করোনা ভাইরাসে বিশ্বে বহু অভিজাত ব্যবসায় ধস নেমেছে। এমনই একটি খাত হচ্ছে বিমান চলাচল শিল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান শিল্প নজিরবিহীন সংকটে পড়ছে। চলছে হাজার হাজার কর্মী ছাটাই। তারা একে তুলনা করেছেন পাহাড়ের চূড়া থেকে ধপাস পতনের সঙ্গে। বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে চলতি মে মাসের মধ্যেই বিশ্বের বেশিরভাগ বিমান সংস্থা দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে হুশিয়ার করে দিয়েছেন তারা।
বোয়িং ও এয়ারবাসের মত শীর্ষ স্থানীয় বিমান নির্মাতা থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মত বিমান সংস্থা এখন ভয়াবহ সংকটের কবলে। বিমান শিল্পের বর্তমান অবস্থার কিছু দিক আমরা আজ তুলে ধরবো
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মার্চ মাসে বিশ্বে বিমানযাত্রী কমেছে ৫৩ শতাংশ। এর মানে হলো যাত্রী অর্ধেকে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সমিতি আইএটিএ বলেছে, বিমান সংস্থাগুলোর বিনা বাধায় পতন ঘটছে। আশঙ্কার কথা হচ্ছে এখনো তলানিতে ঠেকেনি তারা। আইএটিএ বলেছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন দুরাবস্থায় আর পড়তে হয়নি তাদের।
আইএটিএর সদস্য বিশ্বের ২৯০টি বিমান সংস্থা। বিশ্বের মোট উড়ানের ৮২ শতাংশই পরিচালনা করে থাকে । সব সংস্থাই এমন ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আইএটিএর মহাপরিচালক অ্যালেক্সজান্ডার ডি জুনিয়াক বলেছেন, মার্চ মাসটি ছিল বিমানসংস্থাগুলোর জন্য বিপর্যয়কর। এ সময় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয়ক্ষেত্রেই তাদের যাত্রীসংখ্যায় ধস নেমেছে। আইএটিএ জানিয়েছে, তাদের বিমানসংস্থাগুলোর দুই তৃতীয়াংশ বিমানই এখন বেকার বসে আছে।
পরিস্থিতি সামলাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান নির্মাতা বোয়িং ও এয়ারবাস এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানসংস্থা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ হাজার হাজার কর্মী ছাটাইয়ের পরিকল্পনা করছে। ২০০৬ সালের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।
আইএটিএ বলেছে, এখন বিমানের চাহিদা ২০০৬ সালের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। অথচ সেই সময়ের তুলনায় তাদের বিমানের বহর ও কর্মী সংখ্যা দ্বীগুণ হয়েছে । তাদের আশংকা এপ্রিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
মার্চে এশিয়া ও প্যাসিফিকে বিমান চলাচল কমেছে ৬৫ শতাংশ, ইউরোপে ৫৪ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় ৫৩ শতাংশ। আফ্রিকায় করোনার প্রকোপ কম হলেও সেখানেও বিমান চলাচল কমেছে ৪২ শতাংশ।
এ সংকট থেকে বাঁচতে আমেরিকার বিমান নির্মাতা বোয়িং ১০ শতাংশ কর্মী ছাটাই করার ঘোষণা দিয়েছে। বোয়িংয়ে কর্মরত আছে ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি কর্মী। তার মানে হচ্ছে অন্তত ১৬ হাজার কর্মী চাকরি হারাচ্ছেন। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বোয়িং ৬৪ কোটি ডলার লোকসান গুনেছে।
বোয়িংয়ের ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দী এয়ারবাসও প্রথম প্রান্তিকে ৫১ কোটি ডলার লোকসান গুনেছে। সম্প্রতি বিমান উৎপাদন এক তৃতীয়াংশ হ্রাস করেছে এয়ারবাস।
এয়ারবাসের সিইও গুইলম ফাউরি বলেছেন, তারা ৬ হাজার কর্মীর জন্য সরকারি বেতনের চেষ্টা করছেন। চার মহাদেশেই কারখানা রয়েছে এয়ারবাসের। ফাউরি বলেছেন, সংকটের কেবল শুরু। বিমান নির্মাতাদের জন্য এর আগে এতোবড় সংকট আর আসেনি।
বিমানের ইঞ্জিন নির্মাতা জেনারেল ইলেকট্রিক বলেছে, প্রথম প্রান্তিকে তাদের মুনাফা ৩৯ শতাংশ কমে গেছে। সংস্থাটির সিইও লরেন্স কাল্প বলেছেন, তারা এখন ঝড়ের মুখে রয়েছে। এ ঝড় হয়তো আরো কিছুদিন চলবে।
এয়ারলাইনগুলো বিমান নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ পাঠাচ্ছেন যে তারা ইতোপূর্বে যেসব বিমানের অর্ডার করেছিলেন সেগুলোর ডেলিভারি আরো দেরিতে নিতে চান। যেমন বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সাউথইস্ট এয়ারলাইন্স বলেছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা অর্ধেক বিমান ডেলিভারি নিতে চান। বিমান বিক্রির পাশাপাশি বোয়িংয়ের সার্ভিস থেকে আয়েও ধস নেমেছে।
বোয়িং ২০২২ সাল পর্যন্ত ৭৮৭ বিমানের উৎপাদন অর্ধেকে নিয়ে আসবে। ৭৭৭ বিমানের উৎপাদনও কমানো হবে। এছাড়া ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের উৎপাদনের ধীর চলো নীতি গ্রহণ করেছে কোম্পানিটি।
শিকাগো ভিত্তিক বোয়িং বলেছে, তারা সরকারের কাছ থেকে ঋণ পাবার চেষ্টা করছে। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত ৩৮৯০ কোটি ডলার ঋণগ্রস্ত।
