চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমস্ত অর্থনৈতিক বিরোধ ও রাজনৈতিক মতানৈক্য থাকার কারণে মার্কিনীদের অন্তত তিনভাবে কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করতে হবে। যদিও হঠাৎ করে কোন কিছু ঘটবে বলে মনে হয়না। সর্বপরি যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, চীনকে হারিয়ে দেয়ার চেষ্টা কিংবা বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে উঠতে না দেয়ার চেষ্টা করা এ সমস্যার সমাধান দেবে না।
গেল বছরের ডিসেম্বরে বুয়েন্স আয়ার্সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার চীনা প্রতিপক্ষ শি জিনপিং এর মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে তাতে বহু মানুষের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধের অবসান হতে যাচ্ছে। যদিও মার্কিন-চীন সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় সেই আশা অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থার বরফ গলবে কিনা তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
ছোটখাট নানা ইস্যুতে উভয় পক্ষের চলমান যে দ্বন্দ্ব ও তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত থাকবে এতে কোন সন্দেহ নাই। যেমন গেল বছরের ডিসেম্বরে হুয়াওয়ে’র সিএফও মেং ওয়াংঝৌ এর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। কিন্তু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমস্ত অর্থনৈতিক বিরোধ ও রাজনৈতিক মতানৈক্য থাকার কারণে মার্কিনীদের অন্তত তিনভাবে কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করতে হবে।
প্রথমত, বিশ্বের সর্ববৃহৎ জিডিপি’র দেশ হিসেবে চীনকে ‘নতুন স্বাভাবিক’ দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে মার্কিন নীতি প্রণয়নকারীদেরকে। বিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র যেমন বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ছিল, সেখানে একবিংশ শতাব্দিতে এই অবস্থানে চলে আসবে চীন। কিন্তু পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেই থাকবে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ দেশের ভেতরে গঠনমূলক অর্থনৈতিক সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে। এমন সংস্কার কর্মসূচি চীন গ্রহণ করেছিল আরো অন্তত চার দশক আগে। যদিও চীনের এ সংস্কার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী আর আলাদা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতির জন্য সেই সব দেশকে দোষারোপ না করে বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যাওয়া শিল্প সক্ষমতা, অবকাঠামো-শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সাথে সম্পর্কিত খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। সেই সঙ্গে নিজের দেশের নাজুক অর্থনৈতিক নীতির সংস্কারও বিবেচনায় নেয়া উচিত।
মার্কিন নীতি নির্ধারকরা যদি ওয়াল স্ট্রিট, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং নব্য অর্থনীতিবিদদের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে চলা অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশটির অর্থনীতির গতি প্রকৃতি আরো খারাপের দিকে যাবে। এবং মার্কিন সমাজে সম্পদের বৈষম্য ও বিভেদ আরো বাড়তেই থাকবে। আর এতে করে আরেক দফা সামাজিক অস্থিরতা ও চরমপন্থা তৈরি হবে। মার্কিন এলিটরাও ২০০৮ সালের মত অর্থনৈতিক মন্দা তৈরির বুদবুদময় পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারবেন না।
সবশেষ, চীনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্দেশ্য বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এই ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে ব্যর্থ হলে তা অপ্রয়োজনীয় নানা সংঘাতই কেবল উস্কে দেবে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ বিষয়ক পশ্চিমা তত্ত্বগুলো পূর্বাভাস দেয় যে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে যুক্ত আছে চীনের বিশ্বের মধ্যে একটি প্রভাবশালী দেশ হয়ে ওঠার আকাঙ্খা। তবে চীনের ইতিহাস তা বলে না।
চীন কখনোই ভূ-রাজনৈতিকভাবে সম্প্রসারণবাদী ছিল না, এমনকি দেশটি এমন সম্প্রসারণশীল নীতি নেয়ার সময়েও তা করেনি। এটি মূলত জড়িত আগের যুগের চীনা সম্রাটদের ‘অর্থের নীতি’ বা ‘ডকট্রিন অব মিন’ এর সঙ্গে। এই নীতিতে বলা আছে, বিশ্বের অন্য দেশ বা জাতির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী পদক্ষেপ নেয়ার অর্থই হলো ভবিষ্যতের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনা এবং দুর্ভাগ্যকে বরণ করে নেয়া।
বরং নিকট অতীতের ক্ষমতাশালী দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশবাদের মাধ্যমে চীনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এক্ষেত্রে চীনকে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাতে করে চীনের নিকট কখনোই এমন পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, চীন তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সাম্প্রতিক কার্যক্রম চালানোর সময়ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে।
বৈশ্বিক বহু নেতাকে, বিশেষ করে ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে নিজের দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের দেখা যায় একে ওপরের ওপর কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মতো উপায় বেছে নিতে। কিন্তু বাস্তবতা হল, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আর বড় নিয়ামক থাকছে না।
চীন যা চায় তা খুবই স্বচ্ছ ও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একেবারেই উন্মুক্ত। এখানে যে কেউ সমতার ভিত্তিতে অংশ নিতে পারে আর অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে খুবই উৎসাহিত করা হয়েছে। চীন চায় তার দেশের মানুষের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে। সেই সঙ্গে চীন বিশ্বাস করে, একটি দেশের শান্তি ও স্তিতিশীলতা তখনই টেকসই হবে যখন সেদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করতে পারবে। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্বের একটি নেতৃত্বস্থানীয় অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন শান্তিপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কিন্তু, দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিস্তার সমন্বয় করতে গিয়ে চীনের নেতারা বেশ হিমশিম খাচ্ছে আর মারাত্মক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। যদিও স্থানীয় কিছু শিল্প প্রথাগত উৎপাদনশীল খাতে বেশ প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ সফল হচ্ছে। তারপরও চীন স্পর্শকাতর পণ্যের জন্য আমদানি নির্ভর হয়েই থেকে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বাস্থ্যখাতের নানা উপকরণের জন্য চীন পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আমদানির উপরই নির্ভরশীল। আর গেল বছরই রপ্তানি নিয়ম-কানুন ভঙ্গের অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র জেটটিই কোম্পানির কাছে অ্যাডভান্সড সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে প্রমাণিত হয় যে চীন এখনো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। এমনকি, বিশ্বের একটি বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কাজের সুযোগ তৈরির চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হচ্ছে চীনকে। এখানে প্রতি বছর কমপক্ষে ৮০ লাখ তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকে। সেই সঙ্গে সমাজে বিপুল সংখ্যক মানুষের বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও আছে চীনের সামনে।
এই পরীক্ষামূলক সময়ে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি আদর্শিক লড়াই হয়তো কাউকেই লাভবান করবে না। অর্থনীতিতে একটি নতুন ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক ক্রমধারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির দেশ চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই অনেক বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে তা একমাত্র পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই কেবল মোকাবেলা করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ হলো, চীনকে পেছনে ফেলা কিংবা বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে চীনকে উঠতে না দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা কোন সমাধানের উপায় বাতলে দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ভালভাবে রক্ষার সবচেয়ে ভাল উপায় হবে বাস্তবতা মোকাবেলা করা এবং চীনের উত্থানে সহযোগিতা করা।
লেখক: পি.এইচ. ইউ, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল অব দ্য ইন্সটিটিউট অব নিউ স্টাকচারাল ইকোনমিক্স এর চেয়ারম্যান।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর করেছেন ‘সাজিদ রাজু’।