প্রিন্সেস ডায়নার না জানা ইতিহাস

প্রিন্সেস ডায়ানা-সংগৃহীত -

সোনালী ছোটচুলের ২০ বছর বয়সী মেয়েটিকে বিশ্ববাসী চিনেছিলো ব্রিটেনের রাজবধু হিসেবে। তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজপ্রাসাদ  ছাড়বার পরও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেয়ার ঘটনাও রয়ে গেছে রহস্য। এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, আজও তাঁর বেদনাবিধুর বিদায় অশ্রুসিক্ত করে কোটি ভক্তকে। হ্যা প্রিন্সেস ডায়ানার কথা বলছি। তার দুই সন্তান প্রিন্স উইলিয়াম আর প্রিন্স হ্যারি আজো খুজে ফেরেন মায়ের স্মৃতি।

২০১৯ সালের অক্টোবরে ব্রিটেনের ডিউক এবং ডাচেস অব ক্যামব্রিজ প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটন পাঁচ দিনের পাকিস্তান সফরে যান। উদ্দেশ্য মায়ের স্মৃতি আছে এমন জায়গা গুলো ঘুরে আসা। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাথে বৈঠক করেন। ইমরান খান তাদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। ইমরান খান প্রিন্স উইলিয়ামের মা ডায়ানার বন্ধু। সেখানে অনিবার্যভাবে আলোচনায় উঠে আসে প্রিন্সেস ডায়নার স্মৃতি নিয়ে নানা কথা।

ইমরান খানের মায়ের নামে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রিন্সেস ডায়ানা দুইবার পাকিস্তান সফর করেন। ইমরান খান তার মায়ের নামে লাহোরে যে বিশাল ও ব্যয়বহুল ক্যান্সার হাসপাতালটি গড়ে তুলেছেন তাতে প্রিন্সেস ডায়নারও অবদান আছে। তিনি শুধু  ইমরান খানকে উৎসাহ দেননি অর্থ জোগাড়ে ভুমিকা রেখেছেন। বিশ্বের বহু ধর্নাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই হাসপাতাল নির্মানে অনুদান দিয়েছেন। প্রিন্সেস ডায়নার প্রভাব এখানে কমবেশি ভুমিকা রেখেছে।

প্রিন্স উইলিয়াম পাকিস্তান সফরে গিয়ে তার মায়ের বন্ধু  ইমরান খানের সাথে শুধু কথা বলেননি। ক্যান্সার হাসপাতালটি ঘুরে দেখেন। ১৯৯১ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা পাকিস্তান সফরের সময় লাহোরের বাদশাহি মসজিদ দেখতে গিয়েছিলেন। উইলিয়াম আর কেট মিডলটন মায়ের দেখা মসজিদটি দেখতে যান। এ যেনো মায়ের স্মৃতিকে রোমন্থন করা। এমনকি ডায়ানা যে গ্রামের শিশুদের সাথে কথা বলেছিলেন সে গ্রাম সফর করেন প্রিন্স উইলিয়াম ও মিডলটন।

প্রিন্সেস ডায়ানা রুপ, সৌন্দর্য আর আভিজাত্য যে শুধু মানুষের দৃষ্টি কেড়ে ছিলো তা নয় তার মধ্যে এক ধরনের মানবিক অনুভুতির প্রকাশ ঘটেছিলো। ফলে পশ্চিমা সমাজের গন্ডি পেরিয়ে বহু মানুষের মনে স্থান পেয়েছিলেন।

১৯৬১ সালের ১ জুন তাঁর জন্ম হয়েছিলো ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে। তবে ৬ বছর বয়সেই বাবা-মা’র বিচ্ছেদ দেখতে হয়েছিলো ডায়ানাকে। তাঁর জিম্মা নিয়ে বাবা ও মায়ের কদর্য আইনী লড়াই প্র াব ফেলেছিলো ডায়ানার শিশুমনে। শেষ অবধি লেডি ডায়না স্পেন্সারের শৈশব কেটেছিলো বাবার কাছেই। ওয়েস্ট হেলথ পাবলিক স্কুলের কয়েক বছর পড়বার পর তিনি আবাসিক স্কুল রিডলসওয়ার্থ হলে পড়েছেন। পড়াশোনায় অতটা ভালো কখনোই ছিলেন না তিনি। ফেল করেছিলেন ‘ও’ লেভেলে। পরবর্তীতে পড়াশোনা তিনি শেষ করেছিলেন সুইজারল্যান্ডে।

