মাহাথির মোহাম্মদ কেন দীর্ঘজীবী

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ- সংগৃহীত -

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের বয়স এখন ৯৪ বছর। বর্তমানে তিনিই বিশ্বের সবচাইতে বেশি বয়সী সরকারপ্রধান। তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে যেমন বিপুল প্রশংসা আছে, আবার তাঁর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কেরও অন্ত নেই। তবে এখন পর্যন্ত যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, তা হলো, এত বেশি বয়সেও মাহাথির মোহাম্মদ দেশ চালাচ্ছেন দারুণ দক্ষতায় আর প্রাণবন্তভাবে।

কিন্তু কীভাবে সম্ভব! এমন বয়সেও তাঁর কর্মশক্তি দেখে লোকজন খুব অবাক হয়। নিজেদের বিস্ময় আর কৌতূহল চেপে রাখতে না-পেরে তারা সুযোগ পেলে প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেসও করে বসে যে তাঁর এই দীর্ঘ জীবন এবং অফুরান প্রাণশক্তির রহস্য কী।

এ প্রশ্নের তো এককথায় জবাব দেয়া চলে না, তাই জনতার প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসেন তাদের প্রধানমন্ত্রী। বহু বছর ধরে মাহাথির মোহাম্মদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে-দেখতে প্রশ্নকর্তারা হয়তো মনেই রাখতে পারেন না যে, তাদের প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে যোগ দেন ১৯৬৪ সালে, কিন্তু তার আগে থেকেই তিনি একজন পাস করা ডাক্তার। প্র্যাকটিস করতেন নিজ প্রদেশ কেদাহতে।

তো ডাক্তার থেকে রাজনীতিক এবং সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বনে যাওয়া মাহাথির মোহাম্মদ সম্প্রতি কুয়ালালামপুরের ইংরেজি দৈনিক ''নিউ স্ট্রেইট টাইমস''-এ দু'টো নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এতেই তিনি জবাব দিয়েছেন সব প্রশ্নের। বলেছেন তাঁর সব অভ্যাস এবং সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য তিনি কি কী করেন - সেসব কথা। পাশাপাশি বলেছেন স্বাস্থ্য বিষয়ক আরো কিছু কথা।

মালয়েশিয়ান রাজনীতির এ নবতিপর হেভিওয়েট নেতা লিখেছেন, সুস্বাস্থ্যের সূচনা হয় আত্মনিয়ন্ত্রণ থেকে। তাঁর মতে, প্রত্যেকেরই উচিত খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ করে সাবধানী হওয়া এবং সুখাদ্য দেখলেই খেতে বসে না-যাওয়া, এককথায় লোভ সামলানো।

তাঁর উপদেশ, ''আমাদের খাওয়া উচিত বাঁচার জন্য, খাওয়ার জন্য বেঁচে থাকা নয়…যতটা দরকার তার চাইতে বেশি খাওয়া কক্ষণো নয়। মোটা হয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য বা দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য মোটেও ভালো নয়।''

মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ''কারো কোমরে চর্বি জমে যাওয়ার মানেই হলো, ওই ব্যক্তি তাঁর প্রয়োজনের চাইতে বেশি খাচ্ছেন। এর একমাত্র প্রতিকার হলো, খানাপিনার পরিমাণ চার ভাগের এক ভাগ বা তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনা।''

তিনি লিখেছেন, ''কার্বোহাইড্রেট (ভাত/রুটি) ও তৈলাক্ত খাবার বাদ দিন। দেখবেন, কিছু দিনের মধ্যেই পেটে চর্বি জমা বন্ধ হয়ে গেছে।''

এ উপদেশটা সবার জন্য তো বটেই, বিশেষ করে মালয়েশিয়ানদের জন্যে অপরিহার্য। কারণ, মালয়েশিয়া এশিয়ার সবচেয়ে বেশি মোটা মানুষের দেশ হিসেবে পরিচিত। মাহাথির মোহাম্মদ যদিও দাবি করেছেন যে  কমপক্ষে গত ৩০ বছর ধরে তিনি নিজের ওজন ৬২ থেকে ৬৫ কেজি-র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছেন, কিন্তু তাঁর দেশবাসীর বেলায় বিষয়টি তেমন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ স্থুলকায় বা অতিরিক্ত মোটা। গত দু'দশক ধরে সেখানে মোটা হওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

