আন্দালুসিয়া : পান্নায় খচিত মুক্তার হারিয়ে যাওয়া দিন

আলহামরা প্রাসাদ - সংগৃহীত


ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকাকে ভাগ করেছে জিব্রালটার প্রণালী। সরু এই প্রণালীর একদিকে আটলান্টিক, অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর। আর ইউরোপের ভূখন্ডে আইবেরিয় উপদ্বীপ। তিনদিকে সাগরবেষ্টিত এই উপদ্বীপটিই আন্দালুসিয়া। স্পেনের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। সাগর, পাহাড় আর ঐতিহ্য মিলিয়েই ওই অঞ্চল। আন্দালুসিয়ার ভূমিতে ছড়ানো সুন্দর, সভ্যতার চিহ্ন। ওখানে আছে ইউরোপের দ্বিতীয় উঁচু পর্বতশ্রেণি। বিশাল জলাভূমি।


ওখানে আগে আইবেরিয় এবং কেল্টদের বসতি ছিলো। পরে রোমানরা ওই এলাকা দখল করে। মধ্যযুগে এলাকাটি যায় জার্মান যাযাবরদের দখলে। এদের ডাকা হতো ভিসিগোথ। ৫৮৯ সালে ভিসিগোথ সম্রাট ছিলেন উইটিযা। তিনি আরিয়ান খৃস্টান থেকে ক্যাথলিক হয়ে যান। সাম্রাজ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। উইটিযাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন পাশের সামন্ত রাজা রডারিক। পরে তিনি আক্রমণ করেন উইটিযার জামাতা সিউটার রাজা জুলিয়নকে। তিনি প্রথমে পালিয়ে যান। পরে ফিরে এসে রডারিকের আনুগত্য মেনে নেন। আনগুত্য মানার প্রমাণ হিসেবে তখন কেন্দ্রে কোনো সন্তানকে পাঠানো হতো। জুলিয়নের ছিলো একমাত্র কন্যা ফ্লোরিন্ডা। দেখতে সুন্দরী। রডারিকের দরবারে পাঠানো হলো তাকে। রডারিক তাকে ধর্ষণ করলেন। ফ্লোরিন্ডা তার বাবাকে বিষয়টি জানিয়ে গোপনে চিঠি লিখেন। কিছুদিনের ছুটির কথা বলে বাবা কন্যাকে নিজের কাছে নিয়ে যান।


পরে বাবা যোগাযোগ করেন উত্তর আফ্রিকার মুসলিম গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইর সঙ্গে। তাকে আমন্ত্রণ জানান স্পেন আক্রমণের। মুসা অভিযানে পাঠান তার সিপাহসালার তারেক বিন জিয়াদকে। ১২ হাজার সেনা নিয়ে তারেক অগ্রসর হন। জুলিয়ন গোপনে তাদেরকে জিব্রালটার প্রণালী পার করে দেন। ৭১১ সালের ২৯ এপ্রিল স্পেনের সীমানায় একটি পাহাড়ের কাছে সেনাসমাবেশ করেন তিনি। পরে তার নামেই ওই পাহাড়ের নাম রাখা হয় ‘জাবাল উত তারেক’। এর অর্থ ‘তারেকের পাহাড়’। সেটাকেই ব্যাপকভাবে ডাকা হয় ‘জিব্রালটার’।


তারেক জিব্রালটারে পৌঁছে নিজেদের নৌকাগুলো পুড়িয়ে দেন। সেনাদের ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খোলা রাখেননি। তারেকের কাছে ছিলো বিশ্বাসের জোর। তিনি সেনাদের জরো করলেন। ভাষণ দিলেন, ‘আমার সৈন্যরা, কোথায় পালাবে তোমরা? পেছনে সাগর, সামনে শত্রু। তোমাদের কাছে আছে কেবল দৃঢ়তা এবং সাহস। মনে রেখো, অর্থলোভী মালিকরা যেসব এতিমদের বিক্রি করে দেয়, এই দেশে তোমরা তাদের চাইতেও দুর্ভাগা। তোমাদের সামনে অগণিত শত্রু। কিন্তু তোমাদের হাতে কেবল তলোয়ার। যদি শত্রুর হাত থেকে নিজেদের জীবন ছিনিয়ে আনতে পারো, তবে বাঁচতে পারবে। তোমাদের সামনে আছে শত্রুকে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগ। যদি মৃত্যুকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো, জয় নিশ্চিত। ভেবো না, আমি তোমাদেরকে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে যাবো। আমি সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভাবনাই সবচেয়ে কম।’ তিনি ও তার সেনারা শপথ নেন ‘বিজয় অথবা মৃত্যু’র। তারেক বিন জিয়াদ বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ৭১১ সালের ১৯ জুলাই। মাত্র ১২ হাজার সেনা নিয়ে রডেরিকের লাখেরও বেশি সেনার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন কেবল ‘বিশ্বাস’-এর জোরো।


