিখেছেন কোনো সন্দেহ নেই যুক্তরাষ্ট্র একটি জটিল গৃহযুদ্ধের পাকে আটকা পড়তে যাচ্ছে। যেমনটি ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিং হত্যার পর। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার স্লোগানের মধ্যে হয়তো আমেরিকায় দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের উসকানিদাতা বোগালু বয়েজের সাথে কিছুটা মিল আছে। কিন্তু শেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা চেষ্টা করছে বর্ণবাদকে উস্কে দেয়ার।

সহিংস বিক্ষোভের জন্য এন্টিফাকে দোষ দেয়া হচ্ছে কিন্তু এন্টিফা বর্তমানে ফ্যাসীবাদ বিরোধী বনাম ফেসিস্ট হোয়াইট সুপ্রিমেস্টিদের মাঝখানে পড়েছে। সাংবাদিক পেপ এসকোবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইতিহাসে আবার অপারেশন ফনিক্স, অপারেশন জাকার্তা এবং অপারেশন গ্ল্যাডিওর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তবে এবার তা পৃথিবীর দক্ষিনে নয় ঘটতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজ দেশে।

অপারেশন ফনিক্স হলো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সিআইএ পরিচালিত গোপন অপারেশন যেখানে ভিয়েতমানমীদের অপহরণ এবং হত্যা মিশন চালানো হয় । ১৯৬৫ থেকে ৯৭২ সাল পর্যন্ত আট হাজার সাধারণ ভিয়েতনামী নারী পুরুষদের হত্যা করা হয় এ অপারেশনের মাধ্যমে। অপারেশন জাকার্তা হলো ইন্দোনেশিয়ায় কমিউস্টি নিধনের নামে প্রায় ১০ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইন্দোনেশিয়ান আর্মি ১৯৬৫ সালে এ নিধনজজ্ঞ চালায়।

রাশিয়ায় পেট্রোগ্রাডে রুটির সঙ্কট থেকে ১৯১৭ সালে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বতর্স্ফূত গণজাগরণ ঘটেছে। করোনার কারনে প্রায় ৩ কোটি আমেরিকান চাকরি হারিয়েছে। সুতরাং যে পুলিশী বর্বতার মধ্য দিয়ে গণজগারনের সূচনা তা অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যে বিক্ষোভ তা মানুষের আবেগের প্রকাশ এবং স্বতস্ফুর্ত। এখানে কোনো রাজনৈতিক কাঠামো নেই। আমেরিকার দুঃখজনক পরিস্থিতি জনসাধারনের কাছে তুলে ধরার মত নেই কোনো ক্যারিশমাটিক নেতা। এ ঘটনাকে রাজনৈতিক রুপদানের বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারেরও কোনো আয়োজন নেই ।
আসলে বড় ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সঙ্কটে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্যারিশম্যাটিক নেতার অভাব পরিলক্ষিত।

আমেরিকানরা এখন ভিয়েতনাম, এলসালভাদর, পাকিস্তানী উপজাতি এলাকা অথবা বাগদাদের সদর সিটির পরিস্থিতির মুখোমুখিা। ইরাকি গেরিলার এখন ফিরে এসেছে ওয়াশিংটনে। মার্ক এসপার সহিংস বিক্ষোভ এলাকাকে ঘোষণা করেছেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। যে আমেরিকান সেনা ব্যবহার করা হয়েছে ইরাক আফগানিস্তানে তাদের এখন মোতায়েন করা হবে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে। ৮২ এয়ারবর্ণ ডিভিশিন, ১০ মাউনটেন ডিভিশন এবং ১ ইনফ্রেন্টি ডিভিশনের সৈন্যরা পরাজিত হয়েছে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক এবং সোমালিয়ায়। এইসব ডিভিশনের সৈন্যদের আনা হয়েছিলো ওয়াশিংটনের কাছে এন্ড্রুজ বিমান ঘাটিতে।

প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে