মালয়েশিয়ার পেছনের গল্প

আধুনিক মালয়েশিয়া - সংগৃহীত


আজকের মালয়েশিয়া মাহাথির মুহাম্মদের। একটা সময় ছিলো আদিম মানুষের। আধুনিক মালয়েশিয়ায় আছে বহু ধর্ম, গোত্র, বর্ণের লোক। অতীতেও তা-ই ছিলো।
৩ লাখ ৩০ হাজার ৮০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে মোট লোকের সংখ্যা ৩ কোটি ২৭ লাখ ৭২ হাজার ১০০। এদের ৬০ শতাংশ মুসলমান। ৩০ শতাংশ চীনা এবং বাকি ১০ শতাংশ ভারতীয় হিন্দু, শিখসহ অন্য ধর্মের।


মালয়েশিয়ার ভ’মিপুত্র মুসলমানরা। এদেরকেই বলা হয় এই ভ’মির আদি বাসিন্দা। দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন মুসলমানরা। অর্থনীতি চীনারা এবং সেবামূলক অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন হিন্দুরা। ওখানে মুসলমান, হিন্দু এবং বৌদ্ধদের মিলমিশের বসতি।তবে এই মিলমিশ সবসময় ছিলো, এমনটা দাবি করা যায় না। কখনো কখনো ধর্মে-ধর্মে দাঙ্গা দেখা দিয়েছে। তৈরি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। সে কারণেই মালয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় সবাইকে এক কাতারে বাঁধা হয়েছে। এই চেতনার উপরই টিকে আছে দেশটি।


মালয় উপদ্বীপের টিকে থাকার গল্প অনেক দিনের। বলা যায় দশ হাজার বছরেরও আগেকার। খৃস্টের জন্মের আট হাজার বছর আগেও ওখানে লোকের বসতি ছিলো। এমনটাই দাবি করছেন ইতিহাসবিদরা। তারা মনে করেন, তখনকার লোকেরা শিকার করে পেট চালাতো। সেই সময়টাকে বলা হয় প্রস্তর সময়। পাথরের হাতিয়ার তৈরি করে নিজেদের রক্ষা করতো এবং শিকার করতো।পাথুরে সময়ের পর ওই উপদ্বীপে প্রবেশ করতে থাকে আরো কিছু লোক। এদের বিদ্যা আরো উন্নত। আগের লোকেরা বনে বনে ঘুরে ফল খেতো, শিকার সংগ্রহ করতো। নতুন আসা লোকেরা জমিতে ফসল ফলাতেও জানতো। এরা বসত করতে শুরু করলো সাগর উফক’লে এবং নদীর পাশে। কিন্তু সবখানেই বৃষ্টিবন। ইংরেজিতে যাকে বলে রেইন ফরেস্ট। আকাশছোঁয়া গাছ। ওগুলো কাটার মতো হাতিয়ারও নেই কৃষকদের হাতে। তবে চাষাবাদের জমি মিলবে কীভাবে। আর জমি না মিললে ফসল ফলবে কী করে?


সহজ উপায়, বন জ্বালিয়ে দিতে হবে। বনে কৃত্রিম দাবানল তৈরি করে আদিম কৃষকেরা জমি বিরান করলো। এরপর চাষের জন্য উপযোগী করলো। এবং মাটিতে বীজ পুঁতে ফসল ফলাতে শুরু করলো।কৃষকরা যখন এলো, তখন পাথুরে শিকারিদের অবস্থা কী হলো?ওরা ছিলো কৃষকদের ওপর ক্ষুব্ধ। কৃষকদের জ্বালাও-পোড়াওয়ের উৎপাতে শিকারিরা ঢুকে গেলো জঙ্গলের আরো গভীরে।চাষবাস করেই কৃষকদের দিন কাটছিলো। এভাবেই কেটে গেলো কয়েক হাজার বছর। তারপর উপদ্বীপে এলো আরো একধাপ অগ্রসর কৃষক। সেই সময়টা খৃস্টের জন্মের হাজার বছর আগে। নতুন ওই লোকেদের সঙ্গে ছিলো তামা এবং লোহার তৈরি হাতিয়ার। এদের কাছে জীবন অনেকটাই সহজ। চাইলেই হাতিয়ার দিয়ে জঙ্গল সাফ করা যায়। মাটি উর্বর করা যায়। কাঠ কেটে আসবাব তৈরি করা যায়। এরা উপকুল এবং নদীর তীরে মাছ ধরতে শুরু করলো। আর ফসল ফলানোর কাজ তো থাকলোই।