মুসলমানদের বিজয় টিকেছিলো প্রায় সাড়ে সাতশ বছর। আর তারেক বিন জিয়াদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেলো সোনার অক্ষরে। সেই সময় ওই এলাকাটির নাম রাখা হয় আন্দালুসিয়া। আন্দালুসিয়া হওয়ার পর এলাকাটি দ্রুত উন্নত হতে থাকে। সমৃদ্ধ হতে থাকে শিল্প ও সংস্কৃতিতে। অথচ ইউরোপজুড়ে তখন ছিলো মূর্খতা। মুসলমানরা আন্দালুসিয়ায় তৈরি করেন বড় লাইব্রেরি। যাতে বই ছিলো ৬০ হাজার। পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভ’মিতে পরিনত হয় আন্দালুসিয়া। মুসলিমদের আন্দালুসিয়া ছিলো তাক লাগানোর মতো আধুনিক, সভ্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি। তখনকার ইউরোপের অন্য এলাকা ছিলো অন্ধকারে ঢাকা। তখন গোটা স্পেনে ছিলো মুসলিম প্রভাব। ছিলো খৃস্টান, ইহুদিসহ অন্য ধর্মের লোক। মুসলিম শাসকদের কাছে সবাই ছিলো নিরাপদ। ইউরোপের খৃস্টান রাজারা স্থিতিশীলতা মানতে পারলেন না। ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকলেন। এর মধ্যে আরগুনের শাসক ফারডিনান্ড এবং কাস্তালিয়ার পর্তুগীজ রানি ইসাবেলা বিয়ে করে নিজেদের শক্তি বাড়ান। এই দুই শক্তি মিলে মাঠে নামে মুসলিমদের বিপরীতে।


মুসলিম শাসন যখন কিছুটা দুর্বল, তখন সুযোগ নেন পালডিনান্ড-ইসাবেলা দম্পতি। এরা মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করতে চান। বিনিময়ে উৎকোচ সাধাসাধি করেন। অনেকে উৎকোচ নেন, কিন্তু ধর্ম পরিবর্তন করেন না। বিষয়টি টের পেলেন খৃস্টান দম্পতি। এরা এদের প্রভাব বাড়াচ্ছিলেন। সেইসঙ্গে মুসলিমদের ওপর নজরদারিও বাড়াচ্ছিলেন।
একটা সময় ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা গ্রানাডা অবরোধ করেন। ভেতরে না খেতে পেয়ে দুর্বল হয়ে যান মুসলিমরা। খৃস্টান দম্পতি ঘোষণা করেন, যারা মসজিদে আশ্রয় নেবে অথবা সাগরে খৃস্টান জাহাজে উঠবে, তারা নিরাপদ থাকবে। অবরুদ্ধ মুসলিমরা আশ্বাসে  বিশ্বাস করেন। গ্রানাডার ফটক খুলে দেন। দলে দলে মসজিদে ও খৃস্টান জাহাজে লোকেরা আশ্রয় নেন। পরে মসজিদটি বাইরে থেকে খিল এঁটে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজ ডুবানো হয় মাঝ সাগরে। এভাবেই আন্দালুসিয়া থেকে হারিয়ে যায় মুসলমান। যারা তখনো বেঁচে ছিলেন, পালিয়ে যান উত্তর আফ্রিকায়। খৃস্টান দম্পতি গ্রানাডার দখল নিয়ে ধ্বংশ করে দেন মুসলিম সভ্যতা। জ্বালিয়ে দেন লাইব্রেরি। নষ্ট করা হয় স্থাপত্য। তারপরও যতটুকু টিকে আছে, সেটুকুই তাক লাগাচ্ছে পৃথিবীকে।


