গোয়েন্দা অ্যাডভেঞ্চারে মোদির বিপর্যয়

- সংগৃহীত

  • মোতালেব জামালী
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪:২৯

কানাডায় বসবাসরত খালিস্তান আন্দোলনের এক নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারত-কানাডা সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের ১৮ জুন কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত, এমন অভিযোগ তুলেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতের কূটনীতিক ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কর্মকর্তা পবন কুমার রাইকে বহিষ্কার করেছে কানাডা। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারতও বহিষ্কার করেছে দিল্লিতে নিযুক্ত কানাডার এক কূটনীতিককে। এর আগে ভারতের সাথে চলমান বাণিজ্য আলোচনাও স্থগিত করার ঘোষণা দেয় কানাডা। কানাডার এসব ঘোষণা মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা বিপর্যয় হিসাবে দেখা হচ্ছে। যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে শিখ নেতা হত্যায় ভারতের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, কানাডার কোনো সহিংস ঘটনায় ভারত সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। উল্টো ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কানাডা সরকার দেশটিতে শিখদের ভোটের হিসাব মাথায় রেখে খালিস্তানপন্থীদের ভারতবিরোধী তৎপরতা প্রশ্রয় দিচ্ছে।



১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় পাঞ্জাব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর এক অংশ ভারতে ও অন্য অংশ পাকিস্তানে পড়ে। দুটি অংশই দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। ভারতের স্বাধীনতাকামী শিখরা এই দুটি এলাকা নিয়ে খালিস্তান নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। হরদীপ সিং নিজ্জর কানাডায় খালিস্তান আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন।

ভারতের বাইরে কানাডাতেই শিখদের বসবাস সবচেয়ে বেশি। এ সংখ্যা প্রায় ৮ লাখের কাছাকাছি। কানাডা ছাড়াও পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ায় খালিস্তানপন্থী শিখদের জোরালো তৎপরতা রয়েছে। স্বাধীনতাকামী শিখদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে আসছে ভারত সরকার। বিশেষ করে কানাডা সরকারের কাছে জোরালোভাবে বিষয়টি উত্থাপন করেছে ভারত।

সম্প্রতি বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে খালিস্তান আন্দোলনের বেশ কয়েকজন নেতার রহস্যজনক মৃত্যু নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন শিখ নেতা গত মে-জুন মাসে মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে নিহত হন। এরমধ্যে হরদীপ সিং নিজ্জর হলেন তৃতীয় শিখ নেতা। এর আগে গত ৬ মে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে গুলি করে হত্যা করা হয় খালিস্তান কমান্ডো ফোর্সের প্রধান পরমজিৎ সিং পাঞ্জওয়ারকে। এরপর ১৪ জুন ব্রিটেনের বার্মিংহামের একটি হাসপাতালে খালিস্তান লিবারেশন ফোর্সের প্রধান অবতার সিং খান্ডার নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুকে রহস্যময় বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

গত ১৮ জুন সন্ধ্যায় কানাডার পূর্বাঞ্চলীয় ভ্যাঙ্কুভারের এক শহরতলীতে খুন হন নিজ্জর। একটি শিখ মন্দির বা গুরুদুয়ারার বাইরে একটি গাড়িতে থাকা মুখোশ পরা দুই ব্যক্তি হরদীপ সিং নিজ্জরকে গুলি করে হত্যা করে। খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থকদের অভিযোগ তিনটি হত্যাকাণ্ডেই হাত রয়েছে ভারতের। ভ্যাঙ্কুভার কানাডার শিখ অধ্যুষিত একটি এলাকা। ট্রুডোর সরকার নিজ্জর হত্যার সঙ্গে ভারত সরকারের জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে।

হরদিপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে কানাডায় নিযুক্ত ভারতের কূটনীতিক ও গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং ‘র’-এর কর্মকর্তা পবন কুমার রাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আনে কানাডা সরকার। এর পরপরই তাকে বহিষ্কার করে কানাডা।

নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ খুবই গুরুতর বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই হাউস অব কমন্সে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। এটা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার জন্য একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। কারণ, বহু দেশে কূটনীতিকের আড়ালে গোয়েন্দারা কাজ করে থাকেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে এভাবে জড়িয়ে পড়া এবং প্রমাণসহ নাম প্রকাশ হয়ে পড়া বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা।

শিখ নেতা নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িত থাকার প্রমাণ না পেলে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো পার্লামেন্টে এমন অভিযোগ কখনও তুলতেন না। শুধু তাই নয়, তিনি বিষয়টি নিয়ে মিত্র দেশের সরকার প্রধানদের সাথে কথা বলেন। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সরকার প্রধান রয়েছেন।

কানাডার মাটিতে সে দেশের নাগরিক হত্যাকে ফাইভ আইস-ভুক্ত অপর চার দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ব্রিটেন গুরুতর বিষয় হিসাবে দেখবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে নিবিড় গোয়েন্দা সহযোগিতা। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একসাথে কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো স্পষ্টভাবে এ ঘটনাকে তার দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন। ফলে এসব দেশ কানাডার নেওয়া পদক্ষেপকে জোরালোভাবে সমর্থন করবেন। ফলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে ভারতের গোয়েন্দা কার্যক্রমের ওপর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

