ফিলিপাইন আমাদের একেবারে কাছের দেশ না-হলেও খুব দূরের দেশও নয়। ইমেলদা মার্কোসের জুতার বহর, কোরাজন একুইনোর শাসন, মিন্দানাওয়ের স্বায়ত্ত্বশাসন লাভ ইত্যাদি কারণে ফিলিপাইন দেশটি আমাদের সংবাদপত্রে বিভিন্ন সময় শিরোনাম হয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বক্তব্যও বিশ্ব মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। সর্বশেষ খবর হলো, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তেকে বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তার জনপ্রিয়তার রেটিং ৯২ শতাংশ। এটা কিভাবে সম্ভব? আসুন জেনে নেই
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারীর সবচাইতে বড় শিকার ফিলিপাইন। দেশটিতে এ যাবত তিন লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় চলে এসেছে ফিলিপাইন।
এর পাশাপাশি এ বছর দেশটির অর্থনীতি সাত ভাগেরও বেশি নেমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ গত এক দশক ধরে এ দেশটি গড়পড়তা ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এসেছে।
এমন এক দুর্যোগময় পরিস্থিতির মাঝেও ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের জনপ্রিয়তার রেটিং দেখা গেছে আকাশছোঁয়া, যা দেখে কেবল এ কথাই বলা যায় যে, এ মুহূর্তে তিনিই বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জনপ্রিয়তা নিয়ে স¤প্রতি দেশব্যাপী জরিপ চালায় পালস এশিয়া। এটি ওই দেশের সবচাইতে প্রভাবশালী ও নিরপেক্ষ পোলিং এজেন্সিগুলোর একটি। গত ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত জরিপ চালিয়ে এ সপ্তাহে জরিপের ফল প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জনপ্রিয়তা বিস্ময়করভাবে আগের চাইতে চার শতাংশ বেড়ে গিয়ে ৯১ শতাংশে পৌঁছে গেছে। তাঁর প্রধান রাজনৈতিক মিত্র, ফিলিপাইন সিনেটের প্রেসিডেন্ট ভিসেন্তে সতো এবং সংসদের স্পীকার অ্যালান পিটার চায়েতানোর জনপ্রিয়তার রেটিং যথাক্রমে ৮৪% ও ৭০%।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আরেকটি জরিপ চালায় পালস এশিয়া। এতে দেখা যায়, করোনা মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় সন্তুষ্ট ৯২ ভাগ মানুষ। একই কাজে তাঁর সরকারের ভূমিকা অনুমোদন করেছে ৮৪ শতাংশ নাগরিক।
ফিলিপাইনের যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট, সেই লেনি রবেদো বিরোধী দলের প্রধান নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তাও একেবারে কম নয় - ৫৭ শতাংশ। তবে তাঁর তুলনামূলক কম জনপ্রিয়তা নিয়ে ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েননি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র হ্যারি রক। তিনি বলেন, ''ম্যাডাম ভাইস প্রেসিডেন্ট, দেখলেন তো, আমার কথাই ঠিক হলো। ফিলিপিনোরা এমন দুর্যোগের মাঝে রাজনীতি দেখতে চায় না। রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করুন। তাতে আপনার রেটিং আরো বাড়বে।
কোভিড মহামারী দমন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের বহুল আলোচিত ব্যর্থতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সমালোচকরা জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নেটিজেনদের তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছে জরিপের ফলাফল। তাঁরা নানা কটু মন্তব্যে তুলোধুনা করেছেন তাঁদের ভাষায় 'একপেশে' জরিপকে।
সমালোচকরা তর্জনী তুলেছেন জরিপের সময়ের দিকে যে এতদিন চুপচাপ থাকার পর হঠাৎ এ সময় এ জরিপ কেন। তাঁরা জরিপের পরিচালনপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, দেশের সর্ববৃহৎ মিডিয়া নেটওয়ার্ক এবিএন-সিবিএন বন্ধ হওয়া এবং সরকারের সমালোচকদের ওপর দমন অভিযান চলার কারণে দেশে যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে এ জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু?
সুক্ষ দৃষ্টিতে পরীক্ষা করলেও জরিপের ফাঁকটুকু ধরা পড়ে। যেমন খোদ জরিপকারী সংস্থা পালস এশিয়াই বলেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬২ শতাংশ প্রেসিডেন্টের কার্যক্রমকে ''সত্যিকার অনুমোদন'' করেছে আর শতকরা ৩০ ভাগই করেছে ''কোনো-না-কোনোভাবে'' অনুমোদন। এই যদি হয় অবস্থা, সেক্ষেত্রে ৯২ ভাগ জনপ্রিয়তার দাবি ধোপে টিকে কি?
