মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ মারিয়ানা - ইন্টারনেট

  • মেহেদী হাসান
  • ৩১ আগস্ট ২০২০, ০০:২৪

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ মারিয়ানা আইল্যান্ডস গত ৫শ বছর ধরে বিশ্বের চারটি পরাশক্তির দখল আর পাল্টা দখলের শিকার হয়েছে। মারিয়ানা আইল্যান্ডস দখলের কারনে বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছে হাজার হাজার সৈন্য আর স্থানীয় অধিবাসী। গত ৫শ বছরের মধ্যে মারিয়ানা আইল্যান্ডস প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ছিল স্পেনের কলোনী। এরপর জার্মানী এবং জাপান হয়ে বর্তমানে এ দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ। বিডি ভিউজ ইনফোটেইনমেন্টে স্বাগত জানাচ্ছি আমি সাবরিনা কাজী। মারিয়ানা আইল্যান্ডস কেন এতো গুরুত্বপূর্ন আজ জানাবো সেই তথ্য

মারিয়ানা আইল্যান্ডস এর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গুয়াম। এখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র্রের খূবই শক্তিশালী সামরিক ঘাটি। মারিয়ানার আরেক দ্বীপ তিনিয়ান । ১৯৪৫ সালে এখান থেকেই জাপানে বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

মারিয়ানা আইল্যান্ডস চীনের অনেক কাছে অবস্থিত। চীন সীমান্ত থেকে এর দূরত্ব দেড় হাজার মাইলের কিছু বেশি। ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে বর্তমানে যে আধিপত্য কেন্দ্রিক লড়াই চলছে তার প্রেক্ষাপটে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। মারিয়ানা আইল্যান্ডের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর পশ্চিমে। এর আকৃতি ক্রিসেন্ট বা অর্ধচন্দ্রাকৃতি। আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে সৃষ্টি ১৫টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত মারিয়ানা আইল্যান্ডস নামের এ দ্বীপপুঞ্জ।

মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের আয়তন ১ হাজার ৫ বর্গকিলোমিটার। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের সর্ব দক্ষিনের দ্বীপ থেকে সর্ব উত্তরের দ্বীপের দৈর্ঘ্য মোট ৭৫০ কিলোমিটার। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে দুটি প্রশাসন রয়েছে। উত্তরের ১৪টি দ্বীপ ইউএস কমনওয়েলথ অব নর্দার্ন মেরিনা আইল্যান্ড নামে পরিচিত। আর দক্ষিনে রয়েছে ইউএস টেরিটরি অব গুয়াম।

নর্দান মারিয়ানা আইল্যান্ডস এর সবচেয়ে বড় শহর হলো সাইপান। এটিই নর্দার্ন মারিয়ানা আইল্যান্ডের রাজধানী। নর্দার্ণ মারিয়ানার ৩৫ ভাগ ফিলিপিনো, ২৪ ভাগ চামোরো, ১৩ ভাগ মাল্টি রেসিয়াল, ৭ ভাগ চাইনিজ, ৫ ভাগ জাপানিজ, ৪ ভাগ কোরিয়ান রয়েছে।

অপর দিকে গুয়াম দ্বীপের অধিবাসীদের ৩৭ ভাগ আদিবাসী চামেরো। ফিলিপিনোদের সংখ্যা ২৬ ভাগ। সাদা আমেরিকান ৭ ভাগ এবং চীন, জাপানসহ এশিয়ার অন্যান্য আদীবাসী রয়েছে সেখানে। গুয়াম দ্বীপের জনসংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার প্রায়।

মারিয়ানা আইল্যান্ডস এর অধিবাসীরা জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিক । নর্দান মারিয়ানা আইল্যান্ডের ১৪টি দ্বীপের মধ্যে ১০টিতে বর্তমানে কোনো মানুষের বসবাস নেই। কারন এসব দ্বীপে অগ্নুৎপাতের ঝুকি রয়েছে এখনো। মারিয়ানা আইল্যান্ডের সর্ব দক্ষিনে অবস্থান গুয়াম দ্বীপের। গুয়াম দ্বীপ মেরিনা চেইনের অংশ। মারিয়ানা আইল্যান্ডের উত্তর পশ্চিমে জাপান, পূর্বে ফিলিপাইন, দক্ষিনে পাপুয়া নিউগিনি ও ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চল। ফিলিপাইন সাগরের শেষ সীমানা মারিয়ানা আইল্যান্ডস। আসুন জেনে নেই এই দ্বীপ সর্ম্পকে আরো কিছু তথ্য