সুইজারল্যান্ডে  লেখাপড়ার্র  পাঠ চুকিয়ে লন্ডনে ফেরা অভিজাত পরিবারের এই মেয়েটির তারুণ্য কেটেছিলো খুবই সাদামাটাভাবে। শিশুবৎসল ডায়ানার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো শিশু-পরিচারিকা হিসেবেই। পরবর্তীতে কিছুদিন খন্ডকালীন বাবুর্চির কাজ করে। ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন লন্ডনের নাইটসব্রিজের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে, সহকারি শিক্ষিকা পদে। মজার ব্যাপার হলো, সেই বছরই ডায়ানার সাথে চার্লসের প্রথম  আলাপ হয় বোন সারাহ ম্যাককর্কুডেলের প্রেমিক হিসেবে। সময়ের ব্যবধানে সে আলাপ গড়ালো প্রেমে। শুধু বয়সেই ১৩ বছরের বড় ফারাক নয়, ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও দুজন ছিলেন দুই মেরুর। লাজুক আর ফ্যাশন সচেতন ডায়ানার বিপরীতে রাশভারী, বাগানপ্রিয় প্রিন্স চার্লস।

ডায়ানার সাথে যে কেবল তখন থেকে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের পরিচয়, তা নয়। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের ছোট দুই ছেলে প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ডের ছোটবেলার খেলার সাথী ছিলেন ডায়ানা। যা-ই হোক, ব্রিটিশ রাজমুকুটের পরবর্তী উত্তরাধিকার হওয়ায় প্রিন্স চার্লসের এই প্রেম নজর কেড়েছিলো বিশ্ব মিডিয়ার। এই জুটির চার বছরের প্রণয় পরিণতি পায় ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাইয়ের এক মাহেন্দ্রক্ষণে। লন্ডনের সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে অনুষ্ঠিত তাঁদের বিয়ে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় বিশ্ব মিডিয়ায়, যার সাক্ষী হয়েছিলো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

কিন্তু না বিয়ে টা টিকলো না। আসলে জীবনতো  রুপকথা নয়, তাই সব গল্পের শেষটাও হয় না মনমতো। প্রিন্সেস ডায়ানা ও চার্লসের সংসারের সুখও তাই বোধ হয় সইলো না তাঁদের অদৃষ্ট। রাজ পরিবারে থাকার সময় তিনি বুলিমিয়া ও বিষœতায় তার সময় চলে যায়। ক্যামিলা পার্কার-বাওলেসের সাথে স্বামী চার্লস পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় আরো দিশেহারা ডায়ানা নিজেও জেমস গিলবের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যান। ১ ডায়ানার সাথে বিয়ের অনেক আগে থেকেই ভাঙা-গড়ার মধ্যেই চলছিলো চার্লস-ক্যামিলার প্রেম। ১৯৯২ সালে এই দুই সর্ম্পকের কথা গণমাধ্যমের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে রাজপরিবার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর পার্লামেন্টে চার্লস-ডায়ানার বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। ১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয় তাঁদের।

ব্রিটিশ রাজপরিবার ছেড়ে আসবার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিলো অটুট। বরং বিয়ের পর পুরোটা উদ্যম তিনি ব্যয় করেছিলেন মানুষের সেবায়। স্থল-মাইন সম্পর্কে যুদ্ধপীড়িত অ্যাঙ্গোলায় সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য তিনি গিয়েছিলেন মানুষের দ্বারে দ্বারে।