প্রেসিডেন্ট দুতার্তে সরকারের কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলাকে কোনো-না-কোনোভাবে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনাঢ্য শ্রেণি।
প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জনপ্রিয়তার রেটিং এত উঁচুতে পৌঁছে যাওয়ার আরেকটা কারণ হলো মিন্দানাও প্রদেশবাসীর একচেটিয়া সমর্থন। সেখানে তিনি ৯৮ ভাগ মানুষের সমর্থন পেয়েছেন। এর কারণও আছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ প্রদেশটিকে স্বায়ত্বশাসন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। এর মধ্য দিয়ে মিন্দানাওয়ে কয়েক যুগের রক্তারক্তির অবসান ঘটেছে। পাশাপাশি দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের ৯৫ ভাগের সমর্থন পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। এর কারণ হলো, সপ্তাহকয়েক আগে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষকে অর্থনৈতিক সহায়তা ও ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাসম্বলিত একটি আইন করেছে প্রেসিডেন্ট দুতার্তের সরকার।
গত আগস্টে পরিচালিত এক জরিপে প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে ৬৪ ভাগে নেমে আসে। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো নেয়ার পর পরিস্থিতি আবার পাল্টে যায়। অবশ্য ভয়ভীতিও জরিপের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে - একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই শহুরে দরিদ্র। প্রেসিডেন্ট দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানকালে এ শ্রেণীর মানুষই প্রধানত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়। তারা এখন কোন সাহসে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে?
এ বাস্তবতাটি প্রকাশ্যে মেনেও নিয়েছেন ফিলিপাইনের প্রধান দুই জরিপ সংস্থা পালস এশিয়া এবং সোশ্যাল ওয়েদার স্টেশনস-এর প্রধানগণও। বলেছেন, দেশে যেমন ভীতিকর আবহাওয়া, তাতে করে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনের কথাটি কতোটা প্রকাশ করেছেন, কে জানে!
অবশ্য জনপ্রিয়তার এ রকম মগডালে চড়ে বসাটা কেবল ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তের বেলাতেই ঘটেছে, এমন নয়। সঙ্কট মোচনে বিরাট ব্যর্থতার পরও অনেক দেশের নেতাদের জনপ্রিয়তার রেটিং বেশ বেড়ে যেতে দেখা গেছে।
উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর কথাই বলা যায়। তিনি কোভিড-১৯ হুমকিকে পাত্তাই দিতে চাননি এবং লকডাউন আরোপের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। এর ফলে কোভিড-১৯ সংক্রমণে তার দেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে পৌঁছে যায়। অথচ গত আগস্টে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় তাঁর জনপ্রিয়তা ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ভারতেও একই কান্ড। করোনা দেশটির অর্থনীতিকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। লাখ-লাখ শহুরে দরিদ্র মানুষকে করেছে ছিন্নমূল। কিন্তু কী অবাক কান্ড, এর মাঝেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার রেটিং গিয়ে পৌঁছেছে ৯০ শতাংশে।
এর মধ্য দিয়ে এটাই পরিষ্কার হয় যে, অনেক নেতার কার্যক্রম তাদের জনপ্রিয়তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। প্রেসিডেন্ট দুতার্তের মতো ডানপন্থী নেতারা চরম অনিশ্চয়তা ও ভীতিকর অবস্থার মধ্যেও দেশবাসীকে দেখাতে পারেন যে তাঁদের হাতেই দেশ ও জাতি নিরাপদ।
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে সেই মার্চ মাস থেকেই মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন। দেশবাসীকে জানাচ্ছেন করোনা পরিস্থিতি এবং সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা। এছাড়া ফিলিপাইনের নেতা তাঁর দেশে কঠিনতম ও দীর্ঘতম লকডাউন আরোপের দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছেন। এতে দেশটির অর্থনীতি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্থ হলেও রক্ষা পেয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট দুতার্তের সমর্থকরা নেমে পড়েছে মাঠে। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার সাথে ফিলিপাইনের করোনা পরিস্থিতির তুলনা করে দেখিয়ে দিতে চাইছে, প্রেসিডেন্ট দুতার্তের কুশলী ব্যবস্থাপনায় করোনা পরিস্থিতি কতোটা নিয়ন্ত্রণে আছে।
বাস্তবিকই সা¤প্রতিক মাসগুলোতে দেশের করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট, যা তাঁকে অব্যবস্থাপনার দুর্নাম থেকে অনেকটা রেহাই দিয়েছে। তবে সরকার যদি জনগণকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে না-যেতে পারে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দুর্বলই থেকে যায়, তাহলে প্রেসিডেন্ট দুতার্তের জনপ্রিয়তার পারদ নাটকীয়ভাবে নিম্নগামী হতে থাকবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
এটা শুধু প্রেসিডেন্ট দুতার্তের বেলাতেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে তার মতো জনতুষ্টিবাদী নেতাদের বেলায়ও সত্য। তাদের ভাগ্যে কী আছে, আগামী দিনই তা বলে দেবে।
বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে