গান্ধীকে কেন হত্যা করে আর এস এস

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী - সংগৃহীত


ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। এই নেতার পুরো নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গত ২ অক্টোবর পালিত হয়েছে তাঁর দেড়শতম জন্মদিন। আর জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে চুরি করা হয়েছে তার দেহভস্ম। দুর্বৃত্তরা তার পোস্টারে কালি মেখে লিখে গেছে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের এই নেতার মৃত্যুর পর দেহভস্মের কিছু অংশ বিসর্জন দেওয়া হয় এবং কিছু অংশ রেখে দেওয়া হয় প্রদর্শনীর জন্য। সেই অংশটাই চুরি করা হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায় কারা চুরি করেছে এই দেহভস্ম। কংগ্রেস নেতা গুরমিত সিংহ বলেছেন, গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের প্রেমিকরাই এই অপকর্ম করেছে।

নাথুরামের প্রেমিক কারা?


সেটা জানার আগে চলুন ঘুরে আসি গান্ধীর জীবন থেকে।মহাত্মা গান্ধীর স্বপ্ন ছিলো অখ- ভারত। যেখানে হিন্দু মুসলিমদের আলাদা করে দেখা হবে না। তিনি ছিলেন অহিংস আন্দোলনের উদাহরণ। তার এই নীতির বিশ্বজুড়ে কদর থাকলেও নিজের জন্মভ’মিতে চলছে সহিংসতা।


মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম গুজরাটের সাগর উপক’লীয় শহর পোরবন্দরে। দিনটি ছিলো ১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর। বাবা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। মা পুতলি বাই ধর্মকর্ম নিয়ে থাকতেন। অভিজাত পরিবারের সন্তান মোহনদাস করমচাঁদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশীলন এসেছে মায়ের প্রভাবে। বাবা ছিলেন হিন্দু মোধ গোষ্ঠীর। এবং মা ছিলেন প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর কন্যা।


বাবা করমচাঁদ এর আগে আরো তিনটি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সন্তান প্রসব করতে গিয়ে তিন স্ত্রীর-ই মৃত্যু হয়। পুতলি বাই ছিলেন করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী। তার কোলেই জন্ম হয় ভারতের কিংবদন্তী নেতা মহাত্মা গান্ধীর। তখন ১৮৮৩ সাল। মোহনদাসের বয় ১৩। বাবা-মা তার জন্য পাত্রী ঠিক করলেন। পাত্রীর নাম কস্তুরবা মাখাঞ্জী। মোহনদাসের চেয়ে এক বছরের বড়। অর্থাৎ তার বয়স ১৪। পরিবারের পছন্দকে এড়াতে পারলেন না তিনি। বিয়ে করলেন কস্তুরবা মাখাঞ্জীকে। তাকে সবাই চিনতো ‘কস্তুর বাই’ নামে।


সংসার করতে করতেই পড়ালেখা চালিয়ে যান মোহনদাস। ১৮৮৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন রাজকোট হাইস্কুল থেকে। এরপর কিছুদিন গুজরাটের ভবনগরের সামালদাস কলেজ ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করেন। এর মধ্যেই তাদের ঘর আলো করে আসে প্রথম সন্তান হরিলাল গান্ধী। তখন ১৮৮৮ সাল। দ্বিতীয় ছেলে মনিলাল গান্ধীর জন্ম হয় ১৮৯২ সালে। ১৮৯৭ সালে জন্ম হয় রামদাস গান্ধীর। ছোট ছেলে দেবদাস গান্ধীর জন্ম ১৯০০ সালে।