সেই দৃশ্যপট বদলাতেও বেশি সময় লাগলো না। খ্যাতির চূড়া থেকে পতন হলো ডায়ানার, যখন তিনি প্রেম করা শুরু করলেন মিশরীয় চলচ্চিত্র প্রযোজক দোদি ফায়েদের সাথে।  দোদি ফায়েদের আগেও পাকিস্তানি  বংশোদ্ভুত শল্য চিকিৎসক হাসনাত খানের সাথে ‘দুই বছরের সম্পর্ক’ নিয়ে গুজব চাউর হয়েছিলো গণমাধ্যমে। খ্যাতির বিড়ম্বনার কারণেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর শিকার হয়েছিলেন তিনি। ডায়ানা-ফায়েদ যুগল কোথায় যাচ্ছেন, কী খাচ্ছেন- এ নিয়েও নেতিবাচক চর্চা ও সমালোচনা চলতে লাগলো গণমাধ্যমে। সেই থেকে ব্যক্তিজীবন নিয়ে সাংবাদিক ও অতর্কিত ছবিশিকারী ‘পাপারাজ্জি’দের থেকে পালিয়ে বাঁচতে লাগলেন প্রিন্সেস ডায়ানা।

পাপারাজ্জি থেকে এই পালিয়ে বাঁচতে চাওয়ার নীতিই হয়তো কাল হয়েছিলো ডায়ানার জীবনে। ১৯৯৭ সালের আগস্টে ফ্রান্সে প্রমোদ ভ্রমণে এসেছিলেন ডায়ানা ও ফায়েদ। ৩১ আগস্ট সকালে ‘হোটেল রিৎজ’ থেকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে করে বেরোতেই পথিমধ্যে তাদের ধাওয়া করে পাপারাজ্জিদের একটি দল। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দ্রত গতিতে গাড়ি আকস্মিক মোড় নিতে গিয়েই ঘটলো অঘটন। এক টানেলের রাস্তায় তাঁদের বহনকারী গাড়িটি অন্য গাড়ির সাথে সংঘর্ষে দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান দোদি ফায়েদ ও গাড়িটির চালক। কোনোমতে বেঁচে যান ডায়ানার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। ওদিকে দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত ডায়ানাকে দ্রুতই একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। শরীরে অজস্র জখম নিয়ে তীব্র যন্ত্রণার সাথে কয়েক ঘন্টার লড়াই শেষে পরপারে পাড়ি জমান প্রিন্সেস ডায়ানা। তবে অনেকে মনে করেন তার মৃত্যুর সাথে আছে রাজ পরিবারের হাতে। বৃটিশ সিক্রেট সার্ভিস তাকে হত্যা করেছে।

ডায়ানার মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেননি অনেকেই। এ সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নানা অনুমান ও ষড়যন্ত্র তত্ব। অনেকেরই ধারণা মার্সিডিজ গাড়িটির চালক হেনরি পল ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থার লোক। এমনকি রাজপরিবারের সাবেক বধূ খৃষ্টান নয়, এমন কাউকে বিয়ে করবেন এই সম্ভাবনা মেনে নিতে পারেনি ব্রিটিশ রাজপরিবার। তাই নিজেদের আভিজাত্য বাঁচাতেই ডায়ানাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়।এমনকি অনেকে এমনও মনে করেন প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন ডায়ানার আপন বোন লেডি সারাহও।

 ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে ডায়ানার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন অন্তিম স্মৃতি পাঠ করেছিলেন তাঁর ভাই চার্লস স্পেন্সার। এল্টন জনের শোকসঙ্গীত পরিবেশনাও ছিলো সে চির বিদায় অনুষ্ঠানে। সে অনুষ্ঠান টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করেছিলো বিশ্বের প্রায় বত্রিশ মিলিয়ন মানুষ। অবশেষে তাঁর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় স্পেন্সার মালিকানাধীন অ্যালথর্পের একটি ছোট্ট দ্বীপে। সেখানেই সমাহিত হন কোটি মানুষের হৃদয়ের রানী প্রিন্সে ডায়ানা।

‘ব্রিটিশ রাজবধু’র বাইরে এসে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন নিজের আলাদা একটি পরিচয় ও আলাদা জগত। যেখানে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলো রাজপরিবার, অভিজাত শ্রেনী ও গনমাধ্যম। এরপরও তার মানবিক কার্যক্রম যেমন শিশুদের জন্য সহায়তার কর্মসূচী, শিক্ষা  কিংবা হাসপাতাল নির্মানের মতো কাজে নিজের অংশগ্রহন তাকে আলাদা মানবিক ভুমিকায় অধিষ্টিত করেছে।