বোয়িংয়ের সিইও ডেভ কালহাউন বলেছেন, বাণিজ্যিক বিমানের চাহিদা কমছেই। এটা যেন পাহাড়ের চূড়া থেকে পড়ার মত ঘটনা। তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার আগে এ শিল্পের যে অবস্থা ছিল সেখানে পৌছাতে আরও বহু বছর লেগে যেতে পারে।
করোনা সংকটের কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ১২ হাজার কর্মীকে ছাটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এয়ারবাসও বলেছে, বিমান সংস্থার নজিরবিহীন দুর্দিন কেবল শুরু হয়েছে। এমন ভয়াবহ সংকটে বিমান সংস্থাগুলো আগে কখনো পড়েনি। কবে উড়োজাহাজগুলো আবার ডানা মেলবে সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই।
চলতি বছর এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৬০ শতাংশ পড়ে গেছে। ফ্রান্সে এয়ারবাসের ৩ হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। ব্রিটেনে ৩২০০ কর্মীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জার্মানিতে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
করোনা সংকটের কারণে আরেক শীর্ষস্থানীয় বিমান নির্মাতা ব্রিটেনের রোলস রয়েস ৮ হাজার কর্মীকে ছাটাই করতে যাচ্ছে। এ সংস্থায় নিয়োজিত আছেন অর্ধ লক্ষাধিক কর্মী।
করোনা ভাইরাসের মোকাবিলায় সরকার ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ শিল্প সমন্বয় সাধন করে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে মে মাসের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ বিমান সংস্থা দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে বৈশ্বিক বিমান চলাচল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাপা। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ক্ষেত্রে বিশ্বের এই উপদেষ্টা সংস্থাটির মতে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিমান সংস্থাগুলির কোমর ভেঙে দিয়েছে। কাপা জানিয়েছে, ‘করোনা ভাইরাসের প্রভাবে একাধিক দেশের সরকার ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় সম্ভবত বহু বিমান সংস্থা ইতিমধ্যেই কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছে গেছে অথবা ঋণ নেওয়ার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
কাপা বলেছে, এই বিপর্যয় এড়াতে হলে সরকার এবং এ শিল্পের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’ তারা জানিয়েছে, বিপুল সংখ্যক বিমান বেকার বসে থাকায় এয়ারলাইন্সাগুলির নগদ সঞ্চয় দ্রুত কমছে।
এবার আসুন জেনে নেই বাংলাদেশে বিমানসংস্থাগুলোর অবস্থা সম্পর্কে। করোনা দুর্যোগে বাংলাদেশের বিকাশমান এয়ারলাইন্সগুলোও ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমানকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৫০০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোও সরকারের কাছে ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে, জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ দেশের চারটি বিমান সংস্থার মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ৪৪। এর মধ্যে শুধু ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ চীনের গুয়াংজু রুটে চালু আছে। ফলে সব বিমান সংস্থার ৪৩টি উড়োজাহাজই এখন ‘গ্রাউন্ডেড’ বা অচল হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে বিমানের বহরে আছে ১৮টি উড়োজাহাজ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে আছে ১৩টি, নভোএয়ারের বহরে আছে সাতটি এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজের বহরে আছে ছয়টি উড়োজাহাজ।
করোনা ভাইরাসের কারণে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়া ও ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৯০ কোটি টাকা আয় করেছে তারা। এ সময় বিমানের যাত্রী কমে গেছে ৩৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এপ্রিলে এসে এ হার একেবারে শূন্য হয়েছে। কিন্তু বহরের ১৮টি বিমান রক্ষণাবেক্ষণেই প্রতি মাসে ব্যয় করতে হচ্ছে ২৬০ কোটি টাকা। ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। এ অঙ্কও কয়েকশ কোটি টাকা। বিমানের বিশাল কর্মী বহরের বেতন ও বিভিন্ন দেশে অফিস রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মাসে ২০৩ কোটি টাকা। এসব কিছুর জন্য এপ্রিল মাসে খরচ ৫৩৭ কোটি টাকা।
ব্যয় কমাতে গত মার্চ মাসে বিমানের সব কর্মকর্তার ওভারটাইম ভাতা প্রদান বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাসহ ককপিট এবং কেবিন ক্রুদের মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিমান কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনটির ভিডিও দেখুন