যে কারণে রাজপরিবার ছেড়ে গেলেন প্রিন্স হ্যারি

প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর মার্কিনী পত্নী মেগান- সংগৃহীত -

মিশরের রাজা ফারুক ক্ষমতাচ্যূত হয়ে দেশ ছাড়ার সময় একটি অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। বলেছিলেন, পৃথিবীতে দু'জন রাজাই টিকে থাকবেন - ব্রিটেনের রাজা আর তাসের রাজা। সেই ভবিষ্যদ্বাণীর এক রাজা যা এখন রানির রাজতন্ত্র সত্যিই টিকে আছেন এবং প্রায়ই নানা কারণে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন। এই যেমন, এখন ব্রিটিশ মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে তাদের ছোট রাজকুমার প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর মার্কিনী পত্নী মেগানকে নিয়ে।

যা হয়েছে তা হলো, প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান ঘোষণা দিয়েছেন, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে আর কোনো সরকারি অর্থ গ্রহন করবেন না তারা বরং রাজপরিবার ছেড়ে সাধারণ মানুষের মতোই সাধারণ জীবন কাটাবেন। ছোট রাজকুমার ও তার ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স, অর্থাৎ হ্যারি ও মেগান যে এরকম একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বসবেন, এটা কারো মাথাতেই ছিল না। যতদূর জানা যায়, হঠাৎ করেই তারা রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যের খেতাব ত্যাগ করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তাঁরা বলেন, আমরা পরস্পরের সঙ্গে অনেক আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি বহু মাসের আলোচনার প্রতিফলন। আমরা আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছি।

প্রশ্ন হলো, রাজকীয় জৌলুস ছেড়ে কেউ কি সাধারণ মানুষের জীবন বেছে নিতে চায়? কিন্তু তা-ই চাইছেন প্রিন্স হ্যারি ও প্রিন্সেস মেগান।
কিন্তু কেন এ সিদ্ধান্ত ? এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকেবহাল মহল। ব্রিটিশ মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মে মাসে হ্যারি-মেগানের পুত্র আর্চির জন্মের পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল, হ্যারি ও মেগান ''প্রচারের আলো''র নিচ থেকে সরে আসতে চান।

কেন এ চাওয়া? অনেকেই এর কারণ হিসেবে অনেকেই বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে সামনে টেনে আনছেন। প্রিন্স হ্যারির কথা থেকেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনকে বলেন, ‘উইলিয়ামের সঙ্গে আমার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দুজন এখন অনেকটাই দুই পথের মানুষ।’
গুঞ্জন রয়েছে, রাজপরিবারের এই ভাঙনের আভাস মিলেছিল গত বছরের শুরুতেই। আর এই ভাঙনের পেছনে হাত রয়েছে প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী কেট মিডলটন এবং প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের। দুই জা’র মধ্যে সর্ম্পকের অবনতিই চূড়ান্ত ভাঙনের পথে এগিয়ে গেছে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই ভাইয়ের রাজকীয় কার্যালয়, মিডিয়া পরামর্শদাতা টিম এবং স্টাফ সবকিছুই আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানা যায়। শুধু তাই নয়, উইলিয়ামকে ছেড়ে কেনসিংটন প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে উইন্ডসর এস্টেটের ফ্রগমোর কটেজে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন হ্যারি-মেগান। ধারণা করা হয়, এই আলাদা হওয়ার পেছনে দুই ভাইয়ের স্ত্রীদের রেষারেষিই ছিল প্রধান কারণ। আবার এমন অভিযোগও রয়েছে, মেগান প্রচলিত সব নিয়ম-কানুন ভাঙতে চান।
দাতব্যকাজ নিয়েও দুই পরিবারের মধ্যে ফাটল ধরে। গত বছর জুনে ‘ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অফ কেমব্রিজ ফাউন্ডেশন’ থেকে আলাদা হয়ে ‘সাসেক্স রয়্যাল চ্যারিটি’ তৈরি করেছিলেন হ্যারি-মেগান। এছাড়া গণমাধ্যমের বাড়াবাড়ি নিয়েও কিছুটা বিরক্ত ছিলেন হ্যারি-মেগান।

