সৌদি আরবে কেমন পর্যটক যাবে?

সৌদির মেগা প্রজেক্ট নিওম-সংগৃহীত - সংগৃহীত

বেশ ক'বছর হয় সউদি আরব 'ভিশন-২০৩০' ঘোষণা করেছে। এ ভিশন অর্জনের সাথে সঙ্গতি রেখে দেশটি চাচ্ছে তার অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে। এর অংশ হিসেবে তারা গত বছরজুড়ে তাদের পর্যটনশিল্পের ওপর আলোকপাত করেছে এবং সফলও হয়েছে। নিজেদের তারা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সর্বশেষ ট্র্যাভেল অ্যান্ড হসপিটালিটি মার্কেট হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে সউদি আরবের জিডিপি-র প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে।

ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসেবমতে, সউদি আরবের পর্যটন খাত খুবই সম্ভাবনাময়। চলতি ২০১৯ সালেই এ খাত থেকে দেশটির জিডিপি-তে যোগ হতে পারে প্রায় আট হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এ সম্ভাবনার কথা সউদিরাও বেশ ভালোভাবে জানে ও বোঝে। তাই তো তারা চালু করেছে ৫০০ বিলিয়ন বা পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত মেগাসিটি নিওম এবং লোহিত সাগর উন্নয়ন প্রকল্পের মতো বেশকিছু মেগা প্রজেক্ট।

এসব অভিজাত ও ব্যয়বহুল রিসোর্টে ছুটি কাটাতে আসবে প্রধানত বিদেশিরা। এসব সম্ভাবনা সত্ত্বেও একটা বিষয় বলতেই হয়। তা হলো, ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্র্যাভেল ইন্ডাস্ট্রিতে নবগত হিসেবে সউদি আরবকে অনেক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। যেমন, দেশটির কঠোর ভিসা বিধি। এটি দশকের পর দশকব্যাপী দেশটির বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে একটা বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে এতদিন দেশটিতে হজ্ব ও উমরাহকারী, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা এলেও সত্যিকার পর্যটকরা আসতে উৎসাহিত হতোশন। তবে সম্প্রতি সউদি সরকার ভ্রমণ কড়াকড়ি কিছু বাদ দিয়েছে, কিছু সহজ করেছে এবং ৪৯টি দেশের জন্য ই-ভিসা চালু করেছে।

এই প্রথমবারের মতো সউদি আরবে অমুসলিম পর্যটকদের আসার অনুমতিও দেয়া হচ্ছে। পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরী ছাড়া তারা দেশটির সর্বত্র ভ্রমণ করতে পারবে। তাছাড়া যেসব বিদেশি মুসলিম উমরাহ করতে সউদি আরব যাবেন, উমরাহ করার পাশাপাশি তারা এখন থেকে ট্যুরিস্ট ভিসাকে দেশটির অন্যান্য স্থান ভ্রমণেও কাজে লাগাতে পারবেন। দেশটিতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিজিটর বলতে থাকেন মূলত উমরাহকারীরা। কিন্তু এ বছর ওই সময়ে বিদেশিদের আগমনের হার বেড়েছে সাড়ে পাঁচ শতাংশেরও বেশি। মজার ব্যাপার হলো, সউদি আরব ই-ভিসা চালুর প্রথম ১০ দিনেই দেশটি ভ্রমণে গেছে প্রায় ২৪ হাজার বিদেশি। এদের বেশিরভাগই চীনা। এরা মূলত গিয়েছিল দুবাই ও আবুধাবি ভ্রমণে। ই-ভিসার সুযোগ নিয়ে ঘুরে গেল সউদি আরবেও।

সউদি পর্যটন শিল্পের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর একটি হলো পর্যটকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান। সউদি আরামকো-তে ড্রোন হামলার পর দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন এই ঝুঁকি দৃশ্যমান হয়েছে। এসব ঘটনার আগে সউদি আরবকে নিরাপদ ও তুলনামুলক অপরাধমুক্ত দেশ বলে বিবেচনা করা হতো। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সউদি সরকার এখন পর্যন্ত ড্রোন হামলা ঠেকানোর কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। অথচ একটি টেকসই পর্যটন শিল্পের জন্য নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ খুবই জরুরি। তাহলেই কেবল দেশ-বিদেশের পর্যটকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে সউদি আরবের স্মার্ট নগরী নিওম কিংবা শান্ত সমাহিত উপকুলে নিশ্চিন্তে ছুটি কাটাতে পারবে।

সউদি সরকার দেশের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়। দেশটির পর্যটনমন্ত্রী আহমদ আকিল আল-খাতিব মনে করেন, সাম্প্রতিক এসব হামলায় সউদি নিরাপত্তাব্যবস্থার হানি ঘটবে না। তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসী গলায় বলেন, 'আমাদের সব নগরী বিশ্বের সবচাইতে নিরাপদ নগরীগুলোর অন্যতম। কাজেই আমরা মনে করি না এসব হামলা আমাদের পরিকল্পনায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে। সউদি আরবে যত বিদেশি আছে, তারা সবাই এদেশের নিরাপত্তা উপভোগ করে। আমাদের দেশ খুবই সুরক্ষিত।' সউদি সরকার তাদের বেলাভূমি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী।