গান্ধী যখন প্রথম বাবা হলেন, তখন তার কৈশোর। এই বয়সে সবাই যেমন দুরন্ত হয়, তিনিও তাই ছিলেন। ধর্মবিষয়ক বিধিনিষেধ খুব একটা মানতেন না। পরিবারের রীতির বাইরে গিয়ে মাংস খেতেন। এমনকি পতিতালয়েও যেতেন। গান্ধী পরিণত বয়সে এসে দাবি করেছিলেন, পতিতালয়ে তিনি কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেননি।
তিনি যেসব অন্যায় করতেন, সেসব নিয়ে পরে অনুতপ্তও হতেন। কৈশোরের দুরন্তপনার মধ্যেই তাকে যেতে হলো লন্ডন। ১৮৮৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ভর্তি হন। মোহনদাসকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান মা পুতলি বাই। ছেলেকে ডেকে শপথ করালেন- কখনো মাংস খাওয়া যাবে না। মদ স্পর্শ করা যাবে না। হিন্দু ধর্মের নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে।


বাধ্য ছেলের মতো মায়ের কথায় শপথ করলেন মোহনদাস। শুধু তাই নয়, লন্ডনে গিয়ে মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে রাখলেনও। তিনি সেখানে খেতেন নিরাবিষভোজী রেস্টুরেন্টে। ভর্তি হন নিরামিষভোজী একটি ক্লাবেও। পরে ওটার নির্বাহী সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হন। ক্লাবে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য পড়ানো হতো। মোহনদাস সেখানে ভগবত গীতা পড়লেন। পড়লেন বৌদ্ধ, ইসলাম, খৃস্টানসহ বেশ কয়েকটি ধর্মের গ্রন্থ।


বাবা-মায়ের বাধ্যগত সন্তান হিসেবেই নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আরো বড় হচ্ছিলেন মোহনদাস। একটা সময় এসে তার মাথায় চেপে বসে অদ্ভুত নেশা। তিনি ঠিক করেন, ‘যৌনতা’ থেকে দূরে থাকবেন। কারণ, তার বাবার যখন মৃত্যু হয়, তখন মোহনদাস তার স্ত্রীর সঙ্গে যৌনতায় ছিলেন। মৃত্যুর সময়টাতে বাবার কাছে থাকতে পারেননি। এই অপরাধবোধ তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে সারা জীবন। নিজের জীবনীতে গান্ধী লিখেছেন, ‘যদি পাশবিক প্রবৃত্তি আমাকে অন্ধ করে না রাখতো -তাহলে বাবা আমার নিজের হাতের ওপরই মারা যেতেন।’ বাবার মৃত্যুর পর গান্ধীর আরো একটি সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের পরপরই তার মৃত্যু হয়। গান্ধী মনে করেন, বাবার মৃত্যুর সময় তিনি থাকতে পারেননি বলেই ভগবান তাকে এই শাস্তি দিয়েছেন।


এরপর তিনি ‘শোকের পোশাক’ ধরেন। তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ধূতি এবং শাল। এগুলো নিজেই চরকায় বুনতেন। শোকের পোশাক পড়ে গান্ধী ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করেন। নিরামিষ খান। ফল খান। আত্মশুদ্ধি এবং প্রতিবাদ জানাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য উপবাস থাকেন। যৌনতা থেকে দূরে থাকেন। নিজের মনের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য তিনি প্রায়ই নারীদেরকে বিছানায় নিয়ে নগ্ন হয়ে ঘুমাতেন। এমনকি নাতনি মানু গান্ধীকেও পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছেন। গান্ধীর জীবনের এই অধ্যায়টি বরাবরই সমালোকদের রসদ জুগিয়ে আসছে। তবে তার জীবনী লেখক রমাচন্দ্র গুহ লিখেছেন, গান্ধী পরীক্ষা করে দেখতেন নিজের যৌন আকাঙ্খাকে সম্পূর্ণ জয় করতে পেরেছেন কি না।
গান্ধী ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে ফিরেন ১৮৯১ সালে। তখন তিনি মায়ের মৃত্যুসংবাদ পান। সংবাদ শুনে ভেঙে পড়েন। তবে আত্মীয়দের কাছে ফিরে যাননি। লন্ডনে পড়ালেখা করেছেন বলে আত্মীয়দের অনেকে তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন বোম্বাই আদালতে। লাজুক স্বভাব হওয়া সেখানে সুবিধা করতে পারেননি। ১৮৯৩ এক ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে চলে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে তিনি ভারতীয় প্রবাসীদের জন্য কাজ করেন। আইনি লড়াই করেন। বিভিন্ন আন্দোলন করে কারাগারেও যান।