আন্দালুসিয়ার রাজধানী সেভিল। ওখানে ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির সম্মিলন। শহরের অলিতে গলিতে পুরনো স্থাপত্য, নান্দনিক শৈলি। সেভিলার হৃদয় ‘ব্যারিও সান্তা ক্রুজ’। এই হৃদয় ঘিরে আছে আরো স্থাপনা। সবুজ বাগান। বাগানের ভেতর প্রাসাদ ‘রিয়েল আলকাজার’। আছে ‘সেভিলা ক্যাথেড্র্যাল’। ওটা ‘সেন্ট ম্যারি ক্যাথেড্র্যাল’ হিসেবে পরিচিত। এর পাশেই ‘গিরালডা টাওয়ার’। মুসলিমদের সময় ওটা ছিলো মসজিদের মিনার। এখন ক্যাথেড্র্যালের বেল টাওয়ার। ক্যাথেড্র্যালে ঢুকার টিকেট কেটেই ওই টাওয়ারে উঠা যায়।


ওখানকার স্থাপত্যে মুসলিম, স্প্যানিশ এমনকি রোমানদের শৈলির নিদর্শনও আছে। সান্তা ক্রুজ এলাকায় যদি একা যান, তবুও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে সমস্যা হবে না আপনার। প্রাচীন নিদর্শন দেখার পাশাপাশি ঢু মারতে পারেন স্প্যানিশ খাবারের পসরা ‘তাপস বার’-এ। দোকানে দোকানে ঘুরে কেনাকাটা করতে পারেন। দেখতে পারেন হ্যান্ডিক্র্যাফটস এবং সিরামিক।


বিশ্ব তোলপাড় করা সিরিজ ‘গেম অব থ্রোন’ যদি আপনার দেখা থাকে, তাহলে প্রথম দেখাতেই চিনতে পাবেন ‘আল কাজার’। ওখানেই এই সিরিজটির শুটিং হয়েছিলো। আর যারা সিরিজ দেখেননি, তাদের জন্যও প্রাসাদটি দেখা জরুরি। ওখানে আগে ছিলো এক মুসলিম দুর্গ। পরে খৃস্টান রাজা পিটারের জন্য ওই প্রাসাদটি বানানো হয়। আল কাজার খোলা থাকে সপ্তাহের সাতদিন।


প্রথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ‘বুলরিঙ’ আন্দালুসিয়ায়। ওখানে এখন ষাঁড়ের লড়াই হয় না। তবে আগেকার লড়াইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণে আছে। রিঙের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে ষাঁড়ের লড়াইয়ের জাদুঘর। নাম ‘রিয়েল ম্যায়েস্ট্যানজা’।


সেভিলার সুন্দর এবং বিলাসি প্রাসাদ প্লাজ ডি এস্পেনা। আইবেরো-আমেরিকান এই স্থাপত্যটি ১৯২৮ সালে বানানো হয়। সেভিলার চারদিক ঘেরা প্রাচীন প্রাচীরে। ওটা প্রথম তৈরি হয়েছিলো রোমান আমলে। সময়ে সময়ে এর সংস্কার হয়। গত শতাব্দীতে প্রাচীরটি বার বার ভেঙে পড়েছে, বার বার-ই সংস্কার করা হয়েছে।
আন্দালুসিয়ার আরেক সমৃদ্ধ শহর মালাগা। আকারেও বড়। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার এই শহরেই জন্ম হয়েছিলো স্প্যানিশ শিল্পী পাবলো পিকাসোর। তার নামে একটি জাদুঘরও আছে ‘পিকাসো মিউজিয়াম’। ২০০৩ সালে এটি গড়ে তোলা হয়।


মালাগা বিখ্যাত সৈকতের জন্য। খুব কাছেই মালাগুয়েটা সৈকত। চকচকে রোদে সাগরের পানিতে নেমে রোদ গোসল করতে ওখানে যান পর্যটক। সাগর থেকে উঠে এসে হাঁটেন পাহাড়ের গায়ে। এই শহরে হাইকিংয়ের অবারিত সুযোগ। আর সাইক্লিংয়ের জন্যও প্রসিদ্ধ। পরিবারের সব সদস্য নিয়ে স্প্যানিয়রা বেড়াতে যান কোস্টা ডেল সোলে। ওখানে শিশুদের বিনোদনের জন্য আছে আলাদা ব্যবস্থা। এই প্রাণবন্ত বিনোদন এলাকা বছরের ৩২০ দিন-ই রোদঝকমকে থাকে। শীতকালীন খেলার আয়োজন থাকে সিয়েরা নেভাদা শহরে। ওখানে আছে ইউরোপ বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট ‘সোলি নিয়েভা’। এর অর্থ ‘তুষার এবং রোদ’।