মালয় উপদ্বীপের উত্তরের একটি এলাকা কেদাহ। ওই এলাকাকে ঘিরেই গড়ে উঠতে থাকলো সভ্যতা। খৃস্টের জন্মের দুইশ কি তিনশ বছর আগে কেদাহ এলাকাকে কেন্দ্র করে উপদ্বীপের বাসিন্দারা এক হতে থাকলো। মালয়রা হতে থাকলো সভ্য।মালয় উপদ্বীপের সভ্যতার অনেকটাই পৌঁছেছে ভারত থেকে। সেই সময়েই ওখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে ভারতবাসীর ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিলো।  ভ’মির তিনদিকে সাগর হওয়ায় পৃথিবীর অন্য এলাকা থেকেও বনিকদের জাহাজ এসে ভীড়তো ওখানে।
চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল মলাক্কা। ওখানকার মশলার খ্যাতি পৌঁছেছিল সুদূর ইউরোপেও। এর অনেক আগে থেকেই বিদেশি নাবিক আর ব্যবসায়ীরা এসে ভিড় জমিয়েছিল দক্ষিণ-চীন সমুদ্রের বুকে এই বন্দরনগরীতে। এভাবেই যোগাযোগ হয় আরব উপদ্বীপের সঙ্গে। ওখান থেকে বনিকরা দলে দলে মলাক্কায় আসতো। সঙ্গে করে নিয়ে আসতো শান্তির বাণি। অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াত।এই দাওয়াত পৌঁছার আগে উপদ্বীপ ছিলো ভারতীয় সংস্কৃতিরই আরেক প্রতিচ্ছবি। ছিলো জাতিভেদ, শ্রেণিভেদের প্রথা। খৃস্টের জন্মের ৬৭৪ বছর পর, অর্থাৎ মুসলমান ধর্মের সোনালি সময়েই এই উপদ্বীপে আসে ইসলাম।
আরব বনিকদের এক কাতারে নামাজ পড়া, ভ্রাতৃত্ব এবং কোমল ব্যবহারে মুগ্ধ হতে থাকে লোক। দলে দলে লোকেরা দাওয়াত কবুল করতে শুরু করলো। একটা সময় তখনকার শাসকও মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করলেন। তারপর শান্তির বাণি আরো ছড়িয়ে গেলো। উপদ্বীপের প্রায় সবাই এসে আশ্রয় নিলো শীতল ছায়ায়। বাতাসে ভাসলো ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি।


এই ধ্বনি এখনো টিকে আছে। দেশটির প্রধান ধর্ম ইসলাম। তবে বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের অধিকারের ব্যাপারে আইন এবং বাস্তব দুটোই আপোষহীন। অধিকাংশ মুসলিম নারী হিজাব পড়ে। বৌদ্ধ ও হিন্দুরা নিজেদের মতো করে পোশাক পড়ে। এ কারণে সড়ক এবং বিপনীবিতানে দেখা যায় নারীদের বৈচিত্রময় পোশাক।
দেশটিতে আরো বৈচিত্র এসেছে বহু সংস্কৃতির স্পর্শে। এখানে ওপনিবেশ স্থাপন করেছিলো পর্তুগীজ এবং ডাচরাও। সর্বশেষ বৃটিশরা।


১৯২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ডাচদের সঙ্গে চুক্তি করে উপদ্বীপের দখল নেয়। তখনো উপদ্বীপে ১১টি রাজ্য ছিলো। রাজ্যগুলোর ছিলো আলাদা আলাদা শাসক। ১৯৪৬ সালে বৃটিশ উপনিবেশের অধীনে সেইসব রাজ্যগুলো এক করে ইউনিয়ন গঠন করা হয়। বিলুপ্ত হয় শাসকদের ক্ষমতা। কিন্তু এতে চটে যান জাতীয়তাবাদীরা। তাদের প্রতিবাদের মুখে ১৯৪৮ সালে ইউনিয়ন ভাঙা হয়। ১১টি রাজ্য মিলে গঠন হয় মালয় ফেডারেশন। এতে রাজ্যগুলোর শাসকেরা তাদের ক্ষমতা ফিরে পায়। তবে সে ক্ষমতা ছিলো প্রতীকি।


ভারত স্বাধীন হওয়ার দশ বছর পর ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসের মধ্যে ফেডারেশন স্বাধীনতা লাভ করেন। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নাম টুয়ানকু আবদুল রহমান। ১৯৬৩ সালে সাবা আর সারওয়াক ফেডারেশনে যোগ দেয়। তখন ফেডারেশন পুনর্গঠন করে মালয়েশিয়া গঠন করা হয়।  দেশটি চলতে থাকে একটি সালতানাতের অধীনে। তবে এই সালতানাতও প্রতীকী, মালয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক। প্রতি পাঁচ বছর পর পর সালতানাতের সুলতান পরিবর্তন হয়। আর এ পরিবর্তনটা আসে পালাক্রমে। নয়টি রাজ্যের প্রধানদের মধ্য থেকে কার পালা কখন হবে আগেই ঠিক করা থাকে। স্বাধীনতার পর থেকে সালতানাতের অধীন চলে আসছে দেশটি। শুরুর দিকে ধুঁকে ধুঁকে এগুচ্ছিলো। সেই আদিম যুগ থেকে কৃষিই ছিলো এদের ভরসা। কিন্তু কেবল কৃষিতে ভরসা রাখতে চাইলেন না একজন।


মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আবির্ভূত হলেন মাহাথির মুহাম্মদ। ১৯৮১ সালে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। পরে দেশটির অর্থনীতিতে নিয়ে আসেন পরিবর্তন। একের পর এক শিল্প গড়ে তুলতে থাকেন। তিনি পশ্চিমের দিকে নয়, তাকালেন পূবের দিকে। চীন ও জাপানকে অনুসরণ করে কারখানা বানাতে থাকেন। ডাকসাইটে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে টোপ দিতে থাকলেন। তারাও এসে বিনিয়োগ করলো উপদ্বীপে। উচ্ছ্বল গতিতে ঘুরতে শুরু করলো অর্থনীতির চাকা। একটা সময় মালয়দের পক্ষে খেটে-খুটে কাজ উদ্ধার করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। তখন বিদেশ থেকে নেওয়া হতে থাকলো প্রচুর শ্রমিক। এই বিদেশি শ্রমিকদের ঘাম আর মাহাথির মুহাম্মদের মেধার ওপর এখন দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক মালয়েশিয়া।


দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য মাহাথির বিনিয়োগ করেছিলেন শিক্ষা খাতেও। ৭০ এর দশকে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থীকে সরকারি খরচে লন্ডনে পাঠালেন তিনি। পড়ালেখা শেষ করার পর বৃটিশ সরকার তাদের বৃত্তি দিয়ে রেখে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এইসব শিক্ষার্থী দেশে ফিরে যান এবং দেশকে গড়ে তুলেন সোনার টুকরোর মতো করে।  মালয়েশিয়া তৈরি হয়েছে মাহাথিরের স্বপ্ন এবং শ্রমিকের ঘামে। আধুনিক বিশ্বের উন্নত এই দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুর। ওখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার। এটি বিদেশ থেকে ডেকে আনে হাজার হাজার পর্যটক। ১৪৮৩ ফুট উঁচু এই দালানটিতে সর্বমোট ৯৩টি তলা আছে। দুইপাশে দুটো টাওয়ার দাঁড়িয়ে। মাঝখানে কৃত্রিম ঝরনা। আছে আরো কিছু দালানও। সবটাজুড়ে নানা আয়োজন। রাতে ফোয়ারাগুলো ফুলে উঠে। টাওয়ার জ্বলতে থাকে। বাজে গানের সুর। দুই টাওয়ারের সংযোগে আছে একটি আকাশসেতু। ওখানে দাঁড়ালে পাখির চোখে দেখা যায় রাজধানী শহর কুয়ালালামপুর।
কুয়ালালামপুরে দেখার আছে অনেক কিছু। ঝাঁ চকচকে শহর কিম্বা প্রাচীন ঐতিহ্য। আছে মসজিদ, মন্দির। মন্দিরগুলো কিছু বৌদ্ধদের এবং কিছু হিন্দুদের। উপনিবেশ আমলের কিছু স্থাপনা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।


এই শহরটা আগে ছিলো গ্রাম। ১৮৫৭ সালে ভারতের সিপাহী বিদ্রোহের সময় চীন থেকে আসা একটি দল এই উপদ্বীপে আসে। বৃটিশদের অনুমতি নিয়ে বন কেটে বসতি গড়তে থাকে। সেই বসতিই এখন মালয়েশিয়ার রাজধানী।গোটা মালয়েশিয়া-ই অনন্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উঁচু পাহাড় এখানে। আছে নীল সাগর, রুপোর মতো বালির সৈকত, প্রবালদ্বীপ, নদী, বৃষ্টিবন, পাহাড়। আর রহস্যময় গুহা।
কুয়ালালামপুর থেকে দেড়শ কিলোমিটার দক্ষিণেই প্রাচীন বন্দর শহর মলাক্কা। মলাক্কা নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে শহরটি। পাথরে বাঁধানো সড়ক। দুই পাশে থরে থরে সাজানো অতীত।

এই লেখাটির ভিডিও রুপ দেখতে নীচের লিংকে  ক্লিক করুন

 https://www.youtube.com/watch?v=K8m1OmF2m-8