কেবল দক্ষিণ আফ্রিকাতেই নয়, ভারতেও তাকে বেশ কয়েকবার কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলো বৃটিশ সরকার। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে আসেন ১৯৯৫ সালে। ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হন গোপালকৃষ্ণ গোখলের মাধ্যমে। গোখলে ছিলেন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। একটা সময় তিনিও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে চলে যান। তখন কাজ করেন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায়। দারিদ্র্য দূর করায়। স্বরাজ আন্দোলন করেন। অহিংস আন্দোলনে বৃটিশ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেন। তিনি অহিংসভাবে সত্যাগ্রহ করেছিলেন।


১৯৩০ সালে ভারতীয়দের লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে লবন হাঁটার আয়োজন করেন। ৪০০ কিলোমিটর হেঁটে এলাহাবাদ থেকে ডান্ডিতে পৌঁছান। হাজার হাজার ভারতীয় তার সঙ্গে হেঁটে যান সাগর উপকূলে। মূলত এই আন্দোলনের মাধ্যমেই ১৯৪২ সালে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরু হয়।
একটা সময় এসে কংগ্রেস থেকে সরে দাঁড়ান এই মহৎ নেতা। কংগ্রেস নিজেদের মতো করে আন্দোলন করতে থাকে। বিশ^জুড়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ। এতে দুর্বল হয় বৃটেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয় ভারত। একইসঙ্গে জন্ম হয় পাকিস্তানেরও।


ভারত ভেঙে ভাগ হওয়ার বিষয়টি গান্ধীকে মর্মাহত করে। তারপরও সত্যকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন। তবে ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা রুখতে তিনি মাঠে নামেন। দিল্লিতে বিড়লা ভবনে ঘাঁটি গাড়েন। ভবনটির মালিক ডাকসাইটে ব্যবসায়ী ঘনশ্যাম বিড়লা। তিনি গান্ধীর ভক্ত ছিলেন। সেখানে মুসলমানদের অধিকারের জন্য অনশন করেন গান্ধী।
এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাব-ই তার জন্য বিপদ ডেকে আনে। ভেতরে ভেতরে তার বিরুদ্ধে চলতে থাকে ষড়যন্ত্র। গান্ধীর নীতি পছন্দ হয়নি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের। সংক্ষেপে এই সংস্থাটিকে ডাকা হয় আরএসএস। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংস্থাটি তৈরি হয় ১৯২৫ সালে। শুরু থেকেই এটি ইউরোপীয় উগ্র জাতীয়বাদী আন্দোলনের আদল নেয়। আরএসএসের লোকেরা ভারতভাগের জন্য গান্ধীকেই দায়ী করলেন। এরা ভুলে যান লবন আন্দোলন, সত্যাগ্রহ আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলন। এরা প্রতিশোধ নিতে চাইলেন।