আন্দালুসিয়ায় উপকূলে আছে আরো এক প্রাচীন শহর ‘কাদিজ’। প্রত্নতাত্বিকরা তিন হাজার বছরেরও আগেকার বসতির প্রমাণ পেয়েছেন। সেভিলা থেকে দিনে দিনে গিয়েই ঘুরে আসা যায় কাদিজ থেকে। ট্রেনে সময় নেয় দুই ঘণ্টা। এটি প্রাচীন বন্দরশহর। স্প্যানিশ নৌবাহিনীর পোতাশ্রয়। বন্দরটির ব্যবসায়িক গুরুত্ব বিশাল। কাদিজে ছিলো রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের প্রথম পাবলিক অফিস। ইংরেজি সাহিত্যের কবি লর্ড বায়রন এখানে ছুটি কাটাতে আসতেন। এখনো সেসব চিহ্ন আছে।
একটি রোমান ক্যাথলিক ক্যাথেড্র্যালে আছে সোনার গম্বুজ। ১৭৭২ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে এটি বানানো হয়েছে। ক্যাথেড্যালের টাওয়ার থেকে গোটা শহর দেখা যায়। সাগরের দিকে চোখ দিলে আসে উপকূলের দুর্দান্ত দৃশ্য।


আন্দালুসিয়ার তিন দিকেই সৈকত। ওসব সৈকতের পড়ন্ত দুপুর মানেই রোদগোসল। সৈকতে আরামের জন্য পর্যটকরা যান হুয়েলভা এলাকার দে লা লুজ শহরে। ওখানে আছে কিছু প্রত্যন্ত সৈকত। সাগরের বেপরোয়া বাতাসের বিপরীতে আছে পাইন গাছ। গ্রীষ্মে নির্জন সময় কাটাতে স্প্যানীয়রা যান হুয়েলভায়। দুর্বোধ্য সৈকত নেরজা বাড়াবাড়িরকমের সুন্দর। এই ‘সুন্দর’ থাকে সবসময়। গ্রীষ্মেও সৈকত এলাকা শীতের মতো শান্ত।


গোটা আন্দালুসিয়ার সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। প্রাচীন শহর কর্ডোভায় বয়ে গেছে দারো নদী। এর পাশেই আছে এক ‘পান্নায় খচিত মুক্তা’। চারদিকে পাহাড়ি সবুজ, মাঝখানে বিলাসি প্রাসাদ। সাবিক পাহাড়েরর এই প্রাসাদের নাম ‘আল হামরা’, মুসলিম সংস্কৃতির নির্দশন। এখানে আছে মুসলিম স্থাপত্যের জমকালো কাজ। খোলা আঙিনা, ঝর্ণা। আল হামরায় চোখ রাখলে দেখা যায় পুরো গ্রানাডা শহর, আল বাইজিনের তৃণভূমি।


নবম শতাব্দীতে ধ্বংশপ্রাপ্ত এক রোমান দুর্গে তৈরি করা হয়েছে আলহামরা। আরবি ভাষায় এর অর্থ ‘লাল দুর্গ’। কেউ কেউ বলেন নাসিরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আল হামারের নামে ওই প্রাসাদের নাম। আলহামরা জৌলুস পায় আল হামারের সময়েই। আর আজকের জমকালো কাঠামোর অনেকটা গড়ে উঠে সুলতান প্রথম ইউসুফ এবং পঞ্চম মুহাম্মদের সময়। ১৯৪২ সালে মুসলিমদের কাছ থেকে গ্রানাডার পতনের পর রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রানী ইসাবেলার দখলে যায় আল হামরা। এরা কিছু কাজ চুনকাম করে ঢেকে দেয়। প্রাসাদটিতে বসানো হয় রাজসভা। এটি এখন ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত। আলহামরার টানে সারা দুনিয়া থেকে পর্যটক যান আন্দালুসিয়ায়। কেউ যান ওই ভূখ-ের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে। মুসলমানদের স্পেন বিজয় এবং পতনের শব্দ শুনতে।