পৃথিবীজুড়ে শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্ক ও পর্যটনে ধস

ছবি - সংগৃহীত

বিশ্ব প্রস্তুত হচ্ছিলো ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের জন্য। অস্থির হয়ে উঠেছিলো রাজনীতি। মুখোমুখি অবস্থানে ছিলো কয়েকটি বিশ্বশক্তি। চারদিকে যখন রণহুঙ্কার, ঠিক তখনি গর্জন করে মানুষের ওপর হামলে পড়লো প্রকৃতি। চীন দেশ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো করোনা ভাইরাস। শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। মানুষ বনাম প্রকৃতি। কেউ কেউ এই যুদ্ধের জন্যও মানুষদেরই দায়ী করছেন। আঙ্গুল তুলছেন যুদ্ধবাজদের দিকে। তাদের দাবি, পৃথিবীর যুদ্ধবাজ নেতারাই ‘জীবাণু’ অস্ত্র হিসেবে এই ভাইরাসটি তৈরি করেছেন। এখন নিজেরাই সামলাতে পারছেন না। কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, এই মহামারি প্রকৃতির প্রতিশোধ। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি। কারণ যা-ই হোক, নীরব এই ঘাতক নিঃশব্দে জেঁকে বসেছে মানুষের ওপর। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। আক্রান্ত দেশগুলোলোর বাসিন্দাদের কাটাতে হচ্ছে একরকম বন্দি জীবন। কিছু কিছু শহরে তৈরি করা হয়েছে প্রতিরক্ষা ব্যুহ। বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারছে না। ভেতর থেকে যেতে পারছে না বাইরে। আর শহরের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে।

বাংলাদেশেও দেখা দিয়েছে এই রোগের প্রকোপ। এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে না ছড়ালেও দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আতঙ্ক। দেশের বাইরে থেকে আসা-যাওয়ার ওপর আরোপ করা হয়েছে কড়াকড়ি। দেশে প্রবেশ করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে প্রবাসীদের।এই বিপদ সামাল দিতে নাকানি-চুবানি খেতে হচ্ছে বেশ কয়েকটি উন্নত রাষ্ট্রকেও। দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে সীমানা অতিক্রমে। এতে গোটা পৃথিবীতে হুমকির মুখে পড়েছে পর্যটন শিল্প। দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল জানিয়েছে, এই ধাক্কায় পর্যটন ও ভ্রমণ খাতের কয়েক কোটি কর্মসংস্থান নাই হয়ে যেতে পারে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী গ্লোরিয়া গুয়েভারা জানান, কিছু বিমা সংস্থা নতুন গ্রাহকদের জন্য ভ্রমণ বিমা স্থগিত করেছে। পৃথিবীব্যাপী হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তিনি জানান, এই অবস্থা চলতে থাকলে এ বছরের মধ্যেই ভ্রমণ খাতের ২৫ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়ে যাবে।
সংস্থাটির এই আশঙ্কা অমূলক নয়, প্রকৃতির আক্রমণে পৃথিবীর বেসামাল অবস্থা অন্তত সেটাই বলছে। এখন সবার আগে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে নিজের নিরাপত্তা। একজন অন্যজনকে এড়িয়ে চলছে। দেখা হলে হাত মেলাচ্ছে না। কুশল বিনিময় করছে না। একজনের বাড়িতে অন্যজন যাচ্ছে না। আক্রান্ত দেশগুলোতে খুব দরকার না হলে কেউ বাইরেও বের হচ্ছে না। যারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে, তাদেরকেও পালাতে দেওয়া হচ্ছে না। পৃথিবীজুড়ে এখন শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্ক।
এই আতঙ্কের মধ্যে একের পর এক আসছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বৃটেন ও আয়ারল্যান্ডের ওপর। এর আগে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তো ছিলোই।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাসমৃদ্ধ দেশ ভারত। দেশটিজুড়ে রয়েছে দর্শনীয় বহু স্থাপনা। পর্যটন খাতে এসব থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করে ভারত। এগুলো দেখতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ যায়। কিন্তু এই সঙ্কটে মানুষের ভিড় এড়াতে আগ্রার মেয়র নবীন জৈন তাজমহলসহ ভারতের ঐতিহাসিক সব স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধের সুপারিশ করেছেন। মেয়র বলেন, ‘শুধু তাজমহলই নয়, দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্মৃতিসৌধগুলো কিছুদিনের জন্যে জন্য বন্ধ রাখা হবে।’
অবশ্য বন্ধ রাখার বিষয়টি আলোচনায় আসার আগে থেকেই লোকসমাগম কমে যাচ্ছিলো ট্যুারিস্ট স্পটগুলোতে। জম্মু ও কাশ্মিরকে বলা হয় পৃথিবীর স্বর্গ। এই ‘স্বর্গভ’মি’ রাজনৈতিক কারণে অস্থির থাকলেও এর একটা অংশে পর্যটকদের ভীড় সবসময় লেগেই থাকতো। সেই অংশটার নাম ‘লাদাখ’। এই এলাকাটাকে ডাকা হয় ‘বরফমরু’। পাহাড়ে ঘেরা মনোরম লাদাখের সুনাম রয়েছে পর্যটকদের কাছে। গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ওই এলাকায় বিপুল সংখ্যক পর্যটক দেখা গেছে। কিন্তু এখন এই লাদাখও পর্যটকশুন্য।
বলা যায় পর্যটন খাতের ওপরই নির্ভরশীল দেশ ভুটান। সেখানেও এখন পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। গত ৬ মার্চ থেকে দুই সপ্তাহের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো দেশটি। তবে প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং জানিয়েছেন এর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে দেশকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। আমরা বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেখবো এবং অবস্থা বিশ্লেষণ করবো।  এই নিষেধাজ্ঞায় এ পর্যন্ত ভুটানের দুই দশমিক দুই মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান লোটে শেরিং।

পর্যটকদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এভারেস্টের দেশ নেপাল। মাউন্ট এভারেস্টে সব ধরনের অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেছে দেশটি। এর আগে চীন তাদের পাশ থেকে এভারেস্টে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়। গত দুই দশক ধরে চীনের অর্থনীতি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। আর চীনের এই এগিয়ে চলার পেছনে বড় ভ’মিকা রেখেছে পর্যটনশিল্প। দেশটির পর্যটন অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারধর্মী। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক এশিয়ান, ইউরোপিয় ও আমেরিকান পর্যটকদের ঢল নেমেছিল চীনে। কিন্তু হঠাৎ করেই দেশটিতে দেখা দেয় রহস্যময়ী এই রোগ। সংবাদমাধ্যমে এর খবর ফলাও করে প্রচার হতে থাকে। সেইসঙ্গে বাতিল হতে থাকে পর্যটকদের শিডিউল। একটার পর একটা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আসতে থাকে দেশটির ওপর।
এর আগে ২০০২ ও ২০০৪ সালে সার্স আক্রমণের সময় চীনে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ২৫ শতাংশ কমে যায়। তখন হংকংয়ে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৪১ শতাংশ কমে।
তবে এখন অন্য অনেক দেশ চাপ সামলাতে বেকায়দায় থাকলেও চীনের অবস্থা উন্নতির দিকে। দেশটিতে আক্রান্ত’র সংখ্যা কমছে।
চীনের সঙ্গে যে দেশগুলোর যোগাযোগ ভালো সেগুলোর একটি সিঙ্গাপুর। ছোট্ট এই দেশটি কেবল চীন নয় বিশ্বের অনেক দেশের পর্যটকদের তালিকার প্রথম সারিতে থাকে। এ কারণেই শুরুর দিক থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক ব্যবস্থা নিয়েছিলো সিঙ্গাপুর। পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল হলেও আপদকালে দেশটির দরজা পর্যটকদের জন্য সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়। এতে পর্যটনে প্রবৃদ্ধি কমে যায় ২৫ শতাংশ।

পর্যটক আকর্ষক দেশ থাইল্যান্ড। ওই দেশটিও এবার প্রায় ১০৯.৩ বিলিয়ন থাই বাট লোকসানের মুখে পড়ছে। হুমকির মুখে পড়েছে দেশটির অভ্যন্তরিণ পর্যটন শিল্পও।
জানুয়ারির ২৫ তারিখ থেকে শুরু হওয়া চীনের নববর্ষ উদযাপনের সময় থেকে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ পর্যটনে এ লোকসানের সম্মুখিন হয়। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, দেশটির ৪ বিলিয়ন বাণিজ্যিক ক্ষতি বা লোকসান হয়েছে।

ভাইরাস আতঙ্ক ব্যাপকভাবে কাঁপাচ্ছে ফিলিপাইনকে। দেশটির রাজধানী ম্যানিলার সীমানায় অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। ম্যানিলা এখন অবরুদ্ধ। রাজধানী থেকে কেউ বের হতে পারছে না। কাউকে ঢুকতেও দেওয়া হচ্ছে না। এই যখন অবস্থা, তখন বাইরের পর্যটক ফিলিপাইনে প্রবেশ করবে, এমনটা কল্পনা করাও দুঃস্বপ্ন।
অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে চীনের পর্যটন ক্ষতির ফলে ২০২০ সালের প্রথম চার মাসের বিশ্ব সেবা খাতে আয় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর চীনের সাথে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বড় ধরণের লোকসানের হিসেব কষছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের একটি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মালয়েশিয়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছে। তবে সবার পদক্ষেপ একইরকম। ভারত-পাকিস্তানের মতো বৈরি সম্পর্কের দেশও পরিস্থিতি মোকাবেলায় এক সুরে কথা বলছে। এর মধ্যে সার্কভুক্ত দেশগুলো ঐকমতে পৌঁছেছে। সার্কের অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো থাকলেও বিদেশি পর্যটক একেবারেই আসছে না বললেই চলে। আর বাংলাদেশিরাও সীমানা পেরিয়ে বাইরে কোথাও যাওয়ার সাহস করছে না। এতে চরম সঙ্কটে পড়েছে দেশিয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যান্সেল হচ্ছে হোটেল বুকিং, ট্যুার অপারেটরদের ট্যুর প্যাকেজ। বাংলাদেশে বেশিরভাগ বিদেশি পর্যটক আসেন সুন্দরবনের আকর্ষণে। এদের জন্য সুন্দরবনে থাকে প্রমোদতরীর ব্যবস্থা। বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে কয়েকদিন অবস্থান করে তরীগুলো। কিন্তু বৈশ্বিক সঙ্কটের মুখে হুমকিতে পড়েছে সুন্দরবনকেন্দ্রীক এই খাত।
এছাড়া বিশ্বের বৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারও এখন পর্যটকশূন্য। রাজধানী ঢাকার হোটেলগুলোতে বিদেশি অতিথির সমাগম দেখা যাচ্ছে না। এতে সঙ্কটে পড়েছে ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ধাক্কা লেগেছে এয়ার লাইনসে। সঙ্কটের শুরুর সময় থেকেই বিমানে যাত্রীসংখ্যা কমে আসছিলো। এখন বাড়তে শুরু করেছে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিতের সংখ্যা।