কিন্তু সউদি আরব যেহেতু একটি রক্ষণশীল দেশ হিসেবে পরিচিত, সেহেতু এর একটি অপেক্ষাকৃত উদার ইমেজ প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরী। এটা যত দিন না-হবে তত দিন ওই দেশ সফরে যাওয়ার ব্যাপারে বিদেশি পর্যটকদের জড়তা থেকেই যাবে। হয়তো এ কারণেই সউদি সরকার তাদের দেশের হোটেলে অবস্থানকারী বিদেশিদের জন্য বিধিনিষেধ অনেকটা শিথিল করেছে। বিদেশিদের জন্য সম্প্রতি প্রণয়ন করেছে আগের চাইতে উদার ড্রেস কোড। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সউদিরা এতোটা খোলামেলা সমাজে বাস করতে অভ্যস্ত নয়। সউদি কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের জন্য নতুন নতুন ব্র্যান্ডেড গন্তব্য তৈরি করছে। সৃষ্টি করছে বিনোদনের আরো সুযোগ। করছে নানা রকম মিউজিক্যাল, কালচারাল ও স্পোর্টস ইভেন্ট। সবই করা হচ্ছে একটিই লক্ষ্য নিয়ে। আর তা হলো সউদি আরবের একটি নমনীয় ইমেজ সৃষ্টি।

এতো কিছুর পরও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিপদটা কেটে যাচ্ছে না। গোটা বিশ্ব এখন যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ার মারফৎ অনেক বেশি পরস্পরসংযুক্ত, তাই ছোট একটি ঘটনায়ও বৈশ্বিক পর্যটকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তেমন কিছু হলে তা সামাল দেয়াটা হবে কঠিন। এমনিতেই সউদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব অঙ্গনে সমালোচনা আছে। সাংবাদিক জামাল খাসোগী হত্যার ঘটনায় তা আরো তীব্র হয়েছে। তার ওপর প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের সাথে দেশটির সাম্প্রতিক বিরোধ পর্যটন সম্ভাবনার দিক থেকে দেশটিকে খানিকটা হলেও পিছিয়ে দিয়েছে।

কয়েকটি আরব দেশ ও দুবাই ইতিমধ্যে পর্যটন খাতে বেশ সফলতা অর্জন করেছে। তাদের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসছে এ খাত থেকে। এসব দেশ পর্যটনে মনোযোগ দিয়েছে কয়েক দশক আগে। কাজেই ওসব দেশের পর্যায়ে পৌঁছতে সউদি আরবের কমপক্ষে এক দশক তো লাগবেই! বাস্তবত হলো, অপেক্ষাকৃত বড় দেশ হওয়ায় সউদি আরব রাতারাতি বদলে যেতে বা দুবাই হয়ে যেতে পারবে না। পর্যটনশিল্পকে টেকসই করতে হলে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম বিষয়ে সউদি আরবে এ বছর বেশ কয়েকটি বড় বড় সেমিনার ও কনফারেন্স হয়েছে। সেগুলোতে বিভিন্ন কম্পানি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভালো সাড়াও দিয়েছে। এসব সেমিনার ও কনফারেন্সের একটিতে মেলিয়া হোটেলস ইন্টারন্যাশনালের উন্নয়ন বিভাগের প্রধান বেঞ্জামিন ওপল বলেন, সংযুক্ত আরব আমীরত ও কাতারের মতো যথাযোগ্য লোককে বাজারে আনতে সউদি আরবের আরো সময় লাগবে।

কিন্তু যদি বিজনেস ইকুয়েশনের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন, সউদি আরব হচ্ছে আরব দুনিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি। এর রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। আর এখন সেখানে তৈরি করা হয়েছে অবকাশ যাপনের চমৎকার সব সুযোগ। সউদি আরবের সেবা খাতের প্রসঙ্গে বলতে হয়, ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের সেবাদান আর পর্যটকদের সেবাদান - দু'টো আলাদা ব্যাপার। প্রতিটির জন্য লাগবে ভিন্ন ব্যবস্থাপনা আর ভিন্ন দক্ষতা। সউদিরা এতদিন হজ্বযাত্রী ও উমরাহকারীদের সেবা দিয়ে এসেছে। সেবা দিয়েছে ব্যবসায়িক সম্মেলনে আগত মেহমানদের। এখন সেবা দিতে হবে ছুটি কাটাতে আসা পর্যটকদের। এ সেবা কী এবং কীভাবে দিতে হয়, তা বুঝতে এবং অভ্যস্ত হতে কিছু সময় তো লাগবেই!

এর মধ্যেই পর্যটকদের জন্য নানা অনুষ্ঠান আয়োজন এবং তাদের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়ার কাজে তরুণ সউদিদের অনেক কর্মসংস্থান হচ্ছে। আরেকটি প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, নতুন নতুন রিসোর্ট চালু হওয়ায় দেশটিতে প্রতি বছর অভ্যন্তরীন পর্যটনও বাড়ছে প্রায় আট শতাংশ হারে। এতদিন নিজেদের দেশে বিনোদনের ব্যবস্থা না-থাকায় প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ সউদি নাগরিক ছুটি কাটাতে চলে যেত সংযুক্ত আরব আমীরাতে। এখন সেই দিনের বুঝি অবসান হতে চললো!