মালয়েশিয়ানরা রান্নায় নারকেলের দুধ ব্যবহার করে আর ফ্যাট ও তেল তো থাকেই। সবই মোটাসোটা হওয়ার জন্যে যথেষ্ট সহায়ক। তার ওপর আশপাশের দেশের আরেকটি হাওয়াও বেশ ভালোভাবেই লেগেছে। সেটি হলো, ফাস্ট ফুড খাওয়া। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে মালয়েশিয়ায় ফাস্ট ফুডের জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশটির ৪৯ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে গড়ে একবার ফাস্ট ফুড খাবেই। 

দেশবাসীর মুটিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত মালয়েশিয়া সরকারও। স্থুলতা ঠেকাতে গত বছর জুলাই মাসে মালয়েশিয়া সরকার প্রতি লিটার মিষ্টি পানীয়ের ওপর ৪০ সেন (১০ মার্কিন সেন্ট) ট্যাক্স বসায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ''লক্ষ্য অর্জনে যথার্থ পদক্ষেপ'' বলে প্রশংসা করলেও সমালোচকরা বলছেন, শুধু ট্যাক্স বসিয়ে কাজ হবে না, পাশাপাশি সবচাইতে কাজের কাজ হবে স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানো।

এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, ''ফাস্ট ফুড আসক্তি খুবই বিপজ্জনক। দিনে দুই বোতল বা দুই ক্যানের বেশি পানীয় পান করবেন না।''

তিনি আরো লিখেছেন, ''খাবার যতোই সুস্বাদু হবে, আপনি ততোই বেশি খাবেন। আর যত বেশি খাবেন আপনার পাকস্থলী ততোই স্ফীত হবে। পাকস্থলী যত ফুলবে আপনার ক্ষুধা ততই বেশি লাগবে আর ক্ষুধা মেটাতে আপনাকে আরো বেশি খেতে হবে।''

মাহাথির হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের অতিভোজনের ফলে লিভার, কিডনি ও প্যানক্রিয়াসের ওপর চাপ পড়ে এবং ব্লাড প্রেসার ও হার্ট ডিজিজের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ২০০৭ সালে মাহাথির মোহাম্মদের নিজেরও ১০ মাসের মধ্যে দু'বার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তাঁকে বাইপাস সার্জারি করাতে হয়। কিন্তু এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, ''হার্ট অ্যাটাক সাধারণত যতোটা ভয়ানক হয়, (আমার বেলায়) তেমনটা হয়নি।''

নিজে ডাক্তার হলেও মাহাথির মোহাম্মদ কিন্তু বিশেষ কোনো ডায়েটের সুপারিশ করেননি। শুধু বলেছেন ফলমূল ও শাকসব্জি বেশি খেতে এবং কার্বোহাইড্রেট (ভাত/রুটি) ও তৈলাক্ত খাবার না-খেতে।

তবে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ নিজে কিন্তু আসাম পেদাস নামে পরিচিত একটি ডিশ খুবই পছন্দ করেন -  তা সবাই জানে। এটি হলো ষাঁড়ের গ্রীল করা মাংস, যা তেঁতুলের সস দিয়ে খায়। এছাড়া তিনি মালয়েশিয়ার ফেভারিট ডিশ মুরগির মাংসের তরকারি ও রোটি চানাইও পছন্দ করেন। তবে মাছ একদম অপছন্দ মাহাথিরের।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর নিবন্ধে প্রবীনদের সর্বদা সক্রিয় থাকার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি অবসরপ্রাপ্তদের বলেছেন হাঁটতে, কিছু হলেও ব্যায়াম করতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে না-ঘুমাতে, বিশেষ করে দিনের বেলায়। বলা ভালো যে, অন্য রাজনৈতিক নেতাদের মতো প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরও কম ঘুমান এবং সন্ধ্যার পরও দীর্ঘ সময় কাজ করেন। যতদূর জানা যায়, তিনি রাতে সাত ঘণ্টার মতো ঘুমান। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ ঘুম শরীরকে দুর্বল করে দেয় আর কম ঘুম শরীরের শক্তি বাড়ায়, যা মাংসপেশী ও হাড়কে শক্ত করে।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির লিখেছেন, ''যা মাংসপেশীতে যায় তা ব্রেনেও যায়। ব্রেনকে কাজে না-লাগালে তা কার্যকারিতা হারাবে। ব্রেনের অবনমন ঠেকাতে হলে কর্মব্যস্ত থাকুন, কথা বলুন, পড়াশোনা ও লেখালেখি করুন, তর্কবিতর্ক করুন। যারা এসব করবে, বয়স বাড়লেও তাদের ব্রেন থাকবে বেশি সক্রিয়।''