কানাডার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ট্রুডো অভিযোগ করেন, হরদীপ সিংকে খুনের পেছনে ভারতের হাত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তার সরকারের কাছে রয়েছে। তাদের কাছে সেই প্রমাণ যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। ট্রুডো বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরে কানাডার এক নাগরিককে এভাবে হত্যা করা, বিদেশিদের এমন প্রত্যক্ষ যোগসাজশ কানাডার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। পার্লামেন্টে ওই অভিযোগের পরই কানাডায় নিযুক্ত এক ভারতীয় কূটনীতিককে বহিষ্কারের কথা জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানিয়া জোলি। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই কূটনীতিক কানাডায় ‘র’-এর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিখ নেতা নিজ্জর হত্যার বিষয়টি কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো ভারতে সদ্যসমাপ্ত জি-২০ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে উত্থাপন করেছিলেন। এরপর কানাডার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে নিজ্জর হত্যায় সরাসরি ভারত সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি।
এই ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অষ্ট্রেলিয়া।

হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র অ্যাড্রিয়েন ওয়াটসন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো যে অভিযোগগুলো করেছেন তাতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা কানাডার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কানাডার তদন্ত এগোচ্ছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, এই গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে আমাদের কানাডিয়ান অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি। তবে তদন্ত চলাকালে এ-নিয়ে আরও মন্তব্য করা অনুচিত হবে। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, অস্ট্রেলিয়াও এই অভিযোগটি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। অস্ট্রেলিয়া এ ইস্যুতে চলমান তদন্তের বিষয়ে অবগত। আমরা বিষয়টি নিয়ে আমাদের অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি ভারতের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে।

কানাডার এই ঘটনার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শিখদের আন্দোলন আরো জোরদার হতে পারে। চলতি বছরের প্রথম দিকে ভারতে শিখ স্বাধীনতাকামী নেতা অমৃত পাল সিংকে গ্রেফতার করে মোদির সরকার। তার বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে খালিস্তান আন্দোলন জোরদার করা ও সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। এর প্রতিবাদে খালিস্তানপন্থিরা লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনে হামলা চালিয়ে ভবনের জানালা ভাংচুর করে ও ভবনে টানিয়ে রাখা ভারতের জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলে।

এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে ভারতীয় কন্স্যুলেটের জানালা ভাংচুর ও দুতাবাসের কর্মীদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের দূতাবাসগুলোতে এ ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানায় এবং দিল্লিতে ব্রিটেনের উপরাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সম্প্রতি জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে এসেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। সম্মেলনের অবসরে সামান্য কিছু সময়ের জন্য তিনি কথা বলেন মেদির সাথে। এ-সময় তিনি শিখ নেতা নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি মোদির কাছে উত্থাপন করেন। কিন্তু খালিস্তান ইস্যুতে মোদি উল্টো কথা শুনিয়ে দেন ট্রুডোকে। জি-২০ সম্মেলন থেকে ফিরে কানাডা সরকার ভারতের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

মোদি খালিস্তানিদের প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর অভিযোগ করেন ট্রুডোর বিরুদ্ধে। বৈঠকে মোদি বলেছিলেন, কানাডায় ভারতীয় দূতাবাসে একাধিকবার খালিস্তানিরা হামলা চালিয়েছে। কানাডার সরকার হামলাকারী কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। সেই বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ট্রুডো বলেছিলেন, কানাডায় সবার চেতনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার আছে।

ভারতের সাথে কূটনৈতিক পদক্ষেপের অংশ হিসাবে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করেন ট্রুডো। ২০১০ সাল থেকেই ভারত ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনা আবার শুরু হয়। মাত্র তিন মাস আগেই দুই দেশ জানিয়েছিল, চলতি বছরের মধ্যেই মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে তারা একটি চুক্তি করতে চায়।

কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ম্যারি এনজির নেতৃত্বে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অক্টোবর মাসে দিল্লিতে আসার কথা ছিল একটি প্রতিনিধি দলের। কিন্তু সেই সফর বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কানাডায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত সঞ্জয় কুমার ভার্মা দেশটির সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, কেন এই সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নিজ্জর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ভারতের সাথে কানাডার সর্ম্পকের যে অবনতি হয়েছে তা শুধু কানাডার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পাকিস্তান বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে থাকে, সে দেশে সন্ত্রাসী হামলার পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে। কিন্তু কানাডা বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশ পাকিস্তান নয়। মোদির অ্যাডভেঞ্চার এসব দেশ কখনও স্বাভাবিক ভাবে নেবে না। কারণ, এমন পদক্ষেপ এসব দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে দেখবে। ফলে খালিস্তান ও নিজ্জর হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে ভারত-কানাডা সম্পর্কে যে ফাটল তৈরি হয়েছে. তা খুব সহজে জোড়া লাগবে বলে মনে হয় না।