২০১৯ সালের দিকে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলো মেগানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলতে শুরু করে। বলা হতে থাকে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উঠতে পারছেন না মেগান। ঘর মেরামতের জন্য বড় অংকের অর্থ খরচ, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার ব্যবহার, তার জনসমক্ষে আসা এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা নিয়েও সমালোচনার শিকার হন তিনি।
২০১৯ সালের মে মাসে মেগান-হ্যারি দম্পতির প্রথম সন্তান জন্ম নেয়। তারপরও মিডিয়ার সহানুভূতি পাননি তাঁরা। তাঁরা তাঁদের নবজাত সন্তান আর্চির পায়ের ছবি ইন্সটাগ্রামে প্রকাশ করলে ট্যাবলয়েড পত্রিকা 'মিরর' তা ভালোভাবে নেয় না। বলে, জন্মের তিন দিন পর ভক্তরা শুধু শিশুর পায়ের ছবি দেখতে চায় না। তা যত যা-ই হোক, তাই বলে এই দম্পতি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেবেন তা অনেকেই অনুমান করতে পারেননি।


এ নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় আছেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। আর রেগে টং প্রিন্স হ্যারির বাবা ও প্রিন্সেস মেগানের শ্বশুর প্রিন্স চার্লস। সাফ বলে দিয়েছেন, হ্যারিকে আর এক কানাকড়িও দেবেন না তিনি। এ হলো গিয়ে রাগের কথা। তাই একদিকে হ্যারি ও মেগানের রাজপরিবার ছেড়ে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা চলছে, আর ঠেকানো সম্ভব না হলে কেমন হবে বিপুল সম্পত্তির বিলিবণ্টন, তা নিয়েও চলছে অঙ্ক কষা।

অঙ্কের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, এটা কিন্তু ঠিক, যে স্বাধীনতা উপভোগ করার জন্য রাজপরিবার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হ্যারি ও মেগান, তার জন্য বেশ চড়া মূল্যই দিতে হবে তাদের।রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে হ্যারি-মেগান যে বিলাসী জীবনযাপন করেন তার সব ব্যয় এতদিন রাজপরিবার থেকেই বহন করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে তারা এ অনুদান পাবেন না। তাদের যাবতীয় ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হবে। 

কিন্তু কীভাবে তারা এই কাজটি করবেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যারি-মেগান রাজপরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে সাধারণ জীবন-যাপনের কথা বলছেন, আক্ষরিক অর্থে তা কখনোই সম্ভব নয়। তাই রাজপরিবার থেকে অর্থ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বিকল্প আয়ের অনুসন্ধান করতে হবে। এক্ষেত্রে মেগান বড় পর্দায় অভিনয় না করলেও হয়তো ছোট পর্দায় আবারও ফিরে যাবেন। জানা গেছে, ছোট পর্দায় ড্রামা সিরিয়াল ‘সুইটস’-এ আবারও নিয়মিত হতে পারেন মেগান, যেখান থেকে তিনি প্রায় ২২ লাখ মার্কিন ডলার আয় করবেন। সিরিয়ালের প্রতি এপিসোড থেকে প্রায় ৮৫ হাজার ডলার সম্মানী নেবেন মেগান।

এছাড়া ১৯৯৭ সালে প্রিন্সের ডায়ানার মৃত্যুর পর তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়েছেন দুই পুত্র হ্যারি ও উইলিয়াম। এই সম্পদের পরিমাণও কম নয়, প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া তারা বই লিখে এবং বক্তৃতা দিয়েও প্রচুর আয় করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে প্রতি ভাষণের জন্য বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটন লাখ ডলার আয় করেন। ২০১৭ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ফার্স্টলেডি মিশেল বই লেখার চুক্তি করে সাড়ে ছয় কোটি মার্কিন ডলার আয় করেন। হ্যারি-মেগান জুটিও এই ধরনের অফার পেতে শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে। শুধু ইন্সটাগ্রামেই তাদের এক কোটিরও বেশি অনুসারী রয়েছে। চাইলে বিভিন্ন প্রতিষ্টানের প্রমোশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও তারা আয় করতে পারবেন। যেমনটি কিম কারদাশিয়ান এবং তার সৎ বোন কাইলি জেনার কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রমোশনে প্রতি পোস্টের জন্য ৫ লাখ মার্কিন ডলার নিয়ে থাকেন।

এভাবেই 'সাধারণ' হওয়ার পরিকল্পনা আঁটছেন হয়তো হ্যারি-মেগান দম্পতি। দেখা যাক, কত দূর যান বা যেতে পারেন তাঁরা। তবে হ্যারি মেগানের রাজপ্রাসাদ থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে তার মা ডায়ানার রাজপ্রাসাদ ত্যাগের কথাও অনেকের মনে পড়ছে।