মারিয়ানা দ্বীপের নাম রাখা হয়েছে স্পেনের রাণী মারিয়ানার নামে। ১৭ শতকে স্পেনের কলোনীতে পরিণত হয় মারিয়ানা দ্বীপপ্ঞ্জু। ১৬ শতকের শুরুতে পর্তুগীজ নাবিক ম্যাগেলান প্রথম ইউরোপীয়ান হিসেবে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে আসেন। স্পেনের পক্ষে তিনি এ অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে স্পেন একে কলোনী বা উপনিবেশে পরিণত করে। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গুয়ামে তারা স্থাপন করে রাজধানী।

মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের আদি অধিবাসীদের বলা হয় চামেরো । চামেরো আদিবাসীরা মূলত অস্ট্রোনেশিয়ান তথা পূর্ব ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া দ্বীপের সাথে সম্পর্কিত লোকজন। চামেরো আদিবাসীরা প্রায় ৪ হাজার বছর আগে এখানে বসতি স্থাপন করে।

২০১৩ সালে এক গবেষণার ভিত্তিতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন মারিয়ানা দ্বীপে যারা প্রথম বসতি স্থাপন করেছে তারাই হতে পারে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র অভিযানের অধিকারী। ২০১৩ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদদের গবেষণা অনুযায়ী ওশেনিয়া অঞ্চলে প্রথম মানব বসতি শুরু হয় মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের তিনিয়ান দ্বীপে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি, তাসমানিয়া, মেলানেশিয়া, মাইক্রেনেশিয়া প্রভৃতি দেশ ও আরো অনেক দ্বীপ নিয়ে গঠিত ওশেনিয়া অঞ্চল।
হযরত ঈসার জন্মের দেড় হাজার বছর আগে তৈর মাটির জিনিসপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে। একই ধরনের মাটির জিনিসপত্র পাওয়া গেছে ফিলিপাইনে যা হযরত ঈসার জন্মের ১৩শ থেকে ২ হাজার বছর আগে বিকশিত হয়েছে সেখানে। অনুমান ৪ কোটি ২০ লাখ বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগর ও ফিলিপাইন সাগর প্লেটের ঘর্ষনের ফলে সৃষ্ট আগ্নেয়গিরি থেকে গঠিত হয়েছে মারিয়ানা আইল্যান্ডস।

গুয়াম দ্বীপ থেকে জাপান পর্যন্ত দেড় হাজার মাইল জুড়ে রয়েছে জলমগ্ন বিশাল এক পবর্তশ্রেণী। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে হাজার হাজার ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত মাইক্রোনেশিয়া। মাইক্রোনেশিযার উত্তরে বড় একটি দ্বীপ শ্রেণী নিয়ে গঠিত মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ।

গুয়াম দ্বীপে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান এবং নৌ ঘাটি। এখানকার বিমান ঘাটিতে যুবক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী, কৌশলগত বোমারু বিমান মোতায়েন রয়েছে যা পরমানু বোমা বহনে সক্ষম। মোতায়েন রয়েছে পরমানু শক্তিচালিত এটাক সাবমেরিন ও সাবমেরিন টেন্ডার। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ড, প্যাসিফিক ফ্লিটের ভিত্তি হলো গুয়াম দ্বীপ। প্রশান্ত মহসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি আর আধিপত্যের উৎস মারিয়ানা আইল্যান্ডস এর গুয়াম দ্বীপ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডস প্রায় সাড়ে তিনশ বছর স্পেনের দখলে ছিল। ১৮৯৮ সালে স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধে স্পেনের পরাজয়ের ফলে মারিয়ানা আইল্যান্ডের গুয়াম দ্বীপ দখল করে যুক্তরাষ্ট্র। স্পেন এসময় তার অধীনে থাকা অনেক দ্বীপ বিক্রি করে জার্মানির কাছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের দখল চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই মারিয়ানা আইল্যান্ডস দখল নেয় জাপান। এ যুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর আবার মারিয়ানার দখল নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে মাঝখানে জাপানের আড়াই বছর ছাড়া গত একশ বছরের বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ মারিয়ানা আইল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্রের দখলে রয়েছে।

মারিয়ানা আইল্যান্ডস এ আগমনকারী প্রথম ইউরোপীয়ান হলেন বিশ্বখ্যাত নাবিক ফার্ডিনান্ড মেগালান। তিনি পর্তুগীজ নাবিক। স্পেনের রাজার অনুরোধে ইস্ট ইন্ডিজ অভিযানের নেতৃত্ব দেন নাবিক মেগালান। ১৫২১ সালের ৬ মার্চ তিনি মারিয়ানা আইল্যান্ডস এ আসেন।

১৫৬৫ সালে স্পেন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জকে তাদের দ্বীপ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ১৬৬৭ সালে স্পেন মারিয়ানাকে কলোনীতে পরিণত হয়। স্পেনের রানীর নাম অনুসারে এসময় তারা এ দ্বীপের নাম দেয় ‘লাস মারিয়ানাস’। তখন থেকে এখানে স্প্যানিশদের বসবাস শুরু হয়।

১৫৬৫ থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত ফিলিপাইন ছিল স্পেনের কলোনী। মারিয়ানা আইল্যান্ডস ছিল তখন জেনারেল গর্ভমেন্ট অব দি ফিলিপাইনস এর অধীন। ১৮৯৮ সালে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কাছে পরাজিত হয় স্পেন। ফলে ফিলিপাইনসহ মারিয়ানা আইল্যান্ডের গুয়াম দ্বীপের দখল নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

মাইক্রোনেশিয়ার ৬ হাজারের বেশি দ্বীপ স্পেনের অধীন ছিল এক সময়। স্পেন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জসহ এসব দ্বীপ তখনকার ৪১ লাখ ইউএস ডলারে বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নর্দার্ন মারিয়ানা আইল্যান্ডস, মার্শাল আইল্যান্ডসহ জার্মানির অধীনে থাকা এ অঞ্চলের সব দ্বীপ দখল করে জাপান।

মারিয়ান দ্বীপপুঞ্জের গুয়াম দ্বীপ তখনো যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে ছিল, যা বহাল থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ১৯৪১ সালে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের গুয়াম দ্বীপও দখল করে জাপান। এভাবে পুরো মারিয়ানা দ্বীপ জাপানের দখলে চলে আসে। তবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র গুয়াম দ্বীপসহ পুরো মারিয়ান আইল্যান্ডস দখল করে।

মারিয়ানা দ্বীপের নাম রাখা হয়েছে স্পেনের রাণী মারিয়ানার নামে । ছবি : ট্রাভেল আপডেট
মারিয়ানা দ্বীপের নাম রাখা হয়েছে স্পেনের রাণী মারিয়ানার নামে । ছবি : ট্রাভেল আপডেট

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের ৫টি অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে ছিল। এগুলো হলো আজকের ফিলিপাইন, মাইক্রোনেশিয়ার গুয়াম এবং ওয়েক আইল্যান্ড, পলি নেশিয়ার সামোয়া এবং হাওয়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো মারিয়ানা আইল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আসে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র মারিয়ানা দ্বীপের অধিবাসীদের আমেরিকান সিটিজেন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৬ থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত মারিয়ানা আইল্যান্ডস ছিল স্প্যানিশদের মেনিলা গ্যালিয়নস বানিজ্য জাহাজের অন্যতম যাত্রা বিরতি স্থল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভবিষ্যত যে কোনো যুদ্ধে চীন ও উত্তর কোরিয়ার অন্যতম লক্ষ্য মারিয়ানা আইল্যান্ডস। চীন ও উত্তর কোরিয়া ঊভয় যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকা এ দ্বীপপুঞ্জকে লক্ষ্য করে দেশ বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র উদ্ভাবন করেছে । চীনের আকস্মিক হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি মারিয়ানা আইল্যান্ডস এর গুয়াম দ্বীপ থেকে সরিয়ে নিয়েছে তাদের মূল্যবান অনেক বোমারু বিমান।

বিডিভিউজ-এ প্রকাশিত লেখার স্বত্ব সংরক্ষিত। তবে শিক্ষা এবং গবেষণার কাজে সূত্র উল্লেখ করে ব্যবহার করা যাবে