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ লিখেছেন যে এসব কথা তিনি যতটা বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনার ভিত্তিতে বলছেন, তার চাইতে বেশি বলছেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।

প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে মাহাথির লখেছেন, ''প্রতিদিন পত্রিকা পাঠও মনকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। একজন প্রবীন সাম্প্রতিক ঘটনার চাইতে অতীতের ঘটনা বেশি মনে রাখবেন - এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পড়াশোনা ও কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তা ভালোভাবে করা সম্ভব।'' 

মালয়েশিয়ার নেতা বলেন, ''ব্রেনকে সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে লেখালেখি একটি বড় ভূমিকা রাখে। ব্রেনকে সবসময় কাজে লাগানোর জন্য লেখালেখি আপনাকে বাধ্য করে। আপনি চান, আপনি যা লিখবেন তা যেন পাঠযোগ্য হয়। কাজেই আপনি বাধ্য হন কাগজে আপনার কলমটা বসানোর আগে নিজের সাথে কথা বলতে, চিন্তা করতে, তর্কবিতর্ক ও ঝগড়া করতে।''

উল্লেখ্য, মাহাথির মোহাম্মদ ৪০এর দশকের শেষে ও ৫০এর দশকে সিঙ্গাপুরে মেডিক্যালের ছাত্র থাকাকালে ''ছেদেত'' ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন। ২০০৮ সালে ওই নামে তিনি একটি ব্লগ চালু করেন এবং ওতে ইংরেজি ও মালয় ভাষায় পোস্ট দিতে থাকেন। ২০১৭ সালে সর্বশেষবার ক্ষমতায় আসার আগে দুই পূর্বসূরি বাদাভি ও নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে এ ব্লগেই কলম চালাতেন মাহাথির। এবার ক্ষমতায় আসার পরও লেখালেখি বন্ধ করেননি তিনি। এখন তিনি জাতীয় বিভিন্ন বিতর্কিত নিয়ে কথা বলেন এবং তাঁর সরকারের সমালোচনার জবাব দেন। তাঁর ''ছেদেত'' ওয়েবসাইটের ভিজিটর তিন কোটি।

প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ধূমপান করেন না, ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে মদও নয়। তিনি মানুষের অঙ্গভঙ্গি সম্বন্ধে বলেন, ''সবসময় মিলিটারি অফিসারের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াবেন। এতে স্পাইন্যাল কলাম শক্তিশালী হবে এবং বুড়ো বয়সের পিঠ ব্যথার সমস্যা থাকবে না।''

গত নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনের মাঝেই প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এ সময় ''প্রধানমন্ত্রী মাহাথির গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন'' বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাঁর দফতর থেকে গুজবটি নাকচ করে দিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নাক থেকে রক্ত পড়া কমে এসেছে এবং তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করেছেন। তার ব্লাড প্রেসারও ভালো - ১২০/৭০। তিনি কাউকে দুশ্চিন্তা না করতে বলেছেন।

চলতি ২০২০ সালে ৯৫তম জন্মদিন পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। তাঁর কথা, দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকা এক কথা আর দীর্ঘ দিন ভালোভাবে বেঁচে থাকা আরেক কথা। আসলে অনেক জিনিসই আমাদের আয়ত্তের মধ্যে আছে। আমাদের উচিত, নিজেকে নিয়ন্ত্রণের যথাসাধ্য চেষ্টা করা, যাতে সুস্থ থাকতে এবং প্রবীন বয়সের স্বাদ উপভোগ করতে পারি।