আরএসের ঘাঁটি ছিলো পুনেতে। গান্ধীকে হত্যাকারীরাও কোনো না কোনোভাবে এই শহরটির সাথে যুক্ত ছিল। আরএসএসের ভেতর থেকেই গড়ে উঠলো ‘হিন্দু রাষ্ট্রদল’। এর প্রতিষ্ঠা করলেন দামোদর সাভারকর। তিনি ছিলেন খাঁটি ব্রাহ্মণ। ধুরন্ধর এবং গুপ্তঘাতক। সাভারকরের সঙ্গে একটা সময় পরিচয় হয় সেই কুখ্যাত মারাঠি যুবক নাথুরাম গডসের। গান্ধীর হত্যাকারী হিসেবে যাকে নিন্দা করা হয়। তার সঙ্গে ছিলো নারায়ণ আপ্তে এবং বিষ্ণু কারকারেরসহ আরো কয়েকজন। নাথুরাম গডসে এবং তার সাগরেদ নারায়ণ আপ্তে ‘অগ্রণী’ আর ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ নামে দুটি বিতর্কিত খবরের কাগজ প্রকাশ করে। বিষ্ণু কারকারে একটি অতিথিশালা খুলে আহমেদনগরে। সেখান থেকেই হতে থাকে পরিকল্পনা। তাদের মাথার ওপর রয়ে যান আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবক সাভারকর।


২০ জানুয়ারি ১৯৪৮ সাল, মঙ্গলবার। ঠিক হলো ওইদিন তাকে হত্যা করা হবে। গান্ধীর বিড়লা ভবনের মন্ডপের পেছনে কিছু খুপরি ঘর ছিলো। হামলাটা সেখান থেকেই চালানোর পরিকল্পনা হয়। নাথুরাম আর নারায়ণ বাদে বাকিদের হাতে থাকবে বোমা আর পিস্তল। সময় ঘনিয়ে এলে সব গড়বড়ে হয়ে যায়া। মদনলাল অপরিকল্পিতভাবেই একটা বোমা ফাটিয়ে দেয়। এতে লোকের হইচই বেড়ে যায়। গান্ধী থেকে যান অক্ষত।  এই ঘটনার পর তার প্রার্থনাসভায় পুলিশি নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু গান্ধীর তাতেও আপত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো ভারতীয় তাকে মারতে পারে না।


কিন্তু সেই হিসাব ছিলো ভুল। ৩০ জানুয়ারি, আবার আসে খুনীরা। খাকি পোশাক পড়ে নাথুরাম গডসে ঢুকে যান পূজোর মঞ্চে। একটি পিস্তল লুকিয়ে নিয়ে গডসে সোজা হেঁটে যান গান্ধীর কাছে। নিচু হয়ে নমস্কার করেন। তারপর তিনটি গুলি। লুটিয়ে পড়েন মহাত্মা গান্ধী। ঘড়িতে তখন পাঁচটা বেজে সতেরো মিনিট। ভারতের স্বাধীনতার বয়স তখনো ছয় মাস হয়নি।
ঘটনাস্থলেই ধরা পড়ে নাথুরাম। পুলিশ গ্রেফতার করে আটজনকে। নাথুরাম আর নারায়ণের ফাঁসি হয়। অন্যদের পাঠানো হয় দ্বীপান্তরে। ধূর্ত বুদ্ধির জোরে বেঁচে যান নাটের গুরু সাভারকর।


নাথুরামের ভাই গোপাল গডসে জেল খেটে বের হয়ে আবার হিন্দু উগ্রবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। গডসে আর সাভারকরের পরিবারের ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে।
মহাত্মার খুনী এই নাথুরাম গডসের রাজনীতিতে আসা গান্ধীর আন্দোলনের মাধ্যমেই। তিরিশের দশকে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাথুরাম জেল খেটেছিলেন। পরে তিনি উগ্র প্রচারে প্রভাবিত হয়ে নিজের গুরুকেই হত্যা করেন।


নাথুরাম তার শেষ ইচ্ছায় জানিয়েছিলেন, ভারত যতদিন এক না হবে এবং সেখানে হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠা না হবে, ততদিন যেন শ্মশানে পোড়া তার ভস্ম গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া না হয়। তার ভাই গোপাল গডসের বংশধরদের কাছে এখনো রয়ে গেছে সেই ভস্ম।আরএসএসের কেউ কেউ এখনো আছেন সেই দিনের অপেক্ষায়। যেদিন ভারত উপমহাদেশ এক হবে। এবং নাথুরামের ভস্ম বিসর্জন হবে গঙ্গায়।